২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে
তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক যুগ পরেও
ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পাশে যে অন্যায় ও প্রতারণার চিত্র বিদ্যমান, তা গভীরভাবে হতাশাজনক।
এই পরিকল্পিত অগ্নিদুর্ঘটনায় ১১৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ১৭২ জন গুরুতর আহত
হয়েছিলেন। তাদের সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং সর্বোপরি, কারখানা মালিক
দেলোয়ারসহ দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অতীতের এবং বর্তমান—উভয় সরকারের ভূমিকা
নিয়েই আজ গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
বিগত সরকারের ভূমিকা: বিচার নয়, পুরস্কার!
বিগত সরকারের আমলে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির
বিচার নিশ্চিত না হওয়াটা ছিল ন্যায়বিচারের প্রতি এক চরম উপহাস। সবচেয়ে নিন্দনীয়
বিষয় হলো, যে দেলোয়ার হোসেনের চরম অবহেলা ও পরিকল্পিত কারসাজিতে এতগুলো শ্রমিকের
জীবন গেল, তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো দলীয় পদে
ভূষিত করে 'পুরস্কৃত' করা হয়েছে।
এই পদক্ষেপটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন
দলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকের জীবনের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে এবং ধনিক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতাকে
বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা বিচার পাওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি মানসিক
যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন এবং সমাজে একটি বার্তা পৌঁছেছে—অর্থ এবং ক্ষমতা
থাকলে গুরুতর অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়।
বর্তমান সরকারের আশ্বাস ও বাস্তবতার ফারাক
বর্তমান সরকার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এবং তাদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে
আসছে। এসব আশ্বাস কার্যত কেবলই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি হয়ে রয়ে গেছে।
- উদ্যোগের অভাব: আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও ক্ষতিগ্রস্ত
শ্রমিকদের সুচিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার
জন্য বাস্তব বা দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
- বিচার প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা: কারখানার
মালিক দেলোয়ারসহ দায়ীদের বিচারের মামলাটি এখনও আদালতের বারান্দায় ঝুলে আছে।
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়ে দিচ্ছে, শ্রমিকদের
প্রতি সরকারের আন্তরিকতা কেবল মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ।
শ্রমিকদের প্রতি ধারাবাহিক প্রতারণা
তাজরীন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা ধারাবাহিকভাবে
প্রতারিত হয়েছেন। প্রথমত, কারখানা মালিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার প্রতারণার
শিকার হয়েছেন। এরপর, বিগত সরকারের বিচার না করার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
এবং সবশেষে, বর্তমান সরকারের মিথ্যা আশ্বাসের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি,
কিন্তু তাদের বিপদে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের এমন উদাসীনতা শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের
প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এই বিচারহীনতা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
তাজরীন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা ন্যায়বিচার, সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের দাবিদার।
সরকারের উচিত, দলীয় রাজনীতি বা আর্থিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে—কেবল কথার কথা না
বলে—দ্রুততম সময়ের
মধ্যে দেলোয়ারসহ সব দায়ীর বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জীবনমান উন্নয়নে
সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দরকষাকষি
বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

No comments:
Post a Comment