বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ১২৪ক: শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তবে যে শ্রমিকের গায়ের ঘামে এই শিল্পের চাকা সচল থাকে, তাঁদের আইনগত পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘটে নানা অনিয়ম ও প্রতারণা। অতি সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’-এর ১২৪ক ধারা ব্যবহার করে শ্রমিকদের আইনি পাওনা থেকে বঞ্চিত করার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইনগতভাবে কোনো বিরোধ দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে আপোষ-মীমাংসার এই বিধান তৈরি করা হলেও, বাস্তবচিত্রে এটি হয়ে উঠেছে অসাধু মালিক ও সুবিধাভোগী কিছু শ্রমিকনেতার যোগসাজশে শ্রমিক ঠকানোর এক ‘মহা হাতিয়ার’।
১২৪ক ধারার আইনি উদ্দেশ্য ও তার বাস্তবতা
আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকদ্দমা এড়িয়ে শ্রমিকের বকেয়া মজুরি এবং প্রাপ্য পাওনা দ্রুত পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা। আইনের ১২৪ক ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে:
আবেদনের সুযোগ (উপ-ধারা ১): কর্মে কর্মরত, অবসরে যাওয়া, চাকরিচ্যুত বা বরখাস্তকৃত শ্রমিক বা শ্রমিকরা মজুরিসহ আইনত প্রাপ্য পাওনা আদায়ে প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে পারেন।
সময়সীমা (উপ-ধারা ২ ও ৩): আবেদন পাওয়ার সর্বোচ্চ ২০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উদ্যোগ গ্রহণ করে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন।
সিদ্ধান্ত ও কার্যকারিতা (উপ-ধারা ৪ ও ৫): সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে দুই পক্ষকে দিতে হবে এবং তা পালনে পক্ষসমূহ বাধ্য থাকবে।
শ্রম আদালতে আপিলের পথ (উপ-ধারা ৬): কোনো পক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সিদ্ধান্তে সম্মত না হলে তারা শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবেন এবং আদালত এই মধ্যস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।
কাগজে-কলমে এই প্রক্রিয়াটি শ্রমিকের জন্য সময় ও অর্থ বাঁচানোর কথা থাকলেও, বাস্তবে এতে চরম ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বেআইনি কারসাজি চলছে।
যেভাবে হচ্ছে প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার
১২৪ক ধারার সুবিধা নিয়ে কিছু অসাধু পক্ষ আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করছে, যা মূলত তিনটি প্রধান উপায়ে শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে:
আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, শ্রমিক নিজে বা শ্রমিকরা সরাসরি প্রধান পরিদর্শকের কাছে আবেদন করবেন। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকদের সরাসরি যুক্ত না করে অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত কিছু ফেডারেশন বা অসাধু শ্রমিকনেতা শ্রমিকদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের প্রতিনিধি সেজে আবেদন করছেন। অথচ আইনি ভিত্তিতে শ্রমিকদের আইনি সর্বনিম্ন পাওনার চেয়ে কম মূল্যে রফাদফা বা আপোষ করার কোনো এখতিয়ার বা অধিকার এই প্রতিনিধি বা ফেডারেশনগুলোর নেই।
শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের সার্ভিস বেনিফিট, নোটিশ পে, ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া মজুরি পাওয়া একটি নির্দিষ্ট আইনি অধিকার (Statutory Right)। এটি মালিকের কোনো অনুগ্রহ নয়। কিন্তু ১২৪ক ধারার অধীনে মধ্যস্থতার নামে অসাধু মালিক ও শ্রমিকনেতারা যোগসাজশ করে শ্রমিকদের আইনত প্রাপ্য সর্বনিম্ন সুবিধার চেয়ে অনেক কম অর্থে ‘আপোষ’ করতে বাধ্য করছেন। ফলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অর্ধেক বা তারও কম টাকায় সই দিয়ে চলে যাচ্ছেন।
অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির পর শ্রমিককে দিয়ে এমনভাবে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বা বুঝানো হয় যে, তারা আর কোথাও অভিযোগ করতে পারবেন না। ফলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিকরা।
সম্প্রতি লিথি গ্রুপ, ইউনিক ডিজাইনসহ বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিকের সাথে আপোষ-মীমাংসার নামে এই ধরনের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। যেখানে শত শত শ্রমিকের কোটি কোটি টাকার আইনি পাওনাকে ১২৪ক ধারার দোহাই দিয়ে নামমাত্র টাকায় নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
এই অনিয়মের লাগাম এখনই টেনে ধরা না গেলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এবং সামগ্রিক শ্রম খাতের জন্য এর পরিণতি হবে মারাত্মক:
শ্রমিকরা যখন বুঝতে পারবেন যে আইনি প্রক্রিয়াতেও তারা প্রতারিত হচ্ছেন, তখন আইনি ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা উঠে যাবে। ফলে তারা রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হবেন, যা শিল্পে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা ডেকে আনবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং বিদেশী ক্রেতারা (Buyers) বাংলাদেশে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। ১২৪ক ধারার এই অপব্যবহারের খবর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছালে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে এবং অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হবে।
চাকরি হারানোর পর পাওনা না পেয়ে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার চরম অর্থনৈতিক মানবেতর জীবনের মুখে পড়বে।
১২৪ক ধারাকে শ্রমিক ঠকানোর মাধ্যম থেকে রক্ষা করে পুনরায় ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর কোনো প্রতিনিধি এমন কোনো আপোষ-মীমাংসা অনুমোদন বা সই করতে পারবেন না, যা শ্রম আইনে নির্দিষ্টকৃত ন্যূনতম প্রাপ্য পাওনার চেয়ে কম। আইনি পাওনার চেয়ে কম অর্থমূল্যে সমঝোতা করাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ ঘোষণা করতে হবে।
মধ্যস্থতা বৈঠকে শ্রমিকদের সরাসরি উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো অননুমোদিত ফেডারেশন বা নেতার মধ্যস্থতায় শ্রমিকের অবর্তমানে সমঝোতা করা বন্ধ করতে হবে।
ডিআইএফই (DIFE) বা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা অসাধু আপোষ-মীমাংসায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সই করছেন, তাঁদের ওপর কঠোর গোয়েন্দা তদারকি চালাতে হবে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
১২৪ক ধারার উপ-ধারা (৬) অনুযায়ী কোনো আপোষ জোরপূর্বক চাপিয়ে দিলে শ্রমিকরা যে শ্রম আদালতে যেতে পারেন—সে বিষয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক আইনি সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১২৪ক ধারা তৈরি করা হয়েছিল দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য, তাঁদের বলির পাঁঠা বানানোর জন্য নয়। অসাধু মালিক চক্র এবং নামধারী কিছু শ্রমিকনেতার অপতৎপরতায় এই আইনি বিধানটি আজ শ্রমিকের মূল অধিকার হননকারী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শিল্প রক্ষা এবং শ্রমিকের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার স্বার্থে এখনই সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই ধারার অপব্যবহার রোধে কঠোর নীতিমালা জারি করা। অন্যথায়, এই অন্যায় ও ক্ষোভের আগুন দীর্ঘমেয়াদে পুরো গার্মেন্টস শিল্পকেই সংকটের মুখে ফেলে দেবে।
লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


















