Followers

Thursday, April 30, 2026

মহান মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে মহান মে দিবস এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সেই আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় আজকের মে দিবস কেবল একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সংগ্রামের প্রতীক।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহান মে দিবসের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, বিশেষ করে নারী শ্রমিক, অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং মানবিক আচরণ থেকে বঞ্চিত।

রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশের শ্রম ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। শত শত শ্রমিকের প্রাণহানি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—শ্রমিকের জীবনকে অবহেলা করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। এসব ঘটনার পর কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও এখনও অসংখ্য কারখানায় শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। শ্রমিকরা অনেক সময় ন্যায্য দাবি উত্থাপন করলেই হয়রানি, চাকরিচ্যুতি কিংবা দমন-পীড়নের শিকার হন।

মহান মে দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শ্রমিক কেবল উৎপাদনের যন্ত্র নয়; শ্রমিক একজন মানুষ, যার রয়েছে মর্যাদা, অধিকার ও স্বপ্ন। শ্রমিকের ঘামেই শিল্পকারখানা সচল থাকে, অর্থনীতির চাকা ঘোরে, রাষ্ট্র এগিয়ে যায়। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী মজুরি পুনঃনির্ধারণ করা এবং শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব।

বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমিকজীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সীমিত আয়ে পরিবার পরিচালনা, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে গিয়ে শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকের প্রাপ্য সবসময় নিশ্চিত হয় না। এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের জন্য জীবনধারণ উপযোগী মজুরি নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি।

একই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক শিল্পব্যবস্থায় শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার থাকতে হবে। কারণ শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন কেবল শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করে না; এটি শিল্পে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সংলাপই পারে শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই উন্নয়নকে সত্যিকার অর্থে অর্থবহ করতে হলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবসরের নিশ্চয়তা নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়নের কথা বলা যায় না।

মহান মে দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—বাংলাদেশে এমন একটি শ্রমব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে; যেখানে শ্রমিকের কণ্ঠরোধ নয়, তার মতামতের মূল্যায়ন হবে; যেখানে শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আসুন, মহান মে দিবসের চেতনায় আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করব। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠাই হোক উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের অঙ্গীকার।

খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Monday, April 27, 2026

বকেয়া মজুরি ও শ্রমিকের কান্না: একটি জাতীয় সংকট

 


বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প বা গার্মেন্টস সেক্টর মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত হলেও, এর পেছনের কারিগর অর্থাৎ শ্রমিকদের জীবন আজও অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার জালে বন্দি। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে যে হাতগুলোর পরিশ্রমে, সেই হাতগুলোকেই আজ বকেয়া মজুরির দাবিতে রাজপথে মুষ্টিবদ্ধ হতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি আমাদের গর্বের জায়গা। কিন্তু এই বিশাল সাফল্যের পেছনে থাকা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবনচিত্র অত্যন্ত করুণ। মাসের পর মাস কাজ করার পরও যখন বেতন পাওয়া যায় না, তখন সেই শ্রমিকের কাছে অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধি কেবল একটি সংখ্যা মাত্র।

শ্রমিকরা শখ করে রাজপথে নামেন না; বরং দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই তারা আন্দোলনের পথ বেছে নেন। এর পেছনে প্রধান কিছু কারণ হলো:

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কারখানার মালিকরা লভ্যাংশ পেলেও শ্রমিকদের পাওনা দিতে গড়িমসি করেন।কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই লে-অফ বা কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার ফলে শ্রমিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। এক মাসের বেতন বকেয়া হওয়া মানেই শ্রমিকের ঘরে উনুন না জ্বলা এবং ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া।

প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শ্রমিকদের এই আন্দোলন কেবল রাস্তা অবরোধ বা যানজট তৈরি করছে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে। বারবার রাস্তা অবরোধের ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদেশী ক্রেতারাও (Buyers) অনেক সময় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

যেসব মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে বেতন আটকে রাখেন, তাদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিজিএমইএ (BGMEA) এবং সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে যাতে কোনো কারখানায় বকেয়া না জমে।

শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করলে তাদের জীবনযাত্রার চাপ কিছুটা কমবে।

কোনো কারখানা দেউলিয়া হলে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের জন্য একটি স্থায়ী আপদকালীন তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।

গার্মেন্টস শিল্পকে টেকসই করতে হলে শ্রমিকের পেটে খিদে রেখে তা সম্ভব নয়। মালিক, সরকার এবং শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে সঠিক সমন্বয় এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলেই রাজপথের এই দীর্ঘ মিছিল বন্ধ হবে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করা কেবল একটি নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি এই শিল্পের টিকে থাকার প্রধান শর্ত।

আপনার কি মনে হয় এই সমস্যার সমাধানে সরকার নাকি মালিকপক্ষ—কার ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত?

খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


Friday, April 24, 2026

গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল বিষয়ে উদাসীন

আমরা সবাই অবগত আছি ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবনে ঘটে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। ভবনটিতে অবস্থিত পাঁচটি পোশাক কারখানা-নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড কারখানায় ১,১৩৮ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত হন এবং ২,৫০০-এর অধিক শ্রমিক আহত হন।

উল্লেখযোগ্য যে, ২৩ এপ্রিল ভবনটিতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ার পরও ২৪ এপ্রিল শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। এই অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাই এত বড় বিপর্যয়ের প্রধান কারণ শ্রমিক হত্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

রানা প্লজার ঘটনার মাত্র পাঁচ আগে, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশিন্তপুরে তোবা গ্রুপের তাজরিন গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১৪ জন শ্রমিক মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান এবং বহু শ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। পরিকল্পিত ভাবে কারখানার গেইট বন্ধ রাখার কারনে শ্রমিকরা মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। শ্রমিকরা পুড়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচে অবস্থান করলেও এখনো তাদের ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। এই ঘটনার জন্য দায়ী কারখানা মালিক দেলোয়ার এর নামে মামলা হলে তিনি এখন জামিনে মুক্ত হয়ে সুন্দর জীবন যাপন করছেন। 

রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টস কারখানায় বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পরিকল্পিত শ্রমিক হত্যার ঘটনা কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব মামলার অধিকাংশ আসামি বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন, কেবল ভবন মালিক সোহেল রানা ব্যতীত অন্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার এখনো দৃশ্যমান নয়।

গত ২০০৫ সালে ১১ এপ্রিল আশুলিয়ার বাইপাইলে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস কারখানার ৭৩ জন এবং ২০১০ সালে ১৪ ডিসেম্বর আশুলিয়ার হামিম গ্রুপের দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেড কারখানায় ২৯ জন শ্রমিক নিহত হয়। এই দুই কারখানার শ্রমিকদেরও ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। এই ঘটনার জন্য দায়ী কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

সাভার-আশুলিয়াসহ বিভিন্ন যায়গায় বারবার কোন সময় ভবন ধ্বসে, কোন সময় অগ্নিকান্ড ঘটিয়ে শ্রমিক হত্যা হলেও দায়ী ব্যাক্তিদের শাস্তি না হওয়ার কারনেই এমন গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল বিষয়ে উদাসীন।

রানা প্লাজা ও তাজরিন ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকদের জীবন কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়। তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সকলের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।

রানা প্লাজা ভবনের এসব কারখানায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করা হতো, যা এই ঘটনার আন্তর্জাতিক গুরুত্বও তুলে ধরে।

রানা প্লাজা দিবসে আমরা নিহত শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং আহতদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করি। একই সাথে, সাভার রানা প্লাজায় অবস্থিত নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড এবং আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর অবস্থিত তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড গার্মেন্টস কারখানায় নিহত, আহত শ্রমিকদের পুনরাই রি-অ্যাসেসমেন্ট (পুনঃমূল্যায়ন) করে  ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, এবং বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় কর্মরত সকল শ্রমিকদের বাংলাদেশ সরকার, আইএলও (ILO), এবং নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম' (Employment Injury Scheme - EIS) প্রকল্পটি ২১ জুন ২০২২ থেকে কার্যকর হওয়া এই স্কিমের আওতায় সাভার রানা প্লাজায় অবস্থিত নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড এবং আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর অবস্থিত তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড গার্মেন্টস কারখানায় নিহত, আহত শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী দেলোয়ার হোসেন (তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড)সোহেল রানা (রানা প্লাজা ভবনের মালিক)বজলুস সামাদ আদনান (মালিক, নিউ ওয়েভ বটমস)  আমিনুল ইসলাম (মালিক, ফ্যান্টম গার্মেন্টস) মাহবুবুর রহমান তাপস (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিউ ওয়েভ বটমস) ইমতেমাম হোসেন (প্রকৌশলী, সাভার পৌরসভা) আলী মিয়া (সহকারী প্রকৌশলী, সাভার পৌরসভা) বিরুদ্ধে মামলা হলেও অধিকাংশ আসামি আজও জামিনে মুক্ত। বিচার প্রক্রিয়ার এই ধীরগতি শ্রমিকদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছে। শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী ব্যাক্তিদের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচারে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টসের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহয়তার নামে সরকার-বিজিএমইএ-বিভিন্ন এনজিও, এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সিআরপি সহ বিভিন্ন সংগঠন কারকাছ থেকে কত টাকা কি বাবদ অনুদান নিয়েছেন এবং কাকে কত টাকা কি বাবদ অনুদান দিয়েছেন তা প্রকাশ করতে হবে।

দেলোয়ার হোসেন (তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড), সোহেল রানা (রানা প্লাজা ভবনের মালিক), বজলুস সামাদ আদনান (মালিক, নিউ ওয়েভ বটমস), আমিনুল ইসলাম (মালিক, ফ্যান্টম গার্মেন্টস), মাহবুবুর রহমান তাপস (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিউ ওয়েভ বটমস), এদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাদের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। 

নিহত শ্রমিকদের স্মরণে সাভার রানা ভবনের সামনে ও জুরাইন কবরস্থানে স্থায়ী ভাবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করতে হবে। ২৪ এপ্রিলকে শ্রমিক হত্যা দিবস এবং গার্মেন্টস শিল্পে সাধারণ ছুটি হিসাবে ঘোষণা করতে হবে।

রানা প্লাজা ধস এবং তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। এই কারখানাগুলোতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক তৈরি করা হতো। তাই এই দুর্ঘটনার দায়ভার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কোনোভাবেই এই ব্র্যান্ডগুলো এড়িয়ে যেতে পারে না। যেসব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এই কারখানাগুলো থেকে পণ্য সংগ্রহ করত, তাদের নৈতিক ও আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


Thursday, April 16, 2026

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনঃনির্ধারণ: বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প। এই শিল্পে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক—বিশেষ করে নারী শ্রমিক—দিনরাত পরিশ্রম করে দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ নিশ্চিত করে চলেছেন। অথচ এই শ্রমিকদের জীবনমান, মজুরি কাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা আজও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সর্বশেষ মজুরি বৃদ্ধি করা হয়। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে তখন ন্যূনতম ২৩ হাজার টাকা মজুরির দাবি উত্থাপন করা হলেও, মজুরি বোর্ড সেই দাবি উপেক্ষা করে মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে। এই মজুরি বাস্তব জীবনের ব্যয়ের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনধারণের জন্যও পর্যাপ্ত নয়।

বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, এই কম মজুরির কারণে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ওভারটাইম করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে দ্রুত ভেঙে পড়ছেন এবং অল্প বয়সেই কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন। এর প্রভাব শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের পরিবারও এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক শ্রমিকের সন্তান শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, এমনকি অল্প বয়সে বিয়ের মতো সামাজিক সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অন্যদিকে, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাড়িভাড়া, যাতায়াত খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্রমিকদের জন্য পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান মজুরি কাঠামো বাস্তবতার সাথে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এর ১৩৯(৬) ধারা অনুযায়ী (সংশোধিত ১০ এপ্রিল ২০২৬), কোনো শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি প্রতি তিন বছর অন্তর পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা আইনগত বাধ্যবাধকতা।

বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রমিকদের আন্দোলন, সংগ্রাম, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়েই মজুরি বৃদ্ধি আদায় করা সম্ভব হয়েছে। এই বাস্তবতা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে হওয়া উচিত নয়।

বর্তমানে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি উত্থাপন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (১ মে)কে কেন্দ্র করে এই দাবি আরও জোরালোভাবে সামনে আসবে। এই দাবি শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়, বরং শ্রমিকদের মানবিক জীবনযাপনের অধিকার এবং মর্যাদার প্রশ্ন।

এক্ষেত্রে সরকারের প্রতি প্রত্যাশা হলো—অতীতের মতো অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা এবং বাস্তবসম্মত, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মজুরি নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, গার্মেন্টস শিল্পের উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি—শ্রমিকদের—ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পাবে না।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

Saturday, March 14, 2026

গার্মেন্টস শিল্প কি আসলেই দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হলো তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়ে আসছে যে এই শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই শিল্প কি সত্যিই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং বিশেষ করে শ্রমিকদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে?

আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত। কর্মজীবনের শুরুতে আমি একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলাম। বর্তমানে শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে কাজ করছি। এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। আমি কোনো গার্মেন্টস মালিককে কখনও বলতে শুনিনি যে তিনি এই শিল্পে ব্যবসা করে খুব লাভবান হয়েছেন এবং খুব ভালো আছেন। একইভাবে কোনো শ্রমিককেও বলতে শুনিনি যে তিনি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করে সুখে ও স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে—এই শিল্পের প্রকৃত লাভবান কারা?

প্রতিবার যখন শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি ওঠে, তখন গার্মেন্টস মালিকরা তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু একই সময়ে আমরা দেখি, বিভিন্ন সংকটের মুহূর্তে মালিকরা সরকারের কাছে বিশেষ প্রণোদনা, স্বল্পসুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং নানা ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, করোনা মহামারির সময় গার্মেন্টস শিল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো অজুহাতে বারবার সরকারকে বিশেষ সহায়তা দিতে হয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের জন্যও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা নেওয়া হয়েছে। তারপরও দেখা যায় অনেক শ্রমিক তাদের ন্যায্য বেতন ও বোনাসের দাবিতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন।

এই বাস্তবতা থেকে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প কি আসলেই একটি শক্তিশালী ও লাভজনক শিল্প, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি প্রণোদনা-নির্ভর শিল্পে পরিণত হয়েছে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মালিকদের জীবনযাত্রা ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মধ্যে বিশাল বৈষম্য। একদিকে মালিকরা প্রায়ই ব্যবসার দুর্দশার কথা বলেন, অন্যদিকে তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে সেই কথার সাথে বাস্তবতার অনেক সময় মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সময় বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও সামনে এসেছে, যা এই খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন ও অনিশ্চিত। কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব—সব মিলিয়ে তাদের জীবন প্রায়ই সংগ্রামময়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে বর্তমান মজুরিতে অনেক শ্রমিক প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ক্যালোরি গ্রহণ করতে পারেন না। ফলে অপুষ্টি, শারীরিক দুর্বলতা এবং নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় তারা ভুগে থাকেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—শ্রমিকদের মজুরি কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃদ্ধি করা হয়নি। ইতিহাস বলে, প্রতিবার মজুরি বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের জন্য শ্রমিকদের জীবন দিতে হয়েছে, মামলা-হামলার শিকার হতে হয়েছে, এমনকি চাকরিও হারাতে হয়েছে।

তবুও এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে গার্মেন্টস শ্রমিকরাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের শ্রম, ঘাম এবং ত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের এই বিশাল শিল্পখাত।

সুতরাং আজ সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—গার্মেন্টস শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন কাকে বলা হবে? শুধু রপ্তানি আয় বাড়লেই কি উন্নয়ন হবে, নাকি সেই উন্নয়নের সুফল শ্রমিকদের জীবনেও পৌঁছাতে হবে?

একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, শ্রমিকদের বাদ দিয়ে কোনো শিল্পের উন্নয়ন কখনোই সত্যিকারের উন্নয়ন হতে পারে না।

KM Mintu

Monday, February 23, 2026

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশ-এর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একাধিক কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা এখন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিকে বেশি নিবদ্ধ

অন্যদিকে শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প, বর্তমানে বড় ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, বৈদেশিক ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং ব্যাংকিং খাতের জটিলতা শিল্প পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। এই শ্রমিকদের অনেকেই বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের জন্য আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। কিন্তু তাদের দাবি আদায়ের পথও নিরাপদ ছিল নাহামলা, মামলা এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এতে শিল্প সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে

শিল্পখাতে এই অস্থিরতা শুধু শ্রমিক বা মালিকের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি

এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য কয়েকটি নীতিগত অগ্রাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখতে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ ও শ্রম অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন করাও সরকারের দায়িত্ব

সবশেষে বলা যায়, নতুন সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাদের সফলতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতাএই তিনটি ক্ষেত্রেই যদি কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়, তবে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই বর্তমান সময়টি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

KM Mintu 

Monday, February 16, 2026

নতুন সরকারের সামনে প্রধান দায়িত্ব

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা ও বড় চ্যালেঞ্জ—দুই-ই সামনে এনেছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ছাত্র-শ্রমিক জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। এর পর অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচনের পথ সুগম করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।

১৮ মাস পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের পক্ষ থেকে আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এই বিপুল সংসদীয় শক্তি নতুন সরকারের জন্য যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি জনগণের প্রত্যাশাও বহুগুণে বাড়িয়েছে।

গত ১৮ মাসে দেশের শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রায় চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান নেই, কারণ বন্ধ হওয়ার হার বাড়লেও নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার হার অত্যন্ত কম। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় উৎপাদন খাতেও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

অনেক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বকেয়া বেতন ও চাকরির নিরাপত্তার দাবিতে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। কিন্তু এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা কেবল ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—ভোগ কমছে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।

নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হবে শিল্পখাত পুনরুজ্জীবিত করা। বিশেষ করে—

বন্ধ কারখানা দ্রুত চালু করা বা পুনর্বিন্যাস করা

শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শিল্পনীতি বাস্তবায়ন করা

শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা

এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু শ্রমিকদের জীবনমানই উন্নত হবে না, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও গতি পাবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা—স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক সুযোগ। নতুন সরকারের হাতে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে শিল্পখাত পুনর্গঠন এবং শ্রমিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি শ্রমজীবী মানুষ। তাদের কর্মসংস্থান ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হবে। তাই সময়ের দাবি—দ্রুত, কার্যকর এবং শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণ।

KM Mintu 


Saturday, February 14, 2026

ধর্মপ্রাণ হলেও চরমপন্থী বা নারী-বিরোধী রাজনীতিকে সমর্থন করেনা।


বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আজকের বাংলাদেশ–এর অগ্রযাত্রায় নারীদের অবদান অনস্বীকার্য এবং বহুমাত্রিক।

দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে লেদার, টেক্সটাইল, স্বাস্থ্যসেবা, খুচরা ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই নারীরা সক্রিয়। শুধু বেসরকারি খাত নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেও নারীদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। যেমন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এসব প্রতিষ্ঠানে নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে। পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়নমূলক সংস্থাগুলোতেও নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠছেন।

তবে সমাজের আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। এখনো এমন একটি অংশ আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, ঘরের বাইরের জগতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এবং পরিবারে পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করেন। তাদের অনেকেই এই জীবনকেই স্বাভাবিক বা অনিবার্য বলে মনে করেন। এই সামাজিক বাস্তবতাকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংগঠন তাদের নিজস্ব মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ঘরে ঘরে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে এমন নারীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে এমন অভিযোগ ও আলোচনা জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও পরকালকেন্দ্রিক চিন্তার মাধ্যমে নারীদের সামাজিক ভূমিকা সীমিত রাখার ধারণা প্রচারের বিষয়টি নিয়ে সমাজে বিতর্কও কম নয়। কারণ, আধুনিক বাংলাদেশে নারীকে শুধু পরিবারকেন্দ্রিক নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের সমান অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে। ফলে নারী বিদ্বেষী বা নারীর ভূমিকা সংকুচিত করে এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষের বড় অংশ সহজে গ্রহণ করে না।

রাজনীতিতেও এই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল, বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে মৌলবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে জনগণ বারবার দেখিয়েছে তারা ধর্মপ্রাণ হলেও চরমপন্থী বা নারী-বিরোধী রাজনীতিকে সমর্থন করতে প্রস্তুত নয়। যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও, জনমতের বড় অংশ নারীসমতা ও সামাজিক অংশীদারিত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এমন মূল্যায়ন অনেক বিশ্লেষকের।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বাস্তববাদী, মানবিক এবং সামাজিক ভারসাম্যে বিশ্বাসী। তারা বোঝে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না।

আজকের বাংলাদেশে নারীরা শুধু পরিবার নয়, অর্থনীতি, প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছে। তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে এমন একটি সমাজ, যেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে দেশ গঠনের দায়িত্ব ভাগ করে নেবে। এটাই সময়ের দাবি, এটাই অগ্রগতির পথ।

KM Mintu 



Thursday, January 15, 2026

নিজস্ব জগৎ

 


নিজস্ব জগৎ

প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে
যেখানে ঢোকার চাবি
কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না।
সে জগৎ একান্ত, নীরব,
নিজের মতো করে গড়া।

তোমারও আছে তেমনই এক জগৎ,
হয়তো সেখানে
আমার কোনো ঠিকানা নেই,
আমার নাম উচ্চারিত হয় না
দৈনন্দিন প্রার্থনায়।

কিন্তু আমার যে নিজস্ব জগৎ
সে জগতে কেবল তুমি।
দিনের আলো, রাতের নিঃশব্দতা,
সব কিছুর মাঝখানে
একটাই মুখ।

তাই আমি দূরে থাকি
তোমার সেই নিজস্ব জগৎ থেকে,
জোর করে ঢুকে পড়ার অধিকার
আমি চাইনি কখনো।

যেদিন তুমি মন থেকে ডাকবে,
নিঃশব্দ কোনো মুহূর্তে,
নিজের অজান্তেই

সেদিন দেখবে,
আমি ঠিক সেখানেই।

কারণ আমি তো দূরে যাইনি,
আমি ছিলাম
সব সময়ই

ছায়ার মতো
নীরবে, অবিচল,
তোমার পাশেই।

KM Mintu

শ্রমিক সংগঠনে শ্রমিক নেতৃত্বের সংকট: প্রতিনিধিত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন

 

বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং সংগ্রামমুখর। এই ইতিহাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের পথে অসংখ্য আত্মত্যাগ ও লড়াই রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আজ অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনেই প্রকৃত শ্রমিকদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সংগঠনের নামে শ্রমিক আন্দোলন পরিচালিত হলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই সংগঠনগুলো শ্রমিকদের দ্বারা নয়, বরং শ্রমিকদের “নামে” পরিচালিত হচ্ছে।

অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বড় একটি অংশ কখনো শ্রমিক ছিলেন না, কিংবা শ্রমিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের নেই। ফলে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, কর্মস্থলের শোষণ, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনার বাস্তবতা তাদের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। যারা কখনো মজুরি বকেয়া থাকার যন্ত্রণা বোঝেননি, যাদের জীবন কাটেনি কারখানার গরমে, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রের পাশে কিংবা দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চাপে তারা শ্রমিকদের প্রকৃত কণ্ঠস্বর কতটা ধারণ করতে পারেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক সংগঠনে নেতৃত্বের পদগুলো কার্যত আজীবন পদে পরিণত হয়েছে। কিছু নেতা পৃথিবী থেকে বিদায় না নেওয়া পর্যন্ত পদ আঁকড়ে ধরে রাখেন। নিয়মিত সম্মেলন, নেতৃত্বের পরিবর্তন কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চা সেখানে অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের শ্রমিক নেতাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সংগঠনগুলো ক্রমেই স্থবির ও জনগণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলো পেশাদারিত্ব ও আদর্শিক সংগ্রামের বদলে ব্যক্তি স্বার্থ, ক্ষমতার রাজনীতি কিংবা দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে। এতে করে যোগ্য, সচেতন ও সংগ্রামী শ্রমিকরা নেতৃত্বে উঠে আসার সুযোগ পান না। সংগঠন পরিণত হয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত বলয়ে, যেখানে শ্রমিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ গুরুত্ব হারায়।

এই নেতৃত্ব সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব না থাকায় শ্রমিকদের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে, আন্দোলন হারায় বিশ্বাসযোগ্যতা ও গতি। শ্রমিকরা সংগঠনের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন, যা সামগ্রিকভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

শ্রমিক সংগঠনের শক্তি আসে শ্রমিকদের থেকেই এই সত্য ভুলে গেলে চলবে না। সংগঠনের নেতৃত্বে শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং নতুন নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা ছাড়া শ্রমিক আন্দোলনের নবজাগরণ সম্ভব নয়। প্রকৃত শ্রমিক নেতৃত্ব ছাড়া শ্রমিক সংগঠন কেবল নামেই শ্রমিকের বাস্তবে নয়।

শ্রমিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হলে এখনই প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ। নেতৃত্বে শ্রমিকদের ফেরানোই হতে পারে শ্রমিক সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও শক্তি পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত।

KM Mintu

Tuesday, January 13, 2026

প্রস্থান

 


প্রস্থান

প্রস্থান
আমি এই জীবন নামের নাটকের মঞ্চ থেকে প্রস্থান নিতে চাই।
যে মঞ্চে আমার উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি
কারও সংলাপ বদলায় না,
আলো বদলায় না,
শেষ দৃশ্যেও আমার নাম আসে না।

এই মঞ্চে আমি ছিলাম
একজন নীরব অভিনেতা

যার কণ্ঠ ঢেকে গেছে করতালির শব্দে,
যার চোখের জলকে বলা হয়েছে অভিনয়ের অংশ।
আমার ব্যথা ছিল অপ্রয়োজনীয়,
আমার স্বপ্ন ছিল অতিরিক্ত।

যেখানে গুরুত্ব মাপা হয় ক্ষমতায়,
মানুষ চেনা হয় প্রয়োজনে

সেখানে একজন গুরুত্বহীন অভিনেতার
আর কী প্রয়োজন থাকতে পারে?

তাই ক্লান্ত আমি।
সংলাপ বলতে বলতে ক্লান্ত,
নিজেকে প্রমাণ করতে করতে ক্লান্ত,
ভিড়ের মাঝেও অদৃশ্য হয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত।

এই প্রস্থান কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়,
এ এক দীর্ঘ নীরবতার ফল।
এ মঞ্চ ছাড়ার মানে হারিয়ে যাওয়া নয়

বরং নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়া,
যেখানে এখনো
আমার অস্তিত্বের কিছু মূল্য আছে।

আজ আমি করতালি চাই না,
চাই না আলো।
শুধু একটু নীরবতা চাই

যেখানে আমি আবার মানুষ হতে পারি,
অভিনেতা নয়।

KM Mintu

ইরান: পতনের দ্বারপ্রান্তে নয়, বরং ‘গ্রে সিকিউরিটি’ কৌশলের কেন্দ্রে

 

পশ্চিমা রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের আলোচনায় ইরানের শাসনব্যবস্থা প্রায়শই এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যেন দেশটি অবশ্যম্ভাবীভাবে পতনের পথে হাঁটছে। কিন্তু এই মূল্যায়নের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও কৌশলগত মহলের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলো মিলিয়ে পড়লে এক ভিন্ন ও অধিক জটিল বাস্তবতা সামনে আসে। বাস্তবতা হলোইরান বর্তমানে পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, আবার তাৎক্ষণিক পতনের দিকেও এগোচ্ছে না। এই মধ্যবর্তী অবস্থা তেহরানকে একটি নিরাপত্তা ধূসর অঞ্চল বা গ্রে সিকিউরিটি জোন’-এ নিয়ে এসেছে, যা ইসরায়েলের মতো প্রতিপক্ষের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।

এই ধূসর অবস্থাই ইরানের জন্য এক অনন্য কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। সেই সম্পদের নামসময়

তেল আবিবের চোখে হুমকি: কেন সময়ই ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (INSS) তাদের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ইরানকে যেন আগের অবস্থায়বিশেষ করে পারমাণবিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেফিরে যেতে না দেওয়া হয়। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হলো বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা, যেখানে কোনো কার্যকর চুক্তি নেই, আবার পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতও নেই।

এই শূন্যতার সুযোগে ইরান আন্তর্জাতিক নজরদারি দুর্বল হওয়ার সুবিধা নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন, সরবরাহ লাইন মেরামত, উন্নত সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার পুনরায় সাজানোর মতো কাজগুলো এই সময়েই সবচেয়ে সহজে করা যায়।

প্রচলিত সামরিক যুক্তি অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে আগাম আঘাত হানা বা সর্বোচ্চ সামরিক চাপ প্রয়োগ করাই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা সেই হিসাবকে জটিল করে তুলেছে।

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও শাসনব্যবস্থার বাস্তব শক্তি

আইএনএসএসের নিজস্ব বিশ্লেষণেই স্বীকার করা হয়েছে যে, ইরানের শাসনব্যবস্থার সামাজিক বৈধতা আগের তুলনায় ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ক্ষমতার কাঠামো এখনো অটুটনিরাপত্তা বাহিনী, বিপ্লবী গার্ড (IRGC), বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ এখনো শাসকগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত।

ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরানের রাজপথের অস্থিরতা paradoxically একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। প্রখ্যাত বিশ্লেষক রন বেন ইশাইয়ের মতে, বিক্ষোভগুলো বিচ্ছিন্ন, নেতৃত্বহীন এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা উল্টে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে না। ফলে কোনো বড় বিদেশি হামলা হলে এই বিক্ষোভগুলো সরকারবিরোধী শক্তি হিসেবে নয়, বরং “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

বিদেশি হামলা ও জাতীয়তাবাদ: ইতিহাসের সতর্ক সংকেত

ইরানইরাক যুদ্ধের (১৯৮০৮৮) অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বড় ধরনের বিদেশি আগ্রাসন ইরানের ভেতরে জাতীয়তাবাদী আবেগকে তীব্রভাবে উসকে দিতে পারে। দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টসহ একাধিক কৌশলগত সাময়িকী সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েলি বা পশ্চিমা সামরিক হামলা বিক্ষোভের গতিপথ উল্টে দিতে পারে।

বিভাজন আরও গভীর হওয়ার বদলে, সরকার তখন সব ধরনের ভিন্নমতকে “বিদেশি ষড়যন্ত্র” হিসেবে চিহ্নিত করে দমন করার রাজনৈতিক ও নৈতিক অজুহাত পাবে। এতে শাসনব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার বদলে সাময়িকভাবে আরও সংহত হতে পারেযা ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্যবিরোধী।

ইসরায়েলের কৌশলগত দোটানা

এই বাস্তবতায় তেল আবিব এক গভীর কৌশলগত সংকটে আটকে গেছে।

  • হামলা করলে: ইরানের শাসনব্যবস্থাকে অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
  • হামলা না করলে: ইরান সময় পায়পুনর্গঠন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব শক্ত করার জন্য।

এই দ্বিধাই ইরানের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তেহরান কার্যত নিষ্ক্রিয়তার ভার নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে ইসরায়েলের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে ইসরায়েল ছিল সর্বক্ষণ উদ্যোগী ও আক্রমণাত্মক অবস্থানে, এখন তারা পড়ে আছে কৌশলগত বিভ্রান্তিতে।

অস্থিরতা, বয়ান ও আগাম বৈধতা নির্মাণ

ইরানি কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য মোসাদের ষড়যন্ত্রকে দায়ী করেন। এই বক্তব্যের একটি দ্বিমুখী কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে।

দেশের ভেতরে এটি বিক্ষোভকে অবৈধ ও বিদেশি প্রভাবিত বলে চিহ্নিত করে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আগাম বা পাল্টা হামলার জন্য বয়ানগত বৈধতা তৈরি করে।

অস্থিরতাকে বাইরের আগ্রাসনের ফল হিসেবে উপস্থাপন করে তেহরান যেকোনো সরাসরি বা প্রক্সি আঘাতকে জাতীয় আত্মরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার ভিত্তি গড়ে তোলে।

অসম পুনর্গঠন ও কৌশলগত ধৈর্য

আইএনএসএসের আঞ্চলিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে অসম পুনর্গঠনের কৌশল অনুসরণ করছে। হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য প্রক্সি শক্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও, তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার, ড্রোন সক্ষমতা এবং পারমাণবিক সীমারেখা বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

কম তীব্রতার বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা নজরদারিকে রাস্তায় ব্যস্ত রাখে। সেই আড়ালে ইরানি প্রযুক্তিবিদেরা সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন, সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়ন এবং রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করার কাজ চালিয়ে যানযা সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব হতো।

যুদ্ধ নয়, ঝুঁকির ভারসাম্য

তেল আবিব ও ওয়াশিংটনে প্রস্তুত কৌশলগত নথিগুলো পর্যালোচনা করলে একটি সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এখন আর শুধু শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, বরং ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সমীকরণে সময় তৈরির একটি কার্যকর উপাদান

ইসরায়েল ইরানের সক্ষমতা ক্ষয় করতে চায়, কিন্তু সামরিক পদক্ষেপের অনিচ্ছাকৃত পরিণতি তাদের থামিয়ে রাখছে। এই সুযোগ বুঝেই তেহরান ধূসর এই পরিসরকে ব্যবহার করছেশুধু টিকে থাকার জন্য নয়, বরং সংঘাতের মনস্তাত্ত্বিক গতিপথ উল্টে দেওয়ার জন্য।

ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ এখন আর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়; এটি এমন এক সম্ভাবনায় রূপ নিয়েছে, যেখানে ঝুঁকির ভার ইসরায়েলের পক্ষেই সবচেয়ে বেশি।

KM Mintu

Thursday, January 8, 2026

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নারী প্রতিনিধিত্ব: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

 

বাংলাদেশে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ঘিরে নির্বাচন কমিশন ও বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য একটি গভীর ও অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হলেও সরাসরি সংসদ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও ভয়াবহভাবে সীমিত।

নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ৩০০টি সংসদীয় আসনে এবার মোট ২,৫৬৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ১০৯ জনযা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪.২৪ শতাংশ। এই ১০৯ জনের মধ্যে ৭২ জন দলীয় মনোনয়নে এবং ৩৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এই পরিসংখ্যান শুধু হতাশাজনকই নয়, এটি রাজনৈতিক দলগুলোর নারী নেতৃত্ব নিয়ে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রতিফলন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন ও নারীর অবস্থা

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালে চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি (জিএম কাদের) থেকে ২৮০-এর বেশি প্রার্থী দেওয়ার পরও নারী প্রার্থী মাত্র ৯ জন করে। বামধারার কিছু দল তুলনামূলকভাবে কিছুটা অগ্রগামী হলেও সংখ্যার বিচারে সেটিও খুবই সীমিত।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলোপ্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এলডিপি, খেলাফত মজলিসের মতো পরিচিত দল।

অথচ এসব ইসলামী রাজনৈতিক দল তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারে প্রায়ই “নারীর সম্মান”, “নারীর অধিকার”, “নৈতিক সমাজ” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনের মাঠে তারা নারীদের নেতৃত্বে দেখতে রাজি নয়এটাই তাদের প্রকৃত অবস্থান প্রকাশ করে।

প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার দ্বন্দ্ব

যে রাজনৈতিক শক্তি নারীদের নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের জায়গা দিতে চায় না, তারা ক্ষমতায় গেলে নারীর অধিকার রক্ষায় কতটা আন্তরিক হবেএই প্রশ্ন এখন আর তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তব ও জরুরি।

সংসদে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব মানে শুধু একটি আসন নয়; এটি নীতি নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ। যখন কোনো দল ধারাবাহিকভাবে নারীদের এই জায়গা থেকে বাদ দেয়, তখন স্পষ্ট হয়তারা নারীদের সমান নাগরিক হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত একটি গোষ্ঠী হিসেবেই দেখতে চায়।

বিশেষ করে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি এমন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় আসে বা ক্ষমতার কাছাকাছি যায় যারা নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতিকে স্বীকারই করে না, তাহলে প্রশ্ন উঠবেইবাংলাদেশে নারীদের কর্মস্থানের স্বাধীনতা কী হবে?

শিক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা কতটা সংকুচিত হবে?

রাষ্ট্র কি নারীর অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারবে?

জনগণের বোঝার সময় এখন

এই নির্বাচন শুধু দল বদলের নির্বাচন নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গির নির্বাচন। ভোটারদেরবিশেষ করে নারী ভোটারদেরবোঝা উচিত, কোন দল নারীদের কেবল ভোটব্যাংক হিসেবে দেখে আর কোন দল নারীদের নেতৃত্বে বিশ্বাস করে।

নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়, এটি সাংবিধানিক অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার প্রথম ধাপ হলো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব। যে দল সেই জায়গায় নারীদের স্থান দিতে ব্যর্থ, তাদের প্রতিশ্রুতি যতই আকর্ষণীয় হোক না কেনবাস্তবে তা নারীবান্ধব নয়।

এই নির্বাচনে নারী প্রার্থীর স্বল্পতা আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। এখন সিদ্ধান্ত জনগণেরএই আয়নায় দেখা বাস্তবতা আমরা উপেক্ষা করব, নাকি ভবিষ্যতের জন্য সচেতন নির্বাচন করব।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, রাজনৈতিক কর্মী ও শ্রমিকনেতা।

Wednesday, January 7, 2026

তবুও আমি তোমাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখি

 

আমার জীবনটা যেন এক রহস্যময় ধারায় বয়ে চলেছে। অন্য অনেক পরিবারের মতো আমাদের পরিবারে দারিদ্র্যের ছায়া ছিল না, তবু আমার পড়াশোনা এগোয়নি। কেন এগোয়নিতা আমার অজানা নয়। বাবামা না থাকায় পরিবারের অন্য সদস্যদের তত্ত্বাবধানে বড় হওয়া, আর অল্প বয়স থেকেই পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়াই হয়তো তার প্রধান কারণ। তবে সত্যি বলতে কী, পড়াশোনার প্রতি যদি আমার ইচ্ছেটা আরও প্রবল হতো, তাহলে হয়তো সেই পথটাও তৈরি হয়ে যেত। এখানে হয়তো আমার নিজেরই কিছু গাফিলতি ছিলএই সত্য অস্বীকার করি না।

পারিবারিক নানা বাস্তবতায় মাত্র আঠারো বছর বয়সেই কাজের সন্ধানে আমাকে ঢাকা শহরে আসতে হয়েছিল। পড়াশোনার সার্টিফিকেট না থাকলেও জীবন আমাকে শিখিয়েছে বাস্তবতার কঠিন পাঠ। সেই পাঠেই ভর করে আজ পর্যন্ত আমি তুলনামূলকভাবে সফলভাবেই জীবনযাপন করে চলেছিএটাই আমার আত্মতৃপ্তি।

তবে জীবনের আরেকটি অধ্যায় আছে, যেটা বরাবরই নীরব। আমি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে শুধু দূর থেকেই দেখেছি। তার কাছে যাওয়া, নিজের মনের কথাগুলো খুলে বলাসে সাহস কোনোদিনই হয়ে ওঠেনি। কেন পারিনি, তার উত্তর আজও খুঁজে পাই না। তবু এটুকু জানি, আমার ভেতরে প্রেম আছে বলেই হয়তো আমার জীবনটা সুন্দর। না পাওয়া প্রেম কষ্ট দেয়ভীষণ কষ্ট দেয়তবুও সেই কষ্টের মাঝেই এক অদ্ভুত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।

যে বয়সে গভীর প্রেম থাকার কথা ছিল, হয়তো তখন তা ছিল না। কিন্তু আজ, এই বয়সে এসে হঠাৎ করেই মনে হয়আমি যেন এক গভীর প্রেমে পড়ে গেছি। মনে হয়, কেউ একজন আমার ভরসার জায়গা হতে পারত, যার হাত ধরে আগামীর পথচলার স্বপ্নগুলো আরও রঙিন হয়ে উঠত। এই ভাবনাটুকুই মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।

হয়তো এসবই আমার কল্পনা। কিন্তু কল্পনাটাও যে কী অসম্ভব সুন্দর! জানি, বাস্তবে এর কিছুই হবে নাতবুও আমি তোমাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখি। কারণ মানুষ তো শেষ পর্যন্ত বাঁচে স্বপ্ন নিয়েই। না পাওয়ার বেদনা বুকে নিয়েও, এই প্রেমের অনুভূতিটুকু সঙ্গে করে আগামীর পথে এগিয়ে চলাই আমার বেঁচে থাকার শক্তি।

KM Mintu

Tuesday, January 6, 2026

প্রতিষ্ঠানের মূল কারিগর: অন্তরালে থাকা সেই একনিষ্ঠ প্রাণ

 

যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের প্রাণভোমরা হয় এমন একজন মানুষ, যার কাছে সেই প্রতিষ্ঠানটি কেবল জীবিকা বা দায়িত্ব নয়, বরং লালিত একটি স্বপ্ন।

একটি প্রতিষ্ঠান যখন সাফল্যের শিখরে পৌঁছায়, তখন বাইরের পৃথিবী হয়তো তার জাঁকজমক আর বড় বড় সংখ্যাগুলোই দেখে। কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে থাকে কারো একজনের নির্ঘুম রাত, অদম্য জেদ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। একটি সংগঠনে শত শত কর্মী থাকতে পারে, কিন্তু সবার দায়বদ্ধতা বা মানসিক সংযোগ একরকম হয় না। অধিকাংশের কাছে প্রতিষ্ঠানটি হয়তো কেবল একটি কর্মস্থল, কিন্তু সেই 'বিশেষ একজনের' কাছে এটি তার অস্তিত্বের অংশ।

প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ছোট ছোট উন্নতি সেই মানুষটির চোখে আনন্দ অশ্রু আনে। তিনি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে নিজের ব্যক্তিগত জয় হিসেবে দেখেন। যখন সবাই কাজ শেষে ঘড়ি ধরে বাড়ি ফিরে যায়, সেই মানুষটি তখনও হয়তো ভাবছেন কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া যায়। তার কাছে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ মানে কেবল কিছু কাগুজে হিসাব নয়, বরং একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন।

সবাই যখন ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজের পাল্লা হালকা করতে ব্যস্ত থাকে, তখন সেই একজন মানুষই বুক পেতে সবটুকু ব্যর্থতা মেনে নেন। প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হলে বা কোনো লক্ষ্য অর্জিত না হলে তিনি যে বেদনা অনুভব করেন, তা অন্য কারোর পক্ষে উপলব্ধি করা কঠিন। সেই দুঃখ তাকে বিচলিত করে ঠিকই, কিন্তু দমাতে পারে না; বরং সেই ব্যর্থতা থেকেই তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ খুঁজে নেন।

সবাই প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমান দরদ বা মমতা অনুভব করবেএমনটা আশা করা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। অধিকাংশ মানুষই তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্বটুকুর বাইরে আর ভাবতে চান না। এখানেই সেই একজনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাকেই সব ভালো-মন্দের দায়ভার নিতে হয়। সংকটের সময়ে যখন সবাই দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে, তখন সেই নিঃসঙ্গ নাবিকই শক্ত হাতে হাল ধরেন।

এই ধরণের মানুষরা প্রতিষ্ঠানের প্রতি যে ভালোবাসা দেখান, তা কোনো বেতন বা পদমর্যাদা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। এটি এক ধরণের আত্মিক টান। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট-পাথর আর প্রতিটি কর্মীর ভালো-মন্দের সাথে তিনি নিজেকে জড়িয়ে নেন। তার এই "মালিকানাসুলভ মানসিকতা" (Ownership Mindset) থেকেই জন্ম নেয় এমন এক নেতৃত্ব, যা একটি সাধারণ সংগঠনকে অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

যেকোনো সফল প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের পাতায় এমন একজন নিবেদিত মানুষের গল্প লুকিয়ে থাকে। তিনি হয়তো সবসময় সামনের সারিতে থাকেন না, কিন্তু তার নিঃশব্দ পরিশ্রম আর অকৃত্রিম ভালোবাসাই প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখে। সবার মমতা হয়তো সমান হয় না, কিন্তু সেই একজনের 'দরদ' ই প্রতিষ্ঠানের আসল শক্তি।

KM Mintu

মহান মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে মহান মে দিবস এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্...