Followers

Thursday, July 30, 2026

শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?




বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ১২৪ক: শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তবে যে শ্রমিকের গায়ের ঘামে এই শিল্পের চাকা সচল থাকে, তাঁদের আইনগত পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘটে নানা অনিয়ম ও প্রতারণা। অতি সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’-এর ১২৪ক ধারা ব্যবহার করে শ্রমিকদের আইনি পাওনা থেকে বঞ্চিত করার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইনগতভাবে কোনো বিরোধ দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে আপোষ-মীমাংসার এই বিধান তৈরি করা হলেও, বাস্তবচিত্রে এটি হয়ে উঠেছে অসাধু মালিক ও সুবিধাভোগী কিছু শ্রমিকনেতার যোগসাজশে শ্রমিক ঠকানোর এক ‘মহা হাতিয়ার’।

১২৪ক ধারার আইনি উদ্দেশ্য ও তার বাস্তবতা

আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকদ্দমা এড়িয়ে শ্রমিকের বকেয়া মজুরি এবং প্রাপ্য পাওনা দ্রুত পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা। আইনের ১২৪ক ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে:

আবেদনের সুযোগ (উপ-ধারা ১): কর্মে কর্মরত, অবসরে যাওয়া, চাকরিচ্যুত বা বরখাস্তকৃত শ্রমিক বা শ্রমিকরা মজুরিসহ আইনত প্রাপ্য পাওনা আদায়ে প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে পারেন।

সময়সীমা (উপ-ধারা ২ ও ৩): আবেদন পাওয়ার সর্বোচ্চ ২০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উদ্যোগ গ্রহণ করে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন।

সিদ্ধান্ত ও কার্যকারিতা (উপ-ধারা ৪ ও ৫): সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে দুই পক্ষকে দিতে হবে এবং তা পালনে পক্ষসমূহ বাধ্য থাকবে।

শ্রম আদালতে আপিলের পথ (উপ-ধারা ৬): কোনো পক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সিদ্ধান্তে সম্মত না হলে তারা শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবেন এবং আদালত এই মধ্যস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।

কাগজে-কলমে এই প্রক্রিয়াটি শ্রমিকের জন্য সময় ও অর্থ বাঁচানোর কথা থাকলেও, বাস্তবে এতে চরম ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বেআইনি কারসাজি চলছে।

যেভাবে হচ্ছে প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার

১২৪ক ধারার সুবিধা নিয়ে কিছু অসাধু পক্ষ আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করছে, যা মূলত তিনটি প্রধান উপায়ে শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে:

আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, শ্রমিক নিজে বা শ্রমিকরা সরাসরি প্রধান পরিদর্শকের কাছে আবেদন করবেন। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকদের সরাসরি যুক্ত না করে অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত কিছু ফেডারেশন বা অসাধু শ্রমিকনেতা শ্রমিকদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের প্রতিনিধি সেজে আবেদন করছেন। অথচ আইনি ভিত্তিতে শ্রমিকদের আইনি সর্বনিম্ন পাওনার চেয়ে কম মূল্যে রফাদফা বা আপোষ করার কোনো এখতিয়ার বা অধিকার এই প্রতিনিধি বা ফেডারেশনগুলোর নেই।

শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের সার্ভিস বেনিফিট, নোটিশ পে, ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া মজুরি পাওয়া একটি নির্দিষ্ট আইনি অধিকার (Statutory Right)। এটি মালিকের কোনো অনুগ্রহ নয়। কিন্তু ১২৪ক ধারার অধীনে মধ্যস্থতার নামে অসাধু মালিক ও শ্রমিকনেতারা যোগসাজশ করে শ্রমিকদের আইনত প্রাপ্য সর্বনিম্ন সুবিধার চেয়ে অনেক কম অর্থে ‘আপোষ’ করতে বাধ্য করছেন। ফলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অর্ধেক বা তারও কম টাকায় সই দিয়ে চলে যাচ্ছেন।

অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির পর শ্রমিককে দিয়ে এমনভাবে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বা বুঝানো হয় যে, তারা আর কোথাও অভিযোগ করতে পারবেন না। ফলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিকরা।

সম্প্রতি লিথি গ্রুপ, ইউনিক ডিজাইনসহ বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিকের সাথে আপোষ-মীমাংসার নামে এই ধরনের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। যেখানে শত শত শ্রমিকের কোটি কোটি টাকার আইনি পাওনাকে ১২৪ক ধারার দোহাই দিয়ে নামমাত্র টাকায় নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

এই অনিয়মের লাগাম এখনই টেনে ধরা না গেলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এবং সামগ্রিক শ্রম খাতের জন্য এর পরিণতি হবে মারাত্মক:

 শ্রমিকরা যখন বুঝতে পারবেন যে আইনি প্রক্রিয়াতেও তারা প্রতারিত হচ্ছেন, তখন আইনি ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা উঠে যাবে। ফলে তারা রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হবেন, যা শিল্পে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা ডেকে আনবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং বিদেশী ক্রেতারা (Buyers) বাংলাদেশে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। ১২৪ক ধারার এই অপব্যবহারের খবর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছালে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে এবং অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হবে।

চাকরি হারানোর পর পাওনা না পেয়ে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার চরম অর্থনৈতিক মানবেতর জীবনের মুখে পড়বে।

১২৪ক ধারাকে শ্রমিক ঠকানোর মাধ্যম থেকে রক্ষা করে পুনরায় ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর কোনো প্রতিনিধি এমন কোনো আপোষ-মীমাংসা অনুমোদন বা সই করতে পারবেন না, যা শ্রম আইনে নির্দিষ্টকৃত ন্যূনতম প্রাপ্য পাওনার চেয়ে কম। আইনি পাওনার চেয়ে কম অর্থমূল্যে সমঝোতা করাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ ঘোষণা করতে হবে।

মধ্যস্থতা বৈঠকে শ্রমিকদের সরাসরি উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো অননুমোদিত ফেডারেশন বা নেতার মধ্যস্থতায় শ্রমিকের অবর্তমানে সমঝোতা করা বন্ধ করতে হবে।

ডিআইএফই (DIFE) বা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা অসাধু আপোষ-মীমাংসায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সই করছেন, তাঁদের ওপর কঠোর গোয়েন্দা তদারকি চালাতে হবে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

১২৪ক ধারার উপ-ধারা (৬) অনুযায়ী কোনো আপোষ জোরপূর্বক চাপিয়ে দিলে শ্রমিকরা যে শ্রম আদালতে যেতে পারেন—সে বিষয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক আইনি সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১২৪ক ধারা তৈরি করা হয়েছিল দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য, তাঁদের বলির পাঁঠা বানানোর জন্য নয়। অসাধু মালিক চক্র এবং নামধারী কিছু শ্রমিকনেতার অপতৎপরতায় এই আইনি বিধানটি আজ শ্রমিকের মূল অধিকার হননকারী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শিল্প রক্ষা এবং শ্রমিকের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার স্বার্থে এখনই সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই ধারার অপব্যবহার রোধে কঠোর নীতিমালা জারি করা। অন্যথায়, এই অন্যায় ও ক্ষোভের আগুন দীর্ঘমেয়াদে পুরো গার্মেন্টস শিল্পকেই সংকটের মুখে ফেলে দেবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


Saturday, July 18, 2026

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি

 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (Ready-Made Garments-RMG) শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি। প্রতি বছর এই শিল্প থেকে কয়েক দশমিক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে এবং প্রায় ৪০ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক—যাদের অধিকাংশই নারী—তাদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের মাধ্যমে এই শিল্পকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক খাতে পরিণত করেছেন। অথচ এই শিল্পের প্রকৃত চালিকাশক্তি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। ওই বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনিকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে একাধিক বৈঠক, মতবিনিময় ও আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় এবং নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯(৬) ধারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, কোনো শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত নিম্নতম মজুরির হার প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এই বিধানের উদ্দেশ্য হলো জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয়সহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরির সামঞ্জস্য বজায় রাখা।

একই সঙ্গে প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত, শুনানি ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করে নতুন মজুরির সুপারিশ চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডে নিয়োগপ্রাপ্ত মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি—উভয়েরই তিন বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত সর্বনিম্ন মজুরির গেজেটেরও তিন বছর পূর্ণ হবে ২০২৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর।

অর্থাৎ আইনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা অনুসারে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের পরই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে পরবর্তী মজুরি পুনর্নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল, যাতে ডিসেম্বরের আগেই আইনসম্মত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। এটি শুধু প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; বরং শ্রম আইনের উদ্দেশ্য ও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশে একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি যেন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শ্রমিকরা দীর্ঘদিন দাবি জানালেও তাতে কার্যকর সাড়া মেলে না। বরং শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয়, কারখানা বন্ধ হয়, সড়ক অবরোধ হয়, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে, মামলা-হামলা হয়, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। এরপরই কেবল সরকার ও মালিকপক্ষ নড়েচড়ে বসে। একটি আধুনিক ও আইনভিত্তিক রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আজকের বাস্তবতা আরও কঠিন। বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরি দিয়ে অধিকাংশ শ্রমিকের পক্ষে একটি পরিবারের এক মাসের ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, মাসের প্রথম ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অর্থ ফুরিয়ে যায়। এরপর ধার-দেনা, ঋণ কিংবা অতিরিক্ত ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করেই বাকি মাস কাটাতে হয়।

অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির কারণে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসা ও ওষুধের খরচও বহুগুণ বেড়েছে। ফলে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারছেন না। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

একজন অপুষ্ট, অসুস্থ ও মানসিক চাপে থাকা শ্রমিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। শিল্পের উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নত করতেই হবে। কারণ শ্রমিক সুস্থ থাকলে শিল্পও সুস্থ থাকবে; শ্রমিক নিরাপদ থাকলে উৎপাদনও টেকসই হবে।

বর্তমান বিশ্বে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও কেবল কম দামের পণ্য নয়; তারা শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।

আমরা বিশ্বাস করি, নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ কোনো রাজনৈতিক বা আন্দোলনের বিষয় হওয়া উচিত নয়; এটি একটি নিয়মিত, আইনসম্মত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। শ্রম আইনে যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই সময়সীমা মেনেই সরকারকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে এবং জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক পরিবারের মৌলিক চাহিদা, পুষ্টি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সঞ্চয় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

আমরা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাই—অবিলম্বে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বাস্তবসম্মত, ন্যায্য এবং বেঁচে থাকার উপযোগী নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করুন। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলে শিল্প শক্তিশালী হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আরও টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

লিখেছেন: খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা ও সমাজকর্মী

Monday, June 29, 2026

আশুলিয়ার ‘জিন-ভূতের আতঙ্ক’: অতিপ্রাকৃত নয়, এটি শ্রমিকদের চরম শোষণের আর্তনাদ

সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। কোথাও শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, কেউ চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট, শরীর কাঁপা বা অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ করছেন। অনেকেই ঘটনাকে "জিন-ভূতের আতঙ্ক" বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন ব্যাখ্যা প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করে এবং শ্রমিকদের দুর্ভোগের মূল কারণগুলো থেকে সমাজের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এ ধরনের ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে গণ-হিস্টেরিয়া (Mass Psychogenic Illness) বা সমষ্টিগত মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা-র কথা বলা হয়। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, আবার কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনাও নয়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, ভয়, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, শারীরিক দুর্বলতা, পুষ্টিহীনতা এবং অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের কারণে অনেক মানুষের মধ্যে একই ধরনের শারীরিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।

বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। অনেক কারখানায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করানো হচ্ছে। কোনো কোনো দিন রাত ২টা বা ৩টা পর্যন্তও কাজ করতে হচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও "জেনারেল" হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। রাত ১১টা বা ১২টায় বাসায় ফিরে রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ১টা বা ২টা বেজে যায়। আবার ভোর ৫টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। অর্থাৎ একজন শ্রমিক প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন।

একজন মানুষ কতদিন এভাবে চলতে পারেন?

অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং কম মজুরি শ্রমিকদের এমন এক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে তারা পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলছেন। অনেক শ্রমিক প্রতিদিন ডাল, আলুভর্তা, করলা ভাজি বা স্বল্পমূল্যের একঘেয়ে খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। যে পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম তারা করেন, সেই তুলনায় প্রয়োজনীয় ক্যালরি, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান তাদের খাদ্যতালিকায় নেই। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন।

এই দুর্বল শরীর নিয়েই তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎপাদন লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কম মজুরির কারণে তারা অতিরিক্ত আয়ের আশায় ওভারটাইম করতে বাধ্য হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ওভারটাইম করতে অস্বীকৃতি জানালে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। অর্থাৎ এটি কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়; বরং অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে তৈরি হওয়া এক ধরনের বাধ্যবাধকতা।

এমন পরিস্থিতিতে যদি হঠাৎ একটি কারখানায় একজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে একই মানসিক চাপ ও শারীরিক দুর্বলতায় থাকা অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তাই ঘটনাগুলোকে "জিন-ভূতের আছর" বলে প্রচার করা সমস্যার সমাধান নয়; বরং প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানকে বাধাগ্রস্ত করে।

প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কারখানার বায়ুমান, রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার, পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল, তাপমাত্রা, স্বাস্থ্যবিধি এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা—সবকিছুই বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এই শিল্পের প্রাণ হলো শ্রমিক। তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুযায়ী নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো কারখানায় যদি বারবার "জিন-ভূতের আতঙ্ক" দেখা দেয়, তাহলে হয়তো সেখানে অতিপ্রাকৃত কিছু নেই; বরং আছে অবহেলা, শোষণ, ক্লান্তি, অপুষ্টি এবং সীমাহীন মানসিক চাপের এক নির্মম বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াই হবে সমস্যার প্রকৃত সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ।

খাইরুল মামুন মিন্টু

Friday, June 26, 2026

গার্মেন্ট কারখানায় আর কত প্রাণ গেলে জাগবে মালিকপক্ষের বিবেক?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই শিল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা—শ্রমিকের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদার চরম অবমূল্যায়ন। প্রতিনিয়ত শ্রমিকের ঘাম, রক্ত, অশ্রু এবং কখনো কখনো প্রাণের বিনিময়ে দাঁড়িয়ে আছে এই শিল্পের তথাকথিত উন্নয়ন।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি এলাকায় অবস্থিত কালার অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড গার্মেন্টসে ২৪ জুন ২০২৬ (বুধবার) দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া লিজা বেগমের মৃত্যু সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতার আরেকটি বেদনাদায়ক উদাহরণ। এটি শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে অবহেলা, অমানবিকতা এবং দায়িত্বহীনতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বাসিন্দা, ৩৭ বছর বয়সী সুইং অপারেটর লিজা বেগম টানা দুই সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একাধিকবার ছুটির আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ তা মঞ্জুর করেনি। অসুস্থ শরীর নিয়েই তাকে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। অবশেষে গভীর রাতে কর্মস্থলেই তিনি অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। একজন শ্রমিকের জীবনের চেয়ে যদি উৎপাদনের লক্ষ্য, শিপমেন্ট কিংবা মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে সেটি কোনোভাবেই মানবিক বা সভ্য কর্মপরিবেশের পরিচয় হতে পারে না।

এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—গার্মেন্টস শিল্পে একজন শ্রমিক কি কেবল উৎপাদনের একটি যন্ত্র, নাকি তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্র, মালিক এবং প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব?

দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের বহু কারখানায় এখনো এমন একটি সংস্কৃতি বিদ্যমান, যেখানে অসুস্থ শ্রমিক ছুটি চাইলে তাকে নানা অজুহাতে নিরুৎসাহিত করা হয়, কখনো চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়, আবার কখনো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অজুহাতে কাজে বাধ্য করা হয়। ফলে শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতা আধুনিক শিল্পব্যবস্থার নয়; বরং এটি এক ধরনের আধুনিক দাসত্বের প্রতিফলন।

লিজা বেগমের মৃত্যুর পর সহকর্মী শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ প্রমাণ করে যে এই ক্ষোভ শুধুমাত্র একজন শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অবিচার, বৈষম্য এবং অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে জমে থাকা প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, লিজা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। যদি প্রমাণিত হয় যে অসুস্থতা সত্ত্বেও তাকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ছুটি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার, ব্যবস্থাপক এবং দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, লিজা বেগমের পরিবারকে সামান্য অনুদান দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। পরিবার যে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য, পর্যাপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, দেশের প্রতিটি তৈরি পোশাক কারখানায় অসুস্থতাজনিত ছুটিকে (Sick Leave) শ্রমিকের আইনি অধিকার হিসেবে কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কারখানায় সার্বক্ষণিক যোগ্য চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত মেডিকেল টিম, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসা-সুবিধা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চতুর্থত, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার অজুহাতে কোনো অসুস্থ শ্রমিককে জোরপূর্বক কাজ করানো, ছুটি প্রত্যাখ্যান করা অথবা চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়ার মতো অমানবিক চর্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে শ্রমিক কেবল উৎপাদনের মাধ্যম নন; তিনি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই শিল্পায়ন কিংবা উন্নয়নের দাবি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোনো জাতির জন্য গৌরবের বিষয় হতে পারে না।

লিজা বেগমের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই কার্যকর সংস্কার না আনা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বহু লিজা বেগম একই পরিণতির শিকার হবেন। তাই এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, বরং শ্রমিক অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে দেখতে হবে।

শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই শিপমেন্ট, উৎপাদন বা মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান হতে পারে না। এখনই সময় শ্রমিককে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং এমন একটি শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার, যেখানে আর কোনো শ্রমিককে অসুস্থ শরীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হবে না।

আর কোনো লিজা বেগমের জীবন এভাবে ঝরে পড়ুক—এটি কোনো সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। গার্মেন্টস কারখানায় মৃত্যুর এই মিছিল থামাতেই হবে। শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার এখনই সময়।

খাইরুল মামুন মিন্টু 

Wednesday, June 17, 2026

মানবিকতার প্রশ্নে সীমান্তে আটকে থাকা মানুষগুলো

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের কাছে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আসছে। যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা মানবিক সংকট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ তার সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় প্রদান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেক দেশ যখন দায়িত্ব নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন বাংলাদেশ মানবতার স্বার্থে সীমান্ত খুলে দিয়ে অসহায় মানুষগুলোর জীবন রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিল।

কিন্তু আজ আমাদের নিজেদের কিছু মানুষ সীমান্তের নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে জীবিকার সন্ধানে অবৈধ পথে ভারতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি বর্তমানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় আটকা পড়ে রয়েছেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিজ নিজ অবস্থানে থাকলেও এসব মানুষের মানবিক সংকট দিন দিন গভীরতর হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো—এই মানুষগুলো কার? তারা কি শুধুই অবৈধ অভিবাসী, নাকি তারা প্রথমত মানুষ? একজন মানুষের নাগরিকত্ব, আইনগত অবস্থান কিংবা তার ভুল সিদ্ধান্ত মানবিক আচরণের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও সভ্যতার মূল্যবোধ আমাদের শেখায় যে, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।

ভারত তার অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার। তবে সেই প্রক্রিয়া অবশ্যই দুই দেশের মধ্যে সমন্বয়, পরিচয় যাচাই এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পন্ন হওয়া উচিত। সীমান্তে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া বা এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়, তা কোনোভাবেই মানবিক আচরণের উদাহরণ হতে পারে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে এসব মানুষের পরিচয় দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক হন, তাহলে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানবিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নয়, সীমান্ত এলাকার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্ত এলাকায় রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন এবং উদ্বেগের মধ্যে দিন পার করছেন। এটি প্রমাণ করে যে বিষয়টি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি মানবিকতা, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেরও প্রশ্ন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। তাই সীমান্তে আটকে থাকা অসহায় মানুষগুলোর বিষয়ে দুই দেশের উচিত পারস্পরিক আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত একটি মানবিক সমাধানে পৌঁছানো। রাষ্ট্রের আইন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের জীবন ও মর্যাদা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যখন মানবিক বিশ্বের স্বপ্ন দেখি, তখন সেই মানবিকতার পরীক্ষা হয় সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় মানুষের প্রতি আমাদের আচরণে। সীমান্তের নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে আটকে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আজ সেই প্রশ্নই আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে—আমরা কি সত্যিই মানবিকতার পথে হাঁটছি, নাকি কেবল মানবিকতার কথা বলছি?

খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিক নেতা ও মানবাধিকারকর্মী


Wednesday, June 10, 2026

বাজেট কার জন্য—সরকারি কর্মচারীদের জন্য, নাকি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জন্য?

আগামী ১১ জুন ২০২৬ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে জানা গেছে, নতুন পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এবং আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর ৫০ শতাংশ সুবিধা পেতে শুরু করবেন। এর ফলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকায় উন্নীত হওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, দেশের প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারগুলোর জন্য এই বাজেটে কী আছে?

বাংলাদেশে শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ। পরিবারপ্রতি গড়ে দুইজন সদস্য হিসাব করলেও শ্রমিক পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ। দেশের শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, সেবা ও রপ্তানি খাতের সমগ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও শ্রমের ওপর। অথচ বাজেটের আলোচনায় তাদের অস্তিত্ব যেন ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, চামড়া খাত, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার অজুহাতে গণছাঁটাই করা হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েও প্রাপ্য পাওনা পাননি। নতুন চাকরি পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

বাজেটের আগে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আবারও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে—এই বিপুল সংখ্যক বেকার ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্রের কী পরিকল্পনা রয়েছে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাজেট আলোচনায় শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা বেকারত্ব ভাতার বিষয়গুলো এখনও প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছে। অথচ মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রা আজ চরম সংকটের মুখে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি সেই হারে বাড়ছে না।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বাস্তবসম্মত দাবি জানিয়ে আসছি— যেমন, দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গার্মেন্টস ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে শ্রমিক রেশন ব্যবস্থা চালু। 

শ্রমজীবী মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বিশেষ স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে শ্রমিক ও তাদের পরিবার ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত। 

কারখানা বন্ধ, মজুরি বকেয়া, গণছাঁটাই বা শিল্প সংকটের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য একটি স্থায়ী মজুরি সুরক্ষা তহবিল(Wage Protection Fund) গঠন।

বেকার শ্রমিকদের জন্য সীমিত পরিসরে হলেও বেকারত্ব ভাতা ও পুনঃকর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু।

জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষায় ব্যয় নিশ্চিত করা। 

বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনীতি শ্রমিকদের শ্রমে চলে, কিন্তু বাজেটের সুবিধা সবচেয়ে কম পৌঁছায় শ্রমিকদের কাছেই। সরকারি কর্মচারীদের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও শ্রমিকদের জন্য সমমানের সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। যদি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জীবন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথ গুরুত্ব না পায়, তাহলে এই বাজেটকে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শ্রমিকদের বাজেট বলা কঠিন হবে।

আমরা আশা করি সরকার বাজেট বাস্তবায়নের সময় শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। কারণ শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে, আর অর্থনীতি বাঁচলেই দেশ এগিয়ে যাবে।


খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক , বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

Friday, June 5, 2026

শ্রমিকের জীবন কি এতটাই সস্তা?

রক্ত, ঘাম আর অশ্রুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠছে, ব্যবসায়ীদের সম্পদের পাহাড় উঁচু হচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্যের ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা—যেখানে শ্রমিকের ঘাম, অশ্রু, অপমান এবং কখনো কখনো রক্ত দিয়েই নির্মিত হচ্ছে এই শিল্পের ভিত্তি।
যে শ্রমিকের হাতের স্পর্শে বিদেশে রপ্তানির জন্য পোশাক তৈরি হয়, সেই শ্রমিকের জীবন যেন সবচেয়ে সস্তা। তার কষ্ট, তার কান্না, তার সম্মান, এমনকি তার জীবনও যেন উৎপাদনের হিসাব-নিকাশের কাছে মূল্যহীন হয়ে গেছে।

গত ২৫ মে ২০২৬ তারিখে সাভারের হেমায়েতপুরে ব্যাবিলন গ্রুপের অবনী ফ্যাশন লিমিটেডে কর্মরত সুইং সুপারভাইজার মোঃ সুজন (সজল)-এর মরদেহ কারখানার ভেতর থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। পরিবারের সদস্য এবং সহকর্মী শ্রমিকদের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার পর মরদেহ গুম করারও চেষ্টা করা হয়েছে।
নিহত সুজনের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চর হরিণা গ্রামে। তার পিতা জহিরুল ইসলাম। ঘটনার পর মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় এবং পরে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র একদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে কারখানার জেনারেল ম্যানেজার সকালে সুজনকে তার কক্ষে ডেকে নেন। সেখানে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরে আবারও তাকে ডাকা হয়। সেই ডাকার পর থেকে আর কেউ তাকে জীবিত দেখেনি। কয়েক ঘণ্টা পর হঠাৎ কারখানার মাইকে ঘোষণা আসে—একজন শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন।
প্রশ্ন জাগে, এটি কি সত্যিই আত্মহত্যা? নাকি একজন শ্রমিককে নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে? নাকি আরও ভয়ংকর কোনো সত্য আড়াল করার চেষ্টা চলছে?

কিন্তু সুজন একা নন।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৮ জুন গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে গ্রিনল্যান্ড গার্মেন্টস লিমিটেডে হৃদয় নামের এক শ্রমিককে চুরির অভিযোগে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শুকতার বাইদ গ্রামের আবুল কালামের ছেলে হৃদয় ওই কারখানায় মেকানিক্যাল মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। একজন শ্রমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, কিন্তু সেখানে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় কারখানা কর্তৃপক্ষ, আর তার ফল হয় এক শ্রমিকের মৃত্যু।

একই বছরের ২ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে ডিবিএল গ্রুপের জিন্নাত নিটওয়্যার কারখানায় আরেক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। শ্রমিক জাকির হোসেন একটি পোশাকে ভুল লেবেল লাগিয়েছিলেন। সেই "অপরাধে" তাকে সহকর্মীদের সামনে কান ধরে উঠবস করিয়ে অপমান করা হয়। অপমানের সেই ভার তিনি সহ্য করতে পারেননি। পরে কারখানার আটতলা ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন।

একটি ভুল লেবেলের মূল্য কি একটি মানুষের জীবন?
একজন শ্রমিকের আত্মসম্মান কি এতটাই তুচ্ছ যে তাকে সবার সামনে অপদস্থ করা যাবে?
সুজন, হৃদয় এবং জাকির—এই তিনটি নাম কেবল তিনজন ব্যক্তির নাম নয়। তারা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্ধকার বাস্তবতার প্রতীক। তারা হাজার হাজার নিপীড়িত, অপমানিত ও নীরবে কষ্ট সহ্য করা শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করেন, যাদের গল্প কখনো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, যাদের কান্না কারখানার দেয়ালের মধ্যেই আটকে যায়।
আজ দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ করছেন ভয়, অনিশ্চয়তা এবং চরম মানসিক চাপে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য অমানবিক চাপ, অতিরিক্ত কাজ, চাকরি হারানোর আতঙ্ক, ন্যায্য মজুরি না পাওয়া, চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি, ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে বাধা এবং মানবিক মর্যাদার অভাব—সব মিলিয়ে অসংখ্য শ্রমিক প্রতিদিন এক অদৃশ্য যন্ত্রণা বহন করছেন।

অথচ এই শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতির প্রকৃত নির্মাতা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক আন্দোলনে গুলি করে তিনজন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, অসংখ্য শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। অথচ রাষ্ট্র, শিল্পমালিক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সবাই এই শ্রমিকদের শ্রমের ওপর নির্ভর করেই লাভবান হচ্ছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে—শ্রমিক কি শুধু উৎপাদনের একটি উপাদান? একটি যন্ত্র? একটি সংখ্যা?

না, শ্রমিক একজন মানুষ।
তারও স্বপ্ন আছে, পরিবার আছে, সন্তান আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে, সম্মানের সঙ্গে কাজ করার অধিকার আছে।
যে শিল্প শ্রমিকের জীবনকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে কর্মপরিবেশ শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, যে ব্যবস্থায় একজন শ্রমিক অপমান, নির্যাতন বা মৃত্যুর শিকার হওয়ার পরও সত্য গোপনের চেষ্টা করা হয়—সেই ব্যবস্থাকে অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে।
আজ প্রয়োজন প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা, কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি একটি মানবিক কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা।

কারণ শ্রমিক ছাড়া পোশাক শিল্পের অস্তিত্ব নেই।
সাভারের সুজন, গাজীপুরের হৃদয় এবং জাকিরের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়। তাদের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দিক। আমাদের মনে করিয়ে দিক—উৎপাদনের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ আছেন, যার জীবন, সম্মান এবং অধিকার কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সেই শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের ওপর, যিনি নিজের শ্রম দিয়ে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী—রক্তের দাগ বেশিদিন চাপা থাকে না। শ্রমিকের কান্নাও একদিন প্রতিবাদ হয়ে ফিরে আসে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু 
আইন ও দর-কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

Thursday, June 4, 2026

বাংলাদেশের পোশাক খাতে ‘ফোর্সড লেবার’ বিতর্ক ও শ্রম অধিকার বাস্তবতা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এই শিল্পের অবদান অসামান্য। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে শিল্পের এই সাফল্যের পাশাপাশি শ্রম অধিকার নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনাও অব্যাহত রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ‘ফোর্সড লেবার’ বা জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নিয়ে নানা ধরনের প্রতিবেদন ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে বাস্তবতাও তুলে ধরা জরুরি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অনুযায়ী, ভয়ভীতি, শাস্তির আশঙ্কা, ঋণের ফাঁদ, পরিচয়পত্র আটকে রাখা, চাকরি হারানোর ভয় অথবা অন্য কোনো জবরদস্তিমূলক অবস্থার মাধ্যমে কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করা হলে তাকে জোরপূর্বক শ্রম বা ফোর্সড লেবার বলা হয়। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে দাসপ্রথার মতো সংগঠিত ও ব্যাপক জোরপূর্বক শ্রমের অস্তিত্ব রয়েছে—এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা নিজেদের ইচ্ছায় কাজ করেন, চাকরি পরিবর্তন করেন এবং বিভিন্ন সময়ে দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনও পরিচালনা করেন। যদি প্রকৃত অর্থে দাসপ্রথার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকত, তাহলে শ্রমিকদের এই সংগঠিত আন্দোলন, বিক্ষোভ কিংবা ইউনিয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে সরাসরি ‘ফোর্সড লেবার’-নির্ভর শিল্প হিসেবে চিত্রিত করা বাস্তবতার অতিরঞ্জন হবে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে শ্রমিকদের সব অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কিংবা কর্মপরিবেশে কোনো সমস্যা নেই। বাস্তবতা হলো, শিল্পের অনেক কারখানায় এখনও কম মজুরি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, উৎপাদনচাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা, শ্রমিক ছাঁটাই, ইউনিয়ন গঠনে প্রতিবন্ধকতা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা বিদ্যমান। অনেক শ্রমিক তাদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খান। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি এখনও অধিকাংশ শ্রমিকের নাগালের বাইরে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই শ্রম অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক আচরণও পর্যালোচনার দাবি রাখে। ক্রেতাদের ক্রমাগত কম দামে পণ্য কেনার চাপ, অল্প সময়ের মধ্যে উৎপাদনের নির্দেশনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে কারখানাগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ওপর গিয়ে পড়ে। তাই শ্রম অধিকার প্রশ্নে শুধুমাত্র উৎপাদনকারী দেশকে দায়ী না করে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সকল অংশীজনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বহু কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক পরিবেশবান্ধব সবুজ পোশাক কারখানা বাংলাদেশে রয়েছে। কিন্তু শ্রম অধিকার এবং সামাজিক সংলাপের ক্ষেত্রে এখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

একটি টেকসই শিল্প গড়ে তুলতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সংগঠনের স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, শিল্পের অন্যতম অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একইসঙ্গে দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম এবং গঠনমূলক শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কও জরুরি।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের পর নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। সামনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা এবং মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার বিষয়ে বৈশ্বিক প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক ক্রেতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কার্যকর সামাজিক সংলাপের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে সুনির্দিষ্টভাবে ‘ফোর্সড লেবার’ বা দাসপ্রথার মতো জোরপূর্বক শ্রমের অস্তিত্ব নেই। তবে কম মজুরি, অতিরিক্ত শ্রম এবং অধিকারের সীমাবদ্ধতাকে পুরোপুরি আড়াল করার সুযোগও নেই। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখতে এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে শ্রম অধিকারের বিদ্যমান ঘাটতিগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। কারণ শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করেই একটি শক্তিশালী, মানবিক এবং টেকসই পোশাক শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: খায়রুল মামুন মিন্টু, শ্রমিক নেতা ও শ্রম অধিকার কর্মী

Thursday, May 21, 2026

শ্রমিকরা নানামুখী সংকট ও বঞ্চনার শিকার



বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল—বিশেষ করে আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, মিরপুরসহ দেশের গার্মেন্টস শিল্প এলাকাগুলোতে শ্রমিকরা আজ নানামুখী সংকট ও বঞ্চনার শিকার। কোথাও বে-আইনিভাবে শ্রমিকদের চাকুরিচ্যুত করা হচ্ছে, কোথাও রাত-দিন পরিশ্রম করে নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট সম্পন্ন করার পরও পরবর্তী মাসে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে না। আবার অনেক কারখানা শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ না করেই হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করছে।

শ্রমিকদের দিয়ে তাদের সক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ করানো হচ্ছে, অথচ সেই তুলনায় দেওয়া হচ্ছে অতি স্বল্প মজুরি। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কাজের অনিরাপদ পরিবেশ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পরও শ্রমিকরা এখনো তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছেন এবং বড় ধরনের আন্দোলনে জড়াচ্ছেন না।

এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের ন্যায্য দাবি ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এবং চলমান সমস্যাগুলো নিয়ে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা দেখছি, কিছু শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের বাস্তব সমস্যা ও দাবিগুলো নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে “গার্মেন্টস সেক্টরে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা বন্ধে করণীয়” শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজন করছে।

প্রশ্ন হলো—যখন শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, ন্যায্য অধিকার কিংবা জীবনমান উন্নয়নের দাবি সামনে আসে, তখনই কেন এই ধরনের কর্মসূচি সামনে আনা হয়? অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও এমন উদ্যোগ দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও হয়েছে, আর বর্তমান সরকারের সময়ও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এতে শ্রমিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—এই ধরনের আলোচনা সভাগুলো কি সত্যিই শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য, নাকি শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ ও দুর্বল করার একটি প্রচেষ্টা?

শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রশ্নে শ্রমিক সংগঠনগুলোর উচিত শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর হওয়া, তাদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের শক্তি হওয়া; কোনোভাবেই সেই আন্দোলনকে নিরুৎসাহিত বা প্রশ্নবিদ্ধ করার অবস্থানে দাঁড়ানো নয়।

KM Mintu 

Thursday, April 30, 2026

মহান মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে মহান মে দিবস এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সেই আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় আজকের মে দিবস কেবল একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সংগ্রামের প্রতীক।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহান মে দিবসের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, বিশেষ করে নারী শ্রমিক, অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং মানবিক আচরণ থেকে বঞ্চিত।

রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশের শ্রম ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। শত শত শ্রমিকের প্রাণহানি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—শ্রমিকের জীবনকে অবহেলা করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। এসব ঘটনার পর কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও এখনও অসংখ্য কারখানায় শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। শ্রমিকরা অনেক সময় ন্যায্য দাবি উত্থাপন করলেই হয়রানি, চাকরিচ্যুতি কিংবা দমন-পীড়নের শিকার হন।

মহান মে দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শ্রমিক কেবল উৎপাদনের যন্ত্র নয়; শ্রমিক একজন মানুষ, যার রয়েছে মর্যাদা, অধিকার ও স্বপ্ন। শ্রমিকের ঘামেই শিল্পকারখানা সচল থাকে, অর্থনীতির চাকা ঘোরে, রাষ্ট্র এগিয়ে যায়। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী মজুরি পুনঃনির্ধারণ করা এবং শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব।

বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমিকজীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সীমিত আয়ে পরিবার পরিচালনা, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে গিয়ে শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকের প্রাপ্য সবসময় নিশ্চিত হয় না। এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের জন্য জীবনধারণ উপযোগী মজুরি নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি।

একই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক শিল্পব্যবস্থায় শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার থাকতে হবে। কারণ শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন কেবল শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করে না; এটি শিল্পে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সংলাপই পারে শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই উন্নয়নকে সত্যিকার অর্থে অর্থবহ করতে হলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবসরের নিশ্চয়তা নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়নের কথা বলা যায় না।

মহান মে দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—বাংলাদেশে এমন একটি শ্রমব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে; যেখানে শ্রমিকের কণ্ঠরোধ নয়, তার মতামতের মূল্যায়ন হবে; যেখানে শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আসুন, মহান মে দিবসের চেতনায় আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করব। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠাই হোক উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের অঙ্গীকার।

খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Monday, April 27, 2026

বকেয়া মজুরি ও শ্রমিকের কান্না: একটি জাতীয় সংকট

 


বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প বা গার্মেন্টস সেক্টর মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত হলেও, এর পেছনের কারিগর অর্থাৎ শ্রমিকদের জীবন আজও অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার জালে বন্দি। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে যে হাতগুলোর পরিশ্রমে, সেই হাতগুলোকেই আজ বকেয়া মজুরির দাবিতে রাজপথে মুষ্টিবদ্ধ হতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি আমাদের গর্বের জায়গা। কিন্তু এই বিশাল সাফল্যের পেছনে থাকা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবনচিত্র অত্যন্ত করুণ। মাসের পর মাস কাজ করার পরও যখন বেতন পাওয়া যায় না, তখন সেই শ্রমিকের কাছে অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধি কেবল একটি সংখ্যা মাত্র।

শ্রমিকরা শখ করে রাজপথে নামেন না; বরং দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই তারা আন্দোলনের পথ বেছে নেন। এর পেছনে প্রধান কিছু কারণ হলো:

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কারখানার মালিকরা লভ্যাংশ পেলেও শ্রমিকদের পাওনা দিতে গড়িমসি করেন।কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই লে-অফ বা কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার ফলে শ্রমিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। এক মাসের বেতন বকেয়া হওয়া মানেই শ্রমিকের ঘরে উনুন না জ্বলা এবং ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া।

প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শ্রমিকদের এই আন্দোলন কেবল রাস্তা অবরোধ বা যানজট তৈরি করছে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে। বারবার রাস্তা অবরোধের ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদেশী ক্রেতারাও (Buyers) অনেক সময় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

যেসব মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে বেতন আটকে রাখেন, তাদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিজিএমইএ (BGMEA) এবং সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে যাতে কোনো কারখানায় বকেয়া না জমে।

শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করলে তাদের জীবনযাত্রার চাপ কিছুটা কমবে।

কোনো কারখানা দেউলিয়া হলে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের জন্য একটি স্থায়ী আপদকালীন তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।

গার্মেন্টস শিল্পকে টেকসই করতে হলে শ্রমিকের পেটে খিদে রেখে তা সম্ভব নয়। মালিক, সরকার এবং শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে সঠিক সমন্বয় এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলেই রাজপথের এই দীর্ঘ মিছিল বন্ধ হবে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করা কেবল একটি নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি এই শিল্পের টিকে থাকার প্রধান শর্ত।

আপনার কি মনে হয় এই সমস্যার সমাধানে সরকার নাকি মালিকপক্ষ—কার ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত?

খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


Friday, April 24, 2026

গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল বিষয়ে উদাসীন

আমরা সবাই অবগত আছি ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবনে ঘটে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। ভবনটিতে অবস্থিত পাঁচটি পোশাক কারখানা-নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড কারখানায় ১,১৩৮ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত হন এবং ২,৫০০-এর অধিক শ্রমিক আহত হন।

উল্লেখযোগ্য যে, ২৩ এপ্রিল ভবনটিতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ার পরও ২৪ এপ্রিল শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। এই অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাই এত বড় বিপর্যয়ের প্রধান কারণ শ্রমিক হত্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

রানা প্লজার ঘটনার মাত্র পাঁচ আগে, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশিন্তপুরে তোবা গ্রুপের তাজরিন গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১৪ জন শ্রমিক মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান এবং বহু শ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। পরিকল্পিত ভাবে কারখানার গেইট বন্ধ রাখার কারনে শ্রমিকরা মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। শ্রমিকরা পুড়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচে অবস্থান করলেও এখনো তাদের ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। এই ঘটনার জন্য দায়ী কারখানা মালিক দেলোয়ার এর নামে মামলা হলে তিনি এখন জামিনে মুক্ত হয়ে সুন্দর জীবন যাপন করছেন। 

রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টস কারখানায় বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পরিকল্পিত শ্রমিক হত্যার ঘটনা কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব মামলার অধিকাংশ আসামি বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন, কেবল ভবন মালিক সোহেল রানা ব্যতীত অন্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার এখনো দৃশ্যমান নয়।

গত ২০০৫ সালে ১১ এপ্রিল আশুলিয়ার বাইপাইলে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস কারখানার ৭৩ জন এবং ২০১০ সালে ১৪ ডিসেম্বর আশুলিয়ার হামিম গ্রুপের দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেড কারখানায় ২৯ জন শ্রমিক নিহত হয়। এই দুই কারখানার শ্রমিকদেরও ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। এই ঘটনার জন্য দায়ী কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

সাভার-আশুলিয়াসহ বিভিন্ন যায়গায় বারবার কোন সময় ভবন ধ্বসে, কোন সময় অগ্নিকান্ড ঘটিয়ে শ্রমিক হত্যা হলেও দায়ী ব্যাক্তিদের শাস্তি না হওয়ার কারনেই এমন গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল বিষয়ে উদাসীন।

রানা প্লাজা ও তাজরিন ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকদের জীবন কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়। তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সকলের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।

রানা প্লাজা ভবনের এসব কারখানায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করা হতো, যা এই ঘটনার আন্তর্জাতিক গুরুত্বও তুলে ধরে।

রানা প্লাজা দিবসে আমরা নিহত শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং আহতদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করি। একই সাথে, সাভার রানা প্লাজায় অবস্থিত নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড এবং আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর অবস্থিত তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড গার্মেন্টস কারখানায় নিহত, আহত শ্রমিকদের পুনরাই রি-অ্যাসেসমেন্ট (পুনঃমূল্যায়ন) করে  ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, এবং বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় কর্মরত সকল শ্রমিকদের বাংলাদেশ সরকার, আইএলও (ILO), এবং নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম' (Employment Injury Scheme - EIS) প্রকল্পটি ২১ জুন ২০২২ থেকে কার্যকর হওয়া এই স্কিমের আওতায় সাভার রানা প্লাজায় অবস্থিত নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড এবং আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর অবস্থিত তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড গার্মেন্টস কারখানায় নিহত, আহত শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী দেলোয়ার হোসেন (তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড)সোহেল রানা (রানা প্লাজা ভবনের মালিক)বজলুস সামাদ আদনান (মালিক, নিউ ওয়েভ বটমস)  আমিনুল ইসলাম (মালিক, ফ্যান্টম গার্মেন্টস) মাহবুবুর রহমান তাপস (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিউ ওয়েভ বটমস) ইমতেমাম হোসেন (প্রকৌশলী, সাভার পৌরসভা) আলী মিয়া (সহকারী প্রকৌশলী, সাভার পৌরসভা) বিরুদ্ধে মামলা হলেও অধিকাংশ আসামি আজও জামিনে মুক্ত। বিচার প্রক্রিয়ার এই ধীরগতি শ্রমিকদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছে। শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী ব্যাক্তিদের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচারে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টসের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহয়তার নামে সরকার-বিজিএমইএ-বিভিন্ন এনজিও, এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সিআরপি সহ বিভিন্ন সংগঠন কারকাছ থেকে কত টাকা কি বাবদ অনুদান নিয়েছেন এবং কাকে কত টাকা কি বাবদ অনুদান দিয়েছেন তা প্রকাশ করতে হবে।

দেলোয়ার হোসেন (তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড), সোহেল রানা (রানা প্লাজা ভবনের মালিক), বজলুস সামাদ আদনান (মালিক, নিউ ওয়েভ বটমস), আমিনুল ইসলাম (মালিক, ফ্যান্টম গার্মেন্টস), মাহবুবুর রহমান তাপস (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিউ ওয়েভ বটমস), এদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাদের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। 

নিহত শ্রমিকদের স্মরণে সাভার রানা ভবনের সামনে ও জুরাইন কবরস্থানে স্থায়ী ভাবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করতে হবে। ২৪ এপ্রিলকে শ্রমিক হত্যা দিবস এবং গার্মেন্টস শিল্পে সাধারণ ছুটি হিসাবে ঘোষণা করতে হবে।

রানা প্লাজা ধস এবং তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। এই কারখানাগুলোতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক তৈরি করা হতো। তাই এই দুর্ঘটনার দায়ভার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কোনোভাবেই এই ব্র্যান্ডগুলো এড়িয়ে যেতে পারে না। যেসব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এই কারখানাগুলো থেকে পণ্য সংগ্রহ করত, তাদের নৈতিক ও আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


Thursday, April 16, 2026

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনঃনির্ধারণ: বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প। এই শিল্পে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক—বিশেষ করে নারী শ্রমিক—দিনরাত পরিশ্রম করে দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ নিশ্চিত করে চলেছেন। অথচ এই শ্রমিকদের জীবনমান, মজুরি কাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা আজও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সর্বশেষ মজুরি বৃদ্ধি করা হয়। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে তখন ন্যূনতম ২৩ হাজার টাকা মজুরির দাবি উত্থাপন করা হলেও, মজুরি বোর্ড সেই দাবি উপেক্ষা করে মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে। এই মজুরি বাস্তব জীবনের ব্যয়ের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনধারণের জন্যও পর্যাপ্ত নয়।

বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, এই কম মজুরির কারণে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ওভারটাইম করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে দ্রুত ভেঙে পড়ছেন এবং অল্প বয়সেই কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন। এর প্রভাব শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের পরিবারও এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক শ্রমিকের সন্তান শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, এমনকি অল্প বয়সে বিয়ের মতো সামাজিক সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অন্যদিকে, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাড়িভাড়া, যাতায়াত খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্রমিকদের জন্য পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান মজুরি কাঠামো বাস্তবতার সাথে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এর ১৩৯(৬) ধারা অনুযায়ী (সংশোধিত ১০ এপ্রিল ২০২৬), কোনো শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি প্রতি তিন বছর অন্তর পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা আইনগত বাধ্যবাধকতা।

বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রমিকদের আন্দোলন, সংগ্রাম, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়েই মজুরি বৃদ্ধি আদায় করা সম্ভব হয়েছে। এই বাস্তবতা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে হওয়া উচিত নয়।

বর্তমানে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি উত্থাপন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (১ মে)কে কেন্দ্র করে এই দাবি আরও জোরালোভাবে সামনে আসবে। এই দাবি শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়, বরং শ্রমিকদের মানবিক জীবনযাপনের অধিকার এবং মর্যাদার প্রশ্ন।

এক্ষেত্রে সরকারের প্রতি প্রত্যাশা হলো—অতীতের মতো অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা এবং বাস্তবসম্মত, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মজুরি নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, গার্মেন্টস শিল্পের উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি—শ্রমিকদের—ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পাবে না।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

Saturday, March 14, 2026

গার্মেন্টস শিল্প কি আসলেই দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হলো তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়ে আসছে যে এই শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই শিল্প কি সত্যিই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং বিশেষ করে শ্রমিকদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে?

আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত। কর্মজীবনের শুরুতে আমি একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলাম। বর্তমানে শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে কাজ করছি। এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। আমি কোনো গার্মেন্টস মালিককে কখনও বলতে শুনিনি যে তিনি এই শিল্পে ব্যবসা করে খুব লাভবান হয়েছেন এবং খুব ভালো আছেন। একইভাবে কোনো শ্রমিককেও বলতে শুনিনি যে তিনি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করে সুখে ও স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে—এই শিল্পের প্রকৃত লাভবান কারা?

প্রতিবার যখন শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি ওঠে, তখন গার্মেন্টস মালিকরা তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু একই সময়ে আমরা দেখি, বিভিন্ন সংকটের মুহূর্তে মালিকরা সরকারের কাছে বিশেষ প্রণোদনা, স্বল্পসুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং নানা ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, করোনা মহামারির সময় গার্মেন্টস শিল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো অজুহাতে বারবার সরকারকে বিশেষ সহায়তা দিতে হয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের জন্যও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা নেওয়া হয়েছে। তারপরও দেখা যায় অনেক শ্রমিক তাদের ন্যায্য বেতন ও বোনাসের দাবিতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন।

এই বাস্তবতা থেকে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প কি আসলেই একটি শক্তিশালী ও লাভজনক শিল্প, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি প্রণোদনা-নির্ভর শিল্পে পরিণত হয়েছে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মালিকদের জীবনযাত্রা ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মধ্যে বিশাল বৈষম্য। একদিকে মালিকরা প্রায়ই ব্যবসার দুর্দশার কথা বলেন, অন্যদিকে তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে সেই কথার সাথে বাস্তবতার অনেক সময় মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সময় বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও সামনে এসেছে, যা এই খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন ও অনিশ্চিত। কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব—সব মিলিয়ে তাদের জীবন প্রায়ই সংগ্রামময়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে বর্তমান মজুরিতে অনেক শ্রমিক প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ক্যালোরি গ্রহণ করতে পারেন না। ফলে অপুষ্টি, শারীরিক দুর্বলতা এবং নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় তারা ভুগে থাকেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—শ্রমিকদের মজুরি কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃদ্ধি করা হয়নি। ইতিহাস বলে, প্রতিবার মজুরি বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের জন্য শ্রমিকদের জীবন দিতে হয়েছে, মামলা-হামলার শিকার হতে হয়েছে, এমনকি চাকরিও হারাতে হয়েছে।

তবুও এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে গার্মেন্টস শ্রমিকরাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের শ্রম, ঘাম এবং ত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের এই বিশাল শিল্পখাত।

সুতরাং আজ সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—গার্মেন্টস শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন কাকে বলা হবে? শুধু রপ্তানি আয় বাড়লেই কি উন্নয়ন হবে, নাকি সেই উন্নয়নের সুফল শ্রমিকদের জীবনেও পৌঁছাতে হবে?

একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, শ্রমিকদের বাদ দিয়ে কোনো শিল্পের উন্নয়ন কখনোই সত্যিকারের উন্নয়ন হতে পারে না।

KM Mintu

Monday, February 23, 2026

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশ-এর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একাধিক কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা এখন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিকে বেশি নিবদ্ধ

অন্যদিকে শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প, বর্তমানে বড় ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, বৈদেশিক ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং ব্যাংকিং খাতের জটিলতা শিল্প পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। এই শ্রমিকদের অনেকেই বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের জন্য আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। কিন্তু তাদের দাবি আদায়ের পথও নিরাপদ ছিল নাহামলা, মামলা এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এতে শিল্প সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে

শিল্পখাতে এই অস্থিরতা শুধু শ্রমিক বা মালিকের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি

এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য কয়েকটি নীতিগত অগ্রাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখতে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ ও শ্রম অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন করাও সরকারের দায়িত্ব

সবশেষে বলা যায়, নতুন সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাদের সফলতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতাএই তিনটি ক্ষেত্রেই যদি কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়, তবে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই বর্তমান সময়টি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

KM Mintu 

Monday, February 16, 2026

নতুন সরকারের সামনে প্রধান দায়িত্ব

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা ও বড় চ্যালেঞ্জ—দুই-ই সামনে এনেছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ছাত্র-শ্রমিক জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। এর পর অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচনের পথ সুগম করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।

১৮ মাস পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের পক্ষ থেকে আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এই বিপুল সংসদীয় শক্তি নতুন সরকারের জন্য যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি জনগণের প্রত্যাশাও বহুগুণে বাড়িয়েছে।

গত ১৮ মাসে দেশের শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রায় চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান নেই, কারণ বন্ধ হওয়ার হার বাড়লেও নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার হার অত্যন্ত কম। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় উৎপাদন খাতেও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

অনেক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বকেয়া বেতন ও চাকরির নিরাপত্তার দাবিতে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। কিন্তু এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা কেবল ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—ভোগ কমছে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।

নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হবে শিল্পখাত পুনরুজ্জীবিত করা। বিশেষ করে—

বন্ধ কারখানা দ্রুত চালু করা বা পুনর্বিন্যাস করা

শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শিল্পনীতি বাস্তবায়ন করা

শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা

এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু শ্রমিকদের জীবনমানই উন্নত হবে না, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও গতি পাবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা—স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক সুযোগ। নতুন সরকারের হাতে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে শিল্পখাত পুনর্গঠন এবং শ্রমিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি শ্রমজীবী মানুষ। তাদের কর্মসংস্থান ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হবে। তাই সময়ের দাবি—দ্রুত, কার্যকর এবং শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণ।

KM Mintu 


Saturday, February 14, 2026

ধর্মপ্রাণ হলেও চরমপন্থী বা নারী-বিরোধী রাজনীতিকে সমর্থন করেনা।


বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আজকের বাংলাদেশ–এর অগ্রযাত্রায় নারীদের অবদান অনস্বীকার্য এবং বহুমাত্রিক।

দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে লেদার, টেক্সটাইল, স্বাস্থ্যসেবা, খুচরা ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই নারীরা সক্রিয়। শুধু বেসরকারি খাত নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেও নারীদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। যেমন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এসব প্রতিষ্ঠানে নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে। পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়নমূলক সংস্থাগুলোতেও নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠছেন।

তবে সমাজের আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। এখনো এমন একটি অংশ আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, ঘরের বাইরের জগতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এবং পরিবারে পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করেন। তাদের অনেকেই এই জীবনকেই স্বাভাবিক বা অনিবার্য বলে মনে করেন। এই সামাজিক বাস্তবতাকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংগঠন তাদের নিজস্ব মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ঘরে ঘরে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে এমন নারীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে এমন অভিযোগ ও আলোচনা জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও পরকালকেন্দ্রিক চিন্তার মাধ্যমে নারীদের সামাজিক ভূমিকা সীমিত রাখার ধারণা প্রচারের বিষয়টি নিয়ে সমাজে বিতর্কও কম নয়। কারণ, আধুনিক বাংলাদেশে নারীকে শুধু পরিবারকেন্দ্রিক নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের সমান অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে। ফলে নারী বিদ্বেষী বা নারীর ভূমিকা সংকুচিত করে এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষের বড় অংশ সহজে গ্রহণ করে না।

রাজনীতিতেও এই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল, বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে মৌলবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে জনগণ বারবার দেখিয়েছে তারা ধর্মপ্রাণ হলেও চরমপন্থী বা নারী-বিরোধী রাজনীতিকে সমর্থন করতে প্রস্তুত নয়। যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও, জনমতের বড় অংশ নারীসমতা ও সামাজিক অংশীদারিত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এমন মূল্যায়ন অনেক বিশ্লেষকের।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বাস্তববাদী, মানবিক এবং সামাজিক ভারসাম্যে বিশ্বাসী। তারা বোঝে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না।

আজকের বাংলাদেশে নারীরা শুধু পরিবার নয়, অর্থনীতি, প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছে। তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে এমন একটি সমাজ, যেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে দেশ গঠনের দায়িত্ব ভাগ করে নেবে। এটাই সময়ের দাবি, এটাই অগ্রগতির পথ।

KM Mintu 



Thursday, January 15, 2026

নিজস্ব জগৎ

 


নিজস্ব জগৎ

প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে
যেখানে ঢোকার চাবি
কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না।
সে জগৎ একান্ত, নীরব,
নিজের মতো করে গড়া।

তোমারও আছে তেমনই এক জগৎ,
হয়তো সেখানে
আমার কোনো ঠিকানা নেই,
আমার নাম উচ্চারিত হয় না
দৈনন্দিন প্রার্থনায়।

কিন্তু আমার যে নিজস্ব জগৎ
সে জগতে কেবল তুমি।
দিনের আলো, রাতের নিঃশব্দতা,
সব কিছুর মাঝখানে
একটাই মুখ।

তাই আমি দূরে থাকি
তোমার সেই নিজস্ব জগৎ থেকে,
জোর করে ঢুকে পড়ার অধিকার
আমি চাইনি কখনো।

যেদিন তুমি মন থেকে ডাকবে,
নিঃশব্দ কোনো মুহূর্তে,
নিজের অজান্তেই

সেদিন দেখবে,
আমি ঠিক সেখানেই।

কারণ আমি তো দূরে যাইনি,
আমি ছিলাম
সব সময়ই

ছায়ার মতো
নীরবে, অবিচল,
তোমার পাশেই।

KM Mintu

শ্রমিক সংগঠনে শ্রমিক নেতৃত্বের সংকট: প্রতিনিধিত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন

 

বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং সংগ্রামমুখর। এই ইতিহাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের পথে অসংখ্য আত্মত্যাগ ও লড়াই রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আজ অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনেই প্রকৃত শ্রমিকদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সংগঠনের নামে শ্রমিক আন্দোলন পরিচালিত হলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই সংগঠনগুলো শ্রমিকদের দ্বারা নয়, বরং শ্রমিকদের “নামে” পরিচালিত হচ্ছে।

অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বড় একটি অংশ কখনো শ্রমিক ছিলেন না, কিংবা শ্রমিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের নেই। ফলে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, কর্মস্থলের শোষণ, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনার বাস্তবতা তাদের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। যারা কখনো মজুরি বকেয়া থাকার যন্ত্রণা বোঝেননি, যাদের জীবন কাটেনি কারখানার গরমে, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রের পাশে কিংবা দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চাপে তারা শ্রমিকদের প্রকৃত কণ্ঠস্বর কতটা ধারণ করতে পারেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক সংগঠনে নেতৃত্বের পদগুলো কার্যত আজীবন পদে পরিণত হয়েছে। কিছু নেতা পৃথিবী থেকে বিদায় না নেওয়া পর্যন্ত পদ আঁকড়ে ধরে রাখেন। নিয়মিত সম্মেলন, নেতৃত্বের পরিবর্তন কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চা সেখানে অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের শ্রমিক নেতাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সংগঠনগুলো ক্রমেই স্থবির ও জনগণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলো পেশাদারিত্ব ও আদর্শিক সংগ্রামের বদলে ব্যক্তি স্বার্থ, ক্ষমতার রাজনীতি কিংবা দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে। এতে করে যোগ্য, সচেতন ও সংগ্রামী শ্রমিকরা নেতৃত্বে উঠে আসার সুযোগ পান না। সংগঠন পরিণত হয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত বলয়ে, যেখানে শ্রমিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ গুরুত্ব হারায়।

এই নেতৃত্ব সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব না থাকায় শ্রমিকদের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে, আন্দোলন হারায় বিশ্বাসযোগ্যতা ও গতি। শ্রমিকরা সংগঠনের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন, যা সামগ্রিকভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

শ্রমিক সংগঠনের শক্তি আসে শ্রমিকদের থেকেই এই সত্য ভুলে গেলে চলবে না। সংগঠনের নেতৃত্বে শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং নতুন নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা ছাড়া শ্রমিক আন্দোলনের নবজাগরণ সম্ভব নয়। প্রকৃত শ্রমিক নেতৃত্ব ছাড়া শ্রমিক সংগঠন কেবল নামেই শ্রমিকের বাস্তবে নয়।

শ্রমিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হলে এখনই প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ। নেতৃত্বে শ্রমিকদের ফেরানোই হতে পারে শ্রমিক সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও শক্তি পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত।

KM Mintu

শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ১২৪ক: শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার? বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক (গা...