Followers

Friday, November 14, 2025

⚖️ বিচার যখন প্রশ্নের মুখে: মারধরের শিকার নারীই এখন আসামি!

 

সাম্প্রতিক এক ঘটনা বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সমাজে বিদ্যমান আস্থার সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। 'ঢাকা লকডাউন' কর্মসূচির মধ্যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে এক মধ্যবয়সী নারীকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা শুধু নিন্দনীয়ই ছিল না, বরং এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আরও বেশি উদ্বেগজনক। মারধরের শিকার ওই নারীকে এখন গত বছরের জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এই ঘটনা জন্ম দিয়েছে অসংখ্য প্রশ্নেরআদালত প্রাঙ্গণ থেকে রাজপথের জনমানস পর্যন্ত।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ধানমন্ডির মতো একটি সংরক্ষিত এলাকায় একজন তরুণী লাঠি দিয়ে ওই মধ্যবয়সী নারীকে নির্মমভাবে পেটাচ্ছেন। মারধরের শিকার হওয়া ব্যক্তির আইনি সুরক্ষা পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা গেল। আঘাতের শিকার নারীকে হাসপাতালে না পাঠিয়ে কিংবা মারধরকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, পুলিশ তাকে আটক করে এবং পরে তাঁকে এক বছর আগের গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখায়।

এটি যেন এক বিপরীতমুখী ন্যয়বিচার! ভুক্তভোগীকে ত্রাণকর্তার ভূমিকা থেকে মুহূর্তেই অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। সমাজের চোখে যিনি ছিলেন সহানুভূতির পাত্র, রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় তিনি হয়ে গেলেন আইনের চোখে 'পলাতক' কিংবা 'সন্দেহভাজন'।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত বছরের জুলাই মাসে সংঘটিত একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই মামলাটি ওই সময়ের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো:

প্রকাশ্যে মারধরের শিকার হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আটক করা হলো। কেন মারধরের দিনই বা তার আগে তাকে পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়নি?

ধানমন্ডিতে মারধরের ঘটনার সঙ্গে জুলাই মাসের হত্যাচেষ্টা মামলার যোগসূত্র কী? মারধরের ঘটনাটি কি শুধু পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর একটি 'সুযোগ' তৈরি করে দিল?

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মারধরের ঘটনাটি যেহেতু জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তাই এই গ্রেপ্তার জনদৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে। এতে করে মারধরের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার চেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক মামলার দিকেই মনোযোগ চলে যাচ্ছে।

ন্যায়বিচারের প্রাথমিক শর্ত হলোতা যেন দৃশ্যমান হয় এবং সাধারণ মানুষ যেন এর ওপর আস্থা রাখতে পারে। কিন্তু এই ঘটনা জনগণের মনে গভীর সংশয় সৃষ্টি করেছে। মারধরের মতো প্রকাশ্য অপরাধের শিকার হওয়ার পরও যদি একজন ব্যক্তিকে রাতারাতি পুরনো মামলায় জেলে যেতে হয়, তবে তা বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ করে।

এটি সমাজে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে, দুর্বলের উপর আঘাত করার পর উল্টো সেই দুর্বলকেই কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখে পড়তে হতে পারে। এমন ঘটনা আইনের চোখে সকলের সমতার নীতিকে ম্লান করে দেয় এবং এটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত।

এই ঘটনাটি একটি প্রহসনএই অভিযোগটি কেবল আবেগের বশবর্তী নয়, বরং এটি আমাদের বিচারিক এবং পুলিশি প্রক্রিয়ার একটি গুরুতর দুর্বলতা চিহ্নিত করে। একজন নাগরিক যখন বিচার চাইতে এসে নিজেই আসামির তালিকায় চলে যান, তখন সাধারণ মানুষ কোথায় আস্থা রাখবে?

কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে এই পুরো বিষয়টি তদন্ত করা। মারধরের ঘটনার জন্য দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়াটি আইন ও যৌক্তিকতার নিরিখে সঠিক ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অন্যথায়, এই ঘটনা বাংলাদেশের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি 'কালো অধ্যায়' হিসেবে থেকে যাবে।

No comments:

Post a Comment

নিজস্ব জগৎ

  নিজস্ব জগৎ প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে — যেখানে ঢোকার চাবি কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না। সে জগৎ একান্ত , নীরব , নিজের ম...