Followers

Thursday, October 15, 2026

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ ও ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করতে হবে।

গার্মেন্টস শিল্পে অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন পোশাকশ্রমিকরা। শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবির প্রতি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও তাদের জোট সংহতি প্রকাশ করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর উত্তরা, দক্ষিণখান ও উত্তরখান এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিকরাও ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। শ্রমিকদের এই দাবি কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়; বরং বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনধারণের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

শ্রমিকদের প্রশ্ন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গ্যাস, বিদ্যুৎ, ডিজেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে। অন্যদিকে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাহলে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরিতে কীভাবে জীবনযাপন করবেন? তাঁদের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষাসহ ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়টি কি সরকারের বিবেচনায় নেওয়া উচিত নয়? যাঁদের শ্রমে দেশের রপ্তানি আয় ও অর্থনীতি সচল থাকে, তাঁদের জীবনমান নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষের রয়েছে।

বাস্তবতা হলো, বর্তমান মজুরি দিয়ে একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের পক্ষে মাসের প্রয়োজনীয় সংসার খরচ মেটানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মাসের শুরুতে বেতন হাতে পেলেও বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের খরচ এবং সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অধিকাংশ শ্রমিককে চরম সংকটে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাসের প্রথম ১০ দিন পার হওয়ার পরই সংসার চালানোর মতো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। ফলে শ্রমিকদের বাধ্য হয়ে খাদ্যতালিকা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে হচ্ছে। তাঁরা কম দামের নিম্নমানের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাঁদের নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপর। বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টিহীনতা, শারীরিক বিকাশের বাধা এবং শিক্ষার ব্যয় বহন করতে না পারার মতো সমস্যা ক্রমেই গুরুতর হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক শিশু নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না; কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে কিংবা অপরাধপ্রবণতার দিকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। একটি শ্রমজীবী পরিবারের এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।

দুঃখজনকভাবে, শ্রমিকরা যখনই ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির দাবি তোলেন, তখনই তাঁদের দাবিকে ঘিরে বিদেশি ষড়যন্ত্র, বিরোধী রাজনৈতিক দলের উসকানি কিংবা শিল্প ধ্বংসের পরিকল্পনার মতো নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সামনে আনা হয়। শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যা ও তাঁদের জীবনযাপনের সংকট নিয়ে আলোচনা না করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। এবারের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে কেন্দ্র করেও একই ধরনের বক্তব্য ও অভিযোগ প্রচারিত হচ্ছে। অথচ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উত্থাপন করা তাঁদের মৌলিক অধিকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বেঁচে থাকার উপযোগী মজুরি চাওয়া কোনো ষড়যন্ত্র নয়; এটি শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন।

বর্তমান সময়ের শ্রমিকরা তাঁদের অধিকার, বাস্তবতা ও স্বার্থ সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা বোঝেন, কোন বক্তব্য তাঁদের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে আর কোন বক্তব্য তাঁদের ন্যায্য দাবিকে আড়াল করে। তাই শ্রমিকদের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্রের তকমা দিয়ে দমন করার চেষ্টা না করে তাঁদের দাবির যৌক্তিকতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করা এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। বরং ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা গেলে শিল্পে উৎপাদনশীলতা, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।

গার্মেন্টস শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিকদের বাঁচাতে হবে। ক্ষুধা, অপুষ্টি, ঋণ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে কোনো শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব নয়। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিকে উপেক্ষা না করে অবিলম্বে গার্মেন্টস শিল্পের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকেই নতুন মজুরি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া হলে তা শুধু শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করবে না, বরং দেশের অর্থনীতি, শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার নয়, শ্রমিকদের বাস্তব সংকটের সমাধানই হোক সরকারের ও মালিকপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার। শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই গার্মেন্টস শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। 

Wednesday, October 14, 2026

গার্মেন্টস কারখানায় একের পর এক রহস্যজনক মৃত্যু: আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যা—সত্য উদ্‌ঘাটন হবে কবে?

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, সকালে ঢাকার আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের একটি পোশাক কারখানার বহুতল ভবন থেকে পড়ে মো. জামাল উদ্দিন (৩৯) নামে এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তিনি শারমিন গ্রুপের ডিভিশন-৩-এর সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি গাজীপুর সদর থানার বুরুলিয়া ডুয়েট এলাকায়। তিনি মৃত মো. সেকেন্দার আলীর ছেলে। ঘটনার পর দুপুরে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

জামাল উদ্দিনের মৃত্যুকে ঘিরে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। নিহতের ভাই ফখরুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, সকালে অফিসে যাওয়ার পর সাড়ে ৯টার দিকে তাঁকে ফোন করে জানানো হয়, তাঁর ভাই ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছেন। তিনি ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যা বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, ছোট সন্তান থাকা এবং প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হিসেবে জীবনযাপন করা একজন মানুষ কেন আত্মহত্যা করবেন, তা তাঁদের বোধগম্য নয়। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কিছু লোক ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

নিহত জামাল উদ্দিনের স্ত্রী নাহারের বক্তব্যেও ঘটনার আগে কারখানায় কোনো সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁর দাবি, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মুঠোফোনে জামাল জানিয়েছিলেন, কারখানায় কিছুটা ঝামেলা হয়েছে। পরদিন সকালে তিনি আবারও জানান, কর্তৃপক্ষ খারাপ কিছু করতে পারে। এ কারণে স্ত্রী তাঁকে অফিসে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু জামাল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, অফিসে না গেলে তাঁকে উল্টো ফাঁসিয়ে দেওয়া হতে পারে।

নাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, অফিসে যাওয়ার পর জামাল আর ফোন রিসিভ করেননি। প্রায় দুই ঘণ্টা পর অন্য একজন ফোন ধরে জানান, তিনি অসুস্থ এবং তাঁদের হাসপাতালে যেতে বলেন। হাসপাতালে যাওয়ার পর পরিবার জানতে পারে, জামাল আত্মহত্যা করেছেন বলে জানানো হচ্ছে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা এ বক্তব্য মেনে নিতে পারছেন না।

অন্যদিকে, শারমিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ উঠেছে। তবে পরিবারের অভিযোগ কিংবা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য—কোনোটিকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কী ঘটেছিল, কী কারণে ঘটেছিল এবং এর পেছনে কারও দায় বা অপরাধ ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উদ্‌ঘাটন করা জরুরি। একজন মানুষের মৃত্যুকে কেবল আত্মহত্যা বলে চিহ্নিত করে তদন্তের আগেই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।

জামাল উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও পোশাক কারখানায় শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ৩ জুন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নয়নপুরের দক্ষিণ ধনুয়া এলাকায় ডিবিএল গ্রুপের জিন্নাত নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানায় জাকির হোসেন নামে এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ছুটি চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁকে অপমান করা হয়েছিল। এর জের ধরে তিনি কারখানার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে কারও দায় ছিল কি না, সে বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও ফলাফল জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।

একইভাবে, ২০২৬ সালের ২৪ মে সাভারের হেমায়েতপুরে ব্যাবিলন গ্রুপের অবনী ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায় মো. সুজন, যিনি সজল নামেও পরিচিত, তাঁর রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের একাংশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যা বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, এ ঘটনাকেও আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

এসব ঘটনার মধ্যে একটি উদ্বেগজনক মিল রয়েছে—মৃত্যুর পরপরই আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা কিংবা পরিকল্পিত হত্যার মতো ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসে। নিহতের পরিবার ও সহকর্মীরা এক ধরনের অভিযোগ তোলেন, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সত্য কী? তদন্তের ফলাফল কী? কারও অবহেলা, নির্যাতন, হুমকি কিংবা অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

দুঃখজনকভাবে, এ ধরনের অনেক ঘটনার পর প্রাথমিক আলোচনা, প্রতিবাদ ও অভিযোগের মধ্যেই বিষয়গুলো সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তদন্তের অগ্রগতি, ময়নাতদন্তের ফলাফল কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়ে সাধারণ মানুষ, শ্রমিকসমাজ এবং নিহতের পরিবার অনেক সময় স্পষ্ট তথ্য জানতে পারেন না। ফলে একদিকে ন্যায়বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, অন্যদিকে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ শ্রমিক ও কর্মকর্তা তাঁদের শ্রম, দক্ষতা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। অথচ সেই শিল্পের কর্মক্ষেত্রেই যদি মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধোঁয়াশা থেকে যায়, তাহলে তা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়; এটি কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা এবং আইনের শাসনের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।

একজন শ্রমিক কিংবা কর্মকর্তা আত্মহত্যা করেছেন—এমন দাবি করা হলে তার পেছনের পরিস্থিতিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, অপমান, হুমকি, হয়রানি কিংবা অন্য কোনো সমস্যার শিকার ছিলেন কি না, তা তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। একইভাবে, কেউ পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তুললে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদ্‌ঘাটন করতে হবে। কোনো পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে আগেভাগেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন অনুচিত, তেমনি প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কোনো অভিযোগ উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

জামাল উদ্দিন, জাকির হোসেন কিংবা সুজন (সজল)—প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, স্বজনদের অসীম শোক এবং অসংখ্য অনুত্তরিত প্রশ্ন। তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করা শুধু পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার স্বার্থে নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করার জন্যও জরুরি।

আমরা চাই, শারমিন গ্রুপে জামাল উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনার আগে ও পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁর ওপর কোনো চাপ বা হুমকি ছিল কি না—সবকিছু আইনসম্মতভাবে যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে জিন্নাত নিটওয়্যার ও অবনী ফ্যাশনে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর ঘটনাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফলও জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

গার্মেন্টস কারখানায় একের পর এক রহস্যজনক মৃত্যু ঘটবে, আত্মহত্যা কিংবা পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ উঠবে, তারপর সময়ের সঙ্গে সবকিছু চাপা পড়ে যাবে—এ পরিস্থিতি চলতে পারে না। প্রতিটি মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশ্ন একটাই—পোশাকশিল্পের কর্মক্ষেত্রে মানুষের মৃত্যু নিয়ে এই রহস্য ও বিতর্কের অবসান হবে কবে? নিহত ব্যক্তিদের পরিবার কবে প্রকৃত সত্য জানতে পারবে? আর দায়ী ব্যক্তিরা কবে জবাবদিহির আওতায় আসবে?

মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি জীবন, একটি পরিবার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতেই প্রতিটি রহস্যজনক মৃত্যুর সত্য উদ্‌ঘাটন করতে হবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী।

Monday, October 5, 2026

অসুস্থ শ্রমিককে ছুটি না দেওয়ার অভিযোগে কুলসুমার মৃত্যু কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসা, মানবিক আচরণ ও শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সাভারের চন্দনপুর–রাজফুলবাড়িয়া এলাকায় অবস্থিত একে এইচ স্টিচ আর্ট লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানায় অসুস্থ অবস্থায় এক শ্রমিককে ছুটি না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে কারখানা ছুটির পর বাসায় ফিরে ওই শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ১ অক্টোবর ২০২৬ কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করেছেন।

নিহত শ্রমিকের নাম মোছাঃ কুলসুমা বেগম (২২)। তার আইডি কার্ড নম্বর ৮১৪৮২১৯। তিনি কারখানার সুইং বিভাগে জুনিয়র অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০ জানুয়ারি ২০২২ সাল থেকে তিনি কারখানাটিতে স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। তার স্থায়ী ঠিকানা রংপুর জেলার পীরগাছা থানার হোসেনপুর গ্রামে। মৃত্যুকালে তিনি তিন বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।

শ্রমিকদের অভিযোগ, কুলসুমা বেগম মৃত্যুর আগে টানা ৩–৪ দিন অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি একাধিকবার কারখানার মেডিক্যালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কারখানার মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ তার অসুস্থতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি এবং তাকে বিশ্রাম বা ছুটির জন্য কোনো সুপারিশ করা হয়নি বলে সহকর্মীরা অভিযোগ করেছেন।

সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে কর্মরত অবস্থায় কুলসুমা হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তিনি সুপারভাইজারের কাছে ছুটি চাইলেও তাকে ছুটি দেওয়া হয়নি বলে সহকর্মীরা জানান। ফলে শারীরিকভাবে অসুস্থ অবস্থাতেই তাকে কারখানায় অবস্থান করে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হতে হয়।

কারখানা ছুটির পর তিনি বাসায় ফিরে যান। কিন্তু বাসায় যাওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হয়। শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরদিন ১ অক্টোবর ২০২৬ কুলসুমা বেগমের মৃত্যু হয়।

কুলসুমার মৃত্যুর খবর কারখানায় পৌঁছালে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অসুস্থ অবস্থায় ছুটির আবেদন উপেক্ষা করা, যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়া এবং নিরাপদে বাড়ি বা হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা না করার অভিযোগে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করেন।

শ্রমিকদের প্রশ্ন—একজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও যদি ছুটি না পান, চিকিৎসা না পান, নিরাপদে হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ না পান, তাহলে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?

শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, কারখানায় ইউনিয়ন থাকলেও শ্রমিকদের সমস্যার কার্যকর সমাধান হয় না। কোনো অভিযোগ নিয়ে ইউনিয়ন নেতাদের কাছে গেলে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। শ্রমিকদের দাবি, ইউনিয়নের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অনেক সময় মালিকপক্ষের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন এবং শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যা নিয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন না।

শ্রমিকরা বলেন, প্রতিদিন অসুস্থ অবস্থায়ও অনেক শ্রমিককে কাজ করতে হয়। অসুস্থ হয়ে ছুটির আবেদন করলে তা গ্রহণ করা হয় না। ফলে চাকরি হারানোর ভয়ে অসুস্থ শরীর নিয়েই ডিউটি করতে বাধ্য হন শ্রমিকরা।

সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো—যে মজুরি একজন শ্রমিক পান, তা দিয়ে তিনবেলা ঠিকমতো খাবার জোটে না; সেখানে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা অনেকের কাছেই অসম্ভব। শ্রমিকদের ভাষ্য, অসুস্থ হলে তারা স্থানীয় ফার্মেসি থেকে মাস চুক্তিতে ওষুধ কিনে খান। বড় কোনো হাসপাতালে বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই।

শ্রমিকদের আশঙ্কা, কুলসুমার মতো আরও অনেক শ্রমিক অসুস্থ অবস্থায় কাজ করতে করতে একদিন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।

তাদের কণ্ঠে তাই এক গভীর প্রশ্ন—কুলসুমা চলে গেলেন, কিন্তু তার তিন বছরের শিশুটির কী হবে? তার পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে? একজন শ্রমিকের জীবন কি এতটাই মূল্যহীন?

কুলসুমা বেগমের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এটি পোশাকশিল্পে শ্রমিকের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, ছুটি, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

কর্মরত অবস্থায় কোনো শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসা নিশ্চিত করা, প্রয়োজন হলে ছুটি দেওয়া এবং নিরাপদে বাড়ি বা হাসপাতালে পাঠানো কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অসুস্থ শ্রমিককে ছুটি না দেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। তদন্তে কারও দায়িত্বহীনতা বা অবহেলা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে কারখানায় শ্রমিকদের জন্য কার্যকর চিকিৎসাব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, অসুস্থ অবস্থায় ছুটি এবং নিরাপদে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে অভিযোগ করার কারণে কোনো শ্রমিক চাকরি হারানোর ভয় না পান।

আমরা চাই না আর কোনো কুলসুমা অসুস্থ শরীর নিয়ে মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাক।

শ্রমিক মানুষ—সে কোনো মেশিন নয়। তারও অসুস্থ হওয়ার অধিকার আছে, চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে, বিশ্রাম নেওয়ার অধিকার আছে এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

কুলসুমা বেগমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কোনো অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা জড়িত ছিল কি না, তা তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করতে হবে। দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং কুলসুমার পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

আর কোনো কুলসুমার মৃত্যু নয়—শ্রমিকের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা বন্ধ, অসুস্থ শ্রমিককে চিকিৎসা ও ছুটি, কর্মক্ষেত্রে মানবিক আচরণ নিশ্চিত এবং শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। 

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। 

Wednesday, September 30, 2026

কাগজে অধিকার, বাস্তবে কতটা পাবেন শ্রমিক?

আইন সংশোধন শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন করার কারণে চাকরি হারানোর ভয়, হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ করার নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকা এবং আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত না হলে সংশোধিত শ্রম আইন শ্রমিকের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে?

বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের অন্যতম প্রধান দাবি হলো কর্মক্ষেত্রে অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বৈষম্যহীন আচরণ এবং স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার নিশ্চয়তা। এসব অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিকদের আন্দোলন, ধর্মঘট, বিক্ষোভ, দর-কষাকষি এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আইনি সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের শ্রম আইন থেকে ২০২৬ সালের সংশোধিত শ্রম আইনি কাঠামোতে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু এই দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আইনে অধিকার স্বীকৃত হওয়ার পরও শ্রমিকেরা যদি সেই অধিকার প্রয়োগ করতে না পারেন, তাহলে আইন সংশোধনের প্রকৃত সার্থকতা কোথায়?

শ্রম আইন কেবল কিছু বিধি, ধারা, উপধারা কিংবা সরকারি প্রজ্ঞাপনের সমষ্টি নয়। শ্রম আইন হলো শ্রমিকের জীবন, জীবিকা, মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। ফলে আইনের পরিবর্তনকে শুধু নতুন ধারা সংযোজন বা পুরোনো বিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে, এই পরিবর্তন কারখানার শ্রমিকের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, শ্রমিকের দর-কষাকষির ক্ষমতা কতটা বাড়াচ্ছে এবং মালিকপক্ষের অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে শ্রমিককে কতটা সুরক্ষা দিচ্ছে।

২০০৬ সালের শ্রম আইন থেকে ২০২৬: দুই দশকের অভিজ্ঞতা ২০০৬ সালে প্রণীত বাংলাদেশ শ্রম আইন কর্মসংস্থান, চাকরির শর্ত, মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তিসহ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সুরক্ষায় একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকার ও শ্রম প্রশাসনের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

কিন্তু আইনের অস্তিত্ব আর আইনের কার্যকর প্রয়োগের মধ্যে যে বড় ব্যবধান রয়েছে, তা বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতিতে বারবার প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, বকেয়া মজুরি আদায়, চাকরির নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধ এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাধা ও সংকটের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

২০১৯ সালে কয়েকটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল শ্রম পরিদর্শনের কার্যকারিতা, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং আইএলওর ৮১, ৮৭ ও ৯৮ নম্বর কনভেনশন বাস্তবায়নের প্রশ্ন। এই অভিযোগ শুধু শ্রম আইনের কিছু ধারা নিয়ে বিতর্ক ছিল না; বরং শ্রমিকের অধিকার বাস্তবে কতটা সুরক্ষিত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দায়িত্ব পালন করছে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে বাংলাদেশের আইন ও প্রয়োগের সামঞ্জস্য কতটা—সেসব প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রয়োজন, কিন্তু আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসন, স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিকের অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা।

সংশোধিত আইনে অধিকার সম্প্রসারণ: বাস্তবায়নের প্রশ্ন সাম্প্রতিক শ্রম আইন সংস্কারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত সহজ করা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বৃদ্ধি, চাকরিচ্যুত শ্রমিককে অসৎ উদ্দেশ্যে কালোতালিকাভুক্ত করার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড চালু এবং ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা কমিয়ে আনার বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।

এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা এবং শ্রম সম্পর্কের উন্নয়ন। তবে প্রতিটি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে।

প্রথমত, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত সহজ করা হলেও শ্রমিকেরা কি বাস্তবে মালিকপক্ষের বাধা, চাকরিচ্যুতি, ভয়ভীতি, হয়রানি কিংবা মামলা-মোকদ্দমার আশঙ্কা ছাড়াই সংগঠিত হতে পারবেন? দ্বিতীয়ত, বৈষম্য ও হয়রানি নিষিদ্ধ করার বিধান থাকলেও অভিযোগ জানানোর জন্য শ্রমিক কি নিরাপদ, সহজলভ্য এবং নিরপেক্ষ ব্যবস্থা পাবেন? তৃতীয়ত, মাতৃত্বকালীন সুবিধা কিংবা প্রভিডেন্ট ফান্ডের অধিকার আইনে থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ ও নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে?

আইন সংশোধনের সাফল্য নির্ভর করবে এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত সমাধানের ওপর। কারণ, অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে শ্রমিককে যদি নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়, তাহলে কাগজে স্বীকৃত অধিকার শ্রমিকের জন্য কার্যকর সুরক্ষা হয়ে উঠবে না।

ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার: ভয়মুক্ত সংগঠিত হওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন। শ্রমিক একা নিজের দাবি তুললে তার দর-কষাকষির ক্ষমতা সীমিত থাকে। কিন্তু শ্রমিকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগঠিত হলে মজুরি, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা এবং অন্যান্য অধিকার নিয়ে সম্মিলিতভাবে আলোচনা ও দর-কষাকষি করতে পারেন।

সংশোধিত আইনে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত সহজ করা হলেও প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকেরা ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নিলে চাকরি হারানোর ভয়, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিরূপ আচরণ, বদলি, হয়রানি কিংবা নানা ধরনের চাপের আশঙ্কা করেন। ইউনিয়ন গঠনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়।

এ অবস্থায় শুধু ইউনিয়ন নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সহজ করলেই স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হবে না। ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া থেকে শুরু করে নিবন্ধন, নেতৃত্ব নির্বাচন, সদস্য সংগ্রহ, নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা এবং যৌথ দর-কষাকষি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে ইউনিয়নবিরোধী বৈষম্য ও হয়রানির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত, অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত শ্রমিকের কার্যকর প্রতিকার এবং ইউনিয়নের কার্যক্রমে বেআইনি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং মালিকের বৈধ ব্যবস্থাপনাগত অধিকার—উভয়ের ক্ষেত্রে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ, যে শ্রমিক নিজের চাকরি হারানোর ভয়ে ইউনিয়নের সদস্য হতে পারেন না, তাঁর কাছে ইউনিয়ন গঠনের আইনি অধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।

কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধ: অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা চাই কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, যৌন হয়রানি, মানসিক নির্যাতন, অপমানজনক আচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শ্রমিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, শ্রমিকের মানবিক মর্যাদা ও সমানাধিকারের প্রশ্নও।

বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধের বিধান কার্যকর করতে হলে কারখানায় অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগকারী শ্রমিকের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা এবং অভিযোগ করার কারণে শ্রমিকের ওপর প্রতিশোধমূলক আচরণ বন্ধ করা জরুরি।

অভিযোগ ব্যবস্থাপনা যদি সম্পূর্ণভাবে কারখানা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং শ্রমিক যদি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করতে ভয় পান, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা, শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব, যথাযথ তদারকি এবং প্রয়োজনে শ্রম অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।

একই সঙ্গে শ্রমিকদের জানাতে হবে, কোন আচরণ বৈষম্য বা হয়রানির আওতায় পড়বে, কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কত দিনের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে এবং প্রতিকার না পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী। আইনি অধিকার সম্পর্কে শ্রমিকের সচেতনতা ছাড়া অধিকার প্রয়োগের বাস্তব সুযোগ সীমিত থেকে যাবে।

স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা: দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনার আগেই ব্যবস্থা শ্রমিকের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা মালিকের দায়িত্ব এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। অথচ কারখানায় নিরাপত্তার বিধান থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

অগ্নিনিরাপত্তা, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতির সুরক্ষা, বায়ু চলাচল, জরুরি বহির্গমন এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের নিয়মিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হওয়ার অনুশীলন করাতে হবে।

বিশেষ করে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা বিস্ফোরণের পর তদন্ত করে দায় নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত পরিদর্শন ও আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কোনো কারখানায় অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর তা সংশোধনের জন্য কার্যকর সময়সীমা, পুনরায় পরিদর্শন এবং গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু পরিদর্শনের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; পরিদর্শনের মান, শনাক্ত করা অনিয়মের ধরন, সংশোধনের অগ্রগতি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তথ্যও প্রকাশ করতে হবে। শ্রমিক ও তাঁদের প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা কমিটিতে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিরাপত্তার প্রশ্নে অবহেলার মূল্য শ্রমিককে জীবন দিয়ে দিতে হয়। তাই নিরাপত্তা বিধানের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং শ্রমিকের জীবন রক্ষার মাধ্যমে।

ন্যূনতম মজুরি: নির্ধারণের সময়সীমা নয়, জীবনযাপনের বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ন্যায্য মজুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং পরিবারের অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধু আইনে নির্দিষ্ট সময় পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান থাকলেই শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মজুরির সামঞ্জস্য নিশ্চিত হয় না।

ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া সময়মতো শুরু করা, শ্রমিকের প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। মজুরি বোর্ড গঠন, সুপারিশ প্রণয়ন এবং গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্ব হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমিকের জীবন ও পরিবারের ওপর।

মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকের ন্যূনতম প্রয়োজন, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং শ্রমিকের জীবনধারণের ব্যয়—সবকিছুকে স্বচ্ছভাবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মজুরি নির্ধারণের পর তা যথাযথভাবে পরিশোধ হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, কাগজে নির্ধারিত মজুরি এবং শ্রমিকের হাতে পাওয়া মজুরির মধ্যে ব্যবধান থাকলে মজুরি আইনও শ্রমিককে কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা দিতে পারবে না।

চাকরিচ্যুতি ও কালোতালিকাভুক্তি: শ্রমিকের জীবিকা রক্ষার প্রশ্ন শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা এবং অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতির বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার অধিকার শ্রম আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রমে যুক্ত থাকায়, ন্যায্য পাওনা দাবি করায় কিংবা কর্মক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় চাকরি হারালে তা শ্রমিকের স্বাধীনতা ও মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।

চাকরিচ্যুতির পর শ্রমিককে অসৎ উদ্দেশ্যে কালোতালিকাভুক্ত করা হলে তাঁর নতুন কর্মসংস্থান পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হতে পারে। ফলে একটি কারখানার চাকরি হারানোর প্রভাব অন্য কারখানায় কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে শুধু কালোতালিকাভুক্তির বিরুদ্ধে আইনি নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, শ্রমিকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অভিযোগ তদন্ত এবং অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ, চাকরিচ্যুতির বৈধতা যাচাই এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজ ও সময়োপযোগী হওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, আর্থিক অসচ্ছলতা এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে শ্রমিক যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রভিডেন্ট ফান্ড ও সামাজিক সুরক্ষা: ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কতটা? প্রভিডেন্ট ফান্ড শ্রমিকের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কর্মজীবনের শেষে কিংবা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের পর শ্রমিকের সঞ্চিত অর্থ তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনযাপনে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু প্রভিডেন্ট ফান্ড চালুর বিধান থাকলেই শ্রমিকের সঞ্চয় নিশ্চিত হয় না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তহবিল গঠন, নিয়মিত অর্থ জমা, হিসাব সংরক্ষণ, শ্রমিকের তথ্যপ্রাপ্তি এবং প্রাপ্য অর্থ উত্তোলনের স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকতে হবে। তহবিল পরিচালনায় অনিয়ম বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলে দ্রুত তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

একই সঙ্গে শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, মাতৃত্ব, বার্ধক্য এবং কর্মসংস্থান হারানোর মতো ঝুঁকির ক্ষেত্রে শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জন্য কার্যকর সুরক্ষা প্রয়োজন।

শ্রম পরিদর্শন ও শাস্তি: আইনের বাস্তব প্রয়োগের প্রধান শর্ত শ্রম আইন বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো কার্যকর শ্রম প্রশাসন। শ্রম অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত জনবল, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা থাকতে হবে।

শুধু আইন ভঙ্গের অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই হবে না। নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শনের মাধ্যমে অনিয়ম শনাক্ত করতে হবে। শ্রমিকের অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, সংশোধনী কার্যক্রম এবং আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—সবকিছু নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন: বছরে কতটি কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে?, কতটি কারখানায় শ্রম আইনের লঙ্ঘন শনাক্ত হয়েছে?, কতটি অভিযোগ তদন্ত করা হয়েছে এবং কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে?, কতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?, অনিয়ম সংশোধনের নির্দেশ দেওয়ার পর কতটি প্রতিষ্ঠান তা বাস্তবায়ন করেছে?, শ্রমিকের পাওনা আদায় ও চাকরিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে কতটা অগ্রগতি হয়েছে?

এ ধরনের তথ্য প্রকাশিত হলে শ্রম আইনের বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে শ্রমিক, মালিক, সরকার এবং সাধারণ মানুষের কাছে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হবে। একই সঙ্গে শ্রম প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।

ইপিজেড শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সামঞ্জস্য বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব অঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রেও সমমানের শ্রমিক অধিকার ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, যৌথ দর-কষাকষি, বৈষম্য প্রতিরোধ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগের ক্ষেত্রে ইপিজেডের আইন ও প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।

শ্রমিকের অধিকার কর্মস্থলের অবস্থান বা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ মর্যাদার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। যে শ্রমিকই হোন না কেন, তাঁর ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বৈশ্বিক বাজারে শ্রমিকের অধিকার ও বাংলাদেশের দায়িত্ব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই শিল্পের উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয় অনেকাংশে নির্ভর করে আন্তর্জাতিক ক্রেতা, ব্র্যান্ড ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর।

বর্তমানে পণ্যের দাম, গুণগত মান ও সরবরাহের সময়সীমার পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা এবং মানবিক কর্মপরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে শ্রমিকের অধিকারকে শুধু রপ্তানি বাড়ানো বা আন্তর্জাতিক বাজারে ভাবমূর্তি রক্ষার উপায় হিসেবে দেখা উচিত নয়। শ্রমিকের অধিকার তাঁর মৌলিক ও মানবিক অধিকার। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা থাকুক বা না থাকুক, ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও নিয়োগকর্তার দায়িত্ব।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোরও সরবরাহব্যবস্থায় শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। উৎপাদনমূল্য, অর্ডারের সময়সীমা এবং ব্যবসায়িক শর্ত এমন হওয়া দরকার, যাতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বাস্তব সুযোগ পায়।

শ্রমিকের অংশগ্রহণ ছাড়া শ্রম সংস্কার পূর্ণতা পাবে না শ্রম আইন সংশোধন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে শ্রমিকের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রমিকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, কর্মক্ষেত্রের সমস্যা এবং অধিকার প্রয়োগের বাধাগুলো বিবেচনায় না নিয়ে শ্রম সংস্কার করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে।

মজুরি বোর্ড, শ্রমনীতি প্রণয়ন, নিরাপত্তা বিধি, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং শ্রম প্রশাসনের জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের মতামত বিবেচনার সুযোগও থাকতে হবে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ইউনিয়নগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, সদস্যদের কাছে জবাবদিহি এবং শ্রমিকের স্বার্থে কার্যকর দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।

শ্রমিকের অধিকার নিয়ে আলোচনা যদি কেবল সরকার, মালিকপক্ষ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। তাই শ্রমিকের কণ্ঠস্বরকে শ্রম সংস্কারের কেন্দ্রে রাখতে হবে।

উপসংহার: আইনের সাফল্য নির্ধারিত হবে শ্রমিকের জীবনে পরিবর্তনে ২০০৬ থেকে ২০২৬—দুই দশকের শ্রম আইন সংস্কারের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। শুধু নতুন আইন, সংশোধনী কিংবা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আইনের বিধান বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, কার্যকর শ্রম পরিদর্শন, নিরপেক্ষ বিচার ও অভিযোগ নিষ্পত্তি, স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিকের অংশগ্রহণ।

সংশোধিত শ্রম আইনের প্রকৃত সাফল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন শ্রমিক ভয় ছাড়াই ইউনিয়ন করতে পারবেন; অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন না; কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা পাবেন; নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারবেন; সময়মতো ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য পাওনা পাবেন এবং আইন লঙ্ঘনের শিকার হলে দ্রুত প্রতিকার পাবেন।

অতএব, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সংশোধিত শ্রম আইনের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, শ্রম প্রশাসনের জবাবদিহি এবং শ্রমিকের অধিকার প্রয়োগের বাস্তব বাধাগুলো দূর করা। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু শ্রমিকের নিজের নয়; রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।

শ্রম আইন কতটা আধুনিক হয়েছে, তা শুধু আইনের ধারার সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বিচার করতে হবে—একজন শ্রমিক তাঁর অধিকার দাবি করতে গিয়ে কতটা নিরাপদ, তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য কতটা পাচ্ছেন এবং তাঁর জীবন ও মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে।

কারণ, শ্রমিকের জীবনে অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে আইনের পরিবর্তন কেবল কাগজের পরিবর্তন হয়েই থেকে যাবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। 

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ ও ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করতে হবে।

গার্মেন্টস শিল্পে অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন , ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে নতুন মজুরি কার্যকর...