সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। কোথাও শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, কেউ চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট, শরীর কাঁপা বা অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ করছেন। অনেকেই ঘটনাকে "জিন-ভূতের আতঙ্ক" বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন ব্যাখ্যা প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করে এবং শ্রমিকদের দুর্ভোগের মূল কারণগুলো থেকে সমাজের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এ ধরনের ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে গণ-হিস্টেরিয়া (Mass Psychogenic Illness) বা সমষ্টিগত মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা-র কথা বলা হয়। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, আবার কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনাও নয়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, ভয়, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, শারীরিক দুর্বলতা, পুষ্টিহীনতা এবং অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের কারণে অনেক মানুষের মধ্যে একই ধরনের শারীরিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।
বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। অনেক কারখানায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করানো হচ্ছে। কোনো কোনো দিন রাত ২টা বা ৩টা পর্যন্তও কাজ করতে হচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও "জেনারেল" হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। রাত ১১টা বা ১২টায় বাসায় ফিরে রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ১টা বা ২টা বেজে যায়। আবার ভোর ৫টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। অর্থাৎ একজন শ্রমিক প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন।
একজন মানুষ কতদিন এভাবে চলতে পারেন?
অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং কম মজুরি শ্রমিকদের এমন এক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে তারা পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলছেন। অনেক শ্রমিক প্রতিদিন ডাল, আলুভর্তা, করলা ভাজি বা স্বল্পমূল্যের একঘেয়ে খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। যে পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম তারা করেন, সেই তুলনায় প্রয়োজনীয় ক্যালরি, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান তাদের খাদ্যতালিকায় নেই। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন।
এই দুর্বল শরীর নিয়েই তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎপাদন লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কম মজুরির কারণে তারা অতিরিক্ত আয়ের আশায় ওভারটাইম করতে বাধ্য হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ওভারটাইম করতে অস্বীকৃতি জানালে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। অর্থাৎ এটি কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়; বরং অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে তৈরি হওয়া এক ধরনের বাধ্যবাধকতা।
এমন পরিস্থিতিতে যদি হঠাৎ একটি কারখানায় একজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে একই মানসিক চাপ ও শারীরিক দুর্বলতায় থাকা অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তাই ঘটনাগুলোকে "জিন-ভূতের আছর" বলে প্রচার করা সমস্যার সমাধান নয়; বরং প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানকে বাধাগ্রস্ত করে।
প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কারখানার বায়ুমান, রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার, পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল, তাপমাত্রা, স্বাস্থ্যবিধি এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা—সবকিছুই বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এই শিল্পের প্রাণ হলো শ্রমিক। তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুযায়ী নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো কারখানায় যদি বারবার "জিন-ভূতের আতঙ্ক" দেখা দেয়, তাহলে হয়তো সেখানে অতিপ্রাকৃত কিছু নেই; বরং আছে অবহেলা, শোষণ, ক্লান্তি, অপুষ্টি এবং সীমাহীন মানসিক চাপের এক নির্মম বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াই হবে সমস্যার প্রকৃত সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ।
খাইরুল মামুন মিন্টু






