বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আজকের বাংলাদেশ–এর অগ্রযাত্রায় নারীদের অবদান অনস্বীকার্য এবং বহুমাত্রিক।
দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে লেদার, টেক্সটাইল, স্বাস্থ্যসেবা, খুচরা ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই নারীরা সক্রিয়। শুধু বেসরকারি খাত নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেও নারীদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। যেমন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এসব প্রতিষ্ঠানে নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে। পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়নমূলক সংস্থাগুলোতেও নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠছেন।
তবে সমাজের আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। এখনো এমন একটি অংশ আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, ঘরের বাইরের জগতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এবং পরিবারে পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করেন। তাদের অনেকেই এই জীবনকেই স্বাভাবিক বা অনিবার্য বলে মনে করেন। এই সামাজিক বাস্তবতাকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংগঠন তাদের নিজস্ব মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ঘরে ঘরে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে এমন নারীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে এমন অভিযোগ ও আলোচনা জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও পরকালকেন্দ্রিক চিন্তার মাধ্যমে নারীদের সামাজিক ভূমিকা সীমিত রাখার ধারণা প্রচারের বিষয়টি নিয়ে সমাজে বিতর্কও কম নয়। কারণ, আধুনিক বাংলাদেশে নারীকে শুধু পরিবারকেন্দ্রিক নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের সমান অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে। ফলে নারী বিদ্বেষী বা নারীর ভূমিকা সংকুচিত করে এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষের বড় অংশ সহজে গ্রহণ করে না।
রাজনীতিতেও এই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল, বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে মৌলবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে জনগণ বারবার দেখিয়েছে তারা ধর্মপ্রাণ হলেও চরমপন্থী বা নারী-বিরোধী রাজনীতিকে সমর্থন করতে প্রস্তুত নয়। যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও, জনমতের বড় অংশ নারীসমতা ও সামাজিক অংশীদারিত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এমন মূল্যায়ন অনেক বিশ্লেষকের।
বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বাস্তববাদী, মানবিক এবং সামাজিক ভারসাম্যে বিশ্বাসী। তারা বোঝে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না।
আজকের বাংলাদেশে নারীরা শুধু পরিবার নয়, অর্থনীতি, প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছে। তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে এমন একটি সমাজ, যেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে দেশ গঠনের দায়িত্ব ভাগ করে নেবে। এটাই সময়ের দাবি, এটাই অগ্রগতির পথ।
KM Mintu






