Followers

Thursday, September 10, 2026

রপ্তানি বাড়ছে—তাহলে শ্রমিকের মজুরি বাড়বে না কেন?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে ঘিরে বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী চিত্র সামনে এসেছে। একদিকে পোশাক রপ্তানি বাড়ছে, বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা ও ক্রেতাদের আস্থা থাকার কথা বলা হচ্ছে; অন্যদিকে একই সময়ে একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন এবং শিল্পের মালিকরা উৎপাদন ব্যয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকঋণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরছেন।

এই বাস্তবতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—যদি পোশাক শিল্পের রপ্তানি বাড়তে পারে, নতুন কারখানায় বিপুল শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, তাহলে পুরোনো শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করতে এত সংকট কোথায়?

৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময় টিভির এক সাক্ষাৎকারে বিজিএমইএ সভাপতি যে তথ্য দিয়েছেন, তা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৩১টি ওভেন পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং এতে ১৬ হাজার ৭৩৯ জন শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। একই সময়ে নতুন ৫৩টি কারখানায় ৮০ হাজার থেকে ৮২ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ৩৬টি নিট পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ায় ১৭ হাজার ১৫৫ জন শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বিপরীতে নতুন ৫৩টি কারখানায় ৪৬ হাজার ৩৮৪ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অর্থাৎ, মালিক সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্যেই দেখা যাচ্ছে—শিল্পে একদিকে কারখানা বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে। ফলে শুধু ‘শিল্প সংকটে আছে’—এই একমাত্রিক ব্যাখ্যা দিয়ে শ্রমিকের মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না।

রপ্তানি বাড়ছে—তাহলে সংকটের প্রকৃত চিত্র কী?

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস—জুলাই ও আগস্টে—বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৭১৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ।

শুধু দুই মাসের হিসাবেই নয়, আগস্ট মাসের বছরভিত্তিক তুলনাতেও প্রবৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ৩১৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩৬১ কোটি ডলার—প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

উপখাতভিত্তিক হিসাবেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৬ সালের আগস্টে নিটওয়্যার রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২০৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলার, প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

অর্থাৎ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা একেবারে ভেঙে পড়েছে—এমন কথা বলা কঠিন। বরং রপ্তানি তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক এখনও প্রতিযোগিতা করছে এবং ক্রেতাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করছে। এখানেই শ্রমিকদের প্রশ্নটি সামনে আসে।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট আছে, কিন্তু রপ্তানিও বাড়ছে

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের বক্তব্য অনুযায়ী, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের অনেক পোশাক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে, কোথাও দিনের কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে স্থানীয় বস্ত্রকলগুলোর উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সময়মতো পোশাক উৎপাদন ও বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া নিয়ে তৈরি হচ্ছে চাপ।

বিকেএমইএর নিজস্ব নথিতেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া বা বন্ধ থাকার বিষয়ে সদস্য কারখানাগুলোর কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

আবার আগস্টে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে। একই মাসে মোট পণ্য রপ্তানিও বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।

তাহলে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে—উৎপাদন যদি সংকটে থাকে, তাহলে রপ্তানি বাড়ছে কীভাবে?

এর উত্তর হয়তো শিল্পের জটিল বাস্তবতার মধ্যেই রয়েছে। রপ্তানি পরিসংখ্যান এক মাস বা দুই মাসে শিল্পের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি প্রকাশ করে না। আগের অর্ডার, মজুত পণ্য, উৎপাদন সক্ষমতার পুনর্বণ্টন, দক্ষতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পণ্য, ক্রয়াদেশের সময়সূচি—এসব কারণ রপ্তানি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটও বাস্তব সমস্যা হতে পারে।

কিন্তু এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—শিল্পের সংকট থাকলেও তার পুরো বোঝা শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মজুরি বৃদ্ধির সময় এলেই কেন শুধু সংকটের গল্প?

আমার দীর্ঘ শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রশ্ন সামনে এলেই মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে নানা ধরনের সংকটের কথা সামনে আসে। কখনো বলা হয় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কখনো আন্তর্জাতিক বাজার খারাপ, কখনো অর্ডার কম, কখনো গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কখনো ব্যাংকঋণের সমস্যা।

এই সমস্যাগুলো বাস্তব হলে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—তিন পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করতে হবে। কিন্তু শিল্পের প্রতিটি সমস্যার সমাধান যদি শ্রমিকের মজুরি না বাড়ানোর মধ্যে খোঁজা হয়, তাহলে তা কোনো টেকসই শিল্পনীতি হতে পারে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কারখানার মালিকের উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে শ্রমিকের মজুরি যেমন একটি ব্যয়, তেমনি শ্রমিকের শ্রমই সেই উৎপাদনের প্রধান ভিত্তি। শ্রমিককে বাদ দিয়ে পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি কল্পনা করা সম্ভব নয়।

তিন বছর পর মজুরি পুনর্নির্ধারণ—আইন মানা হবে কবে?

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধানে ন্যূনতম মজুরি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণের বিধান যুক্ত হয়েছে। ধারা ১৩৯(৬)-এর এই পরিবর্তনের ফলে ন্যূনতম মজুরি নিয়মিত পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি আরও স্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে এসেছে।

২০১৮ সালের পোশাক শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে নতুন মজুরি নির্ধারণ করা হয়। ফলে ২০২৬ সালে নতুন করে মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইনে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। আইনের কাঠামো অনুযায়ী, সরকার নির্দেশ দিলে মজুরি বোর্ডকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুপারিশ দিতে হয়। একই সঙ্গে মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, জীবনযাত্রার মান, উৎপাদন ব্যয়, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের মূল্য, মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির মতো বিষয় বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

অতএব, মজুরি নির্ধারণের আলোচনায় শুধু মালিকের উৎপাদন ব্যয় দেখলে হবে না; শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

১২ হাজার ৫০০ টাকায় একটি পরিবার চলে কীভাবে?

২০২৩ সালে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষা ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

একজন শ্রমিককে শুধু নিজের খাবারের হিসাব করলেই তো হবে না। তার সঙ্গে রয়েছে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত, চিকিৎসা ও ওষুধ, সন্তানের শিক্ষা, পোশাক, দৈনন্দিন প্রয়োজন এবং হঠাৎ কোনো জরুরি ব্যয়।

অনেক শ্রমিকের অভিজ্ঞতা হলো—মাসের প্রথম ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অর্থের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় ধার-দেনা, ক্ষুদ্রঋণ, দোকানে বাকিতে কেনাকাটা অথবা অতিরিক্ত ওভারটাইমের ওপর নির্ভরতা।

এভাবে একটি শ্রমিক পরিবার মাসের পর মাস টিকে থাকতে পারে, কিন্তু এভাবে একটি শিল্প টেকসই হতে পারে না।ক্ষুধার্ত শ্রমিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা আশা করা যায় না

পোশাক শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো শ্রমিক। একটি আধুনিক মেশিন কয়েক কোটি টাকা দিয়ে কেনা যায়, কিন্তু দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সুস্থ শ্রমিক তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে।

একজন শ্রমিক যদি পর্যাপ্ত খাবার না পান, চিকিৎসা করাতে না পারেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন এবং মাসের শেষে ঋণের বোঝা নিয়ে মানসিক চাপে থাকেন, তাহলে তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

শ্রমিকের অপুষ্টি শুধু শ্রমিকের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি শিল্পের উৎপাদনশীলতার সমস্যাও।

একজন সুস্থ শ্রমিক বেশি মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারেন। নিরাপদ কর্মপরিবেশে থাকা শ্রমিক কম দুর্ঘটনার শিকার হন। ন্যায্য মজুরি পাওয়া শ্রমিকের কর্মস্থলে স্থায়িত্ব ও মনোবল বাড়ে। দক্ষ শ্রমিককে ধরে রাখা যায়। উৎপাদনের গুণগত মানও উন্নত হয়।

সুতরাং শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোকে শুধু ‘ব্যয় বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। ন্যায্য মজুরি আসলে শিল্পের উৎপাদনশীলতায় বিনিয়োগ।

নতুন কারখানায় কর্মসংস্থান হচ্ছে—এটি আশাব্যঞ্জক, কিন্তু পুরোনো শ্রমিকদের কী হবে?

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বন্ধ হওয়া কারখানার বিপরীতে নতুন কারখানায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

কিন্তু এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের কতজন নতুন কারখানায় চাকরি পেয়েছেন?

একজন শ্রমিকের কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু তাঁর চাকরিটিই হারায় না; তাঁর পরিবারের আয়, সন্তানের শিক্ষা, বাসাভাড়া, খাদ্যনিরাপত্তা—সবকিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। নতুন কারখানায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া ভালো, কিন্তু পুরোনো শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, পাওনা পরিশোধ, পুনর্বাসন এবং পুনঃনিয়োগের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

কারখানা বন্ধ এবং নতুন কারখানা খোলার হিসাব দিয়ে শ্রমিকের বাস্তব জীবনকে বিচার করা যায় না।

আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা মানে শ্রমিকের মজুরি কম রাখা নয়

পোশাক মালিকদের একটি সাধারণ যুক্তি হলো—আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র। বাংলাদেশের পোশাকের দাম বেশি হলে ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যেতে পারেন।

এই যুক্তির বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একমাত্র উপায় শ্রমিকের কম মজুরি।

বিশ্বের ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলো এখন ক্রমশ শ্রমিকের অধিকার, মানবাধিকার, কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এসব বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তাই ‘কম মজুরি মানেই বেশি প্রতিযোগিতা’—এই পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ভিত্তি হওয়া উচিত দক্ষতা, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, দ্রুত ডেলিভারি, মানসম্মত উৎপাদন এবং একই সঙ্গে শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার।

শ্রমিকের মজুরি বাড়লে অর্থনীতিও লাভবান হবে

গার্মেন্টস শ্রমিকরা যে অর্থ উপার্জন করেন, তার বড় অংশই দেশে ব্যয় করেন। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে এই অর্থ ব্যয় হয়।

অর্থাৎ শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি শুধু একজন শ্রমিকের আয় বাড়ায় না; এটি স্থানীয় বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতকে সচল রাখে এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ায়।

তাই ন্যায্য মজুরি অর্থনীতির জন্য বোঝা নয়; বরং অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করার অন্যতম উপায়।

শিল্প রক্ষার নামে শ্রমিকের অধিকার খর্ব করা যাবে না

আমরা চাই পোশাক শিল্প টিকে থাকুক, আরও বড় হোক এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হোক। কিন্তু সেই শিল্প যদি শ্রমিকের অস্বাভাবিক কম মজুরি, অনিরাপদ জীবন, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং অধিকারহীনতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

শিল্পের সংকট থাকলে সরকারকে তার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে। শিল্পের জন্য ন্যায্য আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত সুবিধা দিতে হবে। প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ শিল্প বাঁচানোর নামে শ্রমিককে বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কোনো সমাধান নয়।

এখনই মজুরি বোর্ড গঠন জরুরি

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব হলো দ্রুত পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা এবং বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা।

মজুরি নির্ধারণের সময় শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যয় নয়, শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়কে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় আনতে হবে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত, পোশাক এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের বাস্তব ব্যয় বিবেচনা করেই একটি মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির যে দাবি উত্থাপিত হয়েছে, সেটিও বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় ও শ্রমিক পরিবারের প্রয়োজনের আলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।

শেষ কথা

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নিয়ে আজ দুটি ছবি পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে।

একটি ছবিতে কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং মালিকরা নানা সংকটের কথা বলছেন।

অন্য ছবিতে দেখা যাচ্ছে—নতুন কারখানা হচ্ছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, পোশাক রপ্তানি আবারও প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে।

এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাই কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়। বরং প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট—

যদি রপ্তানি বাড়ে, যদি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যদি আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাক কিনতে থাকে, তাহলে যে শ্রমিকের ঘাম ও শ্রমে এই রপ্তানি আয় সৃষ্টি হচ্ছে, তাঁর জীবনযাত্রার ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপত্তি কোথায়?

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করতে হবে, ব্যাংকিং সংকটের সমাধান করতে হবে, শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, নতুন বিনিয়োগ আনতে হবে—এসবই জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরিও বাড়াতে হবে।

কারণ শ্রমিক কোনো খরচের খাত নয়—শ্রমিকই উৎপাদনের প্রধান শক্তি।

শ্রমিকের জীবনমান উন্নত হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। শ্রমিক নিরাপদ থাকলে উৎপাদন টেকসই হবে। শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পেলে শিল্পে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিক ধরে রাখা সহজ হবে। আর শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।

সুতরাং এখন সময় এসেছে সংকটের অজুহাত দেখিয়ে মজুরি বৃদ্ধির প্রশ্নকে পিছিয়ে না দিয়ে আইনের বিধান অনুযায়ী দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন, বাস্তবসম্মত ও জীবনধারণযোগ্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার।

শিল্পকে বাঁচাতে হলে শ্রমিককে বাঁচাতে হবে। আর শ্রমিককে বাঁচাতে হলে ন্যায্য মজুরির কোনো বিকল্প নেই।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Tuesday, September 1, 2026

নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর: শ্রমিকের জীবনে এর সুফল কোথায়?

জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ বাস্তবতা। বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন ও পরিবেশগত বিপর্যয় মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে। এই সংকট মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানি—কয়লা, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস—নির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, ভূ-তাপীয় ও বায়োমাসের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিতে রূপান্তর এখন সময়ের দাবি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, সামাজিক ও নীতিগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন, টেকসই ও ভবিষ্যৎবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে, আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই রূপান্তরের গুরুত্ব আরও বেশি। সূর্যের আলো, বাতাস, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উৎসকে কাজে লাগিয়ে দেশের নিজস্ব সম্পদ থেকে পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল কারা ভোগ করবে? আর এই পরিবর্তনের কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের দায়িত্ব কে নেবে?

জাস্ট ট্রানজিশনের মূল কথা হলো—জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য অর্থনীতিতে যে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, সেই পরিবর্তনের পুরো বোঝা যেন শ্রমিক, নিম্নআয়ের মানুষ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা দুর্বল সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে; কিন্তু সেখানে কর্মরত শ্রমিক যদি পরদিন বেকার হয়ে যান, তার পরিবারের খাবার, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই পরিবর্তনকে পুরোপুরি ন্যায়সংগত বলা যায় না।

একইভাবে তেলভিত্তিক শিল্প বন্ধ করা বা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, আয়-সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার নিশ্চয়তা না দিয়ে শুধু শিল্প বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই জাস্ট ট্রানজিশন হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক সংলাপ, শোভন কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষা করতে হবে, কিন্তু শ্রমিককে ধ্বংস করে নয়; শিল্পকে সবুজ করতে হবে, কিন্তু শ্রমিকের জীবনকে অনিশ্চিত করে নয়।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে ‘গ্রিন ট্রানজিশন’ নিয়ে আলোচনা যতটা হচ্ছে, ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ নিয়ে ততটা বাস্তব পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

সরকার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব ও গ্রিন কারখানা নির্মাণে উৎসাহিত করছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু একটি কারখানাকে পরিবেশবান্ধব করতে যে অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার বড় অংশ যদি শিল্প মালিকদের ওপর পড়ে, তখন তারা সরকারের কাছে প্রণোদনা, ভর্তুকি, সহজ ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা দাবি করেন। অর্থাৎ সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য শিল্প মালিকদের আর্থিক সহায়তার দাবি সামনে আসে।

রাষ্ট্রও অর্থনীতিকে সচল রাখা, বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা এবং শিল্প খাতকে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এই বিপুল অর্থনৈতিক সহায়তার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার—শ্রমিক—কোথায়?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। একটি কারখানা বন্ধ হলে বা উৎপাদন কমে গেলে প্রথম আঘাতটি আসে শ্রমিকের ওপর। চাকরি হারান শ্রমিক। আয় বন্ধ হয়ে যায়। বাড়িভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা—সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অনেক শ্রমিক বছরের পর বছর একটি কারখানায় কাজ করেও এমন কোনো কার্যকর ভবিষ্যৎ তহবিল পান না, যেখান থেকে চাকরি হারানোর পর কয়েক মাস পরিবার চালাতে পারবেন।

এখানে প্রশ্ন ওঠে—একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য যদি হাজার হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া যায়, তাহলে চাকরি হারানো শ্রমিককে কয়েক মাস বেঁচে থাকার জন্য একটি বিশেষ সহায়তা দেওয়া যাবে না কেন?

শিল্পের জন্য প্রণোদনা থাকতে পারে, ব্যাংকের জন্য সহায়তা থাকতে পারে, উদ্যোক্তার জন্য সহজ ঋণ থাকতে পারে, গ্রিন প্রযুক্তির জন্য ভর্তুকি থাকতে পারে—কিন্তু শ্রমিকের জন্য কেন থাকবে না? এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

কারণ শিল্পের প্রকৃত সম্পদ শুধু ভবন, যন্ত্রপাতি কিংবা মূলধন নয়; শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো শ্রমিক। একজন শ্রমিক তার জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়টি শিল্পকে দেন। তার শ্রমে পণ্য তৈরি হয়, রপ্তানি আয় আসে, মালিকের মুনাফা হয় এবং দেশের অর্থনীতি সচল থাকে। সেই শ্রমিক যখন শিল্পের সংকটের কারণে চাকরি হারান, তখন তার দায়িত্ব শুধু শ্রমিকের নিজের নয়—রাষ্ট্র, শিল্প মালিক এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষেরও।

আজ যদি বাংলাদেশের শিল্প খাতকে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে হয়, তাহলে একই সঙ্গে শ্রমিকদের জন্যও একটি ন্যায়সংগত রূপান্তর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

এই পরিকল্পনার প্রথম শর্ত হতে পারে—কোনো শিল্পের প্রযুক্তিগত বা পরিবেশগত রূপান্তরের কারণে শ্রমিক যেন হঠাৎ বেকার না হন। প্রয়োজন হলে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিককে শুধু ‘অদক্ষ শ্রমিক’ হিসেবে দেখলে চলবে না। বছরের পর বছর কাজ করতে করতে তিনি যে দক্ষতা অর্জন করেছেন, তাকে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দিতে হবে।

সোলার প্যানেল উৎপাদন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ব্যাটারি, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প, সবুজ নির্মাণ এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থায় বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তব কর্মসংস্থানে পরিণত করার জন্য রাষ্ট্রকে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে।

শুধু ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ তৈরি করলেই জাস্ট ট্রানজিশন হবে না। প্রশ্ন করতে হবে—সেই গ্রিন ফ্যাক্টরিতে কারা কাজ করবে? পুরোনো শিল্পের চাকরি হারানো শ্রমিকদের কতজন সেখানে পুনর্বাসিত হবে? তাদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে? প্রশিক্ষণ চলাকালে তাদের পরিবার কীভাবে চলবে? নতুন শিল্পে তাদের মজুরি কত হবে? তাদের শ্রমিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া গ্রিন ট্রানজিশন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মজুরি। একজন শ্রমিক যদি সারাদিন কাজ করেও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে না পারেন, তাহলে কোনো অর্থেই সেই কর্মসংস্থানকে টেকসই বলা যায় না। পরিবেশবান্ধব শিল্পের অর্থনীতিও শ্রমিকের জন্য ন্যায্য ও জীবনধারণযোগ্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।

সবুজ অর্থনীতি যদি শুধু মালিকের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে এবং শ্রমিকের জন্য কম মজুরি, অনিশ্চিত চাকরি ও অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করে, তাহলে সেটি প্রকৃত অর্থে ন্যায়সংগত রূপান্তর নয়।

তাই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি ‘জাস্ট ট্রানজিশন ফান্ড’ বা ন্যায়সংগত রূপান্তর তহবিল। এই তহবিলের অর্থ আসতে পারে রাষ্ট্রীয় বাজেট, শিল্প খাতের অবদান, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, উন্নত দেশগুলোর জলবায়ু সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উৎস থেকে।

এই তহবিল থেকে চাকরি হারানো শ্রমিককে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আয়-সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পুনঃপ্রশিক্ষণ, নতুন কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

বিশেষ করে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় উন্নত ও ধনী দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়ের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন ও দীর্ঘদিনের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, তার বড় অংশ উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ওপর সবুজ রূপান্তরের আর্থিক বোঝা একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।

বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন থেকে শ্রমিককেন্দ্রিক জাস্ট ট্রানজিশনের জন্য অর্থ দাবি করা। শুধু বাঁধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অবকাঠামো নয়—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীবিকা হারানো এবং শিল্প রূপান্তরের কারণে চাকরি হারানো শ্রমিকদের জন্যও অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

যদি শিল্প খাতকে গ্রিন করার জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়, তাহলে শ্রমিকের জন্য প্রণোদনা দিতে হবে।  যদি বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে চাকরি হারানো শ্রমিকের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সহায়তা দিতে হবে। যদি গ্রিন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য সহজ ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য তহবিল গঠন করতে হবে। 

যদি শিল্প মালিকের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের কথা বিবেচনা করা হয়, তাহলে শ্রমিকের ভবিষ্যৎ জীবিকার কথা কেন বিবেচনা করতে হবে। এগুলো শিল্পকে টেকসই করার প্রশ্ন। শ্রমিকের নিরাপত্তা ছাড়া কোনো শিল্পই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। আমরা চাইলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরকে শুধু পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি হিসেবে না দেখে একটি নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চুক্তির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারি যেখানে পরিচ্ছন্ন শক্তি থাকবে, দূষণ কমবে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং একই সঙ্গে পুরোনো শিল্পের শ্রমিকরাও নিরাপদ ভবিষ্যৎ পাবেন।

সেই বাংলাদেশে কোনো শ্রমিককে বলা হবে না—‘পরিবেশ রক্ষার জন্য তোমার চাকরি চলে গেছে, এখন তোমার ভবিষ্যৎ তোমাকেই দেখতে হবে।’

বরং রাষ্ট্র বলবে—‘শিল্প ও প্রযুক্তি পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু তুমি এই পরিবর্তনের অংশ। তোমার দক্ষতা উন্নত করা হবে, তোমাকে নতুন কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে এবং তোমার পরিবারকে এই রূপান্তরের সময় সুরক্ষা দেওয়া হবে। এটাই হতে পারে প্রকৃত জাস্ট ট্রানজিশন।

পরিবেশ রক্ষা অবশ্যই করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। গ্রিন শিল্প গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মূল্য যেন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে তাদের চাকরি, আয় ও জীবিকা দিয়ে পরিশোধ করতে না হয়।

কারণ জলবায়ু রক্ষার নামে যদি শ্রমিকের জীবন অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তাহলে সেই উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গ নয়। আর যে সবুজ অর্থনীতিতে শ্রমিকের জন্য নিরাপদ চাকরি, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নেই, সেই সবুজ অর্থনীতি আসলে কতটা ‘সবুজ’—সেটিও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

অতএব, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশে ‘গ্রিন ট্রানজিশন’ নয়, ‘গ্রিন অ্যান্ড জাস্ট ট্রানজিশন’-এর দাবি তোলার। সরকারের উচিত অবিলম্বে চাকরি হারানো শ্রমিকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা, একটি জাতীয় জাস্ট ট্রানজিশন নীতি প্রণয়ন করা, শ্রমিকদের জন্য ন্যায়সংগত রূপান্তর তহবিল গঠন করা এবং নতুন সবুজ শিল্পে পুরোনো শিল্পের শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা দেওয়া।

শুধু শিল্প মালিকের বিনিয়োগ রক্ষা নয়—শ্রমিকের জীবন ও ভবিষ্যৎও রক্ষা করতে হবে। কারণ পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ তখনই সত্যিকার অর্থে টেকসই বাংলাদেশ হবে, যখন সেই বাংলাদেশের বাতাস হবে নির্মল, শিল্প হবে সবুজ, অর্থনীতি হবে শক্তিশালী এবং শ্রমিকের জীবন হবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

Thursday, August 27, 2026

দুঃখ প্রকাশ করার বিষয়টি যেমন প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে

 


পরিসংখ্যানের ভুল সংশোধন এবং তার পরপরই প্রশাসনিক রদবদল—এই দুই ঘটনা মেলালে তৈরি হওয়া সংশয় একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কোনো স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যখন কোনো ডেটা বা তথ্য পরিবেশন করা হয়, সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞ সমাজ সেটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। কিন্তু ভুল তথ্য পরিবেশন এবং পরবর্তীতে দুঃখ প্রকাশ করার বিষয়টি যেমন প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তেমনি তার ঠিক পরদিনই নির্বাহী পরিচালক পদে পরিবর্তনের ঘোষণা সেই সংশয়কে আরও গভীর করে তোলে।

তবে কাগজ-কলমের এই হিসাব বা ভুল তথ্যের পেছনের বিতর্ক যাই হোক না কেন, বাস্তব চিত্রটি যে আরও অনেক বেশি করুণ ও ভয়াবহ—তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। পরিসংখ্যান যা-ই বলুক না কেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতসহ সামগ্রিক শিল্প খাতে যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রকৃত ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে সাধারণ শ্রমিকদের।

একের পর এক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদনে স্থবিরতা দেখা দেওয়ার কারণে ইতিমধ্যে লাখ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। পরিসংখ্যানের খাতায় সংখ্যাটি হাজার বা লাখে সীমাবদ্ধ হলেও, বাস্তবে এটি লাখ লাখ পরিবারের অন্নসংস্থানের পথ বন্ধ হওয়ার গল্প।

চাকরি হারানো এই বিশাল জনগোষ্ঠী রাতারাতি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে বিকল্প কোনো আয়ের উৎস না থাকায় শ্রমিক পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়।

শিল্প খাতের এই অচল অবস্থা এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়ার পর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল দ্রুততম সময়ে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো: বেকার হয়ে পড়া এই বিপুলসংখ্যক পোশাক শ্রমিকের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এখনো চোখে পড়ছে না।

শিল্প কারখানায় স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষায় দৃশ্যমান ও বলিষ্ঠ কোনো পদক্ষেপ বা উদ্যোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

পরিসংখ্যানের নানা জটিলতা বা প্রাতিষ্ঠানিক রদবদলের খবরের চেয়েও আজকের দিনে বড় সত্য হলো মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতা। তথ্যের বিভ্রান্তি সাময়িকভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও, কোটি মানুষের জীবিকার এই সংকটকে জিইয়ে রেখে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সম্ভব নয়। কারখানাগুলোকে দ্রুত সচল করা এবং বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

লিখহেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Tuesday, August 18, 2026

জয় নিশ্চিত জেনেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নাকি অপ্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ব্যয়?

 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংসদীয় গণতন্ত্র, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহারের প্রশ্ন। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় যখন ফলাফল ভোট গ্রহণের আগেই কার্যত নির্ধারিত হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এমন নির্বাচনে বিপুল অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় করার প্রয়োজন কতটা?

বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কেউই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। ফলে তফসিল অনুযায়ী আগামী বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার সাধারণ জনগণ নন; সংসদ সদস্যরাই এ নির্বাচনের ভোটার। বর্তমান সংসদে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্য ২৫৯ জন এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদ সদস্য ৯০ জন। ফলে বিএনপির এককভাবেই দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্ট দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপির সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সুযোগ কার্যত অত্যন্ত সীমিত। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে একজন সংসদ সদস্যকে নিজের আসন হারানোর ঝুঁকি নিতে হবে।

ফলে বিএনপির ২৫৯ জন সংসদ সদস্য যদি দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভোট দেন, তাহলে তিনি প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবেন—এটি প্রায় নিশ্চিত। বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের ৯০ জন সংসদ সদস্য সম্মিলিতভাবে ভোট দিলেও তাঁদের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

অর্থাৎ ভোটের ফলাফল নির্ধারণে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। নির্বাচনের দিন ব্যালট বাক্সে ভোট পড়বে, ভোট গণনা হবে, ফলাফল ঘোষণা করা হবে—কিন্তু ফলাফলের রাজনৈতিক বাস্তবতা ইতোমধ্যেই সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কে নির্ধারিত হয়ে আছে।

এ অবস্থায় প্রশ্নটি হলো—যখন ফলাফল প্রায় নিশ্চিত, তখন এই নির্বাচন আয়োজনের জন্য রাষ্ট্রের কত টাকা ব্যয় হবে এবং সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা কোথায়?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে শুধু ব্যালট পেপার ছাপানোর খরচ জড়িত নয়। এর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহন ও সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত দায়িত্ব, পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, গণনা ও ফলাফল প্রকাশসহ নানা ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয় যুক্ত থাকে।

একটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এসব ব্যয় স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কারণ প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে ভোটারদের মতামত গ্রহণ এবং সেই মতামতের ভিত্তিতে ফলাফল নির্ধারণের জন্য এসব ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু যখন নির্বাচনের ফলাফল ভোট গ্রহণের আগেই সংসদের দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কার্যত নির্ধারিত হয়ে যায়, তখন একই মাত্রার নির্বাচনী আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়।

এখানে বিষয়টি শুধু কয়েকটি ব্যালট পেপারের খরচের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতার প্রশ্ন।

জনগণের করের টাকা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। সেই অর্থের প্রতিটি টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি নির্বাচন যদি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি না করে এবং ফলাফল যদি দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আগেই প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, তাহলে শুধু সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ব্যয় করা অর্থের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বিধান অমান্য করা উচিত। সংবিধানে নির্বাচন নির্ধারিত থাকলে তা অনুসরণ করতেই হবে। বরং প্রশ্নটি আরও গভীর—সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকেই কীভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো যায় এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, অর্থবহ ও গণতান্ত্রিক করা যায়?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যদি সংসদ সদস্যরাই ভোটার হন এবং সংসদে কোনো একটি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তাহলে বাস্তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিসর খুব সংকুচিত হয়ে যায়। কারণ সংসদীয় দলের সিদ্ধান্তই ভোটের ফলাফলকে প্রায় নির্ধারণ করে দেয়। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনেক সময় জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের প্রতিফলন না হয়ে সংসদে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিফলনে পরিণত হতে পারে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গণতন্ত্রের মান। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন আয়োজনের নাম নয়। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো কার্যকর প্রতিযোগিতা, স্বাধীন মতপ্রকাশ, ভিন্নমতের মর্যাদা, জবাবদিহি এবং জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার।

একটি নির্বাচন আয়োজন করা হলো বলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থবহ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হয়ে যায় না। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা বাস্তব, ভোটাররা কতটা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন এবং নির্বাচনের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে কতটা অনিশ্চিত—এসব বিষয়ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—নির্বাচনটি আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় কি না, তা নয়; বরং বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে এই নির্বাচনকে কীভাবে আরও অর্থবহ করা যায়।

যদি নির্বাচনে দুজন প্রার্থী থাকেন, তাহলে তাঁদের সমানভাবে প্রচারের সুযোগ, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ, প্রার্থীদের যোগ্যতা ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এবং ভোটের প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ হারানোর ঝুঁকি থাকলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার বাস্তব সুযোগ কতটা থাকে—সেই প্রশ্নও আলোচনায় আসা দরকার।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ঘটনাটি তাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে দলীয় শৃঙ্খলা যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নির্বাচনকে অর্থবহ করার জন্য সংসদ সদস্যদের বিবেক, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদও গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার—রাষ্ট্রীয় অর্থ কোনো রাজনৈতিক দলের অর্থ নয়; এটি জনগণের অর্থ। নির্বাচন কমিশন কিংবা সরকারের যে অর্থ ব্যয় হয়, তার উৎস জনগণের কর ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব। তাই রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনেরও সর্বোচ্চ দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জয় নিশ্চিত জেনেও যদি একটি নির্বাচনের জন্য ব্যালট পেপার ছাপাতে হয়, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করতে হয়, কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে হয় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় করতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে ব্যয় কমানোর কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও ভাবা যেতে পারে।

তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। নির্বাচনকে শুধু ‘অপচয়’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির সাংবিধানিক গুরুত্ব খাটো করার ঝুঁকি থাকে। একটি নির্বাচন প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিত করে এবং সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে—এটিও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই সমাধান নির্বাচন বাতিল করা নয়; বরং এমন একটি নির্বাচনব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও স্বাধীন মতামতেরও মূল্য থাকে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন রাখে: গণতন্ত্র কি শুধু নিয়ম মেনে নির্বাচন সম্পন্ন করার নাম, নাকি জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয়, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং বাস্তব প্রতিযোগিতাও গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ?

যদি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কেই নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকে নির্ধারিত থাকে, তাহলে ভোট গ্রহণের আগে থেকেই যখন বিজয়ী প্রায় নিশ্চিত, তখন রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এই প্রশ্ন কোনো প্রার্থী বা কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে একটি নীতিগত প্রশ্ন।

অতএব, বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ সব সাংবিধানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন, যাতে নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের অর্থের প্রতি দায়িত্বশীল একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

কারণ গণতন্ত্রের মূল্য শুধু ভোটের সংখ্যায় নয়; গণতন্ত্রের মূল্য নির্ধারিত হয় ভোটের অর্থবহতা, স্বাধীনতা, প্রতিযোগিতা এবং জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার মাধ্যমে।

লিখেছেনঃ-খাইরুল মামুন মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী 

Monday, August 17, 2026

গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন কেন জরুরি

 

গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন কেন জরুরি

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের(BGMEA) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৮.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০.৬২ শতাংশ।

কিন্তু যে শ্রমিকদের ঘাম, শ্রম ও দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে এই বিশাল রপ্তানি অর্থনীতি, তাদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা আজও অত্যন্ত কঠিন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা, যাতায়াত, খাদ্য ও অন্যান্য ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও শ্রমিকের মজুরি সেই হারে বাড়েনি। ফলে কাগজে-কলমে মজুরি বৃদ্ধি ঘটলেও বাস্তবে শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি।

এই বাস্তবতায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং জরুরি ভিত্তিতে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন এখন আর কেবল শ্রমিকদের দাবি নয়; এটি শিল্পের স্থায়িত্ব, উৎপাদনশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় প্রয়োজন।

২০১৮ সালে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ হাজার টাকা। দীর্ঘদিনের শ্রমিক আন্দোলন ও দাবির পর ২০২৩ সালে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে। সেখানে পোশাক শ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা আগের ৮ হাজার টাকার তুলনায় ৫৬.২৫ শতাংশ বেশি। নতুন কাঠামোতে বছরে ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির কথাও বলা থাকলেও ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ১৮ দফা একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সেখানে বছরে ৯ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির কথা বলা আছে। 

২০২৩ সালে এই মজুরি নির্ধারণের সময়ই শ্রমিক সংগঠনগুলো ন্যুনতম মজুরি ২৩ হাজার টাকা দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১২ হাজার ৫০০ টাকাতেই ন্যুনতম মজুরি নির্ধারিত হয়। 
এখন প্রশ্ন হলো—২০২৬ সালের বাস্তবতায় ২০২৩ সালে নির্ধারিত ১২ হাজার ৫০০ টাকা কি একজন শ্রমিক ও তার পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট? বাস্তব উত্তর হলো—না।

২০২৩ সালের পর তিন বছর ধরে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সামঞ্জস্য হয়নি। ফলে নামমাত্র মজুরি বৃদ্ধি হলেও প্রকৃত মজুরি বা প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
একজন পোশাক শ্রমিকের মজুরি দিয়ে শুধু তার নিজের জীবন চলে না। অধিকাংশ শ্রমিকের আয়ের ওপর নির্ভর করে একটি পরিবার। একজন শ্রমিককে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা, পোশাক, যাতায়াত এবং অন্যান্য সামাজিক প্রয়োজন মেটাতে হয়।

বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাকশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ২০২৫ সালের একটি ETI-BRAC University গবেষণার উদ্ধৃতি অনুযায়ী, RMG workforce-এর প্রায় ৫৩.৭ শতাংশ নারী। একই গবেষণায় ২০২৩ সালের মজুরি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিচ্যুতি, কাজের চাপ এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মতো সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। 

অতএব মজুরি বৃদ্ধি শুধু একজন শ্রমিককে বেশি টাকা দেওয়ার বিষয় নয়। এটি একটি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, সন্তানের শিক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কখনো কখনো বলা হয়, শ্রমিকের মজুরি বাড়লে কারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। এই যুক্তি একপাক্ষিক।

কারণ শ্রমিকের মজুরি কোনো অপ্রয়োজনীয় খরচ নয়; এটি উৎপাদনের অন্যতম মৌলিক উপাদান। একজন শ্রমিক যখন দীর্ঘদিন অপুষ্টি, বাসস্থানের সংকট, চিকিৎসার অভাব, ঋণের চাপ এবং পারিবারিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন, তখন তার কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ওপরও প্রভাব পড়ে।
ন্যায্য মজুরি শ্রমিকের মধ্যে কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়, দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখতে সাহায্য করে, শ্রমিকের চাকরি পরিবর্তনের প্রবণতা কমায় এবং শিল্পে স্থিতিশীলতা তৈরি করে।

অন্যদিকে কম মজুরি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং অনিশ্চিত চাকরি শ্রমিকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। এর ফল হতে পারে শ্রমিক অসন্তোষ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শ্রমিকের ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তন এবং শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা। সুতরাং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি আসলে শিল্পের ব্যয় নয়; এটি শিল্পের মানবসম্পদে বিনিয়োগ।
একটি মজুরি কাঠামো নির্ধারণের সময় শুধু মালিকের উৎপাদন ব্যয় কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতাকে বিবেচনা করলে হবে না। শ্রমিকের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়কেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

একজন শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তত কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি যেমন, খাদ্য ও পুষ্টির ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও ওষুধ, সন্তানের শিক্ষা, যাতায়াত, পোশাক ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের ব্যয়, পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের প্রয়োজন, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের ভবিষ্যৎ সঞ্চয় ও সামাজিক নিরাপত্তা।
অর্থাৎ মজুরি নির্ধারণে শুধু ‘শ্রমিক কত টাকা পেলে বেঁচে থাকতে পারবে’—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘একজন শ্রমিক ও তার পরিবার মানবিক মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করতে কত টাকা প্রয়োজন?’

বাংলাদেশের শ্রম আইনে নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৩ সালে তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল এবং সেই বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতেই ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারিত হয়। 
কিন্তু মজুরি নির্ধারণ কোনো এককালীন ঘটনা হতে পারে না। অর্থনীতি পরিবর্তিত হয়, মূল্যস্ফীতি পরিবর্তিত হয়, উৎপাদনশীলতা পরিবর্তিত হয়, শ্রমবাজার পরিবর্তিত হয় এবং শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়ও পরিবর্তিত হয়। তাই শ্রম আইন অনুযায়ী তিন বছর পরপর নতুন করে মজুরি পর্যালোচনা করা অপরিহার্য।

২০২৩ সালে যে মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেটিকে নতুন বাস্তবতার আলোকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এই কাজের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, আইনসম্মত এবং অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান হলো নিম্নতম মজুরি বোর্ড।

নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করলেই হবে না। বোর্ডকে হতে হবে কার্যকর, স্বাধীন, প্রতিনিধিত্বশীল ও শ্রমিকবান্ধব।
বোর্ডে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—তিন পক্ষের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব যেন কেবল নামসর্বস্ব না হয়; প্রকৃত শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিকদের আস্থা রয়েছে এমন প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে বোর্ডকে শ্রমিক পরিবারের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে স্বাধীন গবেষণা করতে হবে। ঢাকা, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মিরপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক পরিবারের প্রকৃত ব্যয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কারণ শুধু রাজধানীভিত্তিক অফিসে বসে মজুরি নির্ধারণ করলে শ্রমিকের বাস্তব জীবন বোঝা সম্ভব নয়।
বর্তমান বিশ্বে শ্রমিকের মজুরি নিয়ে আলোচনায় ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এর অর্থ হলো—শ্রমিক শুধু ন্যূনতমভাবে বেঁচে থাকবে এমন মজুরি নয়; বরং শ্রমিক ও তার পরিবার যেন মানবিক মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করতে পারে এমন মজুরি।

বাংলাদেশের পোশাক খাত বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পোশাক সংগ্রহ করেন। ফলে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণের দায় শুধু স্থানীয় মালিক বা সরকারের ওপর সীমাবদ্ধ নয়। ক্রেতা-ব্র্যান্ড, সরবরাহকারী, সরকার ও শ্রমিক—সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা যেন শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়; বরং দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, মান এবং ন্যায্য শ্রমব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়—এটাই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
গার্মেন্টস শ্রমিকরা তাদের আয়ের বড় অংশই দেশে ব্যয় করেন। খাদ্য, বাসা, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাকসহ স্থানীয় বাজারে তাদের ব্যয় সরাসরি অর্থনীতিতে প্রবাহ সৃষ্টি করে।

অর্থাৎ শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি মানে শুধু শ্রমিকের আয় বৃদ্ধি নয়; এর মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে চাহিদা বাড়ে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবাখাত সক্রিয় হয় এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে।
অন্যদিকে শ্রমিকের আয় যদি ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে সঞ্চয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ সীমিত থাকে। তাই ন্যায্য মজুরি একটি সামাজিক বিনিয়োগ এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ।

বর্তমান সময়ে গার্মেন্টস খাতে শুধু মজুরি নয়, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারখানা বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা শ্রমিকদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারকে একদিকে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে শিল্পের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে।
কারখানা মালিকদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার, মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তাকে শিল্পনীতির কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।

মজুরি বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি—এই তিনটি একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া গেলে শিল্পের প্রতিযোগিতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
একজন দক্ষ শ্রমিক যদি তার দক্ষতার যথাযথ মূল্য না পান, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প সেই দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখতে পারবে না। তাই নতুন মজুরি কাঠামোর সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, গ্রেডভিত্তিক মজুরি এবং উৎপাদনশীলতার স্বচ্ছ মানদণ্ড তৈরি করা প্রয়োজন।

২০২৩ সালের মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের ওপর পরিচালিত গবেষণায় বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা এবং শ্রমিকের ওপর বাড়তি কাজের চাপের বিষয় উঠে এসেছে। তাই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পাশাপাশি মজুরি বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা প্রয়োজন।
প্রতিটি কারখানায়— নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র নিশ্চিত করা, সঠিক গ্রেড অনুযায়ী মজুরি দেওয়া, নিয়মিত বেতন পরিশোধ, ওভারটাইমের যথাযথ পারিশ্রমিক, বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি, উৎসব বোনাস ও অন্যান্য আইনগত পাওনা, চাকরির নিরাপত্তা এবং শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার— এসব নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আজ প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। একসময় যে শিল্প কয়েকশ কোটি ডলারের রপ্তানি দিয়ে শুরু করেছিল, সেটি এখন প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাতে পরিণত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট RMG রপ্তানি ছিল ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। 
এই বিশাল শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কত বেশি পোশাক রপ্তানি করা যায় তার ওপর নয়; বরং কতটা নিরাপদ, দক্ষ, উৎপাদনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় তার ওপর। যে শিল্প শ্রমিকের শ্রমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করে, সেই শিল্পে শ্রমিকের জীবনযাপন যদি অনিশ্চিত থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে কয়েকটি বিষয় জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রথমত, অবিলম্বে তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বোর্ডে প্রকৃত ও গ্রহণযোগ্য শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বর্তমান বাজারদর, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক পরিবারের প্রকৃত ব্যয় এবং জীবনযাপনের ব্যয় বিবেচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। চতুর্থত, শুধু নামমাত্র মজুরি নয়, ‘লিভিং ওয়েজ’ বা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপযোগী মজুরির ধারণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। পঞ্চমত, মজুরি কাঠামোর সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় বা নিয়মিত সমন্বয় ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন, যাতে মূল্যস্ফীতি বাড়লে শ্রমিককে বছরের পর বছর নতুন মজুরি বোর্ডের অপেক্ষায় থাকতে না হয়। ষষ্ঠত, নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে কারখানাভিত্তিক কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সপ্তমত, মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ দেওয়া বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ, কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে।

গার্মেন্টস শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং শ্রমিকের মৌলিক মানবিক অধিকারের প্রশ্ন। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প যদি বিশ্ববাজারে তার অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তাহলে কম মজুরির ওপর নির্ভরশীল প্রতিযোগিতার পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দক্ষতা, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, ন্যায্য মজুরি এবং শ্রমিকের মর্যাদা—এই পাঁচটি ভিত্তির ওপর ভবিষ্যতের পোশাকশিল্প গড়ে তুলতে হবে।

২০২৩ সালে নির্ধারিত ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি আজকের বাস্তবতায় নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। সেই মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড।
অতএব এখন আর অপেক্ষা করার সময় নেই। গার্মেন্টস শ্রমিকদের বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অবিলম্বে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং সেই মজুরি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

কারণ শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে। আর শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।

¬লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

Saturday, August 8, 2026

বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে?

 

                      বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে?

বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শ্রমজীবী মানুষ। তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পে লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রম, ঘাম ও দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং নগর অর্থনীতির একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। কিন্তু শিল্পের এই সাফল্যের আড়ালে বর্তমানে যে বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক—কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়াই শ্রমিকদের জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে যেন শ্রমিক ছাঁটাইয়ের এক মহোৎসব চলছে। কোনো মালিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কথা বলছেন, কেউ অর্ডার কমে যাওয়ার কথা বলছেন, কেউ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়ার কথা বলছেন, আবার কেউ কাঁচামাল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সুদের হার কিংবা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। এসব সমস্যার অনেকগুলোই বাস্তব এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

একটি কারখানা যখন লাভ করে, তখন সেই লাভের মালিকানা উদ্যোক্তার। কিন্তু সংকট দেখা দিলে কেন শ্রমিককে চাকরি হারিয়ে সেই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে? আর যদি সত্যিই কোনো কারখানায় কাজ কমে যায়, তাহলে সেই কাজের পরিমাণ কতটা কমেছে, শ্রমিকের সংখ্যা কতটা কমানো প্রয়োজন এবং ছাঁটাইয়ের আগে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর কি যথাযথভাবে খোঁজা হচ্ছে? বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সর্বশেষ উদাহরণগুলোর একটি সামনে এসেছে সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পুকুরপাড়, জিরাবো এলাকায় অবস্থিত এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিট লিমিটেডে। শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য ও ৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখের কর্তৃপক্ষের নোটিশ অনুযায়ী, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে কারখানায় মারাত্মক ব্যবসায়িক মন্দা, প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং ও আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়া এবং পর্যাপ্ত কাজের স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে ৫৬৫ শ্রমিককে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২০ অনুযায়ী ছাঁটাই করা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের আইনগত পাওনা ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হবে। ভবিষ্যতে কাজের পরিধি বাড়লে বা নতুন শ্রমিক নিয়োগের প্রয়োজন হলে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনরায় কাজে নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

কারখানাটির অস্তিত্ব ও অবস্থান নিয়ে সরকারি ও শিল্প-সংগঠনের নথিও রয়েছে। বিজিএমইএর সদস্য-তথ্যে এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ঠিকানা জিরাবো, আশুলিয়া এবং কর্মীসংখ্যা ৭৬৭ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; অন্যদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের একটি ইউনিট-ভিত্তিক রেকর্ডে ১২০ শ্রমিকের তথ্য রয়েছে। ফলে বিভিন্ন সরকারি ও সংগঠনভিত্তিক ডাটাবেজে কারখানার কর্মীসংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। তবে শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ৫৬৫ জন ছাঁটাইয়ের বিষয়টি যদি সঠিক হয়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকোচনের ঘটনা।

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটিকে নিটিং, ডাইং, ফিনিশিং, তৈরি পোশাক ও প্রিন্টিং—বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিটসমৃদ্ধ একটি কম্পোজিট কারখানা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি একটি বহুমুখী উৎপাদন কাঠামোর শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে ‘কাজের স্বল্পতা’ বা ‘ব্যবসায়িক মন্দা’ দেখিয়ে এত বড় সংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তা যাচাই করা জরুরি।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২০-এ প্রয়োজনের অতিরিক্ততার কারণে বা redundancy-এর ভিত্তিতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিধান রয়েছে। তবে এক বছর বা তার বেশি সময় অবিচ্ছিন্নভাবে চাকরিতে থাকা শ্রমিকের ক্ষেত্রে লিখিত নোটিশ, নোটিশের পরিবর্তে মজুরি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশের কপি পাঠানো এবং আইনানুগ ক্ষতিপূরণের মতো শর্ত রয়েছে। বিশেষ কোনো শ্রেণির শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে চুক্তি না থাকলে ওই শ্রেণিতে সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রমিককে আগে ছাঁটাই করার বিধানও রয়েছে।

অন্যদিকে ধারা ২১-এ বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে মালিক পুনরায় শ্রমিক নিয়োগ করতে চাইলে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের তাদের সর্বশেষ জানা ঠিকানায় নোটিশ দিয়ে আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে এবং আবেদনকারী ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনঃনিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে হবে; একাধিক প্রার্থী হলে পূর্বের চাকরির জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অতএব, ধারা ২০ কোনো মালিককে ‘কাজ কমেছে’ বললেই ইচ্ছামতো শ্রমিকের কর্মসংস্থান বাতিল করার সীমাহীন ক্ষমতা দেয়—এমন ধারণা সঠিক নয়।

আইনের উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রমিকের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। সেই কারণে কোনো বড় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠলে তার প্রকৃত কারণ, প্রয়োজনীয়তা এবং আইনগত প্রক্রিয়া যাচাই করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ঘটনাটি বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে বর্তমান সংকটের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। ২০২৫ সালে বিজিএমইএর তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানায়, আগের ১৪ মাসে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৩৫৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন বলে বিজিএমইএর তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়। এই তথ্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের বড় অংশ বিকল্প কর্মসংস্থান না পেয়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানেই শ্রমিক অন্য একটি কারখানায় গিয়ে চাকরি পেয়ে গেলেন—বাস্তবতা এমন নয়। বরং যখন একই সময়ে একটি শিল্পাঞ্চলের একাধিক কারখানা বন্ধ হতে থাকে, তখন শ্রমিকের জন্য বিকল্প চাকরির বাজারও সংকুচিত হয়ে যায়।

উল্লিখিত ৩৫৩টি কারখানার মধ্যে সাভার ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সাভারে ২১৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল—এর মধ্যে ১২২টি স্থায়ী এবং ৯২টি অস্থায়ী। এর ফলে প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সাভার-আশুলিয়ার জন্য এই সংখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই অঞ্চল দেশের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চল। এখানে একদিকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মরত, অন্যদিকে এক কারখানা থেকে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের জন্য আশপাশের অন্য কারখানায় কাজ পাওয়ার সুযোগই সাধারণত প্রধান ভরসা। কিন্তু যখন একই শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়, তখন সেই ভরসাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সাভার-আশুলিয়ার সাম্প্রতিক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানায় ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই। ৬ জুন ২০২৬-এ এ কে এম নিটওয়্যার লিমিটেড, প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার এবং আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে যথাক্রমে ১,২৮৬, ৫২৯ ও ৫৩ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। মালিকপক্ষ ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কথা বলে ধারা ২০-এর আওতায় ছাঁটাইয়ের কথা জানায়।

কিন্তু শ্রমিকরা এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।ঈদের ছুটির পর কাজে ফিরে এসে অনেক শ্রমিক কারখানার গেটে ছাঁটাইয়ের তালিকা দেখতে পান। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শ্রমিকদের একাংশ দাবি করেন যে নিয়মিত ওভারটাইম করার পরও ‘কাজ নেই’ যুক্তি তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।

এখানেই বর্তমান শ্রমিক ছাঁটাইয়ের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—কাজের স্বল্পতা কি সত্যিই উৎপাদনের স্বল্পতা, নাকি শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে শ্রম ব্যয় কমানোর কৌশল? এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, কারখানার উৎপাদন, অর্ডার, শ্রমঘণ্টা এবং ছাঁটাইয়ের আগে-পরে উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করেই বের করতে হবে।

সাভার-আশুলিয়ার পাশাপাশি গাজীপুরও দীর্ঘদিন ধরে শিল্প ও শ্রমিক সংকটের অন্যতম কেন্দ্র। ২০২৫ সালের বিজিএমইএ-উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ওই ৩৫৩টি বন্ধ কারখানার মধ্যে গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং ৭৩ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০২৬ সালেও গাজীপুরে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের নতুন ঘটনা সামনে এসেছে। ১৭ মার্চ কোনাবাড়ীর জরুন এলাকার রিপন নিট ওয়্যার লিমিটেডে ১০৯ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। এই ঘটনাটি দেখায়, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সমস্যা শুধু সাভার-আশুলিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলেও কর্মসংস্থান নিরাপত্তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের জায়গা এখানেই। একটি কারখানায় যদি সত্যিই অর্ডার কমে যায় এবং উৎপাদনের প্রয়োজন কমে যায়, তাহলে শ্রমিকের প্রয়োজন কমতে পারে। কিন্তু ছাঁটাইয়ের পর যদি কারখানার উৎপাদন খুব বেশি না কমে, অথবা একই উৎপাদন কম শ্রমিক দিয়ে চালানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ধরা যাক, একটি কারখানায় ১,০০০ শ্রমিক কাজ করেন। মালিক বললেন, কাজ কমে গেছে এবং ২০০ শ্রমিক ছাঁটাই করলেন। কিন্তু ছাঁটাইয়ের পরও যদি ৮০০ শ্রমিক দিয়ে আগের কাছাকাছি উৎপাদন করা হয়, তাহলে ২০০ শ্রমিকের কাজ কোথায় গেল? কাজটি নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে বাকি ৮০০ শ্রমিকের ওপর পড়বে। এর অর্থ হলো—একদিকে ২০০ শ্রমিক বেকার হলেন, অন্যদিকে ৮০০ শ্রমিকের কাজের চাপ বাড়ল। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ার পরিবর্তে শ্রমিকের ক্লান্তি, মানসিক চাপ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু ‘কাজ কমেছে’ বলা যথেষ্ট নয়। কাজ কতটা কমেছে এবং তার অনুপাতে শ্রমিক কতজন কমানো হয়েছে—এই সম্পর্কটি যাচাই করা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে কারখানা ‘কাজের স্বল্পতা’র কথা বলে শ্রমিক ছাঁটাই করছে, সেখানে ছাঁটাইয়ের পরও যদি নিয়মিত ওভারটাইম চালু থাকে, তাহলে সেই ছাঁটাইয়ের অর্থনৈতিক যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?

অবশ্যই উৎপাদনের ধরন, অর্ডারের সময়সীমা ও বিভাগভেদে ওভারটাইমের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বড় আকারের ছাঁটাইয়ের পর একই সঙ্গে ব্যাপক অতিরিক্ত কাজ চলতে থাকলে সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কারণ তখন প্রশ্ন উঠবে—কারখানায় শ্রমিকের প্রয়োজন কমেছে, নাকি শুধু শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে বেশি উৎপাদন নেওয়া হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইকে ‘স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত’ বলে মেনে নেওয়া বিপজ্জনক।

কারখানা বন্ধ বা ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে বড় মানবিক সমস্যা হলো—শ্রমিকের পরবর্তী গন্তব্য। একজন শ্রমিক যখন চাকরি হারান, তখন তিনি শুধু মাসিক বেতন হারান না। তিনি হারান বাসাভাড়া দেওয়ার নিশ্চয়তা, পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা, সন্তানের স্কুলের খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা।

২০২৫ সালে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার পরও বিকল্প কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিক কাজ না পেয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শহরের ভাড়া বাসা, বাজার, পরিবহন, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব। অর্থাৎ, একটি শিল্পকারখানা বন্ধ হলে শুধু মালিকের ব্যবসা বন্ধ হয় না; একটি বৃহৎ স্থানীয় অর্থনৈতিক চক্র দুর্বল হয়ে যায়।

বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প নানা বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, আমদানির জন্য এলসি খোলার সমস্যা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং অর্ডারের ওঠানামা—এসব বিষয় শিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে এসব সমস্যার কথা উল্লেখ করা হলেও

প্রয়োজন হলো স্বচ্ছ যাচাই। কারখানার অর্ডার কত? উৎপাদন কত? ব্যাংক ঋণ পরিস্থিতি কী? রপ্তানি কত কমেছে? উৎপাদন ব্যয় কত বেড়েছে? শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পর উৎপাদন কত কমেছে? ছাঁটাইয়ের পর নতুন শ্রমিক নেওয়া হয়েছে কি না? ওভারটাইম বেড়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর থেকেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

মালিকপক্ষ প্রায়ই বলে থাকে—‘শ্রমিকদের সব আইনগত পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে।আইনগত পাওনা পরিশোধ করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এটি শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে না। একজন শ্রমিকের হাতে এককালীন ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে দেওয়া হলো। কিন্তু তিনি পরের মাসে কোথায় কাজ করবেন? দুই মাস পর? ছয় মাস পর? ক্ষতিপূরণের টাকা একসময় শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ শেষ হবে না। তাই শ্রমিক ছাঁটাইয়ের নীতি শুধু ‘পাওনা পরিশোধ’কেন্দ্রিক হলে চলবে না। এর সঙ্গে বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন যুক্ত করতে হবে।

শ্রম আইনের ধারা ২১ ইতোমধ্যেই ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনঃনিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রেখেছে। কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে মালিক নতুন শ্রমিক নিতে চাইলে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিধান বাস্তবে কতটা কার্যকর? যদি ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের তালিকা থাকে, কিন্তু পরে নতুন নিয়োগের সময় সেই শ্রমিকদের খোঁজা না হয়, তাহলে আইনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।

তাই প্রয়োজন একটি কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা। প্রতিটি বড় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, পদ, দক্ষতা ও চাকরির মেয়াদ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এক বছরের মধ্যে নতুন নিয়োগ হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে সেই নিয়োগের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের নোটিশে শ্রমিকদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ বা কারখানার শান্তিশৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড ঘটলে কর্তৃপক্ষ প্রচলিত ফৌজদারি ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে। কারখানার নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শ্রমিক বা ব্যক্তি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলা বা অন্য কোনো অপরাধ করতে পারেন না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে আইনসম্মত প্রতিবাদ, পাওনা দাবি, শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে অভিযোগ এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ন্যায্য প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়। চাকরি হারানো শ্রমিকদের ক্ষোভ কত দ্রুত শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে তা আমরা অতিতে দেখেছি। তাই শ্রমিকদের ভয় দেখানোর পরিবর্তে আলোচনায় বসা প্রয়োজন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হওয়া উচিত বড় ধরনের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আগে ও পরে একটি কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা তৈরি করা। কোনো প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করতে চাইলে তার আগে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে—

কারখানার বর্তমান অর্ডার পরিস্থিতি কী, গত ১২ মাসের উৎপাদন কত, গত ১২ মাসে রপ্তানি বা বিক্রয় কত, শ্রমিক সংখ্যা কত, কতজন ছাঁটাই করা হবে, কেন ওই সংখ্যক শ্রমিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত, বিকল্প ব্যবস্থা কী কী নেওয়া হয়েছে, ছাঁটাইয়ের পর উৎপাদন কত হবে, অতিরিক্ত শ্রমঘণ্টা বা ওভারটাইম বাড়বে কি না, ভবিষ্যতে নতুন শ্রমিক নিয়োগ হলে কীভাবে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ ধরনের যাচাই থাকলে প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকট এবং ছাঁটাইকে শ্রম ব্যয় কমানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করা সহজ হবে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে প্রথম সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নয়—‘কতজন শ্রমিক ছাঁটাই করা যায়?’ প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘কীভাবে শ্রমিকের কর্মসংস্থান ধরে রাখা যায়?’

সাময়িকভাবে উৎপাদন পুনর্বিন্যাস করা যায় কি না, শ্রমঘণ্টা পুনর্বিন্যাস করা যায় কি না, নতুন পণ্য বা বাজার খোঁজা যায় কি না, শ্রমিকদের অন্য বিভাগে স্থানান্তর করা যায় কি না, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের পুনর্বিন্যাস করা যায় কি না—এসব বিকল্প আগে দেখতে হবে। ব্যাংকিং সংকট থাকলে ব্যাংক ও সরকারের সহায়তায় ঋণ পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা হতে পারে। অর্ডার সংকট থাকলে নতুন বাজার ও ক্রেতা খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, শ্রমিক ছাঁটাই হবে সর্বশেষ বিকল্প; প্রথম বিকল্প নয়।

একজন শ্রমিককে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া এবং তাকে নতুন কাজ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। শিল্পাঞ্চলে চাকরির বাজার যখন সংকুচিত, তখন একজন ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের জন্য নতুন চাকরি পাওয়া সহজ নয়। একটি কারখানা বন্ধ হলে ৫০০ শ্রমিক যদি একসঙ্গে চাকরি খোঁজেন, তখন আশপাশের কারখানায় ৫০০টি খালি পদ থাকতেই হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে শ্রমিকের সামনে তিনটি পথ থাকে—অন্য শিল্পাঞ্চলে চলে যাওয়া, গ্রামে ফিরে যাওয়া অথবা বেকার থাকা। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক ঋণ করে শহরে থাকেন। চাকরি চলে গেলে বাসাভাড়া দিতে পারেন না। দোকানে বাকি জমে যায়। সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। চিকিৎসা ব্যাহত হয়।

এই বাস্তবতায় বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া ব্যাপক ছাঁটাই কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সামাজিক সংকট তৈরির সিদ্ধান্তও। একটি কারখানার হিসাবের খাতায় শ্রমিককে শুধু ‘লেবার কস্ট’ হিসেবে দেখলে ব্যবসায়িক সংকটের প্রথম সমাধান হিসেবে শ্রমিক কমানোর চিন্তা আসবে। কিন্তু শ্রমিক কোনো যন্ত্র নয়। একজন শ্রমিকের বহু বছরের অভিজ্ঞতা থাকে। একটি নির্দিষ্ট মেশিন পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন প্রক্রিয়া, সময় ব্যবস্থাপনা—এসব দক্ষতা অর্জন করতে বছর লাগে। একজন দক্ষ শ্রমিককে ছাঁটাই করার অর্থ শুধু একটি বেতন কমানো নয়; প্রতিষ্ঠানের অর্জিত দক্ষতার একটি অংশও হারানো। তাই দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতিতে শ্রমিককে ব্যয় নয়, উৎপাদনের অংশীদার ও মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

একজন শ্রমিকের বেতন বন্ধ হলে তার পরিবারের ব্যয় কমে যায়। হাজার হাজার শ্রমিকের বেতন বন্ধ হলে শিল্পাঞ্চলের বাজারে ভোগ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে মুদি দোকান, হোটেল, পরিবহন, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, ক্ষুদ্র ব্যবসা—সবখানে। অর্থাৎ ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাই জাতীয় অর্থনীতিতে চাহিদার সংকটও তৈরি করতে পারে। এই কারণে শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষা শুধু শ্রমিকবান্ধব নীতি নয়; এটি অর্থনীতিবান্ধব নীতিও।

সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পকেন্দ্র। এখানে যদি একের পর এক কারখানা বন্ধ হয় এবং শ্রমিক ছাঁটাই হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। ২০২৫ সালে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ ও প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, তার সঙ্গে ২০২৬ সালের আল-মুসলিম গ্রুপের ১,৮৬৮ শ্রমিক এবং গাজীপুরের ১০৯ শ্রমিকের মতো নতুন ছাঁটাইয়ের ঘটনাগুলো যুক্ত করলে বোঝা যায়—সমস্যাটি কেবল অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন সংকট নয়। এর সঙ্গে ৮ আগস্টের এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা যুক্ত হলে উদ্বেগ আরও বাড়ে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারকে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বড় ধরনের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সরকারি যাচাই চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ‘ব্যবসায়িক মন্দা’, ‘অর্ডার কমে যাওয়া’, ‘ব্যাংকিং সংকট’ বা ‘কাজের স্বল্পতা’—এসব কারণের বাস্তবতা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, ছাঁটাইয়ের আগে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের জন্য শিল্পাঞ্চলভিত্তিক পুনঃকর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করতে হবে। পঞ্চমত, শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২১ অনুযায়ী পুনঃনিয়োগের অগ্রাধিকার বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। এর পাশাপাশি শিল্প মালিকদের জন্যও একটি কার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনা নীতি তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে ব্যবসায়িক সংকটের সময় সরকার, ব্যাংক, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি একসঙ্গে বসে সমাধান খুঁজতে পারেন। বাংলাদেশের শিল্পনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো—আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু কর্মসংস্থান হারানো মানুষের পুনর্বাসন নিয়ে খুব কম কথা বলি।

একটি নতুন কারখানা ১,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলে সেটি বড় সাফল্য। কিন্তু একটি পুরোনো কারখানা ১,০০০ মানুষকে ছাঁটাই করলে সেই ১,০০০ মানুষের কী হবে—এই প্রশ্নের উত্তরও রাষ্ট্রীয় শ্রমনীতিতে থাকা উচিত। শ্রমিকের হাতে ছাঁটাইয়ের নোটিশ তুলে দিয়ে বলা যাবে না—‘আইন অনুযায়ী আপনার পাওনা দেওয়া হয়েছে।’ রাষ্ট্রকে বলতে হবে—‘আপনার কর্মসংস্থান হারিয়েছে, কিন্তু আপনার জীবিকা হারাতে দেওয়া হবে না।’ এই পার্থক্যটিই একটি মানবিক রাষ্ট্র ও নিছক বাজারনির্ভর রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।

ব্যবসায়িক সংকট বাস্তব হতে পারে।হয়তো কোনো কোনো মালিক সত্যিই কঠিন সময় পার করছেন। ব্যাংকিং সংকট, অর্ডার সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—এসব সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। কিন্তু সেই সমাধানের প্রথম শিকার যদি শ্রমিক হন, তাহলে আমাদের শিল্পনীতির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হবে।

একটি শিল্পের সাফল্য শুধু রপ্তানি আয় দিয়ে মাপা যায় না। সেই শিল্পের শ্রমিক কতটা নিরাপদ, তার পরিবার কতটা নিশ্চিন্ত, তার মজুরি দিয়ে জীবনযাপন সম্ভব কি না, সংকটের সময় তার চাকরি কতটা সুরক্ষিত এবং চাকরি হারালে তার বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে কি না—এসবও শিল্পের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

আজ এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর সামনে এসেছে। এর আগে আল-মুসলিম গ্রুপের তিন কারখানায় ১,৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। গাজীপুরে ১০৯ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।

এগুলো শুধু সংখ্যা নয়। ৫৬৫ মানে ৫৬৫টি জীবিকা। ১,৮৬৮ মানে ১,৮৬৮টি পরিবারের অনিশ্চয়তা। ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ মানে একটি বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সংকট। এই মানুষগুলো দেশের অর্থনীতির বোঝা নন; তারাই দেশের অর্থনীতি তৈরি করেন। তাই এখন সময় এসেছে শ্রমিক ছাঁটাইকে শিল্প ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে সহজ সমাধান হিসেবে দেখা বন্ধ করার। কারণ একটি কারখানা বাঁচানোর নামে যদি হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই শিল্পের টেকসই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।

শ্রমিকদের হাতে কি শুধু ছাঁটাইয়ের নোটিশ তুলে দেওয়া হবে, নাকি তাদের হাতে আবারও কাজ ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও শিল্প মালিকরা গ্রহণ করবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশের শ্রমনীতি ও শিল্পনীতির মানবিক চরিত্র নির্ধারণ করবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। 

Thursday, July 30, 2026

শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?




বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ১২৪ক: শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তবে যে শ্রমিকের গায়ের ঘামে এই শিল্পের চাকা সচল থাকে, তাঁদের আইনগত পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘটে নানা অনিয়ম ও প্রতারণা। অতি সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’-এর ১২৪ক ধারা ব্যবহার করে শ্রমিকদের আইনি পাওনা থেকে বঞ্চিত করার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইনগতভাবে কোনো বিরোধ দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে আপোষ-মীমাংসার এই বিধান তৈরি করা হলেও, বাস্তবচিত্রে এটি হয়ে উঠেছে অসাধু মালিক ও সুবিধাভোগী কিছু শ্রমিকনেতার যোগসাজশে শ্রমিক ঠকানোর এক ‘মহা হাতিয়ার’।

১২৪ক ধারার আইনি উদ্দেশ্য ও তার বাস্তবতা

আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকদ্দমা এড়িয়ে শ্রমিকের বকেয়া মজুরি এবং প্রাপ্য পাওনা দ্রুত পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা। আইনের ১২৪ক ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে:

আবেদনের সুযোগ (উপ-ধারা ১): কর্মে কর্মরত, অবসরে যাওয়া, চাকরিচ্যুত বা বরখাস্তকৃত শ্রমিক বা শ্রমিকরা মজুরিসহ আইনত প্রাপ্য পাওনা আদায়ে প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে পারেন।

সময়সীমা (উপ-ধারা ২ ও ৩): আবেদন পাওয়ার সর্বোচ্চ ২০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উদ্যোগ গ্রহণ করে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন।

সিদ্ধান্ত ও কার্যকারিতা (উপ-ধারা ৪ ও ৫): সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে দুই পক্ষকে দিতে হবে এবং তা পালনে পক্ষসমূহ বাধ্য থাকবে।

শ্রম আদালতে আপিলের পথ (উপ-ধারা ৬): কোনো পক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সিদ্ধান্তে সম্মত না হলে তারা শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবেন এবং আদালত এই মধ্যস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।

কাগজে-কলমে এই প্রক্রিয়াটি শ্রমিকের জন্য সময় ও অর্থ বাঁচানোর কথা থাকলেও, বাস্তবে এতে চরম ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বেআইনি কারসাজি চলছে।

যেভাবে হচ্ছে প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার

১২৪ক ধারার সুবিধা নিয়ে কিছু অসাধু পক্ষ আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করছে, যা মূলত তিনটি প্রধান উপায়ে শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে:

আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, শ্রমিক নিজে বা শ্রমিকরা সরাসরি প্রধান পরিদর্শকের কাছে আবেদন করবেন। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকদের সরাসরি যুক্ত না করে অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত কিছু ফেডারেশন বা অসাধু শ্রমিকনেতা শ্রমিকদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের প্রতিনিধি সেজে আবেদন করছেন। অথচ আইনি ভিত্তিতে শ্রমিকদের আইনি সর্বনিম্ন পাওনার চেয়ে কম মূল্যে রফাদফা বা আপোষ করার কোনো এখতিয়ার বা অধিকার এই প্রতিনিধি বা ফেডারেশনগুলোর নেই।

শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের সার্ভিস বেনিফিট, নোটিশ পে, ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া মজুরি পাওয়া একটি নির্দিষ্ট আইনি অধিকার (Statutory Right)। এটি মালিকের কোনো অনুগ্রহ নয়। কিন্তু ১২৪ক ধারার অধীনে মধ্যস্থতার নামে অসাধু মালিক ও শ্রমিকনেতারা যোগসাজশ করে শ্রমিকদের আইনত প্রাপ্য সর্বনিম্ন সুবিধার চেয়ে অনেক কম অর্থে ‘আপোষ’ করতে বাধ্য করছেন। ফলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অর্ধেক বা তারও কম টাকায় সই দিয়ে চলে যাচ্ছেন।

অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির পর শ্রমিককে দিয়ে এমনভাবে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বা বুঝানো হয় যে, তারা আর কোথাও অভিযোগ করতে পারবেন না। ফলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিকরা।

সম্প্রতি লিথি গ্রুপ, ইউনিক ডিজাইনসহ বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিকের সাথে আপোষ-মীমাংসার নামে এই ধরনের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। যেখানে শত শত শ্রমিকের কোটি কোটি টাকার আইনি পাওনাকে ১২৪ক ধারার দোহাই দিয়ে নামমাত্র টাকায় নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

এই অনিয়মের লাগাম এখনই টেনে ধরা না গেলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এবং সামগ্রিক শ্রম খাতের জন্য এর পরিণতি হবে মারাত্মক:

 শ্রমিকরা যখন বুঝতে পারবেন যে আইনি প্রক্রিয়াতেও তারা প্রতারিত হচ্ছেন, তখন আইনি ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা উঠে যাবে। ফলে তারা রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হবেন, যা শিল্পে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা ডেকে আনবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং বিদেশী ক্রেতারা (Buyers) বাংলাদেশে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। ১২৪ক ধারার এই অপব্যবহারের খবর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছালে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে এবং অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হবে।

চাকরি হারানোর পর পাওনা না পেয়ে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার চরম অর্থনৈতিক মানবেতর জীবনের মুখে পড়বে।

১২৪ক ধারাকে শ্রমিক ঠকানোর মাধ্যম থেকে রক্ষা করে পুনরায় ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর কোনো প্রতিনিধি এমন কোনো আপোষ-মীমাংসা অনুমোদন বা সই করতে পারবেন না, যা শ্রম আইনে নির্দিষ্টকৃত ন্যূনতম প্রাপ্য পাওনার চেয়ে কম। আইনি পাওনার চেয়ে কম অর্থমূল্যে সমঝোতা করাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ ঘোষণা করতে হবে।

মধ্যস্থতা বৈঠকে শ্রমিকদের সরাসরি উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো অননুমোদিত ফেডারেশন বা নেতার মধ্যস্থতায় শ্রমিকের অবর্তমানে সমঝোতা করা বন্ধ করতে হবে।

ডিআইএফই (DIFE) বা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা অসাধু আপোষ-মীমাংসায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সই করছেন, তাঁদের ওপর কঠোর গোয়েন্দা তদারকি চালাতে হবে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

১২৪ক ধারার উপ-ধারা (৬) অনুযায়ী কোনো আপোষ জোরপূর্বক চাপিয়ে দিলে শ্রমিকরা যে শ্রম আদালতে যেতে পারেন—সে বিষয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক আইনি সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১২৪ক ধারা তৈরি করা হয়েছিল দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য, তাঁদের বলির পাঁঠা বানানোর জন্য নয়। অসাধু মালিক চক্র এবং নামধারী কিছু শ্রমিকনেতার অপতৎপরতায় এই আইনি বিধানটি আজ শ্রমিকের মূল অধিকার হননকারী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শিল্প রক্ষা এবং শ্রমিকের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার স্বার্থে এখনই সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই ধারার অপব্যবহার রোধে কঠোর নীতিমালা জারি করা। অন্যথায়, এই অন্যায় ও ক্ষোভের আগুন দীর্ঘমেয়াদে পুরো গার্মেন্টস শিল্পকেই সংকটের মুখে ফেলে দেবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


রপ্তানি বাড়ছে—তাহলে শ্রমিকের মজুরি বাড়বে না কেন?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে ঘিরে বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী চিত্র সামনে এসেছে। একদিকে পোশাক রপ্তানি বাড়ছে, বিদ...