Followers

Saturday, March 14, 2026

গার্মেন্টস শিল্প কি আসলেই দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হলো তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়ে আসছে যে এই শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই শিল্প কি সত্যিই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং বিশেষ করে শ্রমিকদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে?

আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত। কর্মজীবনের শুরুতে আমি একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলাম। বর্তমানে শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে কাজ করছি। এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। আমি কোনো গার্মেন্টস মালিককে কখনও বলতে শুনিনি যে তিনি এই শিল্পে ব্যবসা করে খুব লাভবান হয়েছেন এবং খুব ভালো আছেন। একইভাবে কোনো শ্রমিককেও বলতে শুনিনি যে তিনি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করে সুখে ও স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে—এই শিল্পের প্রকৃত লাভবান কারা?

প্রতিবার যখন শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি ওঠে, তখন গার্মেন্টস মালিকরা তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু একই সময়ে আমরা দেখি, বিভিন্ন সংকটের মুহূর্তে মালিকরা সরকারের কাছে বিশেষ প্রণোদনা, স্বল্পসুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং নানা ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, করোনা মহামারির সময় গার্মেন্টস শিল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো অজুহাতে বারবার সরকারকে বিশেষ সহায়তা দিতে হয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের জন্যও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা নেওয়া হয়েছে। তারপরও দেখা যায় অনেক শ্রমিক তাদের ন্যায্য বেতন ও বোনাসের দাবিতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন।

এই বাস্তবতা থেকে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প কি আসলেই একটি শক্তিশালী ও লাভজনক শিল্প, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি প্রণোদনা-নির্ভর শিল্পে পরিণত হয়েছে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মালিকদের জীবনযাত্রা ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মধ্যে বিশাল বৈষম্য। একদিকে মালিকরা প্রায়ই ব্যবসার দুর্দশার কথা বলেন, অন্যদিকে তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে সেই কথার সাথে বাস্তবতার অনেক সময় মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সময় বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও সামনে এসেছে, যা এই খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন ও অনিশ্চিত। কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব—সব মিলিয়ে তাদের জীবন প্রায়ই সংগ্রামময়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে বর্তমান মজুরিতে অনেক শ্রমিক প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ক্যালোরি গ্রহণ করতে পারেন না। ফলে অপুষ্টি, শারীরিক দুর্বলতা এবং নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় তারা ভুগে থাকেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—শ্রমিকদের মজুরি কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃদ্ধি করা হয়নি। ইতিহাস বলে, প্রতিবার মজুরি বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের জন্য শ্রমিকদের জীবন দিতে হয়েছে, মামলা-হামলার শিকার হতে হয়েছে, এমনকি চাকরিও হারাতে হয়েছে।

তবুও এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে গার্মেন্টস শ্রমিকরাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের শ্রম, ঘাম এবং ত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের এই বিশাল শিল্পখাত।

সুতরাং আজ সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—গার্মেন্টস শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন কাকে বলা হবে? শুধু রপ্তানি আয় বাড়লেই কি উন্নয়ন হবে, নাকি সেই উন্নয়নের সুফল শ্রমিকদের জীবনেও পৌঁছাতে হবে?

একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, শ্রমিকদের বাদ দিয়ে কোনো শিল্পের উন্নয়ন কখনোই সত্যিকারের উন্নয়ন হতে পারে না।

KM Mintu

Monday, February 23, 2026

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশ-এর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একাধিক কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা এখন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিকে বেশি নিবদ্ধ

অন্যদিকে শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প, বর্তমানে বড় ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, বৈদেশিক ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং ব্যাংকিং খাতের জটিলতা শিল্প পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। এই শ্রমিকদের অনেকেই বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের জন্য আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। কিন্তু তাদের দাবি আদায়ের পথও নিরাপদ ছিল নাহামলা, মামলা এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এতে শিল্প সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে

শিল্পখাতে এই অস্থিরতা শুধু শ্রমিক বা মালিকের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি

এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য কয়েকটি নীতিগত অগ্রাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখতে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ ও শ্রম অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন করাও সরকারের দায়িত্ব

সবশেষে বলা যায়, নতুন সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাদের সফলতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতাএই তিনটি ক্ষেত্রেই যদি কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়, তবে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই বর্তমান সময়টি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

KM Mintu 

Monday, February 16, 2026

নতুন সরকারের সামনে প্রধান দায়িত্ব

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা ও বড় চ্যালেঞ্জ—দুই-ই সামনে এনেছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ছাত্র-শ্রমিক জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। এর পর অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচনের পথ সুগম করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।

১৮ মাস পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের পক্ষ থেকে আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এই বিপুল সংসদীয় শক্তি নতুন সরকারের জন্য যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি জনগণের প্রত্যাশাও বহুগুণে বাড়িয়েছে।

গত ১৮ মাসে দেশের শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রায় চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান নেই, কারণ বন্ধ হওয়ার হার বাড়লেও নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার হার অত্যন্ত কম। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় উৎপাদন খাতেও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

অনেক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বকেয়া বেতন ও চাকরির নিরাপত্তার দাবিতে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। কিন্তু এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা কেবল ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—ভোগ কমছে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।

নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হবে শিল্পখাত পুনরুজ্জীবিত করা। বিশেষ করে—

বন্ধ কারখানা দ্রুত চালু করা বা পুনর্বিন্যাস করা

শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শিল্পনীতি বাস্তবায়ন করা

শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা

এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু শ্রমিকদের জীবনমানই উন্নত হবে না, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও গতি পাবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা—স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক সুযোগ। নতুন সরকারের হাতে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে শিল্পখাত পুনর্গঠন এবং শ্রমিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি শ্রমজীবী মানুষ। তাদের কর্মসংস্থান ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হবে। তাই সময়ের দাবি—দ্রুত, কার্যকর এবং শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণ।

KM Mintu 


Saturday, February 14, 2026

ধর্মপ্রাণ হলেও চরমপন্থী বা নারী-বিরোধী রাজনীতিকে সমর্থন করেনা।


বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আজকের বাংলাদেশ–এর অগ্রযাত্রায় নারীদের অবদান অনস্বীকার্য এবং বহুমাত্রিক।

দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে লেদার, টেক্সটাইল, স্বাস্থ্যসেবা, খুচরা ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই নারীরা সক্রিয়। শুধু বেসরকারি খাত নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেও নারীদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। যেমন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এসব প্রতিষ্ঠানে নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে। পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়নমূলক সংস্থাগুলোতেও নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠছেন।

তবে সমাজের আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। এখনো এমন একটি অংশ আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, ঘরের বাইরের জগতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এবং পরিবারে পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করেন। তাদের অনেকেই এই জীবনকেই স্বাভাবিক বা অনিবার্য বলে মনে করেন। এই সামাজিক বাস্তবতাকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংগঠন তাদের নিজস্ব মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ঘরে ঘরে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে এমন নারীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে এমন অভিযোগ ও আলোচনা জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও পরকালকেন্দ্রিক চিন্তার মাধ্যমে নারীদের সামাজিক ভূমিকা সীমিত রাখার ধারণা প্রচারের বিষয়টি নিয়ে সমাজে বিতর্কও কম নয়। কারণ, আধুনিক বাংলাদেশে নারীকে শুধু পরিবারকেন্দ্রিক নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের সমান অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে। ফলে নারী বিদ্বেষী বা নারীর ভূমিকা সংকুচিত করে এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষের বড় অংশ সহজে গ্রহণ করে না।

রাজনীতিতেও এই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল, বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে মৌলবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে জনগণ বারবার দেখিয়েছে তারা ধর্মপ্রাণ হলেও চরমপন্থী বা নারী-বিরোধী রাজনীতিকে সমর্থন করতে প্রস্তুত নয়। যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও, জনমতের বড় অংশ নারীসমতা ও সামাজিক অংশীদারিত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এমন মূল্যায়ন অনেক বিশ্লেষকের।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বাস্তববাদী, মানবিক এবং সামাজিক ভারসাম্যে বিশ্বাসী। তারা বোঝে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না।

আজকের বাংলাদেশে নারীরা শুধু পরিবার নয়, অর্থনীতি, প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছে। তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে এমন একটি সমাজ, যেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে দেশ গঠনের দায়িত্ব ভাগ করে নেবে। এটাই সময়ের দাবি, এটাই অগ্রগতির পথ।

KM Mintu 



Thursday, January 15, 2026

নিজস্ব জগৎ

 


নিজস্ব জগৎ

প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে
যেখানে ঢোকার চাবি
কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না।
সে জগৎ একান্ত, নীরব,
নিজের মতো করে গড়া।

তোমারও আছে তেমনই এক জগৎ,
হয়তো সেখানে
আমার কোনো ঠিকানা নেই,
আমার নাম উচ্চারিত হয় না
দৈনন্দিন প্রার্থনায়।

কিন্তু আমার যে নিজস্ব জগৎ
সে জগতে কেবল তুমি।
দিনের আলো, রাতের নিঃশব্দতা,
সব কিছুর মাঝখানে
একটাই মুখ।

তাই আমি দূরে থাকি
তোমার সেই নিজস্ব জগৎ থেকে,
জোর করে ঢুকে পড়ার অধিকার
আমি চাইনি কখনো।

যেদিন তুমি মন থেকে ডাকবে,
নিঃশব্দ কোনো মুহূর্তে,
নিজের অজান্তেই

সেদিন দেখবে,
আমি ঠিক সেখানেই।

কারণ আমি তো দূরে যাইনি,
আমি ছিলাম
সব সময়ই

ছায়ার মতো
নীরবে, অবিচল,
তোমার পাশেই।

KM Mintu

শ্রমিক সংগঠনে শ্রমিক নেতৃত্বের সংকট: প্রতিনিধিত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন

 

বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং সংগ্রামমুখর। এই ইতিহাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের পথে অসংখ্য আত্মত্যাগ ও লড়াই রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আজ অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনেই প্রকৃত শ্রমিকদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সংগঠনের নামে শ্রমিক আন্দোলন পরিচালিত হলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই সংগঠনগুলো শ্রমিকদের দ্বারা নয়, বরং শ্রমিকদের “নামে” পরিচালিত হচ্ছে।

অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বড় একটি অংশ কখনো শ্রমিক ছিলেন না, কিংবা শ্রমিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের নেই। ফলে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, কর্মস্থলের শোষণ, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনার বাস্তবতা তাদের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। যারা কখনো মজুরি বকেয়া থাকার যন্ত্রণা বোঝেননি, যাদের জীবন কাটেনি কারখানার গরমে, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রের পাশে কিংবা দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চাপে তারা শ্রমিকদের প্রকৃত কণ্ঠস্বর কতটা ধারণ করতে পারেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক সংগঠনে নেতৃত্বের পদগুলো কার্যত আজীবন পদে পরিণত হয়েছে। কিছু নেতা পৃথিবী থেকে বিদায় না নেওয়া পর্যন্ত পদ আঁকড়ে ধরে রাখেন। নিয়মিত সম্মেলন, নেতৃত্বের পরিবর্তন কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চা সেখানে অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের শ্রমিক নেতাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সংগঠনগুলো ক্রমেই স্থবির ও জনগণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলো পেশাদারিত্ব ও আদর্শিক সংগ্রামের বদলে ব্যক্তি স্বার্থ, ক্ষমতার রাজনীতি কিংবা দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে। এতে করে যোগ্য, সচেতন ও সংগ্রামী শ্রমিকরা নেতৃত্বে উঠে আসার সুযোগ পান না। সংগঠন পরিণত হয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত বলয়ে, যেখানে শ্রমিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ গুরুত্ব হারায়।

এই নেতৃত্ব সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব না থাকায় শ্রমিকদের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে, আন্দোলন হারায় বিশ্বাসযোগ্যতা ও গতি। শ্রমিকরা সংগঠনের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন, যা সামগ্রিকভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

শ্রমিক সংগঠনের শক্তি আসে শ্রমিকদের থেকেই এই সত্য ভুলে গেলে চলবে না। সংগঠনের নেতৃত্বে শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং নতুন নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা ছাড়া শ্রমিক আন্দোলনের নবজাগরণ সম্ভব নয়। প্রকৃত শ্রমিক নেতৃত্ব ছাড়া শ্রমিক সংগঠন কেবল নামেই শ্রমিকের বাস্তবে নয়।

শ্রমিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হলে এখনই প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ। নেতৃত্বে শ্রমিকদের ফেরানোই হতে পারে শ্রমিক সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও শক্তি পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত।

KM Mintu

Tuesday, January 13, 2026

প্রস্থান

 


প্রস্থান

প্রস্থান
আমি এই জীবন নামের নাটকের মঞ্চ থেকে প্রস্থান নিতে চাই।
যে মঞ্চে আমার উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি
কারও সংলাপ বদলায় না,
আলো বদলায় না,
শেষ দৃশ্যেও আমার নাম আসে না।

এই মঞ্চে আমি ছিলাম
একজন নীরব অভিনেতা

যার কণ্ঠ ঢেকে গেছে করতালির শব্দে,
যার চোখের জলকে বলা হয়েছে অভিনয়ের অংশ।
আমার ব্যথা ছিল অপ্রয়োজনীয়,
আমার স্বপ্ন ছিল অতিরিক্ত।

যেখানে গুরুত্ব মাপা হয় ক্ষমতায়,
মানুষ চেনা হয় প্রয়োজনে

সেখানে একজন গুরুত্বহীন অভিনেতার
আর কী প্রয়োজন থাকতে পারে?

তাই ক্লান্ত আমি।
সংলাপ বলতে বলতে ক্লান্ত,
নিজেকে প্রমাণ করতে করতে ক্লান্ত,
ভিড়ের মাঝেও অদৃশ্য হয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত।

এই প্রস্থান কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়,
এ এক দীর্ঘ নীরবতার ফল।
এ মঞ্চ ছাড়ার মানে হারিয়ে যাওয়া নয়

বরং নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়া,
যেখানে এখনো
আমার অস্তিত্বের কিছু মূল্য আছে।

আজ আমি করতালি চাই না,
চাই না আলো।
শুধু একটু নীরবতা চাই

যেখানে আমি আবার মানুষ হতে পারি,
অভিনেতা নয়।

KM Mintu

গার্মেন্টস শিল্প কি আসলেই দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হলো তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়ে আসছে যে এই শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্...