Followers

Wednesday, June 10, 2026

বাজেট কার জন্য—সরকারি কর্মচারীদের জন্য, নাকি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জন্য?

আগামী ১১ জুন ২০২৬ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে জানা গেছে, নতুন পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এবং আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর ৫০ শতাংশ সুবিধা পেতে শুরু করবেন। এর ফলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকায় উন্নীত হওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, দেশের প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারগুলোর জন্য এই বাজেটে কী আছে?

বাংলাদেশে শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ। পরিবারপ্রতি গড়ে দুইজন সদস্য হিসাব করলেও শ্রমিক পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ। দেশের শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, সেবা ও রপ্তানি খাতের সমগ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও শ্রমের ওপর। অথচ বাজেটের আলোচনায় তাদের অস্তিত্ব যেন ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, চামড়া খাত, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার অজুহাতে গণছাঁটাই করা হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েও প্রাপ্য পাওনা পাননি। নতুন চাকরি পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

বাজেটের আগে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আবারও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে—এই বিপুল সংখ্যক বেকার ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্রের কী পরিকল্পনা রয়েছে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাজেট আলোচনায় শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা বেকারত্ব ভাতার বিষয়গুলো এখনও প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছে। অথচ মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রা আজ চরম সংকটের মুখে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি সেই হারে বাড়ছে না।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বাস্তবসম্মত দাবি জানিয়ে আসছি— যেমন, দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গার্মেন্টস ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে শ্রমিক রেশন ব্যবস্থা চালু। 

শ্রমজীবী মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বিশেষ স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে শ্রমিক ও তাদের পরিবার ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত। 

কারখানা বন্ধ, মজুরি বকেয়া, গণছাঁটাই বা শিল্প সংকটের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য একটি স্থায়ী মজুরি সুরক্ষা তহবিল(Wage Protection Fund) গঠন।

বেকার শ্রমিকদের জন্য সীমিত পরিসরে হলেও বেকারত্ব ভাতা ও পুনঃকর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু।

জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষায় ব্যয় নিশ্চিত করা। 

বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনীতি শ্রমিকদের শ্রমে চলে, কিন্তু বাজেটের সুবিধা সবচেয়ে কম পৌঁছায় শ্রমিকদের কাছেই। সরকারি কর্মচারীদের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও শ্রমিকদের জন্য সমমানের সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। যদি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জীবন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথ গুরুত্ব না পায়, তাহলে এই বাজেটকে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শ্রমিকদের বাজেট বলা কঠিন হবে।

আমরা আশা করি সরকার বাজেট বাস্তবায়নের সময় শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। কারণ শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে, আর অর্থনীতি বাঁচলেই দেশ এগিয়ে যাবে।


খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক , বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

Friday, June 5, 2026

শ্রমিকের জীবন কি এতটাই সস্তা?

রক্ত, ঘাম আর অশ্রুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠছে, ব্যবসায়ীদের সম্পদের পাহাড় উঁচু হচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্যের ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা—যেখানে শ্রমিকের ঘাম, অশ্রু, অপমান এবং কখনো কখনো রক্ত দিয়েই নির্মিত হচ্ছে এই শিল্পের ভিত্তি।
যে শ্রমিকের হাতের স্পর্শে বিদেশে রপ্তানির জন্য পোশাক তৈরি হয়, সেই শ্রমিকের জীবন যেন সবচেয়ে সস্তা। তার কষ্ট, তার কান্না, তার সম্মান, এমনকি তার জীবনও যেন উৎপাদনের হিসাব-নিকাশের কাছে মূল্যহীন হয়ে গেছে।

গত ২৫ মে ২০২৬ তারিখে সাভারের হেমায়েতপুরে ব্যাবিলন গ্রুপের অবনী ফ্যাশন লিমিটেডে কর্মরত সুইং সুপারভাইজার মোঃ সুজন (সজল)-এর মরদেহ কারখানার ভেতর থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। পরিবারের সদস্য এবং সহকর্মী শ্রমিকদের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার পর মরদেহ গুম করারও চেষ্টা করা হয়েছে।
নিহত সুজনের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চর হরিণা গ্রামে। তার পিতা জহিরুল ইসলাম। ঘটনার পর মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় এবং পরে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র একদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে কারখানার জেনারেল ম্যানেজার সকালে সুজনকে তার কক্ষে ডেকে নেন। সেখানে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরে আবারও তাকে ডাকা হয়। সেই ডাকার পর থেকে আর কেউ তাকে জীবিত দেখেনি। কয়েক ঘণ্টা পর হঠাৎ কারখানার মাইকে ঘোষণা আসে—একজন শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন।
প্রশ্ন জাগে, এটি কি সত্যিই আত্মহত্যা? নাকি একজন শ্রমিককে নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে? নাকি আরও ভয়ংকর কোনো সত্য আড়াল করার চেষ্টা চলছে?

কিন্তু সুজন একা নন।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৮ জুন গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে গ্রিনল্যান্ড গার্মেন্টস লিমিটেডে হৃদয় নামের এক শ্রমিককে চুরির অভিযোগে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শুকতার বাইদ গ্রামের আবুল কালামের ছেলে হৃদয় ওই কারখানায় মেকানিক্যাল মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। একজন শ্রমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, কিন্তু সেখানে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় কারখানা কর্তৃপক্ষ, আর তার ফল হয় এক শ্রমিকের মৃত্যু।

একই বছরের ২ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে ডিবিএল গ্রুপের জিন্নাত নিটওয়্যার কারখানায় আরেক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। শ্রমিক জাকির হোসেন একটি পোশাকে ভুল লেবেল লাগিয়েছিলেন। সেই "অপরাধে" তাকে সহকর্মীদের সামনে কান ধরে উঠবস করিয়ে অপমান করা হয়। অপমানের সেই ভার তিনি সহ্য করতে পারেননি। পরে কারখানার আটতলা ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন।

একটি ভুল লেবেলের মূল্য কি একটি মানুষের জীবন?
একজন শ্রমিকের আত্মসম্মান কি এতটাই তুচ্ছ যে তাকে সবার সামনে অপদস্থ করা যাবে?
সুজন, হৃদয় এবং জাকির—এই তিনটি নাম কেবল তিনজন ব্যক্তির নাম নয়। তারা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্ধকার বাস্তবতার প্রতীক। তারা হাজার হাজার নিপীড়িত, অপমানিত ও নীরবে কষ্ট সহ্য করা শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করেন, যাদের গল্প কখনো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, যাদের কান্না কারখানার দেয়ালের মধ্যেই আটকে যায়।
আজ দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ করছেন ভয়, অনিশ্চয়তা এবং চরম মানসিক চাপে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য অমানবিক চাপ, অতিরিক্ত কাজ, চাকরি হারানোর আতঙ্ক, ন্যায্য মজুরি না পাওয়া, চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি, ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে বাধা এবং মানবিক মর্যাদার অভাব—সব মিলিয়ে অসংখ্য শ্রমিক প্রতিদিন এক অদৃশ্য যন্ত্রণা বহন করছেন।

অথচ এই শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতির প্রকৃত নির্মাতা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক আন্দোলনে গুলি করে তিনজন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, অসংখ্য শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। অথচ রাষ্ট্র, শিল্পমালিক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সবাই এই শ্রমিকদের শ্রমের ওপর নির্ভর করেই লাভবান হচ্ছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে—শ্রমিক কি শুধু উৎপাদনের একটি উপাদান? একটি যন্ত্র? একটি সংখ্যা?

না, শ্রমিক একজন মানুষ।
তারও স্বপ্ন আছে, পরিবার আছে, সন্তান আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে, সম্মানের সঙ্গে কাজ করার অধিকার আছে।
যে শিল্প শ্রমিকের জীবনকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে কর্মপরিবেশ শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, যে ব্যবস্থায় একজন শ্রমিক অপমান, নির্যাতন বা মৃত্যুর শিকার হওয়ার পরও সত্য গোপনের চেষ্টা করা হয়—সেই ব্যবস্থাকে অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে।
আজ প্রয়োজন প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা, কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি একটি মানবিক কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা।

কারণ শ্রমিক ছাড়া পোশাক শিল্পের অস্তিত্ব নেই।
সাভারের সুজন, গাজীপুরের হৃদয় এবং জাকিরের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়। তাদের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দিক। আমাদের মনে করিয়ে দিক—উৎপাদনের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ আছেন, যার জীবন, সম্মান এবং অধিকার কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সেই শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের ওপর, যিনি নিজের শ্রম দিয়ে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী—রক্তের দাগ বেশিদিন চাপা থাকে না। শ্রমিকের কান্নাও একদিন প্রতিবাদ হয়ে ফিরে আসে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু 
আইন ও দর-কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

Thursday, June 4, 2026

বাংলাদেশের পোশাক খাতে ‘ফোর্সড লেবার’ বিতর্ক ও শ্রম অধিকার বাস্তবতা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এই শিল্পের অবদান অসামান্য। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে শিল্পের এই সাফল্যের পাশাপাশি শ্রম অধিকার নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনাও অব্যাহত রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ‘ফোর্সড লেবার’ বা জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নিয়ে নানা ধরনের প্রতিবেদন ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে বাস্তবতাও তুলে ধরা জরুরি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অনুযায়ী, ভয়ভীতি, শাস্তির আশঙ্কা, ঋণের ফাঁদ, পরিচয়পত্র আটকে রাখা, চাকরি হারানোর ভয় অথবা অন্য কোনো জবরদস্তিমূলক অবস্থার মাধ্যমে কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করা হলে তাকে জোরপূর্বক শ্রম বা ফোর্সড লেবার বলা হয়। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে দাসপ্রথার মতো সংগঠিত ও ব্যাপক জোরপূর্বক শ্রমের অস্তিত্ব রয়েছে—এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা নিজেদের ইচ্ছায় কাজ করেন, চাকরি পরিবর্তন করেন এবং বিভিন্ন সময়ে দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনও পরিচালনা করেন। যদি প্রকৃত অর্থে দাসপ্রথার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকত, তাহলে শ্রমিকদের এই সংগঠিত আন্দোলন, বিক্ষোভ কিংবা ইউনিয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে সরাসরি ‘ফোর্সড লেবার’-নির্ভর শিল্প হিসেবে চিত্রিত করা বাস্তবতার অতিরঞ্জন হবে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে শ্রমিকদের সব অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কিংবা কর্মপরিবেশে কোনো সমস্যা নেই। বাস্তবতা হলো, শিল্পের অনেক কারখানায় এখনও কম মজুরি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, উৎপাদনচাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা, শ্রমিক ছাঁটাই, ইউনিয়ন গঠনে প্রতিবন্ধকতা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা বিদ্যমান। অনেক শ্রমিক তাদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খান। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি এখনও অধিকাংশ শ্রমিকের নাগালের বাইরে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই শ্রম অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক আচরণও পর্যালোচনার দাবি রাখে। ক্রেতাদের ক্রমাগত কম দামে পণ্য কেনার চাপ, অল্প সময়ের মধ্যে উৎপাদনের নির্দেশনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে কারখানাগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ওপর গিয়ে পড়ে। তাই শ্রম অধিকার প্রশ্নে শুধুমাত্র উৎপাদনকারী দেশকে দায়ী না করে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সকল অংশীজনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বহু কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক পরিবেশবান্ধব সবুজ পোশাক কারখানা বাংলাদেশে রয়েছে। কিন্তু শ্রম অধিকার এবং সামাজিক সংলাপের ক্ষেত্রে এখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

একটি টেকসই শিল্প গড়ে তুলতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সংগঠনের স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, শিল্পের অন্যতম অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একইসঙ্গে দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম এবং গঠনমূলক শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কও জরুরি।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের পর নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। সামনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা এবং মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার বিষয়ে বৈশ্বিক প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক ক্রেতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কার্যকর সামাজিক সংলাপের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে সুনির্দিষ্টভাবে ‘ফোর্সড লেবার’ বা দাসপ্রথার মতো জোরপূর্বক শ্রমের অস্তিত্ব নেই। তবে কম মজুরি, অতিরিক্ত শ্রম এবং অধিকারের সীমাবদ্ধতাকে পুরোপুরি আড়াল করার সুযোগও নেই। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখতে এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে শ্রম অধিকারের বিদ্যমান ঘাটতিগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। কারণ শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করেই একটি শক্তিশালী, মানবিক এবং টেকসই পোশাক শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: খায়রুল মামুন মিন্টু, শ্রমিক নেতা ও শ্রম অধিকার কর্মী

Thursday, May 21, 2026

শ্রমিকরা নানামুখী সংকট ও বঞ্চনার শিকার



বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল—বিশেষ করে আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, মিরপুরসহ দেশের গার্মেন্টস শিল্প এলাকাগুলোতে শ্রমিকরা আজ নানামুখী সংকট ও বঞ্চনার শিকার। কোথাও বে-আইনিভাবে শ্রমিকদের চাকুরিচ্যুত করা হচ্ছে, কোথাও রাত-দিন পরিশ্রম করে নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট সম্পন্ন করার পরও পরবর্তী মাসে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে না। আবার অনেক কারখানা শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ না করেই হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করছে।

শ্রমিকদের দিয়ে তাদের সক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ করানো হচ্ছে, অথচ সেই তুলনায় দেওয়া হচ্ছে অতি স্বল্প মজুরি। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কাজের অনিরাপদ পরিবেশ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পরও শ্রমিকরা এখনো তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছেন এবং বড় ধরনের আন্দোলনে জড়াচ্ছেন না।

এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের ন্যায্য দাবি ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এবং চলমান সমস্যাগুলো নিয়ে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা দেখছি, কিছু শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের বাস্তব সমস্যা ও দাবিগুলো নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে “গার্মেন্টস সেক্টরে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা বন্ধে করণীয়” শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজন করছে।

প্রশ্ন হলো—যখন শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, ন্যায্য অধিকার কিংবা জীবনমান উন্নয়নের দাবি সামনে আসে, তখনই কেন এই ধরনের কর্মসূচি সামনে আনা হয়? অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও এমন উদ্যোগ দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও হয়েছে, আর বর্তমান সরকারের সময়ও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এতে শ্রমিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—এই ধরনের আলোচনা সভাগুলো কি সত্যিই শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য, নাকি শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ ও দুর্বল করার একটি প্রচেষ্টা?

শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রশ্নে শ্রমিক সংগঠনগুলোর উচিত শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর হওয়া, তাদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের শক্তি হওয়া; কোনোভাবেই সেই আন্দোলনকে নিরুৎসাহিত বা প্রশ্নবিদ্ধ করার অবস্থানে দাঁড়ানো নয়।

KM Mintu 

Thursday, April 30, 2026

মহান মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে মহান মে দিবস এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সেই আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় আজকের মে দিবস কেবল একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সংগ্রামের প্রতীক।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহান মে দিবসের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, বিশেষ করে নারী শ্রমিক, অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং মানবিক আচরণ থেকে বঞ্চিত।

রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশের শ্রম ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। শত শত শ্রমিকের প্রাণহানি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—শ্রমিকের জীবনকে অবহেলা করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। এসব ঘটনার পর কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও এখনও অসংখ্য কারখানায় শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। শ্রমিকরা অনেক সময় ন্যায্য দাবি উত্থাপন করলেই হয়রানি, চাকরিচ্যুতি কিংবা দমন-পীড়নের শিকার হন।

মহান মে দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শ্রমিক কেবল উৎপাদনের যন্ত্র নয়; শ্রমিক একজন মানুষ, যার রয়েছে মর্যাদা, অধিকার ও স্বপ্ন। শ্রমিকের ঘামেই শিল্পকারখানা সচল থাকে, অর্থনীতির চাকা ঘোরে, রাষ্ট্র এগিয়ে যায়। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী মজুরি পুনঃনির্ধারণ করা এবং শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব।

বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমিকজীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সীমিত আয়ে পরিবার পরিচালনা, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে গিয়ে শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকের প্রাপ্য সবসময় নিশ্চিত হয় না। এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের জন্য জীবনধারণ উপযোগী মজুরি নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি।

একই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক শিল্পব্যবস্থায় শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার থাকতে হবে। কারণ শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন কেবল শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করে না; এটি শিল্পে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সংলাপই পারে শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই উন্নয়নকে সত্যিকার অর্থে অর্থবহ করতে হলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবসরের নিশ্চয়তা নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়নের কথা বলা যায় না।

মহান মে দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—বাংলাদেশে এমন একটি শ্রমব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে; যেখানে শ্রমিকের কণ্ঠরোধ নয়, তার মতামতের মূল্যায়ন হবে; যেখানে শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আসুন, মহান মে দিবসের চেতনায় আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করব। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠাই হোক উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের অঙ্গীকার।

খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Monday, April 27, 2026

বকেয়া মজুরি ও শ্রমিকের কান্না: একটি জাতীয় সংকট

 


বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প বা গার্মেন্টস সেক্টর মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত হলেও, এর পেছনের কারিগর অর্থাৎ শ্রমিকদের জীবন আজও অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার জালে বন্দি। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে যে হাতগুলোর পরিশ্রমে, সেই হাতগুলোকেই আজ বকেয়া মজুরির দাবিতে রাজপথে মুষ্টিবদ্ধ হতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি আমাদের গর্বের জায়গা। কিন্তু এই বিশাল সাফল্যের পেছনে থাকা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবনচিত্র অত্যন্ত করুণ। মাসের পর মাস কাজ করার পরও যখন বেতন পাওয়া যায় না, তখন সেই শ্রমিকের কাছে অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধি কেবল একটি সংখ্যা মাত্র।

শ্রমিকরা শখ করে রাজপথে নামেন না; বরং দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই তারা আন্দোলনের পথ বেছে নেন। এর পেছনে প্রধান কিছু কারণ হলো:

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কারখানার মালিকরা লভ্যাংশ পেলেও শ্রমিকদের পাওনা দিতে গড়িমসি করেন।কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই লে-অফ বা কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার ফলে শ্রমিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। এক মাসের বেতন বকেয়া হওয়া মানেই শ্রমিকের ঘরে উনুন না জ্বলা এবং ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া।

প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শ্রমিকদের এই আন্দোলন কেবল রাস্তা অবরোধ বা যানজট তৈরি করছে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে। বারবার রাস্তা অবরোধের ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদেশী ক্রেতারাও (Buyers) অনেক সময় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

যেসব মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে বেতন আটকে রাখেন, তাদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিজিএমইএ (BGMEA) এবং সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে যাতে কোনো কারখানায় বকেয়া না জমে।

শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করলে তাদের জীবনযাত্রার চাপ কিছুটা কমবে।

কোনো কারখানা দেউলিয়া হলে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের জন্য একটি স্থায়ী আপদকালীন তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।

গার্মেন্টস শিল্পকে টেকসই করতে হলে শ্রমিকের পেটে খিদে রেখে তা সম্ভব নয়। মালিক, সরকার এবং শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে সঠিক সমন্বয় এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলেই রাজপথের এই দীর্ঘ মিছিল বন্ধ হবে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করা কেবল একটি নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি এই শিল্পের টিকে থাকার প্রধান শর্ত।

আপনার কি মনে হয় এই সমস্যার সমাধানে সরকার নাকি মালিকপক্ষ—কার ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত?

খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


Friday, April 24, 2026

গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল বিষয়ে উদাসীন

আমরা সবাই অবগত আছি ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবনে ঘটে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। ভবনটিতে অবস্থিত পাঁচটি পোশাক কারখানা-নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড কারখানায় ১,১৩৮ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত হন এবং ২,৫০০-এর অধিক শ্রমিক আহত হন।

উল্লেখযোগ্য যে, ২৩ এপ্রিল ভবনটিতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ার পরও ২৪ এপ্রিল শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। এই অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাই এত বড় বিপর্যয়ের প্রধান কারণ শ্রমিক হত্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

রানা প্লজার ঘটনার মাত্র পাঁচ আগে, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশিন্তপুরে তোবা গ্রুপের তাজরিন গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১৪ জন শ্রমিক মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান এবং বহু শ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। পরিকল্পিত ভাবে কারখানার গেইট বন্ধ রাখার কারনে শ্রমিকরা মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। শ্রমিকরা পুড়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচে অবস্থান করলেও এখনো তাদের ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। এই ঘটনার জন্য দায়ী কারখানা মালিক দেলোয়ার এর নামে মামলা হলে তিনি এখন জামিনে মুক্ত হয়ে সুন্দর জীবন যাপন করছেন। 

রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টস কারখানায় বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পরিকল্পিত শ্রমিক হত্যার ঘটনা কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব মামলার অধিকাংশ আসামি বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন, কেবল ভবন মালিক সোহেল রানা ব্যতীত অন্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার এখনো দৃশ্যমান নয়।

গত ২০০৫ সালে ১১ এপ্রিল আশুলিয়ার বাইপাইলে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস কারখানার ৭৩ জন এবং ২০১০ সালে ১৪ ডিসেম্বর আশুলিয়ার হামিম গ্রুপের দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেড কারখানায় ২৯ জন শ্রমিক নিহত হয়। এই দুই কারখানার শ্রমিকদেরও ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। এই ঘটনার জন্য দায়ী কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

সাভার-আশুলিয়াসহ বিভিন্ন যায়গায় বারবার কোন সময় ভবন ধ্বসে, কোন সময় অগ্নিকান্ড ঘটিয়ে শ্রমিক হত্যা হলেও দায়ী ব্যাক্তিদের শাস্তি না হওয়ার কারনেই এমন গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল বিষয়ে উদাসীন।

রানা প্লাজা ও তাজরিন ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকদের জীবন কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়। তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সকলের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।

রানা প্লাজা ভবনের এসব কারখানায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করা হতো, যা এই ঘটনার আন্তর্জাতিক গুরুত্বও তুলে ধরে।

রানা প্লাজা দিবসে আমরা নিহত শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং আহতদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করি। একই সাথে, সাভার রানা প্লাজায় অবস্থিত নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড এবং আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর অবস্থিত তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড গার্মেন্টস কারখানায় নিহত, আহত শ্রমিকদের পুনরাই রি-অ্যাসেসমেন্ট (পুনঃমূল্যায়ন) করে  ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, এবং বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় কর্মরত সকল শ্রমিকদের বাংলাদেশ সরকার, আইএলও (ILO), এবং নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম' (Employment Injury Scheme - EIS) প্রকল্পটি ২১ জুন ২০২২ থেকে কার্যকর হওয়া এই স্কিমের আওতায় সাভার রানা প্লাজায় অবস্থিত নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড এবং আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর অবস্থিত তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড গার্মেন্টস কারখানায় নিহত, আহত শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী দেলোয়ার হোসেন (তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড)সোহেল রানা (রানা প্লাজা ভবনের মালিক)বজলুস সামাদ আদনান (মালিক, নিউ ওয়েভ বটমস)  আমিনুল ইসলাম (মালিক, ফ্যান্টম গার্মেন্টস) মাহবুবুর রহমান তাপস (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিউ ওয়েভ বটমস) ইমতেমাম হোসেন (প্রকৌশলী, সাভার পৌরসভা) আলী মিয়া (সহকারী প্রকৌশলী, সাভার পৌরসভা) বিরুদ্ধে মামলা হলেও অধিকাংশ আসামি আজও জামিনে মুক্ত। বিচার প্রক্রিয়ার এই ধীরগতি শ্রমিকদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছে। শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী ব্যাক্তিদের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচারে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টসের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহয়তার নামে সরকার-বিজিএমইএ-বিভিন্ন এনজিও, এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সিআরপি সহ বিভিন্ন সংগঠন কারকাছ থেকে কত টাকা কি বাবদ অনুদান নিয়েছেন এবং কাকে কত টাকা কি বাবদ অনুদান দিয়েছেন তা প্রকাশ করতে হবে।

দেলোয়ার হোসেন (তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড), সোহেল রানা (রানা প্লাজা ভবনের মালিক), বজলুস সামাদ আদনান (মালিক, নিউ ওয়েভ বটমস), আমিনুল ইসলাম (মালিক, ফ্যান্টম গার্মেন্টস), মাহবুবুর রহমান তাপস (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিউ ওয়েভ বটমস), এদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাদের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। 

নিহত শ্রমিকদের স্মরণে সাভার রানা ভবনের সামনে ও জুরাইন কবরস্থানে স্থায়ী ভাবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করতে হবে। ২৪ এপ্রিলকে শ্রমিক হত্যা দিবস এবং গার্মেন্টস শিল্পে সাধারণ ছুটি হিসাবে ঘোষণা করতে হবে।

রানা প্লাজা ধস এবং তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। এই কারখানাগুলোতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক তৈরি করা হতো। তাই এই দুর্ঘটনার দায়ভার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কোনোভাবেই এই ব্র্যান্ডগুলো এড়িয়ে যেতে পারে না। যেসব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এই কারখানাগুলো থেকে পণ্য সংগ্রহ করত, তাদের নৈতিক ও আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


বাজেট কার জন্য—সরকারি কর্মচারীদের জন্য, নাকি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জন্য?

আগামী ১১ জুন ২০২৬ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে জানা গেছে,...