বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের কাছে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আসছে। যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা মানবিক সংকট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ তার সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় প্রদান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেক দেশ যখন দায়িত্ব নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন বাংলাদেশ মানবতার স্বার্থে সীমান্ত খুলে দিয়ে অসহায় মানুষগুলোর জীবন রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিল।
কিন্তু আজ আমাদের নিজেদের কিছু মানুষ সীমান্তের নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে জীবিকার সন্ধানে অবৈধ পথে ভারতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি বর্তমানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় আটকা পড়ে রয়েছেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিজ নিজ অবস্থানে থাকলেও এসব মানুষের মানবিক সংকট দিন দিন গভীরতর হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো—এই মানুষগুলো কার? তারা কি শুধুই অবৈধ অভিবাসী, নাকি তারা প্রথমত মানুষ? একজন মানুষের নাগরিকত্ব, আইনগত অবস্থান কিংবা তার ভুল সিদ্ধান্ত মানবিক আচরণের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও সভ্যতার মূল্যবোধ আমাদের শেখায় যে, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।
ভারত তার অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার। তবে সেই প্রক্রিয়া অবশ্যই দুই দেশের মধ্যে সমন্বয়, পরিচয় যাচাই এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পন্ন হওয়া উচিত। সীমান্তে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া বা এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়, তা কোনোভাবেই মানবিক আচরণের উদাহরণ হতে পারে না।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে এসব মানুষের পরিচয় দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক হন, তাহলে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানবিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নয়, সীমান্ত এলাকার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্ত এলাকায় রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন এবং উদ্বেগের মধ্যে দিন পার করছেন। এটি প্রমাণ করে যে বিষয়টি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি মানবিকতা, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। তাই সীমান্তে আটকে থাকা অসহায় মানুষগুলোর বিষয়ে দুই দেশের উচিত পারস্পরিক আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত একটি মানবিক সমাধানে পৌঁছানো। রাষ্ট্রের আইন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের জীবন ও মর্যাদা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যখন মানবিক বিশ্বের স্বপ্ন দেখি, তখন সেই মানবিকতার পরীক্ষা হয় সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় মানুষের প্রতি আমাদের আচরণে। সীমান্তের নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে আটকে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আজ সেই প্রশ্নই আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে—আমরা কি সত্যিই মানবিকতার পথে হাঁটছি, নাকি কেবল মানবিকতার কথা বলছি?
খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিক নেতা ও মানবাধিকারকর্মী






