Followers

Saturday, July 18, 2026

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি

 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (Ready-Made Garments-RMG) শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি। প্রতি বছর এই শিল্প থেকে কয়েক দশমিক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে এবং প্রায় ৪০ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক—যাদের অধিকাংশই নারী—তাদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের মাধ্যমে এই শিল্পকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক খাতে পরিণত করেছেন। অথচ এই শিল্পের প্রকৃত চালিকাশক্তি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। ওই বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনিকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে একাধিক বৈঠক, মতবিনিময় ও আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় এবং নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯(৬) ধারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, কোনো শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত নিম্নতম মজুরির হার প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এই বিধানের উদ্দেশ্য হলো জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয়সহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরির সামঞ্জস্য বজায় রাখা।

একই সঙ্গে প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত, শুনানি ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করে নতুন মজুরির সুপারিশ চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডে নিয়োগপ্রাপ্ত মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি—উভয়েরই তিন বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত সর্বনিম্ন মজুরির গেজেটেরও তিন বছর পূর্ণ হবে ২০২৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর।

অর্থাৎ আইনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা অনুসারে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের পরই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে পরবর্তী মজুরি পুনর্নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল, যাতে ডিসেম্বরের আগেই আইনসম্মত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। এটি শুধু প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; বরং শ্রম আইনের উদ্দেশ্য ও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশে একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি যেন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শ্রমিকরা দীর্ঘদিন দাবি জানালেও তাতে কার্যকর সাড়া মেলে না। বরং শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয়, কারখানা বন্ধ হয়, সড়ক অবরোধ হয়, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে, মামলা-হামলা হয়, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। এরপরই কেবল সরকার ও মালিকপক্ষ নড়েচড়ে বসে। একটি আধুনিক ও আইনভিত্তিক রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আজকের বাস্তবতা আরও কঠিন। বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরি দিয়ে অধিকাংশ শ্রমিকের পক্ষে একটি পরিবারের এক মাসের ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, মাসের প্রথম ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অর্থ ফুরিয়ে যায়। এরপর ধার-দেনা, ঋণ কিংবা অতিরিক্ত ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করেই বাকি মাস কাটাতে হয়।

অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির কারণে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসা ও ওষুধের খরচও বহুগুণ বেড়েছে। ফলে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারছেন না। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

একজন অপুষ্ট, অসুস্থ ও মানসিক চাপে থাকা শ্রমিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। শিল্পের উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নত করতেই হবে। কারণ শ্রমিক সুস্থ থাকলে শিল্পও সুস্থ থাকবে; শ্রমিক নিরাপদ থাকলে উৎপাদনও টেকসই হবে।

বর্তমান বিশ্বে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও কেবল কম দামের পণ্য নয়; তারা শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।

আমরা বিশ্বাস করি, নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ কোনো রাজনৈতিক বা আন্দোলনের বিষয় হওয়া উচিত নয়; এটি একটি নিয়মিত, আইনসম্মত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। শ্রম আইনে যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই সময়সীমা মেনেই সরকারকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে এবং জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক পরিবারের মৌলিক চাহিদা, পুষ্টি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সঞ্চয় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

আমরা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাই—অবিলম্বে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বাস্তবসম্মত, ন্যায্য এবং বেঁচে থাকার উপযোগী নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করুন। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলে শিল্প শক্তিশালী হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আরও টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

লিখেছেন: খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা ও সমাজকর্মী

Monday, June 29, 2026

আশুলিয়ার ‘জিন-ভূতের আতঙ্ক’: অতিপ্রাকৃত নয়, এটি শ্রমিকদের চরম শোষণের আর্তনাদ

সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। কোথাও শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, কেউ চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট, শরীর কাঁপা বা অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ করছেন। অনেকেই ঘটনাকে "জিন-ভূতের আতঙ্ক" বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন ব্যাখ্যা প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করে এবং শ্রমিকদের দুর্ভোগের মূল কারণগুলো থেকে সমাজের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এ ধরনের ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে গণ-হিস্টেরিয়া (Mass Psychogenic Illness) বা সমষ্টিগত মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা-র কথা বলা হয়। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, আবার কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনাও নয়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, ভয়, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, শারীরিক দুর্বলতা, পুষ্টিহীনতা এবং অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের কারণে অনেক মানুষের মধ্যে একই ধরনের শারীরিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।

বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। অনেক কারখানায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করানো হচ্ছে। কোনো কোনো দিন রাত ২টা বা ৩টা পর্যন্তও কাজ করতে হচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও "জেনারেল" হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। রাত ১১টা বা ১২টায় বাসায় ফিরে রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ১টা বা ২টা বেজে যায়। আবার ভোর ৫টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। অর্থাৎ একজন শ্রমিক প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন।

একজন মানুষ কতদিন এভাবে চলতে পারেন?

অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং কম মজুরি শ্রমিকদের এমন এক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে তারা পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলছেন। অনেক শ্রমিক প্রতিদিন ডাল, আলুভর্তা, করলা ভাজি বা স্বল্পমূল্যের একঘেয়ে খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। যে পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম তারা করেন, সেই তুলনায় প্রয়োজনীয় ক্যালরি, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান তাদের খাদ্যতালিকায় নেই। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন।

এই দুর্বল শরীর নিয়েই তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎপাদন লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কম মজুরির কারণে তারা অতিরিক্ত আয়ের আশায় ওভারটাইম করতে বাধ্য হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ওভারটাইম করতে অস্বীকৃতি জানালে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। অর্থাৎ এটি কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়; বরং অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে তৈরি হওয়া এক ধরনের বাধ্যবাধকতা।

এমন পরিস্থিতিতে যদি হঠাৎ একটি কারখানায় একজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে একই মানসিক চাপ ও শারীরিক দুর্বলতায় থাকা অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তাই ঘটনাগুলোকে "জিন-ভূতের আছর" বলে প্রচার করা সমস্যার সমাধান নয়; বরং প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানকে বাধাগ্রস্ত করে।

প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কারখানার বায়ুমান, রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার, পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল, তাপমাত্রা, স্বাস্থ্যবিধি এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা—সবকিছুই বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এই শিল্পের প্রাণ হলো শ্রমিক। তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুযায়ী নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো কারখানায় যদি বারবার "জিন-ভূতের আতঙ্ক" দেখা দেয়, তাহলে হয়তো সেখানে অতিপ্রাকৃত কিছু নেই; বরং আছে অবহেলা, শোষণ, ক্লান্তি, অপুষ্টি এবং সীমাহীন মানসিক চাপের এক নির্মম বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াই হবে সমস্যার প্রকৃত সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ।

খাইরুল মামুন মিন্টু

Friday, June 26, 2026

গার্মেন্ট কারখানায় আর কত প্রাণ গেলে জাগবে মালিকপক্ষের বিবেক?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই শিল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা—শ্রমিকের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদার চরম অবমূল্যায়ন। প্রতিনিয়ত শ্রমিকের ঘাম, রক্ত, অশ্রু এবং কখনো কখনো প্রাণের বিনিময়ে দাঁড়িয়ে আছে এই শিল্পের তথাকথিত উন্নয়ন।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি এলাকায় অবস্থিত কালার অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড গার্মেন্টসে ২৪ জুন ২০২৬ (বুধবার) দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া লিজা বেগমের মৃত্যু সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতার আরেকটি বেদনাদায়ক উদাহরণ। এটি শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে অবহেলা, অমানবিকতা এবং দায়িত্বহীনতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বাসিন্দা, ৩৭ বছর বয়সী সুইং অপারেটর লিজা বেগম টানা দুই সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একাধিকবার ছুটির আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ তা মঞ্জুর করেনি। অসুস্থ শরীর নিয়েই তাকে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। অবশেষে গভীর রাতে কর্মস্থলেই তিনি অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। একজন শ্রমিকের জীবনের চেয়ে যদি উৎপাদনের লক্ষ্য, শিপমেন্ট কিংবা মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে সেটি কোনোভাবেই মানবিক বা সভ্য কর্মপরিবেশের পরিচয় হতে পারে না।

এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—গার্মেন্টস শিল্পে একজন শ্রমিক কি কেবল উৎপাদনের একটি যন্ত্র, নাকি তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্র, মালিক এবং প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব?

দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের বহু কারখানায় এখনো এমন একটি সংস্কৃতি বিদ্যমান, যেখানে অসুস্থ শ্রমিক ছুটি চাইলে তাকে নানা অজুহাতে নিরুৎসাহিত করা হয়, কখনো চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়, আবার কখনো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অজুহাতে কাজে বাধ্য করা হয়। ফলে শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতা আধুনিক শিল্পব্যবস্থার নয়; বরং এটি এক ধরনের আধুনিক দাসত্বের প্রতিফলন।

লিজা বেগমের মৃত্যুর পর সহকর্মী শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ প্রমাণ করে যে এই ক্ষোভ শুধুমাত্র একজন শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অবিচার, বৈষম্য এবং অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে জমে থাকা প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, লিজা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। যদি প্রমাণিত হয় যে অসুস্থতা সত্ত্বেও তাকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ছুটি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার, ব্যবস্থাপক এবং দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, লিজা বেগমের পরিবারকে সামান্য অনুদান দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। পরিবার যে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য, পর্যাপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, দেশের প্রতিটি তৈরি পোশাক কারখানায় অসুস্থতাজনিত ছুটিকে (Sick Leave) শ্রমিকের আইনি অধিকার হিসেবে কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কারখানায় সার্বক্ষণিক যোগ্য চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত মেডিকেল টিম, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসা-সুবিধা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চতুর্থত, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার অজুহাতে কোনো অসুস্থ শ্রমিককে জোরপূর্বক কাজ করানো, ছুটি প্রত্যাখ্যান করা অথবা চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়ার মতো অমানবিক চর্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে শ্রমিক কেবল উৎপাদনের মাধ্যম নন; তিনি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই শিল্পায়ন কিংবা উন্নয়নের দাবি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোনো জাতির জন্য গৌরবের বিষয় হতে পারে না।

লিজা বেগমের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই কার্যকর সংস্কার না আনা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বহু লিজা বেগম একই পরিণতির শিকার হবেন। তাই এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, বরং শ্রমিক অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে দেখতে হবে।

শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই শিপমেন্ট, উৎপাদন বা মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান হতে পারে না। এখনই সময় শ্রমিককে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং এমন একটি শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার, যেখানে আর কোনো শ্রমিককে অসুস্থ শরীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হবে না।

আর কোনো লিজা বেগমের জীবন এভাবে ঝরে পড়ুক—এটি কোনো সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। গার্মেন্টস কারখানায় মৃত্যুর এই মিছিল থামাতেই হবে। শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার এখনই সময়।

খাইরুল মামুন মিন্টু 

Wednesday, June 17, 2026

মানবিকতার প্রশ্নে সীমান্তে আটকে থাকা মানুষগুলো

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের কাছে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আসছে। যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা মানবিক সংকট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ তার সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় প্রদান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেক দেশ যখন দায়িত্ব নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন বাংলাদেশ মানবতার স্বার্থে সীমান্ত খুলে দিয়ে অসহায় মানুষগুলোর জীবন রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিল।

কিন্তু আজ আমাদের নিজেদের কিছু মানুষ সীমান্তের নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে জীবিকার সন্ধানে অবৈধ পথে ভারতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি বর্তমানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় আটকা পড়ে রয়েছেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিজ নিজ অবস্থানে থাকলেও এসব মানুষের মানবিক সংকট দিন দিন গভীরতর হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো—এই মানুষগুলো কার? তারা কি শুধুই অবৈধ অভিবাসী, নাকি তারা প্রথমত মানুষ? একজন মানুষের নাগরিকত্ব, আইনগত অবস্থান কিংবা তার ভুল সিদ্ধান্ত মানবিক আচরণের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও সভ্যতার মূল্যবোধ আমাদের শেখায় যে, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।

ভারত তার অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার। তবে সেই প্রক্রিয়া অবশ্যই দুই দেশের মধ্যে সমন্বয়, পরিচয় যাচাই এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পন্ন হওয়া উচিত। সীমান্তে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া বা এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়, তা কোনোভাবেই মানবিক আচরণের উদাহরণ হতে পারে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে এসব মানুষের পরিচয় দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক হন, তাহলে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানবিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নয়, সীমান্ত এলাকার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্ত এলাকায় রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন এবং উদ্বেগের মধ্যে দিন পার করছেন। এটি প্রমাণ করে যে বিষয়টি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি মানবিকতা, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেরও প্রশ্ন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। তাই সীমান্তে আটকে থাকা অসহায় মানুষগুলোর বিষয়ে দুই দেশের উচিত পারস্পরিক আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত একটি মানবিক সমাধানে পৌঁছানো। রাষ্ট্রের আইন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের জীবন ও মর্যাদা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যখন মানবিক বিশ্বের স্বপ্ন দেখি, তখন সেই মানবিকতার পরীক্ষা হয় সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় মানুষের প্রতি আমাদের আচরণে। সীমান্তের নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে আটকে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আজ সেই প্রশ্নই আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে—আমরা কি সত্যিই মানবিকতার পথে হাঁটছি, নাকি কেবল মানবিকতার কথা বলছি?

খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিক নেতা ও মানবাধিকারকর্মী


Wednesday, June 10, 2026

বাজেট কার জন্য—সরকারি কর্মচারীদের জন্য, নাকি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জন্য?

আগামী ১১ জুন ২০২৬ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে জানা গেছে, নতুন পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এবং আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর ৫০ শতাংশ সুবিধা পেতে শুরু করবেন। এর ফলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকায় উন্নীত হওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, দেশের প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারগুলোর জন্য এই বাজেটে কী আছে?

বাংলাদেশে শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ। পরিবারপ্রতি গড়ে দুইজন সদস্য হিসাব করলেও শ্রমিক পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ। দেশের শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, সেবা ও রপ্তানি খাতের সমগ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও শ্রমের ওপর। অথচ বাজেটের আলোচনায় তাদের অস্তিত্ব যেন ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, চামড়া খাত, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার অজুহাতে গণছাঁটাই করা হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েও প্রাপ্য পাওনা পাননি। নতুন চাকরি পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

বাজেটের আগে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আবারও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে—এই বিপুল সংখ্যক বেকার ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্রের কী পরিকল্পনা রয়েছে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাজেট আলোচনায় শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা বেকারত্ব ভাতার বিষয়গুলো এখনও প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছে। অথচ মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রা আজ চরম সংকটের মুখে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি সেই হারে বাড়ছে না।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বাস্তবসম্মত দাবি জানিয়ে আসছি— যেমন, দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গার্মেন্টস ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে শ্রমিক রেশন ব্যবস্থা চালু। 

শ্রমজীবী মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বিশেষ স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে শ্রমিক ও তাদের পরিবার ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত। 

কারখানা বন্ধ, মজুরি বকেয়া, গণছাঁটাই বা শিল্প সংকটের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য একটি স্থায়ী মজুরি সুরক্ষা তহবিল(Wage Protection Fund) গঠন।

বেকার শ্রমিকদের জন্য সীমিত পরিসরে হলেও বেকারত্ব ভাতা ও পুনঃকর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু।

জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষায় ব্যয় নিশ্চিত করা। 

বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনীতি শ্রমিকদের শ্রমে চলে, কিন্তু বাজেটের সুবিধা সবচেয়ে কম পৌঁছায় শ্রমিকদের কাছেই। সরকারি কর্মচারীদের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও শ্রমিকদের জন্য সমমানের সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। যদি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জীবন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথ গুরুত্ব না পায়, তাহলে এই বাজেটকে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শ্রমিকদের বাজেট বলা কঠিন হবে।

আমরা আশা করি সরকার বাজেট বাস্তবায়নের সময় শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। কারণ শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে, আর অর্থনীতি বাঁচলেই দেশ এগিয়ে যাবে।


খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক , বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

Friday, June 5, 2026

শ্রমিকের জীবন কি এতটাই সস্তা?

রক্ত, ঘাম আর অশ্রুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠছে, ব্যবসায়ীদের সম্পদের পাহাড় উঁচু হচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্যের ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা—যেখানে শ্রমিকের ঘাম, অশ্রু, অপমান এবং কখনো কখনো রক্ত দিয়েই নির্মিত হচ্ছে এই শিল্পের ভিত্তি।
যে শ্রমিকের হাতের স্পর্শে বিদেশে রপ্তানির জন্য পোশাক তৈরি হয়, সেই শ্রমিকের জীবন যেন সবচেয়ে সস্তা। তার কষ্ট, তার কান্না, তার সম্মান, এমনকি তার জীবনও যেন উৎপাদনের হিসাব-নিকাশের কাছে মূল্যহীন হয়ে গেছে।

গত ২৫ মে ২০২৬ তারিখে সাভারের হেমায়েতপুরে ব্যাবিলন গ্রুপের অবনী ফ্যাশন লিমিটেডে কর্মরত সুইং সুপারভাইজার মোঃ সুজন (সজল)-এর মরদেহ কারখানার ভেতর থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। পরিবারের সদস্য এবং সহকর্মী শ্রমিকদের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার পর মরদেহ গুম করারও চেষ্টা করা হয়েছে।
নিহত সুজনের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চর হরিণা গ্রামে। তার পিতা জহিরুল ইসলাম। ঘটনার পর মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় এবং পরে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র একদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে কারখানার জেনারেল ম্যানেজার সকালে সুজনকে তার কক্ষে ডেকে নেন। সেখানে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরে আবারও তাকে ডাকা হয়। সেই ডাকার পর থেকে আর কেউ তাকে জীবিত দেখেনি। কয়েক ঘণ্টা পর হঠাৎ কারখানার মাইকে ঘোষণা আসে—একজন শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন।
প্রশ্ন জাগে, এটি কি সত্যিই আত্মহত্যা? নাকি একজন শ্রমিককে নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে? নাকি আরও ভয়ংকর কোনো সত্য আড়াল করার চেষ্টা চলছে?

কিন্তু সুজন একা নন।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৮ জুন গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে গ্রিনল্যান্ড গার্মেন্টস লিমিটেডে হৃদয় নামের এক শ্রমিককে চুরির অভিযোগে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শুকতার বাইদ গ্রামের আবুল কালামের ছেলে হৃদয় ওই কারখানায় মেকানিক্যাল মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। একজন শ্রমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, কিন্তু সেখানে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় কারখানা কর্তৃপক্ষ, আর তার ফল হয় এক শ্রমিকের মৃত্যু।

একই বছরের ২ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে ডিবিএল গ্রুপের জিন্নাত নিটওয়্যার কারখানায় আরেক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। শ্রমিক জাকির হোসেন একটি পোশাকে ভুল লেবেল লাগিয়েছিলেন। সেই "অপরাধে" তাকে সহকর্মীদের সামনে কান ধরে উঠবস করিয়ে অপমান করা হয়। অপমানের সেই ভার তিনি সহ্য করতে পারেননি। পরে কারখানার আটতলা ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন।

একটি ভুল লেবেলের মূল্য কি একটি মানুষের জীবন?
একজন শ্রমিকের আত্মসম্মান কি এতটাই তুচ্ছ যে তাকে সবার সামনে অপদস্থ করা যাবে?
সুজন, হৃদয় এবং জাকির—এই তিনটি নাম কেবল তিনজন ব্যক্তির নাম নয়। তারা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্ধকার বাস্তবতার প্রতীক। তারা হাজার হাজার নিপীড়িত, অপমানিত ও নীরবে কষ্ট সহ্য করা শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করেন, যাদের গল্প কখনো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, যাদের কান্না কারখানার দেয়ালের মধ্যেই আটকে যায়।
আজ দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ করছেন ভয়, অনিশ্চয়তা এবং চরম মানসিক চাপে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য অমানবিক চাপ, অতিরিক্ত কাজ, চাকরি হারানোর আতঙ্ক, ন্যায্য মজুরি না পাওয়া, চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি, ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে বাধা এবং মানবিক মর্যাদার অভাব—সব মিলিয়ে অসংখ্য শ্রমিক প্রতিদিন এক অদৃশ্য যন্ত্রণা বহন করছেন।

অথচ এই শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতির প্রকৃত নির্মাতা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক আন্দোলনে গুলি করে তিনজন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, অসংখ্য শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। অথচ রাষ্ট্র, শিল্পমালিক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সবাই এই শ্রমিকদের শ্রমের ওপর নির্ভর করেই লাভবান হচ্ছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে—শ্রমিক কি শুধু উৎপাদনের একটি উপাদান? একটি যন্ত্র? একটি সংখ্যা?

না, শ্রমিক একজন মানুষ।
তারও স্বপ্ন আছে, পরিবার আছে, সন্তান আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে, সম্মানের সঙ্গে কাজ করার অধিকার আছে।
যে শিল্প শ্রমিকের জীবনকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে কর্মপরিবেশ শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, যে ব্যবস্থায় একজন শ্রমিক অপমান, নির্যাতন বা মৃত্যুর শিকার হওয়ার পরও সত্য গোপনের চেষ্টা করা হয়—সেই ব্যবস্থাকে অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে।
আজ প্রয়োজন প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা, কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি একটি মানবিক কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা।

কারণ শ্রমিক ছাড়া পোশাক শিল্পের অস্তিত্ব নেই।
সাভারের সুজন, গাজীপুরের হৃদয় এবং জাকিরের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়। তাদের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দিক। আমাদের মনে করিয়ে দিক—উৎপাদনের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ আছেন, যার জীবন, সম্মান এবং অধিকার কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সেই শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের ওপর, যিনি নিজের শ্রম দিয়ে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী—রক্তের দাগ বেশিদিন চাপা থাকে না। শ্রমিকের কান্নাও একদিন প্রতিবাদ হয়ে ফিরে আসে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু 
আইন ও দর-কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

Thursday, June 4, 2026

বাংলাদেশের পোশাক খাতে ‘ফোর্সড লেবার’ বিতর্ক ও শ্রম অধিকার বাস্তবতা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এই শিল্পের অবদান অসামান্য। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে শিল্পের এই সাফল্যের পাশাপাশি শ্রম অধিকার নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনাও অব্যাহত রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ‘ফোর্সড লেবার’ বা জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নিয়ে নানা ধরনের প্রতিবেদন ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে বাস্তবতাও তুলে ধরা জরুরি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অনুযায়ী, ভয়ভীতি, শাস্তির আশঙ্কা, ঋণের ফাঁদ, পরিচয়পত্র আটকে রাখা, চাকরি হারানোর ভয় অথবা অন্য কোনো জবরদস্তিমূলক অবস্থার মাধ্যমে কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করা হলে তাকে জোরপূর্বক শ্রম বা ফোর্সড লেবার বলা হয়। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে দাসপ্রথার মতো সংগঠিত ও ব্যাপক জোরপূর্বক শ্রমের অস্তিত্ব রয়েছে—এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা নিজেদের ইচ্ছায় কাজ করেন, চাকরি পরিবর্তন করেন এবং বিভিন্ন সময়ে দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনও পরিচালনা করেন। যদি প্রকৃত অর্থে দাসপ্রথার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকত, তাহলে শ্রমিকদের এই সংগঠিত আন্দোলন, বিক্ষোভ কিংবা ইউনিয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে সরাসরি ‘ফোর্সড লেবার’-নির্ভর শিল্প হিসেবে চিত্রিত করা বাস্তবতার অতিরঞ্জন হবে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে শ্রমিকদের সব অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কিংবা কর্মপরিবেশে কোনো সমস্যা নেই। বাস্তবতা হলো, শিল্পের অনেক কারখানায় এখনও কম মজুরি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, উৎপাদনচাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা, শ্রমিক ছাঁটাই, ইউনিয়ন গঠনে প্রতিবন্ধকতা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা বিদ্যমান। অনেক শ্রমিক তাদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খান। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি এখনও অধিকাংশ শ্রমিকের নাগালের বাইরে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই শ্রম অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক আচরণও পর্যালোচনার দাবি রাখে। ক্রেতাদের ক্রমাগত কম দামে পণ্য কেনার চাপ, অল্প সময়ের মধ্যে উৎপাদনের নির্দেশনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে কারখানাগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ওপর গিয়ে পড়ে। তাই শ্রম অধিকার প্রশ্নে শুধুমাত্র উৎপাদনকারী দেশকে দায়ী না করে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সকল অংশীজনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বহু কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক পরিবেশবান্ধব সবুজ পোশাক কারখানা বাংলাদেশে রয়েছে। কিন্তু শ্রম অধিকার এবং সামাজিক সংলাপের ক্ষেত্রে এখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

একটি টেকসই শিল্প গড়ে তুলতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সংগঠনের স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, শিল্পের অন্যতম অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একইসঙ্গে দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম এবং গঠনমূলক শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কও জরুরি।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের পর নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। সামনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা এবং মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার বিষয়ে বৈশ্বিক প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক ক্রেতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কার্যকর সামাজিক সংলাপের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে সুনির্দিষ্টভাবে ‘ফোর্সড লেবার’ বা দাসপ্রথার মতো জোরপূর্বক শ্রমের অস্তিত্ব নেই। তবে কম মজুরি, অতিরিক্ত শ্রম এবং অধিকারের সীমাবদ্ধতাকে পুরোপুরি আড়াল করার সুযোগও নেই। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখতে এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে শ্রম অধিকারের বিদ্যমান ঘাটতিগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। কারণ শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করেই একটি শক্তিশালী, মানবিক এবং টেকসই পোশাক শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: খায়রুল মামুন মিন্টু, শ্রমিক নেতা ও শ্রম অধিকার কর্মী

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি

  বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (Ready-Made Garments-RMG) শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি। প্রতি বছর এই শিল্প থেকে কয়েক দশমিক বি...