সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশ-এর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একাধিক কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে
নিয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির
ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক
অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা এখন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে
বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিকে বেশি নিবদ্ধ।
অন্যদিকে শিল্পখাত, বিশেষ করে
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প, বর্তমানে বড় ধরনের সংকটের
মুখে রয়েছে। ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, বৈদেশিক ক্রয়াদেশ
কমে যাওয়া এবং ব্যাংকিং খাতের জটিলতা শিল্প পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় দেড় লাখ
শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। এই শ্রমিকদের অনেকেই বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের
জন্য আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। কিন্তু তাদের দাবি আদায়ের পথও নিরাপদ ছিল না—হামলা, মামলা এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এতে শিল্প
সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শিল্পখাতে এই অস্থিরতা শুধু শ্রমিক বা মালিকের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে
পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে, বিদেশি
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন জাতীয় অর্থনীতির
জন্য অত্যন্ত জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য কয়েকটি নীতিগত অগ্রাধিকার অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিল্পখাতকে
টিকিয়ে রাখতে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত,
শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ ও শ্রম অধিকার রক্ষায় কার্যকর
ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা
দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন
করাও সরকারের দায়িত্ব।
সবশেষে বলা যায়, নতুন সরকার
একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাদের সফলতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার
ওপর। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং
শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই যদি কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়, তবে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক চাপ
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই বর্তমান সময়টি শুধু
রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেরও একটি
গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।





