Followers

Saturday, August 8, 2026

বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে?

 

                      বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে?

বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শ্রমজীবী মানুষ। তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পে লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রম, ঘাম ও দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং নগর অর্থনীতির একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। কিন্তু শিল্পের এই সাফল্যের আড়ালে বর্তমানে যে বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক—কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়াই শ্রমিকদের জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে যেন শ্রমিক ছাঁটাইয়ের এক মহোৎসব চলছে। কোনো মালিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কথা বলছেন, কেউ অর্ডার কমে যাওয়ার কথা বলছেন, কেউ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়ার কথা বলছেন, আবার কেউ কাঁচামাল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সুদের হার কিংবা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। এসব সমস্যার অনেকগুলোই বাস্তব এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

একটি কারখানা যখন লাভ করে, তখন সেই লাভের মালিকানা উদ্যোক্তার। কিন্তু সংকট দেখা দিলে কেন শ্রমিককে চাকরি হারিয়ে সেই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে? আর যদি সত্যিই কোনো কারখানায় কাজ কমে যায়, তাহলে সেই কাজের পরিমাণ কতটা কমেছে, শ্রমিকের সংখ্যা কতটা কমানো প্রয়োজন এবং ছাঁটাইয়ের আগে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর কি যথাযথভাবে খোঁজা হচ্ছে? বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সর্বশেষ উদাহরণগুলোর একটি সামনে এসেছে সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পুকুরপাড়, জিরাবো এলাকায় অবস্থিত এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিট লিমিটেডে। শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য ও ৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখের কর্তৃপক্ষের নোটিশ অনুযায়ী, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে কারখানায় মারাত্মক ব্যবসায়িক মন্দা, প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং ও আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়া এবং পর্যাপ্ত কাজের স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে ৫৬৫ শ্রমিককে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২০ অনুযায়ী ছাঁটাই করা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের আইনগত পাওনা ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হবে। ভবিষ্যতে কাজের পরিধি বাড়লে বা নতুন শ্রমিক নিয়োগের প্রয়োজন হলে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনরায় কাজে নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

কারখানাটির অস্তিত্ব ও অবস্থান নিয়ে সরকারি ও শিল্প-সংগঠনের নথিও রয়েছে। বিজিএমইএর সদস্য-তথ্যে এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ঠিকানা জিরাবো, আশুলিয়া এবং কর্মীসংখ্যা ৭৬৭ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; অন্যদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের একটি ইউনিট-ভিত্তিক রেকর্ডে ১২০ শ্রমিকের তথ্য রয়েছে। ফলে বিভিন্ন সরকারি ও সংগঠনভিত্তিক ডাটাবেজে কারখানার কর্মীসংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। তবে শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ৫৬৫ জন ছাঁটাইয়ের বিষয়টি যদি সঠিক হয়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকোচনের ঘটনা।

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটিকে নিটিং, ডাইং, ফিনিশিং, তৈরি পোশাক ও প্রিন্টিং—বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিটসমৃদ্ধ একটি কম্পোজিট কারখানা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি একটি বহুমুখী উৎপাদন কাঠামোর শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে ‘কাজের স্বল্পতা’ বা ‘ব্যবসায়িক মন্দা’ দেখিয়ে এত বড় সংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তা যাচাই করা জরুরি।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২০-এ প্রয়োজনের অতিরিক্ততার কারণে বা redundancy-এর ভিত্তিতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিধান রয়েছে। তবে এক বছর বা তার বেশি সময় অবিচ্ছিন্নভাবে চাকরিতে থাকা শ্রমিকের ক্ষেত্রে লিখিত নোটিশ, নোটিশের পরিবর্তে মজুরি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশের কপি পাঠানো এবং আইনানুগ ক্ষতিপূরণের মতো শর্ত রয়েছে। বিশেষ কোনো শ্রেণির শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে চুক্তি না থাকলে ওই শ্রেণিতে সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রমিককে আগে ছাঁটাই করার বিধানও রয়েছে।

অন্যদিকে ধারা ২১-এ বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে মালিক পুনরায় শ্রমিক নিয়োগ করতে চাইলে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের তাদের সর্বশেষ জানা ঠিকানায় নোটিশ দিয়ে আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে এবং আবেদনকারী ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনঃনিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে হবে; একাধিক প্রার্থী হলে পূর্বের চাকরির জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অতএব, ধারা ২০ কোনো মালিককে ‘কাজ কমেছে’ বললেই ইচ্ছামতো শ্রমিকের কর্মসংস্থান বাতিল করার সীমাহীন ক্ষমতা দেয়—এমন ধারণা সঠিক নয়।

আইনের উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রমিকের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। সেই কারণে কোনো বড় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠলে তার প্রকৃত কারণ, প্রয়োজনীয়তা এবং আইনগত প্রক্রিয়া যাচাই করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ঘটনাটি বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে বর্তমান সংকটের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। ২০২৫ সালে বিজিএমইএর তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানায়, আগের ১৪ মাসে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৩৫৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন বলে বিজিএমইএর তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়। এই তথ্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের বড় অংশ বিকল্প কর্মসংস্থান না পেয়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানেই শ্রমিক অন্য একটি কারখানায় গিয়ে চাকরি পেয়ে গেলেন—বাস্তবতা এমন নয়। বরং যখন একই সময়ে একটি শিল্পাঞ্চলের একাধিক কারখানা বন্ধ হতে থাকে, তখন শ্রমিকের জন্য বিকল্প চাকরির বাজারও সংকুচিত হয়ে যায়।

উল্লিখিত ৩৫৩টি কারখানার মধ্যে সাভার ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সাভারে ২১৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল—এর মধ্যে ১২২টি স্থায়ী এবং ৯২টি অস্থায়ী। এর ফলে প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সাভার-আশুলিয়ার জন্য এই সংখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই অঞ্চল দেশের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চল। এখানে একদিকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মরত, অন্যদিকে এক কারখানা থেকে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের জন্য আশপাশের অন্য কারখানায় কাজ পাওয়ার সুযোগই সাধারণত প্রধান ভরসা। কিন্তু যখন একই শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়, তখন সেই ভরসাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সাভার-আশুলিয়ার সাম্প্রতিক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানায় ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই। ৬ জুন ২০২৬-এ এ কে এম নিটওয়্যার লিমিটেড, প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার এবং আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে যথাক্রমে ১,২৮৬, ৫২৯ ও ৫৩ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। মালিকপক্ষ ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কথা বলে ধারা ২০-এর আওতায় ছাঁটাইয়ের কথা জানায়।

কিন্তু শ্রমিকরা এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।ঈদের ছুটির পর কাজে ফিরে এসে অনেক শ্রমিক কারখানার গেটে ছাঁটাইয়ের তালিকা দেখতে পান। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শ্রমিকদের একাংশ দাবি করেন যে নিয়মিত ওভারটাইম করার পরও ‘কাজ নেই’ যুক্তি তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।

এখানেই বর্তমান শ্রমিক ছাঁটাইয়ের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—কাজের স্বল্পতা কি সত্যিই উৎপাদনের স্বল্পতা, নাকি শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে শ্রম ব্যয় কমানোর কৌশল? এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, কারখানার উৎপাদন, অর্ডার, শ্রমঘণ্টা এবং ছাঁটাইয়ের আগে-পরে উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করেই বের করতে হবে।

সাভার-আশুলিয়ার পাশাপাশি গাজীপুরও দীর্ঘদিন ধরে শিল্প ও শ্রমিক সংকটের অন্যতম কেন্দ্র। ২০২৫ সালের বিজিএমইএ-উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ওই ৩৫৩টি বন্ধ কারখানার মধ্যে গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং ৭৩ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০২৬ সালেও গাজীপুরে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের নতুন ঘটনা সামনে এসেছে। ১৭ মার্চ কোনাবাড়ীর জরুন এলাকার রিপন নিট ওয়্যার লিমিটেডে ১০৯ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। এই ঘটনাটি দেখায়, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সমস্যা শুধু সাভার-আশুলিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলেও কর্মসংস্থান নিরাপত্তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের জায়গা এখানেই। একটি কারখানায় যদি সত্যিই অর্ডার কমে যায় এবং উৎপাদনের প্রয়োজন কমে যায়, তাহলে শ্রমিকের প্রয়োজন কমতে পারে। কিন্তু ছাঁটাইয়ের পর যদি কারখানার উৎপাদন খুব বেশি না কমে, অথবা একই উৎপাদন কম শ্রমিক দিয়ে চালানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ধরা যাক, একটি কারখানায় ১,০০০ শ্রমিক কাজ করেন। মালিক বললেন, কাজ কমে গেছে এবং ২০০ শ্রমিক ছাঁটাই করলেন। কিন্তু ছাঁটাইয়ের পরও যদি ৮০০ শ্রমিক দিয়ে আগের কাছাকাছি উৎপাদন করা হয়, তাহলে ২০০ শ্রমিকের কাজ কোথায় গেল? কাজটি নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে বাকি ৮০০ শ্রমিকের ওপর পড়বে। এর অর্থ হলো—একদিকে ২০০ শ্রমিক বেকার হলেন, অন্যদিকে ৮০০ শ্রমিকের কাজের চাপ বাড়ল। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ার পরিবর্তে শ্রমিকের ক্লান্তি, মানসিক চাপ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু ‘কাজ কমেছে’ বলা যথেষ্ট নয়। কাজ কতটা কমেছে এবং তার অনুপাতে শ্রমিক কতজন কমানো হয়েছে—এই সম্পর্কটি যাচাই করা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে কারখানা ‘কাজের স্বল্পতা’র কথা বলে শ্রমিক ছাঁটাই করছে, সেখানে ছাঁটাইয়ের পরও যদি নিয়মিত ওভারটাইম চালু থাকে, তাহলে সেই ছাঁটাইয়ের অর্থনৈতিক যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?

অবশ্যই উৎপাদনের ধরন, অর্ডারের সময়সীমা ও বিভাগভেদে ওভারটাইমের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বড় আকারের ছাঁটাইয়ের পর একই সঙ্গে ব্যাপক অতিরিক্ত কাজ চলতে থাকলে সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কারণ তখন প্রশ্ন উঠবে—কারখানায় শ্রমিকের প্রয়োজন কমেছে, নাকি শুধু শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে বেশি উৎপাদন নেওয়া হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইকে ‘স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত’ বলে মেনে নেওয়া বিপজ্জনক।

কারখানা বন্ধ বা ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে বড় মানবিক সমস্যা হলো—শ্রমিকের পরবর্তী গন্তব্য। একজন শ্রমিক যখন চাকরি হারান, তখন তিনি শুধু মাসিক বেতন হারান না। তিনি হারান বাসাভাড়া দেওয়ার নিশ্চয়তা, পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা, সন্তানের স্কুলের খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা।

২০২৫ সালে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার পরও বিকল্প কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিক কাজ না পেয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শহরের ভাড়া বাসা, বাজার, পরিবহন, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব। অর্থাৎ, একটি শিল্পকারখানা বন্ধ হলে শুধু মালিকের ব্যবসা বন্ধ হয় না; একটি বৃহৎ স্থানীয় অর্থনৈতিক চক্র দুর্বল হয়ে যায়।

বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প নানা বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, আমদানির জন্য এলসি খোলার সমস্যা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং অর্ডারের ওঠানামা—এসব বিষয় শিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে এসব সমস্যার কথা উল্লেখ করা হলেও

প্রয়োজন হলো স্বচ্ছ যাচাই। কারখানার অর্ডার কত? উৎপাদন কত? ব্যাংক ঋণ পরিস্থিতি কী? রপ্তানি কত কমেছে? উৎপাদন ব্যয় কত বেড়েছে? শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পর উৎপাদন কত কমেছে? ছাঁটাইয়ের পর নতুন শ্রমিক নেওয়া হয়েছে কি না? ওভারটাইম বেড়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর থেকেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

মালিকপক্ষ প্রায়ই বলে থাকে—‘শ্রমিকদের সব আইনগত পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে।আইনগত পাওনা পরিশোধ করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এটি শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে না। একজন শ্রমিকের হাতে এককালীন ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে দেওয়া হলো। কিন্তু তিনি পরের মাসে কোথায় কাজ করবেন? দুই মাস পর? ছয় মাস পর? ক্ষতিপূরণের টাকা একসময় শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ শেষ হবে না। তাই শ্রমিক ছাঁটাইয়ের নীতি শুধু ‘পাওনা পরিশোধ’কেন্দ্রিক হলে চলবে না। এর সঙ্গে বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন যুক্ত করতে হবে।

শ্রম আইনের ধারা ২১ ইতোমধ্যেই ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনঃনিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রেখেছে। কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে মালিক নতুন শ্রমিক নিতে চাইলে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিধান বাস্তবে কতটা কার্যকর? যদি ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের তালিকা থাকে, কিন্তু পরে নতুন নিয়োগের সময় সেই শ্রমিকদের খোঁজা না হয়, তাহলে আইনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।

তাই প্রয়োজন একটি কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা। প্রতিটি বড় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, পদ, দক্ষতা ও চাকরির মেয়াদ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এক বছরের মধ্যে নতুন নিয়োগ হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে সেই নিয়োগের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের নোটিশে শ্রমিকদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ বা কারখানার শান্তিশৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড ঘটলে কর্তৃপক্ষ প্রচলিত ফৌজদারি ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে। কারখানার নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শ্রমিক বা ব্যক্তি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলা বা অন্য কোনো অপরাধ করতে পারেন না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে আইনসম্মত প্রতিবাদ, পাওনা দাবি, শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে অভিযোগ এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ন্যায্য প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়। চাকরি হারানো শ্রমিকদের ক্ষোভ কত দ্রুত শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে তা আমরা অতিতে দেখেছি। তাই শ্রমিকদের ভয় দেখানোর পরিবর্তে আলোচনায় বসা প্রয়োজন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হওয়া উচিত বড় ধরনের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আগে ও পরে একটি কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা তৈরি করা। কোনো প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করতে চাইলে তার আগে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে—

কারখানার বর্তমান অর্ডার পরিস্থিতি কী, গত ১২ মাসের উৎপাদন কত, গত ১২ মাসে রপ্তানি বা বিক্রয় কত, শ্রমিক সংখ্যা কত, কতজন ছাঁটাই করা হবে, কেন ওই সংখ্যক শ্রমিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত, বিকল্প ব্যবস্থা কী কী নেওয়া হয়েছে, ছাঁটাইয়ের পর উৎপাদন কত হবে, অতিরিক্ত শ্রমঘণ্টা বা ওভারটাইম বাড়বে কি না, ভবিষ্যতে নতুন শ্রমিক নিয়োগ হলে কীভাবে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ ধরনের যাচাই থাকলে প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকট এবং ছাঁটাইকে শ্রম ব্যয় কমানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করা সহজ হবে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে প্রথম সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নয়—‘কতজন শ্রমিক ছাঁটাই করা যায়?’ প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘কীভাবে শ্রমিকের কর্মসংস্থান ধরে রাখা যায়?’

সাময়িকভাবে উৎপাদন পুনর্বিন্যাস করা যায় কি না, শ্রমঘণ্টা পুনর্বিন্যাস করা যায় কি না, নতুন পণ্য বা বাজার খোঁজা যায় কি না, শ্রমিকদের অন্য বিভাগে স্থানান্তর করা যায় কি না, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের পুনর্বিন্যাস করা যায় কি না—এসব বিকল্প আগে দেখতে হবে। ব্যাংকিং সংকট থাকলে ব্যাংক ও সরকারের সহায়তায় ঋণ পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা হতে পারে। অর্ডার সংকট থাকলে নতুন বাজার ও ক্রেতা খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, শ্রমিক ছাঁটাই হবে সর্বশেষ বিকল্প; প্রথম বিকল্প নয়।

একজন শ্রমিককে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া এবং তাকে নতুন কাজ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। শিল্পাঞ্চলে চাকরির বাজার যখন সংকুচিত, তখন একজন ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের জন্য নতুন চাকরি পাওয়া সহজ নয়। একটি কারখানা বন্ধ হলে ৫০০ শ্রমিক যদি একসঙ্গে চাকরি খোঁজেন, তখন আশপাশের কারখানায় ৫০০টি খালি পদ থাকতেই হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে শ্রমিকের সামনে তিনটি পথ থাকে—অন্য শিল্পাঞ্চলে চলে যাওয়া, গ্রামে ফিরে যাওয়া অথবা বেকার থাকা। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক ঋণ করে শহরে থাকেন। চাকরি চলে গেলে বাসাভাড়া দিতে পারেন না। দোকানে বাকি জমে যায়। সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। চিকিৎসা ব্যাহত হয়।

এই বাস্তবতায় বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া ব্যাপক ছাঁটাই কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সামাজিক সংকট তৈরির সিদ্ধান্তও। একটি কারখানার হিসাবের খাতায় শ্রমিককে শুধু ‘লেবার কস্ট’ হিসেবে দেখলে ব্যবসায়িক সংকটের প্রথম সমাধান হিসেবে শ্রমিক কমানোর চিন্তা আসবে। কিন্তু শ্রমিক কোনো যন্ত্র নয়। একজন শ্রমিকের বহু বছরের অভিজ্ঞতা থাকে। একটি নির্দিষ্ট মেশিন পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন প্রক্রিয়া, সময় ব্যবস্থাপনা—এসব দক্ষতা অর্জন করতে বছর লাগে। একজন দক্ষ শ্রমিককে ছাঁটাই করার অর্থ শুধু একটি বেতন কমানো নয়; প্রতিষ্ঠানের অর্জিত দক্ষতার একটি অংশও হারানো। তাই দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতিতে শ্রমিককে ব্যয় নয়, উৎপাদনের অংশীদার ও মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

একজন শ্রমিকের বেতন বন্ধ হলে তার পরিবারের ব্যয় কমে যায়। হাজার হাজার শ্রমিকের বেতন বন্ধ হলে শিল্পাঞ্চলের বাজারে ভোগ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে মুদি দোকান, হোটেল, পরিবহন, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, ক্ষুদ্র ব্যবসা—সবখানে। অর্থাৎ ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাই জাতীয় অর্থনীতিতে চাহিদার সংকটও তৈরি করতে পারে। এই কারণে শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষা শুধু শ্রমিকবান্ধব নীতি নয়; এটি অর্থনীতিবান্ধব নীতিও।

সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পকেন্দ্র। এখানে যদি একের পর এক কারখানা বন্ধ হয় এবং শ্রমিক ছাঁটাই হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। ২০২৫ সালে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ ও প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, তার সঙ্গে ২০২৬ সালের আল-মুসলিম গ্রুপের ১,৮৬৮ শ্রমিক এবং গাজীপুরের ১০৯ শ্রমিকের মতো নতুন ছাঁটাইয়ের ঘটনাগুলো যুক্ত করলে বোঝা যায়—সমস্যাটি কেবল অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন সংকট নয়। এর সঙ্গে ৮ আগস্টের এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা যুক্ত হলে উদ্বেগ আরও বাড়ে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারকে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বড় ধরনের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সরকারি যাচাই চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ‘ব্যবসায়িক মন্দা’, ‘অর্ডার কমে যাওয়া’, ‘ব্যাংকিং সংকট’ বা ‘কাজের স্বল্পতা’—এসব কারণের বাস্তবতা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, ছাঁটাইয়ের আগে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের জন্য শিল্পাঞ্চলভিত্তিক পুনঃকর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করতে হবে। পঞ্চমত, শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২১ অনুযায়ী পুনঃনিয়োগের অগ্রাধিকার বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। এর পাশাপাশি শিল্প মালিকদের জন্যও একটি কার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনা নীতি তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে ব্যবসায়িক সংকটের সময় সরকার, ব্যাংক, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি একসঙ্গে বসে সমাধান খুঁজতে পারেন। বাংলাদেশের শিল্পনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো—আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু কর্মসংস্থান হারানো মানুষের পুনর্বাসন নিয়ে খুব কম কথা বলি।

একটি নতুন কারখানা ১,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলে সেটি বড় সাফল্য। কিন্তু একটি পুরোনো কারখানা ১,০০০ মানুষকে ছাঁটাই করলে সেই ১,০০০ মানুষের কী হবে—এই প্রশ্নের উত্তরও রাষ্ট্রীয় শ্রমনীতিতে থাকা উচিত। শ্রমিকের হাতে ছাঁটাইয়ের নোটিশ তুলে দিয়ে বলা যাবে না—‘আইন অনুযায়ী আপনার পাওনা দেওয়া হয়েছে।’ রাষ্ট্রকে বলতে হবে—‘আপনার কর্মসংস্থান হারিয়েছে, কিন্তু আপনার জীবিকা হারাতে দেওয়া হবে না।’ এই পার্থক্যটিই একটি মানবিক রাষ্ট্র ও নিছক বাজারনির্ভর রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।

ব্যবসায়িক সংকট বাস্তব হতে পারে।হয়তো কোনো কোনো মালিক সত্যিই কঠিন সময় পার করছেন। ব্যাংকিং সংকট, অর্ডার সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—এসব সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। কিন্তু সেই সমাধানের প্রথম শিকার যদি শ্রমিক হন, তাহলে আমাদের শিল্পনীতির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হবে।

একটি শিল্পের সাফল্য শুধু রপ্তানি আয় দিয়ে মাপা যায় না। সেই শিল্পের শ্রমিক কতটা নিরাপদ, তার পরিবার কতটা নিশ্চিন্ত, তার মজুরি দিয়ে জীবনযাপন সম্ভব কি না, সংকটের সময় তার চাকরি কতটা সুরক্ষিত এবং চাকরি হারালে তার বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে কি না—এসবও শিল্পের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

আজ এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর সামনে এসেছে। এর আগে আল-মুসলিম গ্রুপের তিন কারখানায় ১,৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। গাজীপুরে ১০৯ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।

এগুলো শুধু সংখ্যা নয়। ৫৬৫ মানে ৫৬৫টি জীবিকা। ১,৮৬৮ মানে ১,৮৬৮টি পরিবারের অনিশ্চয়তা। ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ মানে একটি বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সংকট। এই মানুষগুলো দেশের অর্থনীতির বোঝা নন; তারাই দেশের অর্থনীতি তৈরি করেন। তাই এখন সময় এসেছে শ্রমিক ছাঁটাইকে শিল্প ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে সহজ সমাধান হিসেবে দেখা বন্ধ করার। কারণ একটি কারখানা বাঁচানোর নামে যদি হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই শিল্পের টেকসই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।

শ্রমিকদের হাতে কি শুধু ছাঁটাইয়ের নোটিশ তুলে দেওয়া হবে, নাকি তাদের হাতে আবারও কাজ ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও শিল্প মালিকরা গ্রহণ করবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশের শ্রমনীতি ও শিল্পনীতির মানবিক চরিত্র নির্ধারণ করবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। 

Thursday, July 30, 2026

শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?




বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ১২৪ক: শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তবে যে শ্রমিকের গায়ের ঘামে এই শিল্পের চাকা সচল থাকে, তাঁদের আইনগত পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘটে নানা অনিয়ম ও প্রতারণা। অতি সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’-এর ১২৪ক ধারা ব্যবহার করে শ্রমিকদের আইনি পাওনা থেকে বঞ্চিত করার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইনগতভাবে কোনো বিরোধ দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে আপোষ-মীমাংসার এই বিধান তৈরি করা হলেও, বাস্তবচিত্রে এটি হয়ে উঠেছে অসাধু মালিক ও সুবিধাভোগী কিছু শ্রমিকনেতার যোগসাজশে শ্রমিক ঠকানোর এক ‘মহা হাতিয়ার’।

১২৪ক ধারার আইনি উদ্দেশ্য ও তার বাস্তবতা

আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকদ্দমা এড়িয়ে শ্রমিকের বকেয়া মজুরি এবং প্রাপ্য পাওনা দ্রুত পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা। আইনের ১২৪ক ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে:

আবেদনের সুযোগ (উপ-ধারা ১): কর্মে কর্মরত, অবসরে যাওয়া, চাকরিচ্যুত বা বরখাস্তকৃত শ্রমিক বা শ্রমিকরা মজুরিসহ আইনত প্রাপ্য পাওনা আদায়ে প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে পারেন।

সময়সীমা (উপ-ধারা ২ ও ৩): আবেদন পাওয়ার সর্বোচ্চ ২০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উদ্যোগ গ্রহণ করে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন।

সিদ্ধান্ত ও কার্যকারিতা (উপ-ধারা ৪ ও ৫): সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে দুই পক্ষকে দিতে হবে এবং তা পালনে পক্ষসমূহ বাধ্য থাকবে।

শ্রম আদালতে আপিলের পথ (উপ-ধারা ৬): কোনো পক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সিদ্ধান্তে সম্মত না হলে তারা শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবেন এবং আদালত এই মধ্যস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।

কাগজে-কলমে এই প্রক্রিয়াটি শ্রমিকের জন্য সময় ও অর্থ বাঁচানোর কথা থাকলেও, বাস্তবে এতে চরম ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বেআইনি কারসাজি চলছে।

যেভাবে হচ্ছে প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার

১২৪ক ধারার সুবিধা নিয়ে কিছু অসাধু পক্ষ আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করছে, যা মূলত তিনটি প্রধান উপায়ে শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে:

আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, শ্রমিক নিজে বা শ্রমিকরা সরাসরি প্রধান পরিদর্শকের কাছে আবেদন করবেন। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকদের সরাসরি যুক্ত না করে অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত কিছু ফেডারেশন বা অসাধু শ্রমিকনেতা শ্রমিকদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের প্রতিনিধি সেজে আবেদন করছেন। অথচ আইনি ভিত্তিতে শ্রমিকদের আইনি সর্বনিম্ন পাওনার চেয়ে কম মূল্যে রফাদফা বা আপোষ করার কোনো এখতিয়ার বা অধিকার এই প্রতিনিধি বা ফেডারেশনগুলোর নেই।

শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের সার্ভিস বেনিফিট, নোটিশ পে, ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া মজুরি পাওয়া একটি নির্দিষ্ট আইনি অধিকার (Statutory Right)। এটি মালিকের কোনো অনুগ্রহ নয়। কিন্তু ১২৪ক ধারার অধীনে মধ্যস্থতার নামে অসাধু মালিক ও শ্রমিকনেতারা যোগসাজশ করে শ্রমিকদের আইনত প্রাপ্য সর্বনিম্ন সুবিধার চেয়ে অনেক কম অর্থে ‘আপোষ’ করতে বাধ্য করছেন। ফলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অর্ধেক বা তারও কম টাকায় সই দিয়ে চলে যাচ্ছেন।

অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির পর শ্রমিককে দিয়ে এমনভাবে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বা বুঝানো হয় যে, তারা আর কোথাও অভিযোগ করতে পারবেন না। ফলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিকরা।

সম্প্রতি লিথি গ্রুপ, ইউনিক ডিজাইনসহ বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিকের সাথে আপোষ-মীমাংসার নামে এই ধরনের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। যেখানে শত শত শ্রমিকের কোটি কোটি টাকার আইনি পাওনাকে ১২৪ক ধারার দোহাই দিয়ে নামমাত্র টাকায় নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

এই অনিয়মের লাগাম এখনই টেনে ধরা না গেলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এবং সামগ্রিক শ্রম খাতের জন্য এর পরিণতি হবে মারাত্মক:

 শ্রমিকরা যখন বুঝতে পারবেন যে আইনি প্রক্রিয়াতেও তারা প্রতারিত হচ্ছেন, তখন আইনি ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা উঠে যাবে। ফলে তারা রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হবেন, যা শিল্পে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা ডেকে আনবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং বিদেশী ক্রেতারা (Buyers) বাংলাদেশে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। ১২৪ক ধারার এই অপব্যবহারের খবর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছালে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে এবং অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হবে।

চাকরি হারানোর পর পাওনা না পেয়ে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার চরম অর্থনৈতিক মানবেতর জীবনের মুখে পড়বে।

১২৪ক ধারাকে শ্রমিক ঠকানোর মাধ্যম থেকে রক্ষা করে পুনরায় ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর কোনো প্রতিনিধি এমন কোনো আপোষ-মীমাংসা অনুমোদন বা সই করতে পারবেন না, যা শ্রম আইনে নির্দিষ্টকৃত ন্যূনতম প্রাপ্য পাওনার চেয়ে কম। আইনি পাওনার চেয়ে কম অর্থমূল্যে সমঝোতা করাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ ঘোষণা করতে হবে।

মধ্যস্থতা বৈঠকে শ্রমিকদের সরাসরি উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো অননুমোদিত ফেডারেশন বা নেতার মধ্যস্থতায় শ্রমিকের অবর্তমানে সমঝোতা করা বন্ধ করতে হবে।

ডিআইএফই (DIFE) বা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা অসাধু আপোষ-মীমাংসায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সই করছেন, তাঁদের ওপর কঠোর গোয়েন্দা তদারকি চালাতে হবে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

১২৪ক ধারার উপ-ধারা (৬) অনুযায়ী কোনো আপোষ জোরপূর্বক চাপিয়ে দিলে শ্রমিকরা যে শ্রম আদালতে যেতে পারেন—সে বিষয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক আইনি সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১২৪ক ধারা তৈরি করা হয়েছিল দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য, তাঁদের বলির পাঁঠা বানানোর জন্য নয়। অসাধু মালিক চক্র এবং নামধারী কিছু শ্রমিকনেতার অপতৎপরতায় এই আইনি বিধানটি আজ শ্রমিকের মূল অধিকার হননকারী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শিল্প রক্ষা এবং শ্রমিকের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার স্বার্থে এখনই সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই ধারার অপব্যবহার রোধে কঠোর নীতিমালা জারি করা। অন্যথায়, এই অন্যায় ও ক্ষোভের আগুন দীর্ঘমেয়াদে পুরো গার্মেন্টস শিল্পকেই সংকটের মুখে ফেলে দেবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


Saturday, July 18, 2026

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি

 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (Ready-Made Garments-RMG) শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি। প্রতি বছর এই শিল্প থেকে কয়েক দশমিক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে এবং প্রায় ৪০ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক—যাদের অধিকাংশই নারী—তাদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের মাধ্যমে এই শিল্পকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক খাতে পরিণত করেছেন। অথচ এই শিল্পের প্রকৃত চালিকাশক্তি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। ওই বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনিকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে একাধিক বৈঠক, মতবিনিময় ও আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় এবং নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯(৬) ধারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, কোনো শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত নিম্নতম মজুরির হার প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এই বিধানের উদ্দেশ্য হলো জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয়সহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরির সামঞ্জস্য বজায় রাখা।

একই সঙ্গে প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত, শুনানি ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করে নতুন মজুরির সুপারিশ চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডে নিয়োগপ্রাপ্ত মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি—উভয়েরই তিন বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত সর্বনিম্ন মজুরির গেজেটেরও তিন বছর পূর্ণ হবে ২০২৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর।

অর্থাৎ আইনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা অনুসারে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের পরই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে পরবর্তী মজুরি পুনর্নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল, যাতে ডিসেম্বরের আগেই আইনসম্মত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। এটি শুধু প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; বরং শ্রম আইনের উদ্দেশ্য ও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশে একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি যেন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শ্রমিকরা দীর্ঘদিন দাবি জানালেও তাতে কার্যকর সাড়া মেলে না। বরং শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয়, কারখানা বন্ধ হয়, সড়ক অবরোধ হয়, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে, মামলা-হামলা হয়, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। এরপরই কেবল সরকার ও মালিকপক্ষ নড়েচড়ে বসে। একটি আধুনিক ও আইনভিত্তিক রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আজকের বাস্তবতা আরও কঠিন। বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরি দিয়ে অধিকাংশ শ্রমিকের পক্ষে একটি পরিবারের এক মাসের ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, মাসের প্রথম ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অর্থ ফুরিয়ে যায়। এরপর ধার-দেনা, ঋণ কিংবা অতিরিক্ত ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করেই বাকি মাস কাটাতে হয়।

অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির কারণে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসা ও ওষুধের খরচও বহুগুণ বেড়েছে। ফলে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারছেন না। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

একজন অপুষ্ট, অসুস্থ ও মানসিক চাপে থাকা শ্রমিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। শিল্পের উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নত করতেই হবে। কারণ শ্রমিক সুস্থ থাকলে শিল্পও সুস্থ থাকবে; শ্রমিক নিরাপদ থাকলে উৎপাদনও টেকসই হবে।

বর্তমান বিশ্বে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও কেবল কম দামের পণ্য নয়; তারা শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।

আমরা বিশ্বাস করি, নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ কোনো রাজনৈতিক বা আন্দোলনের বিষয় হওয়া উচিত নয়; এটি একটি নিয়মিত, আইনসম্মত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। শ্রম আইনে যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই সময়সীমা মেনেই সরকারকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে এবং জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক পরিবারের মৌলিক চাহিদা, পুষ্টি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সঞ্চয় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

আমরা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাই—অবিলম্বে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বাস্তবসম্মত, ন্যায্য এবং বেঁচে থাকার উপযোগী নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করুন। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলে শিল্প শক্তিশালী হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আরও টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

লিখেছেন: খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা ও সমাজকর্মী

Monday, June 29, 2026

আশুলিয়ার ‘জিন-ভূতের আতঙ্ক’: অতিপ্রাকৃত নয়, এটি শ্রমিকদের চরম শোষণের আর্তনাদ

সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। কোথাও শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, কেউ চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট, শরীর কাঁপা বা অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ করছেন। অনেকেই ঘটনাকে "জিন-ভূতের আতঙ্ক" বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন ব্যাখ্যা প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করে এবং শ্রমিকদের দুর্ভোগের মূল কারণগুলো থেকে সমাজের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এ ধরনের ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে গণ-হিস্টেরিয়া (Mass Psychogenic Illness) বা সমষ্টিগত মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা-র কথা বলা হয়। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, আবার কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনাও নয়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, ভয়, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, শারীরিক দুর্বলতা, পুষ্টিহীনতা এবং অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের কারণে অনেক মানুষের মধ্যে একই ধরনের শারীরিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।

বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। অনেক কারখানায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করানো হচ্ছে। কোনো কোনো দিন রাত ২টা বা ৩টা পর্যন্তও কাজ করতে হচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও "জেনারেল" হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। রাত ১১টা বা ১২টায় বাসায় ফিরে রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ১টা বা ২টা বেজে যায়। আবার ভোর ৫টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। অর্থাৎ একজন শ্রমিক প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন।

একজন মানুষ কতদিন এভাবে চলতে পারেন?

অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং কম মজুরি শ্রমিকদের এমন এক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে তারা পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলছেন। অনেক শ্রমিক প্রতিদিন ডাল, আলুভর্তা, করলা ভাজি বা স্বল্পমূল্যের একঘেয়ে খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। যে পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম তারা করেন, সেই তুলনায় প্রয়োজনীয় ক্যালরি, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান তাদের খাদ্যতালিকায় নেই। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন।

এই দুর্বল শরীর নিয়েই তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎপাদন লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কম মজুরির কারণে তারা অতিরিক্ত আয়ের আশায় ওভারটাইম করতে বাধ্য হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ওভারটাইম করতে অস্বীকৃতি জানালে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। অর্থাৎ এটি কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়; বরং অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে তৈরি হওয়া এক ধরনের বাধ্যবাধকতা।

এমন পরিস্থিতিতে যদি হঠাৎ একটি কারখানায় একজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে একই মানসিক চাপ ও শারীরিক দুর্বলতায় থাকা অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তাই ঘটনাগুলোকে "জিন-ভূতের আছর" বলে প্রচার করা সমস্যার সমাধান নয়; বরং প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানকে বাধাগ্রস্ত করে।

প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কারখানার বায়ুমান, রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার, পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল, তাপমাত্রা, স্বাস্থ্যবিধি এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা—সবকিছুই বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এই শিল্পের প্রাণ হলো শ্রমিক। তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুযায়ী নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো কারখানায় যদি বারবার "জিন-ভূতের আতঙ্ক" দেখা দেয়, তাহলে হয়তো সেখানে অতিপ্রাকৃত কিছু নেই; বরং আছে অবহেলা, শোষণ, ক্লান্তি, অপুষ্টি এবং সীমাহীন মানসিক চাপের এক নির্মম বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াই হবে সমস্যার প্রকৃত সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ।

খাইরুল মামুন মিন্টু

Friday, June 26, 2026

গার্মেন্ট কারখানায় আর কত প্রাণ গেলে জাগবে মালিকপক্ষের বিবেক?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই শিল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা—শ্রমিকের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদার চরম অবমূল্যায়ন। প্রতিনিয়ত শ্রমিকের ঘাম, রক্ত, অশ্রু এবং কখনো কখনো প্রাণের বিনিময়ে দাঁড়িয়ে আছে এই শিল্পের তথাকথিত উন্নয়ন।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি এলাকায় অবস্থিত কালার অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড গার্মেন্টসে ২৪ জুন ২০২৬ (বুধবার) দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া লিজা বেগমের মৃত্যু সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতার আরেকটি বেদনাদায়ক উদাহরণ। এটি শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে অবহেলা, অমানবিকতা এবং দায়িত্বহীনতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বাসিন্দা, ৩৭ বছর বয়সী সুইং অপারেটর লিজা বেগম টানা দুই সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একাধিকবার ছুটির আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ তা মঞ্জুর করেনি। অসুস্থ শরীর নিয়েই তাকে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। অবশেষে গভীর রাতে কর্মস্থলেই তিনি অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। একজন শ্রমিকের জীবনের চেয়ে যদি উৎপাদনের লক্ষ্য, শিপমেন্ট কিংবা মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে সেটি কোনোভাবেই মানবিক বা সভ্য কর্মপরিবেশের পরিচয় হতে পারে না।

এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—গার্মেন্টস শিল্পে একজন শ্রমিক কি কেবল উৎপাদনের একটি যন্ত্র, নাকি তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্র, মালিক এবং প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব?

দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের বহু কারখানায় এখনো এমন একটি সংস্কৃতি বিদ্যমান, যেখানে অসুস্থ শ্রমিক ছুটি চাইলে তাকে নানা অজুহাতে নিরুৎসাহিত করা হয়, কখনো চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়, আবার কখনো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অজুহাতে কাজে বাধ্য করা হয়। ফলে শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতা আধুনিক শিল্পব্যবস্থার নয়; বরং এটি এক ধরনের আধুনিক দাসত্বের প্রতিফলন।

লিজা বেগমের মৃত্যুর পর সহকর্মী শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ প্রমাণ করে যে এই ক্ষোভ শুধুমাত্র একজন শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অবিচার, বৈষম্য এবং অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে জমে থাকা প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, লিজা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। যদি প্রমাণিত হয় যে অসুস্থতা সত্ত্বেও তাকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ছুটি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার, ব্যবস্থাপক এবং দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, লিজা বেগমের পরিবারকে সামান্য অনুদান দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। পরিবার যে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য, পর্যাপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, দেশের প্রতিটি তৈরি পোশাক কারখানায় অসুস্থতাজনিত ছুটিকে (Sick Leave) শ্রমিকের আইনি অধিকার হিসেবে কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কারখানায় সার্বক্ষণিক যোগ্য চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত মেডিকেল টিম, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসা-সুবিধা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চতুর্থত, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার অজুহাতে কোনো অসুস্থ শ্রমিককে জোরপূর্বক কাজ করানো, ছুটি প্রত্যাখ্যান করা অথবা চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়ার মতো অমানবিক চর্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে শ্রমিক কেবল উৎপাদনের মাধ্যম নন; তিনি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই শিল্পায়ন কিংবা উন্নয়নের দাবি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোনো জাতির জন্য গৌরবের বিষয় হতে পারে না।

লিজা বেগমের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই কার্যকর সংস্কার না আনা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বহু লিজা বেগম একই পরিণতির শিকার হবেন। তাই এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, বরং শ্রমিক অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে দেখতে হবে।

শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই শিপমেন্ট, উৎপাদন বা মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান হতে পারে না। এখনই সময় শ্রমিককে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং এমন একটি শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার, যেখানে আর কোনো শ্রমিককে অসুস্থ শরীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হবে না।

আর কোনো লিজা বেগমের জীবন এভাবে ঝরে পড়ুক—এটি কোনো সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। গার্মেন্টস কারখানায় মৃত্যুর এই মিছিল থামাতেই হবে। শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার এখনই সময়।

খাইরুল মামুন মিন্টু 

Wednesday, June 17, 2026

মানবিকতার প্রশ্নে সীমান্তে আটকে থাকা মানুষগুলো

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের কাছে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আসছে। যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা মানবিক সংকট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ তার সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় প্রদান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেক দেশ যখন দায়িত্ব নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন বাংলাদেশ মানবতার স্বার্থে সীমান্ত খুলে দিয়ে অসহায় মানুষগুলোর জীবন রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিল।

কিন্তু আজ আমাদের নিজেদের কিছু মানুষ সীমান্তের নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে জীবিকার সন্ধানে অবৈধ পথে ভারতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি বর্তমানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় আটকা পড়ে রয়েছেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিজ নিজ অবস্থানে থাকলেও এসব মানুষের মানবিক সংকট দিন দিন গভীরতর হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো—এই মানুষগুলো কার? তারা কি শুধুই অবৈধ অভিবাসী, নাকি তারা প্রথমত মানুষ? একজন মানুষের নাগরিকত্ব, আইনগত অবস্থান কিংবা তার ভুল সিদ্ধান্ত মানবিক আচরণের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও সভ্যতার মূল্যবোধ আমাদের শেখায় যে, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।

ভারত তার অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার। তবে সেই প্রক্রিয়া অবশ্যই দুই দেশের মধ্যে সমন্বয়, পরিচয় যাচাই এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পন্ন হওয়া উচিত। সীমান্তে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া বা এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়, তা কোনোভাবেই মানবিক আচরণের উদাহরণ হতে পারে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে এসব মানুষের পরিচয় দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক হন, তাহলে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানবিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নয়, সীমান্ত এলাকার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্ত এলাকায় রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন এবং উদ্বেগের মধ্যে দিন পার করছেন। এটি প্রমাণ করে যে বিষয়টি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি মানবিকতা, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেরও প্রশ্ন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। তাই সীমান্তে আটকে থাকা অসহায় মানুষগুলোর বিষয়ে দুই দেশের উচিত পারস্পরিক আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত একটি মানবিক সমাধানে পৌঁছানো। রাষ্ট্রের আইন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের জীবন ও মর্যাদা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যখন মানবিক বিশ্বের স্বপ্ন দেখি, তখন সেই মানবিকতার পরীক্ষা হয় সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় মানুষের প্রতি আমাদের আচরণে। সীমান্তের নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে আটকে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আজ সেই প্রশ্নই আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে—আমরা কি সত্যিই মানবিকতার পথে হাঁটছি, নাকি কেবল মানবিকতার কথা বলছি?

খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিক নেতা ও মানবাধিকারকর্মী


Wednesday, June 10, 2026

বাজেট কার জন্য—সরকারি কর্মচারীদের জন্য, নাকি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জন্য?

আগামী ১১ জুন ২০২৬ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে জানা গেছে, নতুন পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এবং আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর ৫০ শতাংশ সুবিধা পেতে শুরু করবেন। এর ফলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকায় উন্নীত হওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, দেশের প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারগুলোর জন্য এই বাজেটে কী আছে?

বাংলাদেশে শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ। পরিবারপ্রতি গড়ে দুইজন সদস্য হিসাব করলেও শ্রমিক পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ। দেশের শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, সেবা ও রপ্তানি খাতের সমগ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও শ্রমের ওপর। অথচ বাজেটের আলোচনায় তাদের অস্তিত্ব যেন ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, চামড়া খাত, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার অজুহাতে গণছাঁটাই করা হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েও প্রাপ্য পাওনা পাননি। নতুন চাকরি পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

বাজেটের আগে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আবারও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে—এই বিপুল সংখ্যক বেকার ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্রের কী পরিকল্পনা রয়েছে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাজেট আলোচনায় শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা বেকারত্ব ভাতার বিষয়গুলো এখনও প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছে। অথচ মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রা আজ চরম সংকটের মুখে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি সেই হারে বাড়ছে না।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বাস্তবসম্মত দাবি জানিয়ে আসছি— যেমন, দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গার্মেন্টস ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে শ্রমিক রেশন ব্যবস্থা চালু। 

শ্রমজীবী মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বিশেষ স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে শ্রমিক ও তাদের পরিবার ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত। 

কারখানা বন্ধ, মজুরি বকেয়া, গণছাঁটাই বা শিল্প সংকটের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য একটি স্থায়ী মজুরি সুরক্ষা তহবিল(Wage Protection Fund) গঠন।

বেকার শ্রমিকদের জন্য সীমিত পরিসরে হলেও বেকারত্ব ভাতা ও পুনঃকর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু।

জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষায় ব্যয় নিশ্চিত করা। 

বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনীতি শ্রমিকদের শ্রমে চলে, কিন্তু বাজেটের সুবিধা সবচেয়ে কম পৌঁছায় শ্রমিকদের কাছেই। সরকারি কর্মচারীদের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও শ্রমিকদের জন্য সমমানের সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। যদি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জীবন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথ গুরুত্ব না পায়, তাহলে এই বাজেটকে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শ্রমিকদের বাজেট বলা কঠিন হবে।

আমরা আশা করি সরকার বাজেট বাস্তবায়নের সময় শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। কারণ শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে, আর অর্থনীতি বাঁচলেই দেশ এগিয়ে যাবে।


খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক , বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে?

                        বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে? বাংলাদেশের শিল্প অর্থন...