বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (Ready-Made Garments-RMG) শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি। প্রতি বছর এই শিল্প থেকে কয়েক দশমিক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে এবং প্রায় ৪০ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক—যাদের অধিকাংশই নারী—তাদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের মাধ্যমে এই শিল্পকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক খাতে পরিণত করেছেন। অথচ এই শিল্পের প্রকৃত চালিকাশক্তি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। ওই বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনিকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে একাধিক বৈঠক, মতবিনিময় ও আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় এবং নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়।
কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯(৬) ধারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, কোনো শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত নিম্নতম মজুরির হার প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এই বিধানের উদ্দেশ্য হলো জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয়সহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরির সামঞ্জস্য বজায় রাখা।
একই সঙ্গে প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত, শুনানি ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করে নতুন মজুরির সুপারিশ চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।
এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডে নিয়োগপ্রাপ্ত মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি—উভয়েরই তিন বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত সর্বনিম্ন মজুরির গেজেটেরও তিন বছর পূর্ণ হবে ২০২৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর।
অর্থাৎ আইনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা অনুসারে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের পরই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে পরবর্তী মজুরি পুনর্নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল, যাতে ডিসেম্বরের আগেই আইনসম্মত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। এটি শুধু প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; বরং শ্রম আইনের উদ্দেশ্য ও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশে একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি যেন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শ্রমিকরা দীর্ঘদিন দাবি জানালেও তাতে কার্যকর সাড়া মেলে না। বরং শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয়, কারখানা বন্ধ হয়, সড়ক অবরোধ হয়, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে, মামলা-হামলা হয়, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। এরপরই কেবল সরকার ও মালিকপক্ষ নড়েচড়ে বসে। একটি আধুনিক ও আইনভিত্তিক রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি কখনোই কাম্য হতে পারে না।
আজকের বাস্তবতা আরও কঠিন। বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরি দিয়ে অধিকাংশ শ্রমিকের পক্ষে একটি পরিবারের এক মাসের ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, মাসের প্রথম ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অর্থ ফুরিয়ে যায়। এরপর ধার-দেনা, ঋণ কিংবা অতিরিক্ত ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করেই বাকি মাস কাটাতে হয়।
অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির কারণে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসা ও ওষুধের খরচও বহুগুণ বেড়েছে। ফলে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারছেন না। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
একজন অপুষ্ট, অসুস্থ ও মানসিক চাপে থাকা শ্রমিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। শিল্পের উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নত করতেই হবে। কারণ শ্রমিক সুস্থ থাকলে শিল্পও সুস্থ থাকবে; শ্রমিক নিরাপদ থাকলে উৎপাদনও টেকসই হবে।
বর্তমান বিশ্বে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও কেবল কম দামের পণ্য নয়; তারা শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।
আমরা বিশ্বাস করি, নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ কোনো রাজনৈতিক বা আন্দোলনের বিষয় হওয়া উচিত নয়; এটি একটি নিয়মিত, আইনসম্মত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। শ্রম আইনে যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই সময়সীমা মেনেই সরকারকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে এবং জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক পরিবারের মৌলিক চাহিদা, পুষ্টি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সঞ্চয় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
আমরা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাই—অবিলম্বে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বাস্তবসম্মত, ন্যায্য এবং বেঁচে থাকার উপযোগী নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করুন। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলে শিল্প শক্তিশালী হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আরও টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
লিখেছেন: খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা ও সমাজকর্মী






