Followers

Monday, February 23, 2026

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশ-এর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একাধিক কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা এখন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিকে বেশি নিবদ্ধ

অন্যদিকে শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প, বর্তমানে বড় ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, বৈদেশিক ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং ব্যাংকিং খাতের জটিলতা শিল্প পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। এই শ্রমিকদের অনেকেই বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের জন্য আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। কিন্তু তাদের দাবি আদায়ের পথও নিরাপদ ছিল নাহামলা, মামলা এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এতে শিল্প সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে

শিল্পখাতে এই অস্থিরতা শুধু শ্রমিক বা মালিকের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি

এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য কয়েকটি নীতিগত অগ্রাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখতে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ ও শ্রম অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন করাও সরকারের দায়িত্ব

সবশেষে বলা যায়, নতুন সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাদের সফলতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীলতাএই তিনটি ক্ষেত্রেই যদি কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়, তবে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই বর্তমান সময়টি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

KM Mintu 

Monday, February 16, 2026

নতুন সরকারের সামনে প্রধান দায়িত্ব

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা ও বড় চ্যালেঞ্জ—দুই-ই সামনে এনেছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ছাত্র-শ্রমিক জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। এর পর অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচনের পথ সুগম করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।

১৮ মাস পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের পক্ষ থেকে আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এই বিপুল সংসদীয় শক্তি নতুন সরকারের জন্য যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি জনগণের প্রত্যাশাও বহুগুণে বাড়িয়েছে।

গত ১৮ মাসে দেশের শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রায় চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান নেই, কারণ বন্ধ হওয়ার হার বাড়লেও নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার হার অত্যন্ত কম। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় উৎপাদন খাতেও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

অনেক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বকেয়া বেতন ও চাকরির নিরাপত্তার দাবিতে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। কিন্তু এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা কেবল ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—ভোগ কমছে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।

নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হবে শিল্পখাত পুনরুজ্জীবিত করা। বিশেষ করে—

বন্ধ কারখানা দ্রুত চালু করা বা পুনর্বিন্যাস করা

শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শিল্পনীতি বাস্তবায়ন করা

শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা

এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু শ্রমিকদের জীবনমানই উন্নত হবে না, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও গতি পাবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা—স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক সুযোগ। নতুন সরকারের হাতে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে শিল্পখাত পুনর্গঠন এবং শ্রমিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি শ্রমজীবী মানুষ। তাদের কর্মসংস্থান ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হবে। তাই সময়ের দাবি—দ্রুত, কার্যকর এবং শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণ।

KM Mintu 


Saturday, February 14, 2026

ধর্মপ্রাণ হলেও চরমপন্থী বা নারী-বিরোধী রাজনীতিকে সমর্থন করেনা।


বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আজকের বাংলাদেশ–এর অগ্রযাত্রায় নারীদের অবদান অনস্বীকার্য এবং বহুমাত্রিক।

দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে লেদার, টেক্সটাইল, স্বাস্থ্যসেবা, খুচরা ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই নারীরা সক্রিয়। শুধু বেসরকারি খাত নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেও নারীদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। যেমন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এসব প্রতিষ্ঠানে নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে। পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়নমূলক সংস্থাগুলোতেও নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠছেন।

তবে সমাজের আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। এখনো এমন একটি অংশ আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, ঘরের বাইরের জগতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এবং পরিবারে পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করেন। তাদের অনেকেই এই জীবনকেই স্বাভাবিক বা অনিবার্য বলে মনে করেন। এই সামাজিক বাস্তবতাকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংগঠন তাদের নিজস্ব মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ঘরে ঘরে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে এমন নারীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে এমন অভিযোগ ও আলোচনা জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও পরকালকেন্দ্রিক চিন্তার মাধ্যমে নারীদের সামাজিক ভূমিকা সীমিত রাখার ধারণা প্রচারের বিষয়টি নিয়ে সমাজে বিতর্কও কম নয়। কারণ, আধুনিক বাংলাদেশে নারীকে শুধু পরিবারকেন্দ্রিক নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের সমান অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে। ফলে নারী বিদ্বেষী বা নারীর ভূমিকা সংকুচিত করে এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষের বড় অংশ সহজে গ্রহণ করে না।

রাজনীতিতেও এই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল, বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে মৌলবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে জনগণ বারবার দেখিয়েছে তারা ধর্মপ্রাণ হলেও চরমপন্থী বা নারী-বিরোধী রাজনীতিকে সমর্থন করতে প্রস্তুত নয়। যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও, জনমতের বড় অংশ নারীসমতা ও সামাজিক অংশীদারিত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এমন মূল্যায়ন অনেক বিশ্লেষকের।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বাস্তববাদী, মানবিক এবং সামাজিক ভারসাম্যে বিশ্বাসী। তারা বোঝে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না।

আজকের বাংলাদেশে নারীরা শুধু পরিবার নয়, অর্থনীতি, প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছে। তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে এমন একটি সমাজ, যেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে দেশ গঠনের দায়িত্ব ভাগ করে নেবে। এটাই সময়ের দাবি, এটাই অগ্রগতির পথ।

KM Mintu 



Thursday, January 15, 2026

নিজস্ব জগৎ

 


নিজস্ব জগৎ

প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে
যেখানে ঢোকার চাবি
কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না।
সে জগৎ একান্ত, নীরব,
নিজের মতো করে গড়া।

তোমারও আছে তেমনই এক জগৎ,
হয়তো সেখানে
আমার কোনো ঠিকানা নেই,
আমার নাম উচ্চারিত হয় না
দৈনন্দিন প্রার্থনায়।

কিন্তু আমার যে নিজস্ব জগৎ
সে জগতে কেবল তুমি।
দিনের আলো, রাতের নিঃশব্দতা,
সব কিছুর মাঝখানে
একটাই মুখ।

তাই আমি দূরে থাকি
তোমার সেই নিজস্ব জগৎ থেকে,
জোর করে ঢুকে পড়ার অধিকার
আমি চাইনি কখনো।

যেদিন তুমি মন থেকে ডাকবে,
নিঃশব্দ কোনো মুহূর্তে,
নিজের অজান্তেই

সেদিন দেখবে,
আমি ঠিক সেখানেই।

কারণ আমি তো দূরে যাইনি,
আমি ছিলাম
সব সময়ই

ছায়ার মতো
নীরবে, অবিচল,
তোমার পাশেই।

KM Mintu

শ্রমিক সংগঠনে শ্রমিক নেতৃত্বের সংকট: প্রতিনিধিত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন

 

বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং সংগ্রামমুখর। এই ইতিহাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের পথে অসংখ্য আত্মত্যাগ ও লড়াই রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আজ অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনেই প্রকৃত শ্রমিকদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সংগঠনের নামে শ্রমিক আন্দোলন পরিচালিত হলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই সংগঠনগুলো শ্রমিকদের দ্বারা নয়, বরং শ্রমিকদের “নামে” পরিচালিত হচ্ছে।

অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বড় একটি অংশ কখনো শ্রমিক ছিলেন না, কিংবা শ্রমিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের নেই। ফলে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, কর্মস্থলের শোষণ, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনার বাস্তবতা তাদের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। যারা কখনো মজুরি বকেয়া থাকার যন্ত্রণা বোঝেননি, যাদের জীবন কাটেনি কারখানার গরমে, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রের পাশে কিংবা দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চাপে তারা শ্রমিকদের প্রকৃত কণ্ঠস্বর কতটা ধারণ করতে পারেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক সংগঠনে নেতৃত্বের পদগুলো কার্যত আজীবন পদে পরিণত হয়েছে। কিছু নেতা পৃথিবী থেকে বিদায় না নেওয়া পর্যন্ত পদ আঁকড়ে ধরে রাখেন। নিয়মিত সম্মেলন, নেতৃত্বের পরিবর্তন কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চা সেখানে অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের শ্রমিক নেতাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সংগঠনগুলো ক্রমেই স্থবির ও জনগণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলো পেশাদারিত্ব ও আদর্শিক সংগ্রামের বদলে ব্যক্তি স্বার্থ, ক্ষমতার রাজনীতি কিংবা দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে। এতে করে যোগ্য, সচেতন ও সংগ্রামী শ্রমিকরা নেতৃত্বে উঠে আসার সুযোগ পান না। সংগঠন পরিণত হয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত বলয়ে, যেখানে শ্রমিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ গুরুত্ব হারায়।

এই নেতৃত্ব সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব না থাকায় শ্রমিকদের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে, আন্দোলন হারায় বিশ্বাসযোগ্যতা ও গতি। শ্রমিকরা সংগঠনের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন, যা সামগ্রিকভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

শ্রমিক সংগঠনের শক্তি আসে শ্রমিকদের থেকেই এই সত্য ভুলে গেলে চলবে না। সংগঠনের নেতৃত্বে শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং নতুন নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা ছাড়া শ্রমিক আন্দোলনের নবজাগরণ সম্ভব নয়। প্রকৃত শ্রমিক নেতৃত্ব ছাড়া শ্রমিক সংগঠন কেবল নামেই শ্রমিকের বাস্তবে নয়।

শ্রমিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হলে এখনই প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ। নেতৃত্বে শ্রমিকদের ফেরানোই হতে পারে শ্রমিক সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও শক্তি পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত।

KM Mintu

Tuesday, January 13, 2026

প্রস্থান

 


প্রস্থান

প্রস্থান
আমি এই জীবন নামের নাটকের মঞ্চ থেকে প্রস্থান নিতে চাই।
যে মঞ্চে আমার উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি
কারও সংলাপ বদলায় না,
আলো বদলায় না,
শেষ দৃশ্যেও আমার নাম আসে না।

এই মঞ্চে আমি ছিলাম
একজন নীরব অভিনেতা

যার কণ্ঠ ঢেকে গেছে করতালির শব্দে,
যার চোখের জলকে বলা হয়েছে অভিনয়ের অংশ।
আমার ব্যথা ছিল অপ্রয়োজনীয়,
আমার স্বপ্ন ছিল অতিরিক্ত।

যেখানে গুরুত্ব মাপা হয় ক্ষমতায়,
মানুষ চেনা হয় প্রয়োজনে

সেখানে একজন গুরুত্বহীন অভিনেতার
আর কী প্রয়োজন থাকতে পারে?

তাই ক্লান্ত আমি।
সংলাপ বলতে বলতে ক্লান্ত,
নিজেকে প্রমাণ করতে করতে ক্লান্ত,
ভিড়ের মাঝেও অদৃশ্য হয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত।

এই প্রস্থান কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়,
এ এক দীর্ঘ নীরবতার ফল।
এ মঞ্চ ছাড়ার মানে হারিয়ে যাওয়া নয়

বরং নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়া,
যেখানে এখনো
আমার অস্তিত্বের কিছু মূল্য আছে।

আজ আমি করতালি চাই না,
চাই না আলো।
শুধু একটু নীরবতা চাই

যেখানে আমি আবার মানুষ হতে পারি,
অভিনেতা নয়।

KM Mintu

ইরান: পতনের দ্বারপ্রান্তে নয়, বরং ‘গ্রে সিকিউরিটি’ কৌশলের কেন্দ্রে

 

পশ্চিমা রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের আলোচনায় ইরানের শাসনব্যবস্থা প্রায়শই এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যেন দেশটি অবশ্যম্ভাবীভাবে পতনের পথে হাঁটছে। কিন্তু এই মূল্যায়নের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও কৌশলগত মহলের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলো মিলিয়ে পড়লে এক ভিন্ন ও অধিক জটিল বাস্তবতা সামনে আসে। বাস্তবতা হলোইরান বর্তমানে পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, আবার তাৎক্ষণিক পতনের দিকেও এগোচ্ছে না। এই মধ্যবর্তী অবস্থা তেহরানকে একটি নিরাপত্তা ধূসর অঞ্চল বা গ্রে সিকিউরিটি জোন’-এ নিয়ে এসেছে, যা ইসরায়েলের মতো প্রতিপক্ষের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।

এই ধূসর অবস্থাই ইরানের জন্য এক অনন্য কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। সেই সম্পদের নামসময়

তেল আবিবের চোখে হুমকি: কেন সময়ই ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (INSS) তাদের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ইরানকে যেন আগের অবস্থায়বিশেষ করে পারমাণবিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেফিরে যেতে না দেওয়া হয়। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হলো বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা, যেখানে কোনো কার্যকর চুক্তি নেই, আবার পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতও নেই।

এই শূন্যতার সুযোগে ইরান আন্তর্জাতিক নজরদারি দুর্বল হওয়ার সুবিধা নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন, সরবরাহ লাইন মেরামত, উন্নত সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার পুনরায় সাজানোর মতো কাজগুলো এই সময়েই সবচেয়ে সহজে করা যায়।

প্রচলিত সামরিক যুক্তি অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে আগাম আঘাত হানা বা সর্বোচ্চ সামরিক চাপ প্রয়োগ করাই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা সেই হিসাবকে জটিল করে তুলেছে।

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও শাসনব্যবস্থার বাস্তব শক্তি

আইএনএসএসের নিজস্ব বিশ্লেষণেই স্বীকার করা হয়েছে যে, ইরানের শাসনব্যবস্থার সামাজিক বৈধতা আগের তুলনায় ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ক্ষমতার কাঠামো এখনো অটুটনিরাপত্তা বাহিনী, বিপ্লবী গার্ড (IRGC), বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ এখনো শাসকগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত।

ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরানের রাজপথের অস্থিরতা paradoxically একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। প্রখ্যাত বিশ্লেষক রন বেন ইশাইয়ের মতে, বিক্ষোভগুলো বিচ্ছিন্ন, নেতৃত্বহীন এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা উল্টে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে না। ফলে কোনো বড় বিদেশি হামলা হলে এই বিক্ষোভগুলো সরকারবিরোধী শক্তি হিসেবে নয়, বরং “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

বিদেশি হামলা ও জাতীয়তাবাদ: ইতিহাসের সতর্ক সংকেত

ইরানইরাক যুদ্ধের (১৯৮০৮৮) অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বড় ধরনের বিদেশি আগ্রাসন ইরানের ভেতরে জাতীয়তাবাদী আবেগকে তীব্রভাবে উসকে দিতে পারে। দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টসহ একাধিক কৌশলগত সাময়িকী সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েলি বা পশ্চিমা সামরিক হামলা বিক্ষোভের গতিপথ উল্টে দিতে পারে।

বিভাজন আরও গভীর হওয়ার বদলে, সরকার তখন সব ধরনের ভিন্নমতকে “বিদেশি ষড়যন্ত্র” হিসেবে চিহ্নিত করে দমন করার রাজনৈতিক ও নৈতিক অজুহাত পাবে। এতে শাসনব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার বদলে সাময়িকভাবে আরও সংহত হতে পারেযা ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্যবিরোধী।

ইসরায়েলের কৌশলগত দোটানা

এই বাস্তবতায় তেল আবিব এক গভীর কৌশলগত সংকটে আটকে গেছে।

  • হামলা করলে: ইরানের শাসনব্যবস্থাকে অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
  • হামলা না করলে: ইরান সময় পায়পুনর্গঠন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব শক্ত করার জন্য।

এই দ্বিধাই ইরানের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তেহরান কার্যত নিষ্ক্রিয়তার ভার নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে ইসরায়েলের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে ইসরায়েল ছিল সর্বক্ষণ উদ্যোগী ও আক্রমণাত্মক অবস্থানে, এখন তারা পড়ে আছে কৌশলগত বিভ্রান্তিতে।

অস্থিরতা, বয়ান ও আগাম বৈধতা নির্মাণ

ইরানি কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য মোসাদের ষড়যন্ত্রকে দায়ী করেন। এই বক্তব্যের একটি দ্বিমুখী কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে।

দেশের ভেতরে এটি বিক্ষোভকে অবৈধ ও বিদেশি প্রভাবিত বলে চিহ্নিত করে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আগাম বা পাল্টা হামলার জন্য বয়ানগত বৈধতা তৈরি করে।

অস্থিরতাকে বাইরের আগ্রাসনের ফল হিসেবে উপস্থাপন করে তেহরান যেকোনো সরাসরি বা প্রক্সি আঘাতকে জাতীয় আত্মরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার ভিত্তি গড়ে তোলে।

অসম পুনর্গঠন ও কৌশলগত ধৈর্য

আইএনএসএসের আঞ্চলিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে অসম পুনর্গঠনের কৌশল অনুসরণ করছে। হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য প্রক্সি শক্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও, তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার, ড্রোন সক্ষমতা এবং পারমাণবিক সীমারেখা বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

কম তীব্রতার বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা নজরদারিকে রাস্তায় ব্যস্ত রাখে। সেই আড়ালে ইরানি প্রযুক্তিবিদেরা সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন, সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়ন এবং রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করার কাজ চালিয়ে যানযা সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব হতো।

যুদ্ধ নয়, ঝুঁকির ভারসাম্য

তেল আবিব ও ওয়াশিংটনে প্রস্তুত কৌশলগত নথিগুলো পর্যালোচনা করলে একটি সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এখন আর শুধু শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, বরং ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সমীকরণে সময় তৈরির একটি কার্যকর উপাদান

ইসরায়েল ইরানের সক্ষমতা ক্ষয় করতে চায়, কিন্তু সামরিক পদক্ষেপের অনিচ্ছাকৃত পরিণতি তাদের থামিয়ে রাখছে। এই সুযোগ বুঝেই তেহরান ধূসর এই পরিসরকে ব্যবহার করছেশুধু টিকে থাকার জন্য নয়, বরং সংঘাতের মনস্তাত্ত্বিক গতিপথ উল্টে দেওয়ার জন্য।

ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ এখন আর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়; এটি এমন এক সম্ভাবনায় রূপ নিয়েছে, যেখানে ঝুঁকির ভার ইসরায়েলের পক্ষেই সবচেয়ে বেশি।

KM Mintu

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশ - এর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনে একক সংখ্...