বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে ঘিরে বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী চিত্র সামনে এসেছে। একদিকে পোশাক রপ্তানি বাড়ছে, বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা ও ক্রেতাদের আস্থা থাকার কথা বলা হচ্ছে; অন্যদিকে একই সময়ে একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন এবং শিল্পের মালিকরা উৎপাদন ব্যয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকঋণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরছেন।
এই বাস্তবতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—যদি পোশাক শিল্পের রপ্তানি বাড়তে পারে, নতুন কারখানায় বিপুল শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, তাহলে পুরোনো শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করতে এত সংকট কোথায়?
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময় টিভির এক সাক্ষাৎকারে বিজিএমইএ সভাপতি যে তথ্য দিয়েছেন, তা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৩১টি ওভেন পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং এতে ১৬ হাজার ৭৩৯ জন শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। একই সময়ে নতুন ৫৩টি কারখানায় ৮০ হাজার থেকে ৮২ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ৩৬টি নিট পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ায় ১৭ হাজার ১৫৫ জন শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বিপরীতে নতুন ৫৩টি কারখানায় ৪৬ হাজার ৩৮৪ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ, মালিক সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্যেই দেখা যাচ্ছে—শিল্পে একদিকে কারখানা বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে। ফলে শুধু ‘শিল্প সংকটে আছে’—এই একমাত্রিক ব্যাখ্যা দিয়ে শ্রমিকের মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না।
রপ্তানি বাড়ছে—তাহলে সংকটের প্রকৃত চিত্র কী?
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস—জুলাই ও আগস্টে—বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৭১৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ।
শুধু দুই মাসের হিসাবেই নয়, আগস্ট মাসের বছরভিত্তিক তুলনাতেও প্রবৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ৩১৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩৬১ কোটি ডলার—প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।
উপখাতভিত্তিক হিসাবেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৬ সালের আগস্টে নিটওয়্যার রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২০৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলার, প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ।
অর্থাৎ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা একেবারে ভেঙে পড়েছে—এমন কথা বলা কঠিন। বরং রপ্তানি তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক এখনও প্রতিযোগিতা করছে এবং ক্রেতাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করছে। এখানেই শ্রমিকদের প্রশ্নটি সামনে আসে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট আছে, কিন্তু রপ্তানিও বাড়ছে
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের বক্তব্য অনুযায়ী, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের অনেক পোশাক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে, কোথাও দিনের কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে স্থানীয় বস্ত্রকলগুলোর উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সময়মতো পোশাক উৎপাদন ও বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া নিয়ে তৈরি হচ্ছে চাপ।
বিকেএমইএর নিজস্ব নথিতেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া বা বন্ধ থাকার বিষয়ে সদস্য কারখানাগুলোর কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
আবার আগস্টে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে। একই মাসে মোট পণ্য রপ্তানিও বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।
তাহলে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে—উৎপাদন যদি সংকটে থাকে, তাহলে রপ্তানি বাড়ছে কীভাবে?
এর উত্তর হয়তো শিল্পের জটিল বাস্তবতার মধ্যেই রয়েছে। রপ্তানি পরিসংখ্যান এক মাস বা দুই মাসে শিল্পের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি প্রকাশ করে না। আগের অর্ডার, মজুত পণ্য, উৎপাদন সক্ষমতার পুনর্বণ্টন, দক্ষতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পণ্য, ক্রয়াদেশের সময়সূচি—এসব কারণ রপ্তানি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটও বাস্তব সমস্যা হতে পারে।
কিন্তু এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—শিল্পের সংকট থাকলেও তার পুরো বোঝা শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মজুরি বৃদ্ধির সময় এলেই কেন শুধু সংকটের গল্প?
আমার দীর্ঘ শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রশ্ন সামনে এলেই মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে নানা ধরনের সংকটের কথা সামনে আসে। কখনো বলা হয় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কখনো আন্তর্জাতিক বাজার খারাপ, কখনো অর্ডার কম, কখনো গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কখনো ব্যাংকঋণের সমস্যা।
এই সমস্যাগুলো বাস্তব হলে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—তিন পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করতে হবে। কিন্তু শিল্পের প্রতিটি সমস্যার সমাধান যদি শ্রমিকের মজুরি না বাড়ানোর মধ্যে খোঁজা হয়, তাহলে তা কোনো টেকসই শিল্পনীতি হতে পারে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কারখানার মালিকের উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে শ্রমিকের মজুরি যেমন একটি ব্যয়, তেমনি শ্রমিকের শ্রমই সেই উৎপাদনের প্রধান ভিত্তি। শ্রমিককে বাদ দিয়ে পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি কল্পনা করা সম্ভব নয়।
তিন বছর পর মজুরি পুনর্নির্ধারণ—আইন মানা হবে কবে?
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধানে ন্যূনতম মজুরি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণের বিধান যুক্ত হয়েছে। ধারা ১৩৯(৬)-এর এই পরিবর্তনের ফলে ন্যূনতম মজুরি নিয়মিত পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি আরও স্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে এসেছে।
২০১৮ সালের পোশাক শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে নতুন মজুরি নির্ধারণ করা হয়। ফলে ২০২৬ সালে নতুন করে মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইনে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। আইনের কাঠামো অনুযায়ী, সরকার নির্দেশ দিলে মজুরি বোর্ডকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুপারিশ দিতে হয়। একই সঙ্গে মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, জীবনযাত্রার মান, উৎপাদন ব্যয়, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের মূল্য, মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির মতো বিষয় বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
অতএব, মজুরি নির্ধারণের আলোচনায় শুধু মালিকের উৎপাদন ব্যয় দেখলে হবে না; শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
১২ হাজার ৫০০ টাকায় একটি পরিবার চলে কীভাবে?
২০২৩ সালে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষা ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
একজন শ্রমিককে শুধু নিজের খাবারের হিসাব করলেই তো হবে না। তার সঙ্গে রয়েছে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত, চিকিৎসা ও ওষুধ, সন্তানের শিক্ষা, পোশাক, দৈনন্দিন প্রয়োজন এবং হঠাৎ কোনো জরুরি ব্যয়।
অনেক শ্রমিকের অভিজ্ঞতা হলো—মাসের প্রথম ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অর্থের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় ধার-দেনা, ক্ষুদ্রঋণ, দোকানে বাকিতে কেনাকাটা অথবা অতিরিক্ত ওভারটাইমের ওপর নির্ভরতা।
এভাবে একটি শ্রমিক পরিবার মাসের পর মাস টিকে থাকতে পারে, কিন্তু এভাবে একটি শিল্প টেকসই হতে পারে না।ক্ষুধার্ত শ্রমিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা আশা করা যায় না
পোশাক শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো শ্রমিক। একটি আধুনিক মেশিন কয়েক কোটি টাকা দিয়ে কেনা যায়, কিন্তু দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সুস্থ শ্রমিক তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে।
একজন শ্রমিক যদি পর্যাপ্ত খাবার না পান, চিকিৎসা করাতে না পারেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন এবং মাসের শেষে ঋণের বোঝা নিয়ে মানসিক চাপে থাকেন, তাহলে তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
শ্রমিকের অপুষ্টি শুধু শ্রমিকের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি শিল্পের উৎপাদনশীলতার সমস্যাও।
একজন সুস্থ শ্রমিক বেশি মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারেন। নিরাপদ কর্মপরিবেশে থাকা শ্রমিক কম দুর্ঘটনার শিকার হন। ন্যায্য মজুরি পাওয়া শ্রমিকের কর্মস্থলে স্থায়িত্ব ও মনোবল বাড়ে। দক্ষ শ্রমিককে ধরে রাখা যায়। উৎপাদনের গুণগত মানও উন্নত হয়।
সুতরাং শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোকে শুধু ‘ব্যয় বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। ন্যায্য মজুরি আসলে শিল্পের উৎপাদনশীলতায় বিনিয়োগ।
নতুন কারখানায় কর্মসংস্থান হচ্ছে—এটি আশাব্যঞ্জক, কিন্তু পুরোনো শ্রমিকদের কী হবে?
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বন্ধ হওয়া কারখানার বিপরীতে নতুন কারখানায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
কিন্তু এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের কতজন নতুন কারখানায় চাকরি পেয়েছেন?
একজন শ্রমিকের কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু তাঁর চাকরিটিই হারায় না; তাঁর পরিবারের আয়, সন্তানের শিক্ষা, বাসাভাড়া, খাদ্যনিরাপত্তা—সবকিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। নতুন কারখানায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া ভালো, কিন্তু পুরোনো শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, পাওনা পরিশোধ, পুনর্বাসন এবং পুনঃনিয়োগের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
কারখানা বন্ধ এবং নতুন কারখানা খোলার হিসাব দিয়ে শ্রমিকের বাস্তব জীবনকে বিচার করা যায় না।
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা মানে শ্রমিকের মজুরি কম রাখা নয়
পোশাক মালিকদের একটি সাধারণ যুক্তি হলো—আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র। বাংলাদেশের পোশাকের দাম বেশি হলে ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যেতে পারেন।
এই যুক্তির বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একমাত্র উপায় শ্রমিকের কম মজুরি।
বিশ্বের ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলো এখন ক্রমশ শ্রমিকের অধিকার, মানবাধিকার, কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এসব বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তাই ‘কম মজুরি মানেই বেশি প্রতিযোগিতা’—এই পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ভিত্তি হওয়া উচিত দক্ষতা, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, দ্রুত ডেলিভারি, মানসম্মত উৎপাদন এবং একই সঙ্গে শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার।
শ্রমিকের মজুরি বাড়লে অর্থনীতিও লাভবান হবে
গার্মেন্টস শ্রমিকরা যে অর্থ উপার্জন করেন, তার বড় অংশই দেশে ব্যয় করেন। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে এই অর্থ ব্যয় হয়।
অর্থাৎ শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি শুধু একজন শ্রমিকের আয় বাড়ায় না; এটি স্থানীয় বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতকে সচল রাখে এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ায়।
তাই ন্যায্য মজুরি অর্থনীতির জন্য বোঝা নয়; বরং অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করার অন্যতম উপায়।
শিল্প রক্ষার নামে শ্রমিকের অধিকার খর্ব করা যাবে না
আমরা চাই পোশাক শিল্প টিকে থাকুক, আরও বড় হোক এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হোক। কিন্তু সেই শিল্প যদি শ্রমিকের অস্বাভাবিক কম মজুরি, অনিরাপদ জীবন, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং অধিকারহীনতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
শিল্পের সংকট থাকলে সরকারকে তার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে। শিল্পের জন্য ন্যায্য আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত সুবিধা দিতে হবে। প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ শিল্প বাঁচানোর নামে শ্রমিককে বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কোনো সমাধান নয়।
এখনই মজুরি বোর্ড গঠন জরুরি
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব হলো দ্রুত পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা এবং বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা।
মজুরি নির্ধারণের সময় শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যয় নয়, শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়কে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় আনতে হবে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত, পোশাক এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের বাস্তব ব্যয় বিবেচনা করেই একটি মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির যে দাবি উত্থাপিত হয়েছে, সেটিও বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় ও শ্রমিক পরিবারের প্রয়োজনের আলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
শেষ কথা
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নিয়ে আজ দুটি ছবি পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে।
একটি ছবিতে কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং মালিকরা নানা সংকটের কথা বলছেন।
অন্য ছবিতে দেখা যাচ্ছে—নতুন কারখানা হচ্ছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, পোশাক রপ্তানি আবারও প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে।
এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাই কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়। বরং প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট—
যদি রপ্তানি বাড়ে, যদি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যদি আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাক কিনতে থাকে, তাহলে যে শ্রমিকের ঘাম ও শ্রমে এই রপ্তানি আয় সৃষ্টি হচ্ছে, তাঁর জীবনযাত্রার ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপত্তি কোথায়?
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করতে হবে, ব্যাংকিং সংকটের সমাধান করতে হবে, শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, নতুন বিনিয়োগ আনতে হবে—এসবই জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরিও বাড়াতে হবে।
কারণ শ্রমিক কোনো খরচের খাত নয়—শ্রমিকই উৎপাদনের প্রধান শক্তি।
শ্রমিকের জীবনমান উন্নত হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। শ্রমিক নিরাপদ থাকলে উৎপাদন টেকসই হবে। শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পেলে শিল্পে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিক ধরে রাখা সহজ হবে। আর শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।
সুতরাং এখন সময় এসেছে সংকটের অজুহাত দেখিয়ে মজুরি বৃদ্ধির প্রশ্নকে পিছিয়ে না দিয়ে আইনের বিধান অনুযায়ী দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন, বাস্তবসম্মত ও জীবনধারণযোগ্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার।
শিল্পকে বাঁচাতে হলে শ্রমিককে বাঁচাতে হবে। আর শ্রমিককে বাঁচাতে হলে ন্যায্য মজুরির কোনো বিকল্প নেই।
লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র




