Followers

Monday, November 17, 2025

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মামলা ও জন-আস্থার সংকট: রায়ের স্থায়িত্ব নির্ধারণে 'স্থান, কাল, পাত্র'-এর প্রভাব

 

সাম্প্রতিককালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার মতো একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী রায়ের পরও সাধারণ জনগণের মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিক্রিয়া বা আগ্রহের অভাব দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের এক গভীর ও অস্বস্তিকর দিক তুলে ধরে। এই নীরবতা নিছক ঔদাসীন্য নয়; এটি এক ধরনের অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধি, যার সারকথা হলো: এই ধরনের রাজনৈতিক মামলার শাস্তি বা রায়ের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ভর করে ‘স্থান, কাল ও পাত্র’অর্থাৎ রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের ওপর। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মামলার নজির এবং জন-আস্থার সংকটের কারণ বিশ্লেষণ করা হবে।

রাজনৈতিক বিচার: ক্ষমতার হাতবদলে রায়ের ভাগ্যবদল

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়াকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। শীর্ষস্থানীয় নেতারাযেমন শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং সাম্প্রতিককালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসকলেই তাদের প্রতিপক্ষের ক্ষমতা আমলে বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন এবং সাজার রায় পেয়েছেন।

এই রায়ের তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো এর অস্থিরতা (Instability)। যখনই ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, নতুন সরকার এসেই পূর্বেকার সাজা ও মামলার গতিপথ বদলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বহু মামলা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাতিল বা স্থগিত হয়ে যায়। একইভাবে, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের বহু মামলার একই পরিণতি দেখা যায়। তারেক রহমানের অর্থ পাচার মামলায় প্রাথমিক রায়ে খালাস এবং পরবর্তীতে আপিল বিভাগে সাজার রায়, অথবা বেগম খালেদা জিয়ার এতিমখানা ট্রাস্ট মামলার সাজার দীর্ঘসূত্রতাএগুলো সবই প্রমাণ করে যে, বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি প্রায়শই আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল

জন-আগ্রহের অভাব: সংশয় ও হতাশায় নিমজ্জিত আস্থা

বারবার এই দৃশ্যপট দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর সংশয় ও হতাশা জন্ম নিয়েছে। এ কারণেই বড় বড় রাজনৈতিক রায়ের ঘোষণায় জনমনে তেমন কোনো গভীর প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। এর মূল কারণগুলি নিম্নরূপ:

  • ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা: জনগণ নিশ্চিত যে, বর্তমান রায় বা সাজার স্থায়িত্ব বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। সরকার পরিবর্তন হলে এই রায় বাতিল বা খারিজ হয়ে যেতে পারে। যে রায় কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তা নিয়ে তাৎক্ষণিক আগ্রহ দেখানো যৌক্তিক নয়।
  • বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস: যখন বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে দেখা যায়, তখন তা আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। মানুষ প্রশ্ন তোলেমামলার বিচার কি সত্যিই অপরাধের বিচার, নাকি এটি ক্ষমতা ধরে রাখা বা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার একটি কৌশল?
  • গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রভাব: সুস্থ গণতন্ত্রে আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু যখন দেখা যায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে 'বিচার' কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তখন সাধারণ মানুষ এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মূলত ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত হয়েছিল। এই ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক সম্প্রসারিত পরিধি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার বিষয়টি নিঃসন্দেহে বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংবেদনশীল।

তবে জনগণের মানসে এই রায়ও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক মামলার ফ্রেমওয়ার্কে পড়েছে, যেখানে রায়ের ভাগ্য 'স্থান, কাল ও পাত্র' দ্বারা নির্ধারিত হয়। যদিও আইসিটি-র প্রতিষ্ঠার পেছনে ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু এর সাম্প্রতিক রায়কে অনেকে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে ট্রাইব্যুনালের আইনি সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীন অস্তিত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

আস্থার পুনরুদ্ধারে করণীয়

রাজনৈতিক মামলার রায় নিয়ে জন-আগ্রহের এই অভাব এবং নীরবতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। বিচার বিভাগ যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হতে পারে এবং যদি রায়ের স্থায়িত্ব 'স্থান, কাল, পাত্র'-এর ওপর নির্ভর করে, তবে আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন:

বিচার বিভাগের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে আইনি প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে না।

জনগণের মধ্যে এই আস্থা সৃষ্টি করা যে, বিচারের রায় চূড়ান্ত এবং তা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যাবে না।

যতদিন পর্যন্ত না বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত থেকে মুক্ত হয়ে স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতা অর্জন করবে, ততদিন পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক মামলার রায়গুলো কেবল সাময়িক শিরোনাম সৃষ্টি করবে, কিন্তু জনসাধারণের মনে স্থায়ী কোনো বিশ্বাস বা প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে ব্যর্থ হবে।

KM Mintu

No comments:

Post a Comment

নিজস্ব জগৎ

  নিজস্ব জগৎ প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে — যেখানে ঢোকার চাবি কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না। সে জগৎ একান্ত , নীরব , নিজের ম...