জীবনে সুখী হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি মানুষের সহজাত। কিন্তু আমরা প্রায়শই সুখকে খুঁজে বেড়াই এমন কিছুর মধ্যে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আপনার কথাতেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য— জীবনে যা হতে চলেছে, তা যেহেতু আমরা জানি না, যা হবার তা হবেই, আপনি তা থামাতে পারবেন না। আর এই অনিবার্যকে থামানোর বা পাল্টে দেওয়ার বৃথা চেষ্টাই আমাদের জীবনে কষ্ট নিয়ে আসে।
১.
নিয়ন্ত্রণের মোহ এবং তার মূল্য
আমাদের মন সব
সময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিজেদের ইচ্ছামতো সাজাতে চায়। ভবিষ্যতের
অনিশ্চয়তা আমাদের মনে ভয় আর উদ্বেগের জন্ম দেয়। আমরা ভুলে যাই যে, জীবনের
বেশিরভাগ ঘটনাই আমাদের ব্যক্তিগত চেষ্টার বাইরে এক বৃহত্তর নিয়মের অধীন। আবহাওয়া
কেমন হবে, অন্য একজন মানুষ কী ভাববে, বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা কখন ঘটবে—এই সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা
আমাদের নেই।
তবুও, আমরা
সেই নিয়ন্ত্রণের মোহ ত্যাগ করতে পারি না। যখন জীবন আমাদের ছক ভেঙে অন্য পথে
হাঁটে, তখনই আমরা হতাশ হই, ক্ষুব্ধ হই এবং নিজেদের অসুখী মনে করি। এই প্রতিরোধই
হলো কষ্টের মূল কারণ। যা আমাদের জীবনে একটু পর ঘটতে চলেছে, তা যদি আমরা সহজে মেনে
নিতে পারতাম, তবে অনেক মানসিক চাপ আপনা থেকেই দূর হয়ে যেত।
২.
নিজেকে "যা হতে চাই" তাই হতে দিন
সুখী হওয়ার
প্রথম শর্ত হলো নিজের ভেতরের সত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। আপনার জীবন আপনার
ইচ্ছানুসারে যেভাবে বিকশিত হতে চাইছে, তাকে সেই পথে চলতে দিন। এর অর্থ এই নয় যে
আপনি চেষ্টা করা বা পরিকল্পনা করা বন্ধ করে দেবেন। বরং, এর অর্থ হলো আপনি
প্রচেষ্টা করবেন, কিন্তু ফলাফলের ভার মহাকালের হাতে ছেড়ে দেবেন।
যখন আপনি
নিজেকে বিচার করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বা সমাজের চাপিয়ে দেওয়া আদর্শের পথে
চলতে বাধ্য করা বন্ধ করেন, তখনই আপনার ভেতরের "যা হতে চাই" তা প্রকাশ
পেতে শুরু করে। এই স্বতঃস্ফূর্ততা এবং নিজস্ব পথে এগিয়ে চলার স্বাধীনতাতেই লুকিয়ে
আছে সত্যিকারের শান্তি।
৩.
স্বীকৃতির (Acceptance)
শক্তি
'যা হবার তা
হবেই'—এই ভাবনাটি
আসলে এক ধরনের গভীর স্বীকৃতি (Acceptance)। এটি
কোনো হতাশা বা নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং এটি জীবনের অনিবার্য সত্যকে মেনে নিয়ে
এগিয়ে যাওয়ার সাহস। এর মানে হলো:
- বর্তমানের প্রতি মনোযোগ: যা ঘটতে চলেছে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, আপনি আপনার
বর্তমান কাজটি পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে করতে পারছেন।
- মানসিক স্বাধীনতা: আপনি অনিয়ন্ত্রিত ঘটনার ভার মন থেকে নামিয়ে ফেলছেন এবং
একটি হালকা, চাপমুক্ত জীবন যাপন করতে পারছেন।
- পরিবর্তনের প্রতি নমনীয়তা: যখন কোনো অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে, তখন তাকে প্রতিরোধ
না করে, তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার শক্তি খুঁজে পাচ্ছেন।
জীবনের
প্রতিটি মুহূর্তকে তার নিজস্ব রূপে মেনে নেওয়ার এই ক্ষমতাই হলো প্রকৃত সুখের
চাবিকাঠি। যখন আপনি জানেন যে, আপনার সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও যদি কোনো কিছু না ঘটে,
তবে তা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল—তখন
আর নিজেকে দোষারোপ করার বা কষ্ট পাওয়ার প্রয়োজন থাকে না।
সহজ
হও, সুখী হও
জীবনকে তার
আপন গতিতে বইতে দিন। যা আপনি পারেন, তা করুন। আর যা পারেন না, তা প্রকৃতির হাতে
ছেড়ে দিন। আপনার জীবনে যা হতে যাচ্ছে, তা যদি আপনি থামানোর চেষ্টা না করে বরং বরণ
করে নেন, তবে সেই সহজ জীবনযাত্রাই আপনাকে এনে দেবে অনাবিল সুখ।
জীবনকে সহজ
করুন। যা হবার তা হবেই—এই সত্যকে
বুকে ধারণ করে নিজের মতো করে বাঁচুন। সুখ আসলে বাইরের কোনো অর্জন নয়, এটি
জীবনকে তার সমস্ত অনিশ্চয়তা সহকারে মেনে নেওয়ার একটি অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত।
.jpg)
No comments:
Post a Comment