Followers

Friday, October 24, 2025

প্রতিবিম্বের মায়াজাল

 

শুভ্র যখন তিথিকে প্রথম দেখেছিল, তখন তার মনে হয়েছিল যেন সে এক অপ্সরীকে দেখছেগ্রীক পুরাণের নার্সিসাসের মতোই অনিন্দ্যসুন্দরী এবং মনোমুগ্ধকর। তিথির ব্যক্তিত্বে ছিল এক প্রবল আকর্ষণ, এক তেজস্বী আভা। প্রথমদিকে শুভ্র মুগ্ধ হয়েছিল তার অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস এবং জীবনের প্রতি তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখে।

তিথি সব সময় বলত যে সে অন্য সবার চেয়ে আলাদা এবং তার ভাগ্য শ্রেষ্ঠত্বের জন্য লেখা হয়েছে। সে ঘন্টার পর ঘন্টা নিজের সাফল্য এবং ভবিষ্যতের অসীম ক্ষমতা, সৌন্দর্য ও সাফল্যের কাল্পনিক গল্প শোনাত, আর শুভ্র মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। তার প্রতিটি কথোপকথনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সে নিজেতার নতুন ডিজাইনার পোশাক, তার উচ্চ-পদস্থ পরিচিতি, অথবা যেকোনো ছোট অর্জনকে অতিরঞ্জিত করে বলা।

সময়ের সাথে সাথে, শুভ্র বুঝতে পারল যে তিথির এই ঔজ্জ্বল্য কেবলই তার নিজের প্রতিবিম্বের আলো

তিথি দাবি করত যে শুভ্রকে সব সময় তার প্রশংসা করতে হবে। কোনো কারণে শুভ্র তার মনোযোগ অন্য দিকে সরালেই তিথি অসন্তুষ্ট হয়ে উঠত। সে আশা করত যে শুভ্র সর্বদা তার অহংকে পুষ্ট করার জন্য প্রস্তুত থাকবে।

শুভ্র যখনই কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা বা মানসিক কষ্ট নিয়ে তার সাথে কথা বলতে যেত, তিথি দ্রুতই আলোচনাটিকে ঘুরিয়ে নিজের কোনো প্রয়োজন বা অসুবিধার দিকে নিয়ে যেত, যা ছিল তার সহানুভূতির অভাবের সুস্পষ্ট লক্ষণ। একবার শুভ্রর কাজের চাপ নিয়ে সে উদ্বিগ্ন হলে, তিথি তার উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে অভিযোগ করেছিল যে শুভ্র মনোযোগ না দেওয়ায় তার দিনটি নষ্ট হচ্ছে।

তিথি আশা করত যে শুভ্র সব সময় তার ইচ্ছামতো কাজ করবে। তার কাছে, শুভ্র ছিল একটি সম্পদ, যাকে ব্যবহার করে সে নিজের সামাজিক অবস্থান আরও দৃঢ় করবে। কোনো সুবিধা নিতে তিথি শুভ্রকে ব্যবহার করত। শুভ্রর কোনো সাফল্যে সে খুশি না হয়ে বরং ঈর্ষান্বিত হতো এবং তিরস্কারের মাধ্যমে শুভ্রর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করার চেষ্টা করত।

মাস গড়াতে থাকে, আর তিথির আচরণ আরও নিয়ন্ত্রণমূলক ও শোষণমূলক হয়ে ওঠে। সে শুভ্রকে বোঝাতে শুরু করে যে শুভ্র তার মতো বিশেষ কারো যোগ্যই না, তিথি তার জীবনে না থাকলে শুভ্রর কোনো মূল্য নেই।

একদিন শুভ্র আয়নায় তিথিকে নয়, বরং নিজেকে দেখতে পেল। তিথির আত্মপ্রেমের ফাঁদে পড়ে শুভ্র তার নিজস্বতা, আত্মবিশ্বাস আর সুখ সব হারিয়ে ফেলেছে। সে অনুভব করল যে তিথির জগতের প্রতিটি মানুষ কেবল তার নিজের মহত্ত্বের প্রতিধ্বনি (Echo) মাত্র, যার নিজস্ব কোনো স্বর নেই।

শুভ্র অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল। সে বুঝতে পারল, তিথির এই তীব্র নিজের প্রতি আসক্তি তাকে কখনো অন্যের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে দেবে না। শুভ্র সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করল, যেখানে তিথি তার নিজের প্রতিবিম্বের সামনে একা রয়ে গেল। শুভ্র জানত, তিথি হয়তো অন্য কারো সন্ধানে যাবে, যে তার অহংকারী চাহিদাকে নতুন করে পূরণ করবে। কিন্তু শুভ্র তার নিজস্ব জীবন ও আত্মমর্যাদা ফিরে পেল, সেই জীবনযা তিথির অহংকারী ছায়া থেকে মুক্ত।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা।

Tuesday, October 21, 2025

জীবন ও মৃত্যুর ভাবনা

আমাদের মানব জীবনের এক অদ্ভুত অসঙ্গতি হলো যা অনিবার্য, তা নিয়েই আমাদের উদ্বেগ যেন সবচেয়ে বেশি। জীবনের কেন্দ্রে আমাদের নিরন্তর আবর্তন চলে "বেঁচে থাকা"কে ঘিরে। আমরা অবিরাম গণনা করি আর ভাবিআর কত দিন বাঁচব? কেমন হবে সেই বেঁচে থাকার পথ? সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন লাভের জন্য কতই না চেষ্টা, কতই না সতর্কতা! জীবনের প্রতি এই মমতা, এই টান খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক গভীর বৈপরীত্য।

আমরা সবাই জানি, আমাদের জীবনের শেষ পরিণতি হলো মৃত্যু। এটি একটি চরম, নিশ্চিত এবং অবশ্যম্ভাবী সত্য। পৃথিবীর বুকে এমন কোনো প্রাণী নেই যার জীবন অনন্ত। যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তার সমাপ্তি ঘটবেই।

যদি মৃত্যু এতই নিশ্চিত হয়, তাহলে যা আসবেই, যা আটকানো অসম্ভব, তা নিয়ে এত বেশি চিন্তা করা বা আতঙ্কিত হওয়া কি মূর্খতা নয়?

বড়জোর আমরা এই নিশ্চিত সত্যকে উপেক্ষা করতে পারি, বা এর থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু তাতে সত্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। এই ভাবনাটিই আমাদের জীবনের দৃষ্টিকোণ বদলে দিতে পারে। যেহেতু আমাদের "কত দিন বাঁচব" এই প্রশ্নের উত্তর অনিশ্চিত কিন্তু "মৃত্যু আসবেই" এই উত্তরটি নিশ্চিত, তাহলে জীবনকে দীর্ঘ করার চিন্তা না করে, একে গভীর করার দিকে মনোযোগ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

বরং, এই অনিবার্যতার সত্যকে গ্রহণ করে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান করে তোলা উচিত। চিন্তা করা উচিতআমরা কিভাবে বাঁচব? আমাদের স্বল্প সময়ের যাত্রায় আমরা কী ছাপ রেখে যাব? প্রেম, সহানুভূতি, সৃষ্টিশীলতা, আর অর্থপূর্ণ কাজ দিয়ে জীবনকে ভরে তোলাই কি শ্রেষ্ঠ পথ নয়?

জীবনকে তার সমগ্রতা দিয়ে গ্রহণ করার অর্থ হলোমৃত্যুকে তার অবশ্যম্ভাবী অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া। এই স্বীকারোক্তি আমাদের বাঁচিয়ে থাকার উদ্বেগকে প্রশমিত করে, এবং জীবনের ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার সাহস যোগায়। কারণ, যা নিশ্চিত তা নিয়ে আর নয় দুশ্চিন্তা; এখন সময় নিশ্চিতভাবে বাঁচবার।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা। 

Sunday, October 19, 2025

শ্রমিক আন্দোলন ধ্বংসের ষড়যন্ত্র ও মুক্তির পথ: ঐক্যের আবশ্যকতা

দীর্ঘদিনের আশঙ্কা আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শ্রমিক নেতাদের মধ্যে চরম বিভক্তির মধ্য দিয়ে মালিকপক্ষের শ্রমিক আন্দোলন ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র যেন আজ পূর্ণতা পেয়েছে। বর্তমানে গার্মেন্টসসহ দেশের বিভিন্ন শিল্প ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জীবনমান অত্যন্ত শোচনীয়। স্বল্প মজুরি, চাকুরীর নিরাপত্তার অভাব, শ্রমিকদের নামে মিথ্যা মামলা, কর্মক্ষেত্রের খারাপ পরিবেশ, খারাপ ব্যবহার এবং সময়মতো মজুরি না পাওয়াসহ অসংখ্য সমস্যায় শ্রমিক সমাজ জর্জরিত।

আইনি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রায় ৪৬টি শ্রম সেক্টর এবং অসংখ্য অস্বীকৃত সেক্টরে নিয়োজিত কোটি কোটি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৫ বছর পর পর ঘোষণার বিধান থাকলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবের মুখ দেখেনি। অধিকার আদায়ের জন্য আইনি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সেক্টরগুলোতে প্রায় একশোরও বেশি জাতীয় ফেডারেশন এবং কেবল গার্মেন্টস সেক্টরেই প্রায় ১৪০০ কারখানায় বেসিক ইউনিয়ন এবং ৭০টি সেক্টর-ভিত্তিক ফেডারেশন কাজ করছে। এত বিপুল সংখ্যক সংগঠনের উপস্থিতি সত্ত্বেও শ্রমিকদের অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন না হওয়া এক চরম বেদনাদায়ক বাস্তবতা।

এই করুণ অবস্থার মূল কারণ হলো শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চরম মাত্রার দ্বন্দ্ব। সংগঠনগুলোর এই বিভক্তির মূলে রয়েছে মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত। মালিক এবং সরকারের কাছ থেকে ব্যক্তিগত বা দলগত সুবিধা নেওয়াকে কেন্দ্র করেই এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বেশি তীব্র হয়। বিশেষ করে এনজিও-ভিত্তিক বা তাদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা কিছু সংগঠনের মালিকদের সহায়তায় কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা নিয়ে যে বিতর্ক ও সংঘাত, তা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে বড় অন্তরায়। এই বিভেদ আন্দোলনের শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা প্রকারান্তরে মালিকপক্ষের স্বার্থকেই রক্ষা করছে।

যখন কোনো আন্দোলন আভ্যন্তরীণ কোন্দলে জীর্ণ হয়ে পড়ে, তখন তার লক্ষ্যচ্যুত হওয়া অনিবার্য। বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনও আজ সেই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। সংগঠনের নেতারা যখন ব্যক্তিগত সুবিধা, দলীয় আনুগত্য বা অর্থনৈতিক প্রাপ্তির লোভে একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন, তখন শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য গৌণ হয়ে যায়। আন্দোলনের গতিপথ নিয়ন্ত্রিত হয় বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তির হাতে। ফলস্বরূপ, শ্রমিকরা দিনের পর দিন তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।

শ্রমিক আন্দোলনকে ধ্বংস করার যে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র মালিকপক্ষ করে চলেছে, তা রুখে দেওয়ার একমাত্র হাতিয়ার হলো শ্রমিক সংগঠনগুলোর দৃঢ় ঐক্য। এই মুহূর্তে প্রয়োজন হলো সকল দল, মত ও ব্যক্তিগত সুবিধা-স্বার্থ পরিহার করে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ইস্পাতকঠিন বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে সকল সেক্টরের সকল ফেডারেশন ও ইউনিয়নকে ভুলে যেতে হবে তাদের অতীত কোন্দল এবং এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও সম্মানজনক জীবনযাপনের দাবি জানাতে হবে।

যতদিন না শ্রমিক সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যেকার সকল দ্বন্দ্ব নিরসন করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে, ততদিন শ্রমিকদের অধিকার আদায় সুদূরপরাহত থাকবে। কেবল একটি সম্মিলিত ও অটল শ্রমিক আন্দোলনই পারে শোষণের জাল ছিন্ন করে শ্রমিকদের মুক্তি এনে দিতে। কারণ, শ্রমিকের মুক্তি কোনো একক নেতার বা সংগঠনের দ্বারা সম্ভব নয়তা কেবল সম্ভব সকল শ্রমিকের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর এবং ঐক্যবদ্ধ শক্তির মাধ্যমে। এই ঐক্যই হবে শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং শোষণমুক্তির চাবিকাঠি।

তাই, সময় এসেছে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর শ্রমিক সমাজের কল্যাণে এক পতাকাতলে আসার। এই ঐক্যের মাধ্যমেই শ্রমিক আন্দোলন তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং নিশ্চিত করতে পারবে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি ও ন্যায্য অধিকার।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দরকষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


Saturday, October 18, 2025

মানুষের জীবন এবং তাদের নিরাপত্তা হবে প্রথম ও প্রধানতম অগ্রাধিকার

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা: অগ্রাধিকারের প্রশ্নে পুনর্মূল্যায়ন

সম্প্রতি মিরপুরের শিয়ালবাড়ী গার্মেন্টস কারখানা, চট্টগ্রাম ইপিজেড, এবং ঢাকার বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো আমাদের জাতীয় উদ্বেগের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর আগেও তাজরিন ফ্যাশনস, হামিম গ্রুপসহ বহু শিল্প-কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ও বিপুল সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার মূল ভিত্তি মানুষের জীবন ও তাদের কষ্টার্জিত সম্পদ এখনও পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই বাস্তবতায়, সাধারণ জনগণের মনে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে: যখন দেশের ভেতরে নিয়মিতভাবে জীবন ও সম্পদের এমন ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, তখন কি সরকারের অগ্রাধিকারের খাতগুলোতে কোনো ভারসাম্যহীনতা রয়েছে?

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহিরাগত হুমকি মোকাবিলার জন্য সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখা অপরিহার্য। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র কেনা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ। তবে, প্রশ্ন হলো দেশের অভ্যন্তরে যে "দৈনন্দিন যুদ্ধ" চলছে আগুন, দুর্ঘটনা ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তা মোকাবেলার জন্য কী পরিমাণ গুরুত্ব ও সম্পদ বরাদ্দ করা হচ্ছে?

দেশের সম্পদ বলতে কেবল সামরিক সরঞ্জাম বা প্রাকৃতিক সম্পদকে বোঝায় না, এর প্রধানতম অংশ হলো দেশের জনগণ ও তাদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ। লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয় যে গার্মেন্টস কারখানাগুলো থেকে, যে বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, সেগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশের সম্পদের সুরক্ষারই অংশ। শ্রমিকদের জীবন রক্ষা করা, কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ করা, এবং কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও পণ্যসামগ্রী পুড়ে যাওয়া থেকে বাঁচানো এগুলো সরাসরি জাতীয় সম্পদের সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আধুনিকীকরণ, তাদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, এবং দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা আজ সময়ের দাবি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে, যা মোকাবিলায় বর্তমান সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত। সরকারের উচিত যুদ্ধাস্ত্র কেনার পাশাপাশি জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতেও বিপুল বিনিয়োগ করা।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষের জীবনের মূল্য অপরিসীম। কোনোভাবেই যেন মুনাফার তাড়নায় শ্রমিকের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা জরুরি। যথাযথ অগ্নি-প্রতিরোধক ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার শৈথিল্য না দেখানো নিশ্চিত করতে হবে।

সুতরাং, সরকারের উচিত হবে দেশের ভেতরের এই নীরব দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রতিরক্ষা খাতের মতোই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। জাতীয় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন, যেখানে মানুষের জীবন এবং তাদের নিরাপত্তা হবে প্রথম ও প্রধানতম অগ্রাধিকার। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হলো যেকোনো দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। যুদ্ধাস্ত্রের মতোই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সরঞ্জাম এবং সুরক্ষা নিশ্চিতকারী কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আজ বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দরকষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Friday, October 17, 2025

শ্রমিকের জীবনকে মূল্য দাও

 

মিরপুর অগ্নিকাণ্ড: শ্রমিক জীবন ও অধিকার রক্ষায় জরুরি দাবি

ঢাকার মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে শাহ আলম কেমিক্যাল গোডাউন, জেএসকে নীট ফ্যাশন লিমিটেড এবং স্মার্ট ডিজাইন এন্ড প্রিন্টিং লিমিটেডে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র, মালিক ও তদারকি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অবহেলা ও দায়হীনতার ফল। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর শোক ও প্রতিশ্রুতির বুলি শোনা গেলেও, বাস্তবে শ্রমিকদের জীবন সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটে না। এবার তাই প্রয়োজন শুধু সমবেদনা নয় দায়বদ্ধতা, বিচার ও স্থায়ী পরিবর্তন।

১. মানবিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ: জীবনের মূল্যায়ন হোক ন্যায্যভাবে

এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ও আহত শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের ন্যূনতম দায়িত্ব হলো তাদের পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। নিহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য আজীবন আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ (Loss of Earning) নিশ্চিত করা না হলে, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অতলে হারিয়ে যাবে। আহত শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, শারীরিক পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তার পাশাপাশি তাদের কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ‘যৌক্তিক’ ও ‘মানসম্মত’ হতে হবে। কেবল অল্প কিছু অর্থ নয়, বরং এমন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে যা শ্রমিকের জীবনের বাস্তব মূল্যায়ন করে এবং পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।

২. স্বচ্ছ তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি: দুর্ঘটনা নয়, এটি অবহেলার হত্যাকাণ্ড

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত কমিটি গঠন করা আবশ্যক। অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিকদের বের হওয়ার মূল গেট ও ছাদে যাওয়ার দরজা তালাবদ্ধ ছিলযা সরাসরি শ্রমিক হত্যার সমান অপরাধ। এমন ঘটনা প্রমাণ করে, কারখানাগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার তদারকি প্রায় অনুপস্থিত।

তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে এবং যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দোষী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, দায়মুক্তি সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে আগুনের লেলিহান শিখা আবারও শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেবে।

৩. ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণ ও কঠোর নজরদারি: নিরাপত্তা যেন কাগজে নয়, বাস্তবে হয়

অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধে জরুরি প্রয়োজন আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউনসহ সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান অপসারণ। একটি কার্যকর ও স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যারা নিয়মিত ও পূর্বঘোষণা ছাড়া অগ্নি ও নিরাপত্তা পরিদর্শন চালাবে।

যেসব প্রতিষ্ঠান ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বা নিরাপত্তা মান লঙ্ঘন করছে, তাদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শিল্প উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গিয়ে শ্রমিকের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও জরুরি নির্গমণ ব্যবস্থা: প্রস্তুতিই বাঁচাতে পারে জীবন

প্রত্যেক শ্রমিককে বাধ্যতামূলকভাবে অগ্নিনির্বাপণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রতিটি কারখানায় নিয়মিত জরুরি মহড়া (Fire Drill) পরিচালনা করা উচিত, যাতে বিপদের মুহূর্তে শ্রমিকরা জানে কোথায় যেতে হবে, কীভাবে নিজেকে বাঁচাতে হবে।

সব সময় এক্সিট রুট খোলা রাখা, পর্যাপ্ত আলো ও সাইনেজ স্থাপন এবং জরুরি নির্গমণ পথ কখনোই তালাবদ্ধ না রাখা নিশ্চিত করতে হবে। একটিমাত্র খোলা গেট শত শত প্রাণ বাঁচাতে পারেএই সত্য ভুলে যাওয়া মানে আবারও আগুনের কাছে শ্রমিকদের বলি দেওয়া।

৫. স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা: আগুনের পরে জীবন ও প্রকৃতি রক্ষা

অগ্নিকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিক দূষণ শুধু শ্রমিক নয়, আশপাশের জনগণ ও পরিবেশের জন্যও মারাত্মক হুমকি। এই দূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করে তা মোকাবিলায় অবিলম্বে স্বাস্থ্য সহায়তা ও পরিবেশ পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয় এটি মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৬. মালিক, ব্র্যান্ড ও সরকারের দায়বদ্ধতা: তিন পক্ষের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব

অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনায় দায় কেবল শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অনৈতিক ও অমানবিক। মালিক ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে অবশ্যই তাদের নৈতিক ও আর্থিক দায় স্বীকার করতে হবে। তাদের বিশাল মুনাফার অংশ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

একইসাথে, সরকারের তদারকি প্রতিষ্ঠান যেমন শ্রম মন্ত্রণালয়, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) ও ফায়ার সার্ভিসতাদের অবহেলা বা ব্যর্থতার জন্যও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো শ্রমিকের জীবন ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা রক্ষা করা; এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা মানে সংবিধান ও মানবতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।

ন্যায়বিচার ও সংস্কারের পথে অঙ্গীকার

মিরপুরের এই অগ্নিকাণ্ড কেবল কিছু প্রাণহানির ঘটনা নয় এটি বাংলাদেশের শ্রম ব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। এই ট্র্যাজেডিকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে আড়াল না করে, এটিকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। নিহত ও আহত শ্রমিকদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার গড়ে তোলাই হবে সত্যিকার মানবিক প্রতিশ্রুতি।

বাংলাদেশের শ্রমিকেরা শুধু উৎপাদনের যন্ত্র নয় তারা এই দেশের অর্থনীতির প্রাণ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে, জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

আজ তাই আমাদের দাবি 

"শ্রমিকের জীবনকে মূল্য দাও, দায়ীদের বিচার করো, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করো।"


লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দরকষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

Saturday, October 11, 2025

অতিরিক্ত আবেগ ও সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা

 

ভালোবাসামানুষের জীবনের সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। এই ভালোবাসাই কখনো মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, আবার কখনো একই ভালোবাসা পরিণত হয় মানসিক ক্লান্তি ও অসহায়তার উৎসে। কারণ, ভালোবাসা যখন নিজের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে অতিরিক্ত আবেগে পরিণত হয়, তখন তা সম্পর্কের ভারসাম্যকে নষ্ট করে ফেলে।

সম্পর্কে দু’জন মানুষ পরস্পরের প্রতি যত্নবান থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন একজন তার সমস্ত সত্তা, প্রতিটি ভাবনা, প্রতিটি নিশ্বাস অন্যজনের উপর কেন্দ্রীভূত করে ফেলেতখন সেই ভালোবাসা ধীরে ধীরে শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে ওঠে। সম্পর্কের একপাশের ওজন যত বাড়ে, অন্যপাশ ততটাই হালকা হয়ে পড়ে। এই ভারসাম্যহীনতাই জন্ম দেয় ভুল বোঝাবুঝি, মানসিক দূরত্ব ও অভিযোগের পাহাড়।

“সে আর আগের মতো ভালোবাসে না”এই বাক্যটি তখন বাস্তবতার চেয়ে বেশি আসে অসন্তুষ্টি ও প্রত্যাশার অতিরিক্ত চাপ থেকে। ভালোবাসা কখনোই মাপার বিষয় নয়; কিন্তু যখন তা তুলনার মাপে বিচার করা শুরু হয়, তখন আবেগের স্বচ্ছতা নষ্ট হয়ে যায়। কারণ ভালোবাসা প্রতিদান দাবি করে নাএটি কেবল অনুভবের জায়গা।

অতিরিক্ত ভালোবাসা অনেক সময় মানসিক নির্ভরতার রূপ নেয়। মানুষ তখন প্রিয়জনকে নিজের সম্পত্তি মনে করে, তার ওপর একধরনের অদৃশ্য মালিকানা খাটাতে চায়। এর ফলেই জন্ম নেয় সন্দেহ, ঈর্ষা, নজরদারি ও আত্মসম্মানহানি। এমন এক অবস্থায় ভালোবাসা আর মুক্তির জায়গা থাকে নাবরং তা হয়ে ওঠে মানসিক শৃঙ্খল।

সুস্থ সম্পর্কের মূল হলো সমতা, সম্মান ও স্বাধীনতা। একজনের অতিরিক্ত উপস্থিতি যেমন সম্পর্ককে দমিয়ে ফেলে, তেমনি অতিরিক্ত অনুপস্থিতিও তা নিঃশেষ করে দেয়। তাই দরকার একটি সুস্থ সীমারেখাযেখানে ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু অধিকারবোধ নয়; কাছাকাছি থাকার তাগিদ থাকবে, কিন্তু শ্বাসরুদ্ধকর আঁকড়ে ধরা নয়।

যদি সম্পর্কের টানাপোড়েন দুইজনের মধ্যকার আলোচনায় মীমাংসা করা যায়, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ। একে অপরের চাহিদা, সীমা ও দুর্বলতা বুঝে নেওয়াই পারে সম্পর্ককে নতুন প্রাণ দিতে।
তবে যদি সেই বোঝাপড়া না গড়ে ওঠে
আর সম্পর্ক যদি ক্রমে মানসিক চাপ, হতাশা ও ব্যক্তিজীবনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়তবে বিচ্ছেদও হতে পারে একটি প্রয়োজনীয় ও মর্যাদাপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

বিচ্ছেদ মানেই ব্যর্থতা নয়, বরং কখনো কখনো তা আত্মরক্ষার উপায়। কারণ ভালোবাসার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের মানসিক সুস্থতা। ভালোবাসা তখনই সুন্দর, যখন তা মুক্ত করেবেঁধে নয়।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা ও সমাজকর্মী

সীমারেখার কাঁটাতার

 

তিথি আর অভ্রর ভালোবাসা ছিল আকাশের মতো উদারঅন্তত তিথির দিক থেকে। তাদের সম্পর্কের শুরুটা ছিল রূপকথার মতো, কিন্তু যত দিন যেতে লাগলো, অভ্রর কাছে তিথির এই উদারতা যেন একরকম ভার হয়ে দাঁড়ালো। তিথি ভালোবাসতো অভ্রকে, আর ভালোবাসতো নিজের মতো করে। কিন্তু সেই ‘নিজের মতো করে’ ভালোবাসাটা কখন যে বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল, তিথি নিজেও বোঝেনি।

অভ্র অফিস থেকে ফিরলেই তিথি ছুটে আসতো। "কোথায় ছিলে এতক্ষণ? ফোনটা ধরছিলে না কেন? বসের সাথে কী কথা হলো? পাশের ডেস্কে বসা মেয়েটা কি আজ তোমার দিকে তাকিয়েছিল?"প্রশ্নগুলো শুনতে শুনতে অভ্রর মনে হতো, সে যেন কোনো নিরন্তর জেরার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। তিথির কণ্ঠে ভালোবাসা ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ধরনের তীব্র অধিকারবোধ।

তিথির কাছে অভ্র ছিল তার জীবনের কেন্দ্রে। তাই সে চাইতো অভ্রও যেন তার চারপাশে ঘোরে। অভ্র বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখতে গেলে তিথি সারাক্ষণ মেসেজ করতো, "কখন ফিরবে? আমার খুব একা লাগছে।" অভ্রর প্রোফাইল পিকচারে অন্য কোনো মেয়ের কমেন্ট দেখলেই তিথি রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে দিতো। একবার অভ্রর ছোটবেলার এক বান্ধবী জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করেছিল, আর তাতেই তিথি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিল, "কেন সে এখনো তোমার সাথে যোগাযোগ রাখবে? তোমার জীবনে শুধু আমিই তো যথেষ্ট!"

অভ্র প্রথম দিকে তিথির এই আচরণকে তার 'গভীর ভালোবাসা' হিসেবেই দেখতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সে হাঁপিয়ে উঠলো। তার মনে হতে লাগলো, তিথির ভালোবাসা যেন একটা ভারী জালের মতো, যা তাকে চারপাশ থেকে জাপটে ধরে শ্বাসরুদ্ধ করে দিচ্ছে। সে যেন তিথির কোনো প্রিয় সম্পত্তি, যার উপর তিথির নিরঙ্কুশ অধিকার।

একদিন সন্ধ্যায় দু'জনে বসে ছিল। অভ্র কোনো বিষয়ে মন দিয়ে কাজ করছিল, আর তিথি বারবার অভ্রকে জিজ্ঞেস করছিলসে তাকে আগের মতো ভালোবাসে কিনা।

বিরক্ত হয়ে অভ্র বলল, "তিথি, সবসময় আমিই কেন প্রমাণ দেবো যে আমি তোমাকে ভালোবাসি? তুমি আমার প্রতিটি পদক্ষেপে এত নিয়ন্ত্রণ করতে চাও কেন? তুমি আমার বন্ধু-বান্ধব, আমার ব্যক্তিগত জায়গায় নাক গলাচ্ছোএটা ভালোবাসা নয়, তিথি। এটা অসুস্থতা।"

তিথি কেঁদে ফেললো। "তুমি বলছো আমি অসুস্থ? আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি বলেই এমন করি। তুমি কি বোঝো না, আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে থাকি?"

"ঠিক এই ভয়টাই তো আমাদের সম্পর্কটাকে বিষিয়ে দিচ্ছে, তিথি!" অভ্র বলল। "ভালোবাসা মানে মুক্ত শ্বাস নিতে দেওয়া। তোমার এই অতিরিক্ত অধিকারবোধ, এই ঈর্ষাআমার মনে হচ্ছে তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না। আমি তোমার ওথেলো সিনড্রোমের শিকার হতে চাই না।"

তিথির কাছে এই কথাগুলো ছিল আঘাতের মতো। সে ভাবতে পারেনি তার ভালোবাসা এমন নেতিবাচকভাবে ফিরে আসবে। তাদের মধ্যে অসামঞ্জস্য এত বেড়ে গিয়েছিল যে, অভ্রর কাছে তিথির শত চেষ্টা সত্ত্বেও সেই ভালোবাসা আর 'যথেষ্ট' মনে হতো না।

কয়েক মাস ধরে তাদের মধ্যে চলতে থাকলো শীতল যুদ্ধ। তিথি চেষ্টা করলো নিজেকে বদলাতে, অভ্রকে একটু স্বাধীনতা দিতে। কিন্তু অভ্র ততদিনে মানসিকভাবে অনেক দূরে চলে গেছে। সে বুঝে গিয়েছিল, এই সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা তাদের দু'জনের জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছেবিশেষ করে তিথির এই আবেগ তাকে কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনে মন দিতে দিচ্ছে না।

অবশেষে এক কঠিন সিদ্ধান্ত এলো। যখন বোঝাপড়ার আর কোনো পথ রইল না, তখন অভ্র বিচ্ছেদের কথা বললো।

তিথি প্রথমে মানতে পারেনি। "আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না!"তার কান্নায় অভ্রর মন গলে গেল না। সে শান্তভাবে জানালো, তাদের এই 'বিষাক্ত ভালোবাসা' থেকে বেরিয়ে আসাটাই এখন দু'জনের জন্য মঙ্গল।

বিচ্ছেদের পর তিথির জীবনে নেমে এলো এক তেতো অধ্যায়। সে অভ্রকে দোষারোপ করতে শুরু করলো, কারণ তার কাছে মনে হলো, ভালোবাসার মূল্য সে-ই বেশি দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, যখন সে নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলো, তখন উপলব্ধি করলোআসলে ভালোবাসা দিয়ে সে অভ্রকে বাঁধতে চায়নি, বেঁধেছিল তার নিজের নিরাপত্তাহীনতা দিয়ে।

তিথি শিখলোভালোবাসার স্বাস্থ্যকর চর্চা জীবনের সমৃদ্ধি আনে, আর তার অসুস্থতা কেবল ক্ষতিই ডেকে আনে। অতিরিক্ত আবেগ আর তীব্র অধিকারবোধের কাঁটাতার সরিয়ে এবার সে নিজেকে ভালোবাসতে শিখলো, এবং আশা করলোপরবর্তী সম্পর্কে সে ভালোবাসবে সীমারেখা মেনে, একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা ও সমাজকর্মী

Tuesday, October 7, 2025

থমকে যাওয়া জীবন ও অর্থনীতির উদ্বেগ

 

খাইরুল মামুন মিন্টু

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার ও টেক্সটাইলশিল্প। এই শিল্প কেবল বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাই এনে দেয় না, এটি দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানও নিশ্চিত করে। তবে গত এক বছরে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক, যা দেশের অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর জন্য এক অশনি সংকেত।

বেকারত্বের প্রবল আঘাত

বিভিন্ন পত্র পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, এই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে সাভার-আশুলিয়াতে একাই বন্ধ হয়েছে ২১৪টি, যেখানে প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন। গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হওয়ায় বেকার হয়েছেন সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭৩ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ এবং নরসিংদীর চিত্রও একই রকম হতাশাজনক। এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়া মানে হাজার হাজার পরিবারের আয়ে ছেদ পড়া।

শ্রমিকরা, যারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেন, তাঁরা এখন চাকরির খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে হতাশ হয়ে গ্রামে ফিরছেন। তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন এবং পরিবার পরিজনের দুরাবস্থা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয় এটি মানবিক বিপর্যয়ের এক প্রতিচ্ছবি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, এই শ্রমিকরা যখন তাঁদের ন্যূনতম পাওনা আদায়ের চেষ্টা করেছেন, তখন উল্টো মামলা, হামলা, জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়েছে। সরকারী উদ্যোগে তাঁদের কোনো বিকল্প কর্মসংস্থান বা সহায়তা করা হয়নি।

নতুন শঙ্কা: নাসা গ্রুপের কারখানা বন্ধ

পুরোনো বেকারত্বের ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি গভীর উদ্বেগ। নাসা গ্রুপের মতো বড় আকারের কারখানাও যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কর্মরত, তবে বেকার শ্রমিকের সংখ্যা আরও ৩০ হাজার বাড়বে। এই ৩০ হাজার শ্রমিকের পরিবারও নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। ইতোমধ্যেই কর্মহীন ১ লাখ ১৯ হাজারের বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়নি, এর উপর নতুন করে এই শ্রমিকরা যুক্ত হলে সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

অর্থনীতির উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

কারখানা বন্ধ হওয়া মানে কেবল শ্রমিক বেকার হওয়া নয়; এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উপর পড়বে: কর্মসংস্থান হারানো শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা হ্রাস পায়, যা পরোক্ষভাবে অন্যান্য শিল্প ও ব্যবসার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বেকারত্ব এবং আর্থিক দুরাবস্থা সমাজে হতাশা ও অস্থিরতা বাড়ায়, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের কারখানা বন্ধের সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের মোট উৎপাদন এবং রপ্তানি আয়ের উপর। এতগুলো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে দেশের শিল্পখাত নিয়ে আস্থা সংকট তৈরি করতে পারে।

সরকারের প্রতি আহ্বান

এই পরিস্থিতিতে, সরকারের কাছে প্রত্যাশা হলো, বন্ধ কারখানার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে তা পুনরায় কীভাবে চালু করা যায় সেই বিষয়ে জরুরি এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। শ্রমিক বেকার হওয়া মানে দেশের এক বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া। সরকার ও শিল্প মালিকপক্ষকে সমন্বিতভাবে এই সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে।

বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো কেন বন্ধ হলো, তার কারণ অনুসন্ধান করে দ্রুত আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা দিয়ে সেগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা জরুরি। যে শ্রমিকরা ইতোমধ্যেই বেকার হয়েছেন, তাঁদের জন্য সরকারী উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাঁরা অন্য কোনো খাতে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে এবং পাওনা আদায় করতে গিয়ে শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

দেশের লাখ লাখ শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এই দুইয়ের স্বার্থেই কারখানা বন্ধের এই ধারাকে অবিলম্বে থামাতে হবে এবং বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় সচল করার যথাযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

Friday, October 3, 2025

Wednesday, October 1, 2025

দেশের অর্থনীতির নেপথ্যের নায়ক আমাদের দেশের গার্মেন্ট শ্রমিকরা

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এই গার্মেন্ট শিল্প। অথচ এর ভিত গড়ে উঠেছে লাখো শ্রমিকের রক্ত-ঘামে, ত্যাগে আর সহনশীলতায়। তাদের জীবন যেন এক বিশাল দোলনা, যেখানে সুখ আর দুঃখ পালা করে দোল খায়। প্রতিটি নতুন সকাল আসে না আনন্দের বার্তা নিয়ে; বরং ভোরের আলোয় তাদের জন্য অপেক্ষা করে একই একঘেয়েমি, নতুন সংগ্রামের অধ্যায়।

গার্মেন্ট শ্রমিকদের দিন শুরু হয় তখনই, যখন শহর এখনও পুরোপুরি ঘুমের কোলে। ফ্যাক্টরির পথে তাদের দীর্ঘ পদচারণা যেন জীবনের অন্তহীন দায়বদ্ধতার প্রতীক। কারখানার ভেতরে ঢুকলেই তারা হারিয়ে যায় শত শত মেশিনের অবিরাম ঘর্ঘর শব্দে। সেই শব্দের নিচে চাপা পড়ে যায় তাদের হাসি, আনন্দ, কিংবা ব্যক্তিগত নীরবতার আকাঙ্ক্ষা। প্রতিদিন একই কাজ হাজার হাজার পোশাকের সেলাই, একই ফ্লোরে, একই গতিতে যেন সময়ও এখানে থমকে আছে, কেবল পোশাকের গোনা সংখ্যাই জীবনের ঘড়ি টিকটিক করে।

দিন পেরোয় সকাল থেকে দুপুর, তারপর সন্ধ্যা, আর অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত। ওভারটাইম যেন আরোপিত নিয়ম, আর টার্গেট পূরণের দুশ্চিন্তা অবিরাম ছায়া। সামান্য দেরি, কিংবা ক্ষুদ্রতম ভুলের জন্য ভর্ৎসনা, বকাঝকা, ধমক এসব যেন তাদের প্রতিদিনের অনিবার্য সঙ্গী। এই মানসিক চাপ তারা নীরবে সয়ে যায়, কারণ পেটের দায়ে, পরিবারের দায়ে, এই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পথ তাদের খোলা নেই।

তবুও এই কঠিন জীবনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট সুখের আলো। মাসের শেষে হাতে বেতন পাওয়ার মুহূর্ত যেন অমলিন আনন্দের উৎসব। সেই টাকায় সন্তানের মুখে ভাত তুলে দেওয়া, নতুন জামা কেনা, গ্রামে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে টাকা পাঠানো এসব ক্ষুদ্র অথচ অমূল্য আনন্দই তাদের বেঁচে থাকার প্রেরণা। গার্মেন্ট শিল্প তাদের দিয়েছে একটি পরিচয়, দিয়েছে জীবনের টিকে থাকার উপায়।

কিন্তু দুঃখের বোঝা সুখের চেয়েও ভারী। কাজের চাপের নিচে চাপা পড়ে যায় নিজের শরীরের যত্ন, সামাজিক জীবন, এমনকি পরিবারকে দেওয়া সময়ও। ছুটি তাদের কাছে এক দুর্লভ প্রাপ্তি। সামান্য মজুরি দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয়, ফলে জীবন হয়ে ওঠে আরও কঠিন।

তবুও সত্য এটাই এই শ্রমিকরাই আমাদের জাতীয় গর্ব। তাদের হাতের সেলাইয়ে তৈরি পোশাক বহন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা। ডলার আসে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে, আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে যায় তাদের ঘামে ভেজা পথ ধরে।

তাদের প্রতি তাই কেবল দায়িত্ব নয়, নৈতিক কর্তব্যও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা, ন্যায্য মজুরি প্রদান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা। যেন তাদের জীবনের দোলনায় দুঃখ নয়, সুখের পাল্লাটিই হয় ভারী। গার্মেন্ট শ্রমিক কেবল শ্রমিক নন, তারা আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রার নেপথ্যের নায়ক। আর নায়কের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়াই আমাদের আজকের অঙ্গীকার হওয়া উচিত।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

মহান মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে মহান মে দিবস এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্...