Followers

Friday, October 17, 2025

শ্রমিকের জীবনকে মূল্য দাও

 

মিরপুর অগ্নিকাণ্ড: শ্রমিক জীবন ও অধিকার রক্ষায় জরুরি দাবি

ঢাকার মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে শাহ আলম কেমিক্যাল গোডাউন, জেএসকে নীট ফ্যাশন লিমিটেড এবং স্মার্ট ডিজাইন এন্ড প্রিন্টিং লিমিটেডে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র, মালিক ও তদারকি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অবহেলা ও দায়হীনতার ফল। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর শোক ও প্রতিশ্রুতির বুলি শোনা গেলেও, বাস্তবে শ্রমিকদের জীবন সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটে না। এবার তাই প্রয়োজন শুধু সমবেদনা নয় দায়বদ্ধতা, বিচার ও স্থায়ী পরিবর্তন।

১. মানবিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ: জীবনের মূল্যায়ন হোক ন্যায্যভাবে

এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ও আহত শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের ন্যূনতম দায়িত্ব হলো তাদের পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। নিহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য আজীবন আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ (Loss of Earning) নিশ্চিত করা না হলে, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অতলে হারিয়ে যাবে। আহত শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, শারীরিক পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তার পাশাপাশি তাদের কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ‘যৌক্তিক’ ও ‘মানসম্মত’ হতে হবে। কেবল অল্প কিছু অর্থ নয়, বরং এমন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে যা শ্রমিকের জীবনের বাস্তব মূল্যায়ন করে এবং পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।

২. স্বচ্ছ তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি: দুর্ঘটনা নয়, এটি অবহেলার হত্যাকাণ্ড

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত কমিটি গঠন করা আবশ্যক। অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিকদের বের হওয়ার মূল গেট ও ছাদে যাওয়ার দরজা তালাবদ্ধ ছিলযা সরাসরি শ্রমিক হত্যার সমান অপরাধ। এমন ঘটনা প্রমাণ করে, কারখানাগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার তদারকি প্রায় অনুপস্থিত।

তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে এবং যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দোষী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, দায়মুক্তি সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে আগুনের লেলিহান শিখা আবারও শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেবে।

৩. ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণ ও কঠোর নজরদারি: নিরাপত্তা যেন কাগজে নয়, বাস্তবে হয়

অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধে জরুরি প্রয়োজন আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউনসহ সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান অপসারণ। একটি কার্যকর ও স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যারা নিয়মিত ও পূর্বঘোষণা ছাড়া অগ্নি ও নিরাপত্তা পরিদর্শন চালাবে।

যেসব প্রতিষ্ঠান ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বা নিরাপত্তা মান লঙ্ঘন করছে, তাদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শিল্প উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গিয়ে শ্রমিকের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও জরুরি নির্গমণ ব্যবস্থা: প্রস্তুতিই বাঁচাতে পারে জীবন

প্রত্যেক শ্রমিককে বাধ্যতামূলকভাবে অগ্নিনির্বাপণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রতিটি কারখানায় নিয়মিত জরুরি মহড়া (Fire Drill) পরিচালনা করা উচিত, যাতে বিপদের মুহূর্তে শ্রমিকরা জানে কোথায় যেতে হবে, কীভাবে নিজেকে বাঁচাতে হবে।

সব সময় এক্সিট রুট খোলা রাখা, পর্যাপ্ত আলো ও সাইনেজ স্থাপন এবং জরুরি নির্গমণ পথ কখনোই তালাবদ্ধ না রাখা নিশ্চিত করতে হবে। একটিমাত্র খোলা গেট শত শত প্রাণ বাঁচাতে পারেএই সত্য ভুলে যাওয়া মানে আবারও আগুনের কাছে শ্রমিকদের বলি দেওয়া।

৫. স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা: আগুনের পরে জীবন ও প্রকৃতি রক্ষা

অগ্নিকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিক দূষণ শুধু শ্রমিক নয়, আশপাশের জনগণ ও পরিবেশের জন্যও মারাত্মক হুমকি। এই দূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করে তা মোকাবিলায় অবিলম্বে স্বাস্থ্য সহায়তা ও পরিবেশ পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয় এটি মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৬. মালিক, ব্র্যান্ড ও সরকারের দায়বদ্ধতা: তিন পক্ষের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব

অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনায় দায় কেবল শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অনৈতিক ও অমানবিক। মালিক ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে অবশ্যই তাদের নৈতিক ও আর্থিক দায় স্বীকার করতে হবে। তাদের বিশাল মুনাফার অংশ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

একইসাথে, সরকারের তদারকি প্রতিষ্ঠান যেমন শ্রম মন্ত্রণালয়, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) ও ফায়ার সার্ভিসতাদের অবহেলা বা ব্যর্থতার জন্যও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো শ্রমিকের জীবন ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা রক্ষা করা; এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা মানে সংবিধান ও মানবতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।

ন্যায়বিচার ও সংস্কারের পথে অঙ্গীকার

মিরপুরের এই অগ্নিকাণ্ড কেবল কিছু প্রাণহানির ঘটনা নয় এটি বাংলাদেশের শ্রম ব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। এই ট্র্যাজেডিকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে আড়াল না করে, এটিকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। নিহত ও আহত শ্রমিকদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার গড়ে তোলাই হবে সত্যিকার মানবিক প্রতিশ্রুতি।

বাংলাদেশের শ্রমিকেরা শুধু উৎপাদনের যন্ত্র নয় তারা এই দেশের অর্থনীতির প্রাণ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে, জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

আজ তাই আমাদের দাবি 

"শ্রমিকের জীবনকে মূল্য দাও, দায়ীদের বিচার করো, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করো।"


লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দরকষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

No comments:

Post a Comment

নিজস্ব জগৎ

  নিজস্ব জগৎ প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে — যেখানে ঢোকার চাবি কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না। সে জগৎ একান্ত , নীরব , নিজের ম...