Followers

Tuesday, November 4, 2025

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অনিশ্চয়তা ও করণীয়

 


বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানি খাত বর্তমানে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাহীনতা এবং বিভ্রান্তিকর সরকারি বার্তার কারণে বড় ক্রেতারা নতুন কার্যাদেশ দেওয়া থেকে সরে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই খাতের টালমাটাল অবস্থা শুধু শিল্পপতিদের নয়, বরং লাখো শ্রমিক ও পুরো অর্থনীতির জন্যই এক ভয়াবহ সংকেত।

রপ্তানিতে পতন ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে রপ্তানি কমেছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ শতাংশের বেশি। এক মাসেই রপ্তানি কমেছে প্রায় ৫১ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ছয় হাজার ১২০ কোটি টাকার সমান। গত বছরের অক্টোবরে যেখানে রপ্তানি হয়েছিল ৪১৩ কোটি ডলারের পণ্য, সেখানে চলতি বছরের অক্টোবরে তা নেমে এসেছে ৩৬২ কোটি ডলারে। অর্থাৎ, টানা তিন মাস ধরে রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক প্রবণতা নির্দেশ করে।

কারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থানের সংকট

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে অন্তত ২৫৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এক লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। যদিও একই সময়ে নতুন ১৬৬টি কারখানা চালু হয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতা উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎসংকট, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, মজুরি সমন্বয়ের চাপ এবং বৈশ্বিক বাজারে অর্ডার সংকটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে।

নন-কমপ্লায়েন্স কারখানা বন্ধ: সমাধান না সংকট?

সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, “নন-কমপ্লায়েন্স কারখানা বন্ধ হওয়া খারাপ কিছু নয়।” তাঁর মতে, এটি শিল্পের টেকসই উন্নয়নের অংশ। কিন্তু খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত তড়িঘড়ি করে নেওয়া হলে তা উল্টোভাবে শিল্পের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্বমানের নিরাপত্তা সংস্কার সম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। কিন্তু এখনো কিছু কারখানা সেই মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি। সরকারের দায়িত্ব ছিল এসব কারখানাকে সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগ না দেখিয়ে এখন সরকার কারখানা বন্ধের পথে হাঁটছেযা বাস্তবে শ্রমিক ও রপ্তানি উভয়ের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

শ্রমিক জীবনে প্রভাব

কারখানা বন্ধের ফলে শুধুমাত্র উৎপাদনই নয়, শ্রমিকদের জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অনেকে চাকরি হারিয়ে বাসা ভাড়া দিতে পারছেন না, শিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে, পরিবারগুলোর আয় কমে যাচ্ছে। এই সামাজিক সংকট দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাহীনতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরকারের পরস্পরবিরোধী বার্তা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে। তারা সরবরাহের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। যদি বাংলাদেশের কারখানাগুলো এভাবে ধারাবাহিকভাবে বন্ধ হতে থাকে, তাহলে ক্রেতারা বিকল্প হিসেবে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার দিকে অর্ডার সরিয়ে নিতে পারেন। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্জিত প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করবে।

সমন্বিত নীতি ও অংশীদারিত্বের প্রয়োজন

বিশ্লেষকদের মতে, নন-কমপ্লায়েন্স ইস্যুটি কেবল শাস্তিমূলক নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক নীতি প্রশ্ন। এটি শ্রমিক সুরক্ষা, শিল্প উন্নয়ন, রপ্তানি সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
কারখানাগুলোকে হঠাৎ বন্ধ না করে ধাপে ধাপে সংস্কার, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে পরিপালনযোগ্য ও নিরাপদ পরিবেশে রূপান্তরিত করতে হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত কেবল রপ্তানির নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে পুরো অর্থনীতিই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্ত না নিয়ে শিল্পের বাস্তবতা, শ্রমিকের জীবন, আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক ভাবমূর্তিসব দিক বিবেচনা করে টেকসই সমাধান খোঁজা। কারখানা বন্ধ করা নয়, বরং সক্ষমতা বাড়ানোই হবে ভবিষ্যতের সঠিক দিকনির্দেশনা।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

No comments:

Post a Comment

মহান মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে মহান মে দিবস এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্...