বাংলাদেশের প্রধান পোশাক শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিকদের অধিকার
আদায়ের আন্দোলন এবং পরবর্তী গণছাঁটাইয়ের ঘটনা পোশাক শিল্পে এক গভীর মানবিক ও
অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে শ্রমিকরা জীবন দিলেও, ৫ আগস্টের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ
রূপ নিয়েছে। একদিকে যেমন শ্রমিকের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর হয়নি, তেমনই অন্যদিকে ব্যাপক হারে কারখানা বন্ধ ও বেআইনী
ছাঁটাইয়ের কারণে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের 'শ্রমিক বৈষম্য দূরীকরণ' এবং 'নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির' প্রতিশ্রুতির বিপরীতে, এই অঞ্চলে এখন বিরাজ করছে চরম অনিশ্চয়তা ও নীরব নির্যাতন।
গণছাঁটাইয়ের চিত্র ও বেকারত্বের ভয়াবহতা
৫ আগস্টের পর ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে ২৩টিরও বেশি
গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা যায়। এই হঠাৎ বন্ধ ও বেআইনীভাবে
শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতিতে প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক সরাসরি বেকারত্বের শিকার হয়েছেন।
শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ও মানবিক সংকট
চাকরি হারানো এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের জীবন এখন অর্ধাহারে-অনাহারে কাটছে।
বেকার শ্রমিকরা প্রতিদিন বিভিন্ন কারখানার গেটে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন, যা এই শিল্পাঞ্চলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে।
১. অর্থনৈতিক
ভঙ্গুরতা: চাকরিচ্যুত শ্রমিকরা সঞ্চয় ভেঙে, জিনিসপত্র বিক্রি করে এবং ঋণের মাধ্যমে দিন পার করছেন। অনেকেই ঘরভাড়া দিতে
পারছেন না, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম
হয়েছে।
২. নিম্ন মজুরিতে
কাজ: বাধ্য হয়ে অনেকেই তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক কম মজুরিতে কাজ নিতে
বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মান আরও
নামিয়ে দিয়েছে।
৩. মানসিক ও
পারিবারিক চাপ: বেকারত্বের কারণে শ্রমিক পরিবারগুলোতে চরম হতাশা ও মানসিক চাপ
সৃষ্টি হয়েছে।
আন্দোলন দমনে হত্যা ও নিরব নির্যাতন
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করার সময় ৩ জন শ্রমিককে হত্যা
করা হয়েছে, যা এই শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক
অধিকারের পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বর্তমানে কারখানার ভেতরেও এক
ধরনের 'নিরব
নির্যাতন' চলছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- শ্রমিকদের সক্ষমতার
বাইরে মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ।
- ন্যায্য ছুটি না পাওয়া।
- যখন তখন চাকরি হারানোর
ভয়।
- শ্রমিকদের সাথে
অসৌজন্যমূলক ও খারাপ আচরণ।
- 'কালো
তালিকা' তৈরি:
চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের একটি
তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে
তারা অন্য কোনো কারখানায় চাকরি না পায়—যা তাদের কর্মসংস্থানের
সুযোগকে স্থায়ীভাবে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের ফারাক
অন্তর্বর্তী সরকার শ্রমিকদের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির
প্রতিশ্রুতি দিলেও, সাভার-আশুলিয়ার
বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্যাপক হারে কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই কেবল
শ্রমিকদের অধিকারকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পোশাক খাতকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে
ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, শ্রমিকদের জীবন দিয়ে অর্জিত আন্দোলনের ফলেও বৈষম্য দূর হয়নি, বরং তাদের জীবনে নেমে এসেছে আরও কঠোর ও অনিশ্চিত
বাস্তবতা।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালু
করার মাধ্যমে শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহাল নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
.jpg)
No comments:
Post a Comment