Followers

Thursday, September 25, 2025

পোশাক শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা: নাসা গ্রুপের কারখানা বন্ধের প্রভাব

 

পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই শিল্পের সামান্য অস্থিরতাও হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন-জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি নাসা গ্রুপ-এর আশুলিয়ার ১৬টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তটি তেমনই এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

নাসা গ্রুপ, যা ১৯৯০ সালে তাদের যাত্রা শুরু করার পর থেকে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে দেশের অন্যতম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক পোশাক ও টেক্সটাইল উৎপাদনকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। পোশাক উৎপাদন ছাড়াও ব্যাংকিং, রিয়েল এস্টেট, শেয়ার ব্রোকারেজ, শিক্ষা ও ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর বিশ্বখ্যাত ক্রেতা যেমন Sears, Kmart, Zara, Marks & Spencer-দের নিয়মিতভাবে পরিষেবা দিয়ে আসা এই গ্রুপের ৩৪টি কারখানায় কাজ করেন প্রায় ৩০ হাজার ৫ শত শ্রমিক। এই শ্রমিকদের জীবন চলে এই শিল্পকে কেন্দ্র করেই।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কারখানার টালমাটাল পরিস্থিতি

গত ৫ আগস্ট ২০২৪, সরকারের পটপরিবর্তনের পর নাসা গ্রুপের মালিক নজরুল ইসলাম মজুমদার গ্রেফতার হলে পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। মালিকের অনুপস্থিতিতে কারখানাগুলিতে টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে। সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে কলকারখানা প্রতিষ্ঠান ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে শ্রমিক নেতাদের উপস্থিতিতে এক চুক্তির মাধ্যমে আশুলিয়ার ১৬টি কারখানা ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

এই চুক্তিতে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি ১৫ থেকে ৩০ অক্টোবর এবং শ্রম আইনের ২০ ধারা মোতাবেক আইনানুগ পাওনা আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। এই চুক্তি আপাতত কিছু পাওনা মিটিয়ে দিলেও, এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক রাতারাতি বেকার হয়ে যাবেন, যা তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্যোগ নিয়ে আসবে। এই শ্রমিকরা সহজে বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজে পাবেন না, বিশেষত যখন এর আগে বেক্সিমকো কারখানাসহ আরও অনেকগুলো কারখানা বন্ধ হওয়ায় ইতিমধ্যেই প্রায় এক লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।

রাজনৈতিক কারণ ও অর্থনীতির ঝুঁকি

এই ধরনের বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত যখন আসে, তখন এর কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মালিকের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন, এত বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। অনেকেই মনে করছেন, কারখানা বন্ধের এই সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে নেওয়া হচ্ছে এবং সরকার কারখানাগুলি চালু রাখার জন্য কোনো বিকল্প পথ বা সমাধান খুঁজে দেখেনি

অভিযোগ রয়েছে, নাসা গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপের মালিকদের বিরুদ্ধে যেসব ঋণ সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা কার্যত দেশের অধিকাংশ গার্মেন্টস মালিকদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। গার্মেন্টস শিল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা একটি সাধারণ চিত্র, যেখানে নিজস্ব পুঁজি বলে কিছু নেই বললেই চলে। যদি রাজনৈতিক কারণে এভাবে একটার পর একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে থাকে, তবে তা শুধু বেকারত্ব নয়, দেশের পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে

সরকারের কাছে আবেদন: বিকল্প পথের সন্ধান হোক

বর্তমানে দেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা এক ভয়াবহ সংকটের মুখে। একদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে কর্মসংস্থান তৈরির ব্যর্থতা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হবে এই সমস্যার রাজনৈতিকীকরণ না করে, লক্ষাধিক শ্রমিকের জীবন বাঁচানোর জন্য অর্থনৈতিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া

এখনও সময় আছে। সরকারের উচিত, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নাসা গ্রুপের কারখানাগুলো চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রয়োজনে কারখানা পরিচালনার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হোক। দেশের প্রধান শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা এবং শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই শ্রমিকদের বেকারত্ব কোনোভাবেই অর্থনীতির জন্য সুসংবাদ হতে পারে না।

এই পরিস্থিতিতে সরকার কি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করে দ্রুত একটি কার্যকর সমাধানের পথ দেখাবে, নাকি দেশের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠীর পতন দেখতে হবে?

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

No comments:

Post a Comment

নিজস্ব জগৎ

  নিজস্ব জগৎ প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে — যেখানে ঢোকার চাবি কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না। সে জগৎ একান্ত , নীরব , নিজের ম...