বাংলাদেশের
অর্থনীতির মেরুদণ্ড এই গার্মেন্ট
শিল্প। অথচ এর ভিত গড়ে উঠেছে লাখো শ্রমিকের রক্ত-ঘামে, ত্যাগে আর সহনশীলতায়। তাদের
জীবন যেন এক বিশাল দোলনা, যেখানে সুখ আর দুঃখ পালা করে দোল খায়। প্রতিটি নতুন সকাল
আসে না আনন্দের বার্তা নিয়ে; বরং ভোরের আলোয় তাদের জন্য অপেক্ষা করে একই একঘেয়েমি,
নতুন সংগ্রামের অধ্যায়।
গার্মেন্ট
শ্রমিকদের দিন শুরু হয় তখনই, যখন শহর এখনও পুরোপুরি ঘুমের কোলে। ফ্যাক্টরির পথে
তাদের দীর্ঘ পদচারণা যেন জীবনের অন্তহীন দায়বদ্ধতার প্রতীক। কারখানার ভেতরে ঢুকলেই
তারা হারিয়ে যায় শত শত মেশিনের অবিরাম ঘর্ঘর শব্দে। সেই শব্দের নিচে চাপা পড়ে যায়
তাদের হাসি, আনন্দ, কিংবা ব্যক্তিগত নীরবতার আকাঙ্ক্ষা। প্রতিদিন একই কাজ হাজার হাজার পোশাকের সেলাই, একই
ফ্লোরে, একই গতিতে যেন সময়ও
এখানে থমকে আছে, কেবল পোশাকের গোনা সংখ্যাই জীবনের ঘড়ি টিকটিক করে।
দিন পেরোয়
সকাল থেকে দুপুর, তারপর সন্ধ্যা, আর অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত। ওভারটাইম যেন
আরোপিত নিয়ম, আর টার্গেট পূরণের দুশ্চিন্তা অবিরাম ছায়া। সামান্য দেরি, কিংবা
ক্ষুদ্রতম ভুলের জন্য ভর্ৎসনা, বকাঝকা, ধমক
এসব যেন তাদের প্রতিদিনের অনিবার্য সঙ্গী। এই মানসিক চাপ তারা
নীরবে সয়ে যায়, কারণ পেটের দায়ে, পরিবারের দায়ে, এই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পথ তাদের
খোলা নেই।
তবুও এই কঠিন
জীবনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট সুখের আলো। মাসের শেষে হাতে বেতন পাওয়ার
মুহূর্ত যেন অমলিন আনন্দের উৎসব। সেই টাকায় সন্তানের মুখে ভাত তুলে দেওয়া, নতুন
জামা কেনা, গ্রামে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে টাকা পাঠানো এসব ক্ষুদ্র অথচ অমূল্য আনন্দই তাদের
বেঁচে থাকার প্রেরণা। গার্মেন্ট শিল্প তাদের দিয়েছে একটি পরিচয়, দিয়েছে জীবনের
টিকে থাকার উপায়।
কিন্তু দুঃখের
বোঝা সুখের চেয়েও ভারী। কাজের চাপের নিচে চাপা পড়ে যায় নিজের শরীরের যত্ন, সামাজিক
জীবন, এমনকি পরিবারকে দেওয়া সময়ও। ছুটি তাদের কাছে এক দুর্লভ প্রাপ্তি। সামান্য
মজুরি দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয়, ফলে
জীবন হয়ে ওঠে আরও কঠিন।
তবুও সত্য
এটাই এই শ্রমিকরাই
আমাদের জাতীয় গর্ব। তাদের হাতের সেলাইয়ে তৈরি পোশাক বহন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
বাংলাদেশের পতাকা। ডলার আসে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে, আমাদের অর্থনীতি
এগিয়ে যায় তাদের ঘামে ভেজা পথ ধরে।
তাদের প্রতি
তাই কেবল দায়িত্ব নয়, নৈতিক কর্তব্যও
মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা, ন্যায্য মজুরি প্রদান, নিরাপদ
কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা। যেন তাদের জীবনের দোলনায় দুঃখ নয়, সুখের পাল্লাটিই হয় ভারী।
গার্মেন্ট শ্রমিক কেবল শ্রমিক নন, তারা আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রার নেপথ্যের নায়ক।
আর নায়কের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়াই আমাদের আজকের অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
লিখেছেনঃ
খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক
ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

No comments:
Post a Comment