একটি
মানবিক শিল্পনীতি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের
অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো সেই কোটি কোটি কর্মজীবী মানুষ, যারা প্রাতিষ্ঠানিক ও
অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাদের
ঘামে ভেজা হাতেই গড়ে উঠছে দেশের শিল্প, রপ্তানি, অবকাঠামো ও সেবাখাতের ভিত্তি।
কিন্তু এই শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা বিশ্লেষণ করলে এক গভীর বৈপরীত্য চোখে পড়ে—একদিকে তারা অর্থনীতির চালিকাশক্তি,
অন্যদিকে নিজেরাই বঞ্চিত একটি মানবিক জীবনযাপনের মৌলিক অধিকার থেকে।
যাযাবর
জীবনের প্রতিচ্ছবি
বাংলাদেশের
শ্রমিক সমাজের বড় অংশকেই বলা যায় ‘অর্থনৈতিক যাযাবর’। কেউ গ্রামের মাটি ছেড়ে এসেছে
শহরে, কেউ শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে-সবাই জীবিকার টানে, টিকে থাকার
সংগ্রামে। তাদের জীবনের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে চাকরির ধারাবাহিকতার উপর, মাটির
মালিকানার উপর নয়। তারা ভাড়া করা এক কামরার বাসায় পরিবার নিয়ে দিন কাটায়-যেন এক
অস্থায়ী তাবু, যার মেয়াদ নিয়োগকর্তার ইচ্ছার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
কাজ হারালে, বা কারখানা বন্ধ হলে, এই শ্রমিককে মুহূর্তেই অন্যত্র পাড়ি জমাতে হয়।
তার সন্তানের স্কুল, পরিবারের সামাজিক সম্পর্ক-সবকিছু ভেঙে যায় একবারে। এই ঘুরে
বেড়ানোই যেন তাদের জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা।
শিল্পের
বিকাশ ও মানবিক দায়িত্ব
বাংলাদেশ এখন
দ্রুত শিল্পায়নের পথে। গার্মেন্টস, চামড়া, জুতা, ইলেকট্রনিকস-নতুন নতুন শিল্প
কারখানা গড়ে উঠছে। এসব শিল্পের বিকাশে শ্রমিকের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই
শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশের অভাব উদ্বেগজনক।
অধিকাংশ
শ্রমিকই কারখানার আশপাশে গাদাগাদি করে থাকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। পর্যাপ্ত
বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন, চিকিৎসা বা শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
কর্মঘণ্টা শেষে তারা ফিরে আসে এক ক্লান্ত, ঘিঞ্জি ও বিষণ্ন জীবনে। ফলে তাদের
কর্মক্ষমতা যেমন কমে, তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও ভেঙে পড়ে।
শ্রমিক
কল্যাণে বাসযোগ্য শিল্প এলাকা অপরিহার্য
শিল্পের টেকসই
উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শ্রমিকদের জন্য মানবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা। একটি দেশের
উন্নয়ন তখনই স্থায়ী হয়, যখন উন্নয়নের মূল চালক-শ্রমজীবী মানুষ-নিরাপদ ও
মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।
তাই সরকার ও শিল্পমালিকদের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি বড় শিল্পাঞ্চলে নিম্নলিখিত উদ্যোগ
নেওয়া জরুরি-
·
শ্রমিক
আবাসন প্রকল্প: স্বল্প খরচে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত
বাসস্থান নির্মাণ।
·
শিক্ষা ও
স্বাস্থ্যসেবা: শ্রমিক পরিবারের জন্য বিনামূল্যে বা
স্বল্পমূল্যে বিদ্যালয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন।
·
নিরাপদ
যাতায়াত ব্যবস্থা: কারখানার শ্রমিকদের জন্য নির্ভরযোগ্য
পরিবহন ব্যবস্থা।
·
সবুজ ও
পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গাছপালা ও খেলার
জায়গা সহ মানবিক পরিবেশ সৃষ্টি।
·
শিশু
যত্নকেন্দ্র: বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য
কারখানার পাশে শিশুদের যত্নের উপযুক্ত ব্যবস্থা।
মানবিক
শিল্পনীতি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
শুধু শিল্প
উৎপাদনের হার বাড়ানোই উন্নয়ন নয়; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন শ্রমিক শ্রেণী
নিজেকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী নাগরিক হিসেবে অনুভব করে। রাষ্ট্রের উচিত
একটি মানবিক শিল্পনীতি প্রণয়ন
করা, যেখানে শ্রমিক কল্যাণকে কেবল দায় হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ
হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
শ্রমিকের কল্যাণে বিনিয়োগ মানে কেবল তাদের জীবনমান উন্নয়ন নয়, বরং এটি একটি
শক্তিশালী, দক্ষ ও উৎপাদনশীল কর্মশক্তি গড়ে তোলার পথও প্রশস্ত করবে।
বাংলাদেশের
শ্রমিক শ্রেণী দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তাদের ঘাম ও শ্রমে গড়ে উঠেছে জাতির
অগ্রগতির ভিত্তি। অথচ তারাই সবচেয়ে অস্থির, সবচেয়ে অনিশ্চিত জীবনে বন্দী। তাই এখন
সময় এসেছে শিল্পের পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনকেও "বাসযোগ্য ও স্থায়ী" করার।
শিল্প
যদি দেশের উন্নয়নের প্রতীক হয়, তবে শ্রমিকের কল্যাণই সেই উন্নয়নের আত্মা।
লিখেছেনঃ
খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স
শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

No comments:
Post a Comment