শুভ্র
যখন তিথিকে প্রথম দেখেছিল, তখন তার মনে হয়েছিল যেন সে এক অপ্সরীকে দেখছে—গ্রীক পুরাণের নার্সিসাসের মতোই অনিন্দ্যসুন্দরী এবং মনোমুগ্ধকর।
তিথির ব্যক্তিত্বে ছিল এক প্রবল আকর্ষণ, এক তেজস্বী আভা। প্রথমদিকে শুভ্র মুগ্ধ
হয়েছিল তার অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস এবং
জীবনের প্রতি তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখে।
তিথি
সব সময় বলত যে সে অন্য সবার চেয়ে আলাদা
এবং তার ভাগ্য শ্রেষ্ঠত্বের জন্য লেখা হয়েছে। সে ঘন্টার পর ঘন্টা নিজের সাফল্য
এবং ভবিষ্যতের অসীম ক্ষমতা, সৌন্দর্য ও
সাফল্যের কাল্পনিক গল্প শোনাত, আর শুভ্র মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। তার
প্রতিটি কথোপকথনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সে নিজে—তার নতুন ডিজাইনার পোশাক, তার
উচ্চ-পদস্থ পরিচিতি, অথবা যেকোনো ছোট অর্জনকে অতিরঞ্জিত করে বলা।
সময়ের
সাথে সাথে, শুভ্র বুঝতে পারল যে তিথির এই ঔজ্জ্বল্য কেবলই তার নিজের প্রতিবিম্বের আলো।
তিথি
দাবি করত যে শুভ্রকে সব সময় তার প্রশংসা করতে হবে। কোনো কারণে শুভ্র তার মনোযোগ
অন্য দিকে সরালেই তিথি অসন্তুষ্ট
হয়ে উঠত। সে আশা করত যে শুভ্র সর্বদা তার অহংকে
পুষ্ট করার জন্য প্রস্তুত থাকবে।
শুভ্র
যখনই কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা বা মানসিক কষ্ট নিয়ে তার সাথে কথা বলতে যেত, তিথি
দ্রুতই আলোচনাটিকে ঘুরিয়ে নিজের কোনো প্রয়োজন বা অসুবিধার দিকে নিয়ে যেত, যা
ছিল তার সহানুভূতির অভাবের
সুস্পষ্ট লক্ষণ। একবার শুভ্রর কাজের চাপ নিয়ে সে উদ্বিগ্ন হলে, তিথি তার উদ্বেগকে
গুরুত্ব না দিয়ে অভিযোগ করেছিল যে শুভ্র মনোযোগ না দেওয়ায় তার দিনটি নষ্ট হচ্ছে।
তিথি
আশা করত যে শুভ্র সব সময় তার ইচ্ছামতো কাজ করবে। তার কাছে, শুভ্র ছিল একটি সম্পদ, যাকে ব্যবহার করে সে নিজের
সামাজিক অবস্থান আরও দৃঢ় করবে। কোনো সুবিধা নিতে তিথি শুভ্রকে ব্যবহার করত। শুভ্রর কোনো সাফল্যে সে খুশি না হয়ে বরং
ঈর্ষান্বিত হতো এবং তিরস্কারের মাধ্যমে
শুভ্রর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করার চেষ্টা করত।
মাস
গড়াতে থাকে, আর তিথির আচরণ আরও নিয়ন্ত্রণমূলক
ও শোষণমূলক হয়ে ওঠে। সে শুভ্রকে বোঝাতে শুরু করে যে শুভ্র তার মতো বিশেষ
কারো যোগ্যই না, তিথি তার জীবনে না থাকলে শুভ্রর কোনো মূল্য নেই।
একদিন
শুভ্র আয়নায় তিথিকে নয়, বরং নিজেকে দেখতে পেল। তিথির আত্মপ্রেমের ফাঁদে পড়ে শুভ্র তার নিজস্বতা, আত্মবিশ্বাস আর সুখ সব
হারিয়ে ফেলেছে। সে অনুভব করল যে তিথির জগতের প্রতিটি মানুষ কেবল তার নিজের মহত্ত্বের প্রতিধ্বনি (Echo)
মাত্র, যার নিজস্ব কোনো স্বর নেই।
শুভ্র
অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল। সে বুঝতে পারল, তিথির এই তীব্র নিজের প্রতি আসক্তি তাকে কখনো অন্যের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে
দেবে না। শুভ্র সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করল, যেখানে তিথি তার নিজের প্রতিবিম্বের সামনে একা রয়ে গেল।
শুভ্র জানত, তিথি হয়তো অন্য কারো সন্ধানে যাবে, যে তার অহংকারী চাহিদাকে নতুন করে পূরণ করবে। কিন্তু শুভ্র তার নিজস্ব জীবন
ও আত্মমর্যাদা ফিরে পেল, সেই জীবন—যা তিথির অহংকারী ছায়া থেকে মুক্ত।
লিখেছেনঃ
খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা।

No comments:
Post a Comment