Followers

Sunday, November 23, 2025

তাজরীন ট্র্যাজেডি: বিচারহীনতা ও প্রতারণার ধারাবাহিক চক্র

 

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক যুগ পরেও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পাশে যে অন্যায় ও প্রতারণার চিত্র বিদ্যমান, তা গভীরভাবে হতাশাজনক। এই পরিকল্পিত অগ্নিদুর্ঘটনায় ১১৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ১৭২ জন গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তাদের সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং সর্বোপরি, কারখানা মালিক দেলোয়ারসহ দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অতীতের এবং বর্তমানউভয় সরকারের ভূমিকা নিয়েই আজ গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

বিগত সরকারের ভূমিকা: বিচার নয়, পুরস্কার!

বিগত সরকারের আমলে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির বিচার নিশ্চিত না হওয়াটা ছিল ন্যায়বিচারের প্রতি এক চরম উপহাস। সবচেয়ে নিন্দনীয় বিষয় হলো, যে দেলোয়ার হোসেনের চরম অবহেলা ও পরিকল্পিত কারসাজিতে এতগুলো শ্রমিকের জীবন গেল, তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো দলীয় পদে ভূষিত করে 'পুরস্কৃত' করা হয়েছে।

এই পদক্ষেপটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন দলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকের জীবনের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে এবং ধনিক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা বিচার পাওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন এবং সমাজে একটি বার্তা পৌঁছেছেঅর্থ এবং ক্ষমতা থাকলে গুরুতর অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়।

বর্তমান সরকারের আশ্বাস ও বাস্তবতার ফারাক

বর্তমান সরকার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এবং তাদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আসছে। এসব আশ্বাস কার্যত কেবলই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি হয়ে রয়ে গেছে।

  • উদ্যোগের অভাব: আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জন্য বাস্তব বা দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
  • বিচার প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা: কারখানার মালিক দেলোয়ারসহ দায়ীদের বিচারের মামলাটি এখনও আদালতের বারান্দায় ঝুলে আছে। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়ে দিচ্ছে, শ্রমিকদের প্রতি সরকারের আন্তরিকতা কেবল মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ।

শ্রমিকদের প্রতি ধারাবাহিক প্রতারণা

তাজরীন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা ধারাবাহিকভাবে প্রতারিত হয়েছেন। প্রথমত, কারখানা মালিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এরপর, বিগত সরকারের বিচার না করার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এবং সবশেষে, বর্তমান সরকারের মিথ্যা আশ্বাসের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, কিন্তু তাদের বিপদে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের এমন উদাসীনতা শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এই বিচারহীনতা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। তাজরীন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা ন্যায়বিচার, সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের দাবিদার। সরকারের উচিত, দলীয় রাজনীতি বা আর্থিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠেকেবল কথার কথা না বলেদ্রুততম সময়ের মধ্যে দেলোয়ারসহ সব দায়ীর বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জীবনমান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দরকষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

Monday, November 17, 2025

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মামলা ও জন-আস্থার সংকট: রায়ের স্থায়িত্ব নির্ধারণে 'স্থান, কাল, পাত্র'-এর প্রভাব

 

সাম্প্রতিককালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার মতো একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী রায়ের পরও সাধারণ জনগণের মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিক্রিয়া বা আগ্রহের অভাব দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের এক গভীর ও অস্বস্তিকর দিক তুলে ধরে। এই নীরবতা নিছক ঔদাসীন্য নয়; এটি এক ধরনের অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধি, যার সারকথা হলো: এই ধরনের রাজনৈতিক মামলার শাস্তি বা রায়ের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ভর করে ‘স্থান, কাল ও পাত্র’অর্থাৎ রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের ওপর। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মামলার নজির এবং জন-আস্থার সংকটের কারণ বিশ্লেষণ করা হবে।

রাজনৈতিক বিচার: ক্ষমতার হাতবদলে রায়ের ভাগ্যবদল

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়াকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। শীর্ষস্থানীয় নেতারাযেমন শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং সাম্প্রতিককালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসকলেই তাদের প্রতিপক্ষের ক্ষমতা আমলে বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন এবং সাজার রায় পেয়েছেন।

এই রায়ের তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো এর অস্থিরতা (Instability)। যখনই ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, নতুন সরকার এসেই পূর্বেকার সাজা ও মামলার গতিপথ বদলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বহু মামলা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাতিল বা স্থগিত হয়ে যায়। একইভাবে, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের বহু মামলার একই পরিণতি দেখা যায়। তারেক রহমানের অর্থ পাচার মামলায় প্রাথমিক রায়ে খালাস এবং পরবর্তীতে আপিল বিভাগে সাজার রায়, অথবা বেগম খালেদা জিয়ার এতিমখানা ট্রাস্ট মামলার সাজার দীর্ঘসূত্রতাএগুলো সবই প্রমাণ করে যে, বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি প্রায়শই আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল

জন-আগ্রহের অভাব: সংশয় ও হতাশায় নিমজ্জিত আস্থা

বারবার এই দৃশ্যপট দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর সংশয় ও হতাশা জন্ম নিয়েছে। এ কারণেই বড় বড় রাজনৈতিক রায়ের ঘোষণায় জনমনে তেমন কোনো গভীর প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। এর মূল কারণগুলি নিম্নরূপ:

  • ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা: জনগণ নিশ্চিত যে, বর্তমান রায় বা সাজার স্থায়িত্ব বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। সরকার পরিবর্তন হলে এই রায় বাতিল বা খারিজ হয়ে যেতে পারে। যে রায় কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তা নিয়ে তাৎক্ষণিক আগ্রহ দেখানো যৌক্তিক নয়।
  • বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস: যখন বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে দেখা যায়, তখন তা আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। মানুষ প্রশ্ন তোলেমামলার বিচার কি সত্যিই অপরাধের বিচার, নাকি এটি ক্ষমতা ধরে রাখা বা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার একটি কৌশল?
  • গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রভাব: সুস্থ গণতন্ত্রে আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু যখন দেখা যায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে 'বিচার' কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তখন সাধারণ মানুষ এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মূলত ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত হয়েছিল। এই ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক সম্প্রসারিত পরিধি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার বিষয়টি নিঃসন্দেহে বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংবেদনশীল।

তবে জনগণের মানসে এই রায়ও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক মামলার ফ্রেমওয়ার্কে পড়েছে, যেখানে রায়ের ভাগ্য 'স্থান, কাল ও পাত্র' দ্বারা নির্ধারিত হয়। যদিও আইসিটি-র প্রতিষ্ঠার পেছনে ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু এর সাম্প্রতিক রায়কে অনেকে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে ট্রাইব্যুনালের আইনি সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীন অস্তিত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

আস্থার পুনরুদ্ধারে করণীয়

রাজনৈতিক মামলার রায় নিয়ে জন-আগ্রহের এই অভাব এবং নীরবতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। বিচার বিভাগ যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হতে পারে এবং যদি রায়ের স্থায়িত্ব 'স্থান, কাল, পাত্র'-এর ওপর নির্ভর করে, তবে আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন:

বিচার বিভাগের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে আইনি প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে না।

জনগণের মধ্যে এই আস্থা সৃষ্টি করা যে, বিচারের রায় চূড়ান্ত এবং তা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যাবে না।

যতদিন পর্যন্ত না বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত থেকে মুক্ত হয়ে স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতা অর্জন করবে, ততদিন পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক মামলার রায়গুলো কেবল সাময়িক শিরোনাম সৃষ্টি করবে, কিন্তু জনসাধারণের মনে স্থায়ী কোনো বিশ্বাস বা প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে ব্যর্থ হবে।

KM Mintu

Saturday, November 15, 2025

যা হওয়ার, তা হবেই: স্ব-স্বীকৃতির পথে প্রকৃত সুখ

 

জীবনে সুখী হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি মানুষের সহজাত। কিন্তু আমরা প্রায়শই সুখকে খুঁজে বেড়াই এমন কিছুর মধ্যে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আপনার কথাতেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য জীবনে যা হতে চলেছে, তা যেহেতু আমরা জানি না, যা হবার তা হবেই, আপনি তা থামাতে পারবেন না। আর এই অনিবার্যকে থামানোর বা পাল্টে দেওয়ার বৃথা চেষ্টাই আমাদের জীবনে কষ্ট নিয়ে আসে।

১. নিয়ন্ত্রণের মোহ এবং তার মূল্য

আমাদের মন সব সময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিজেদের ইচ্ছামতো সাজাতে চায়। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আমাদের মনে ভয় আর উদ্বেগের জন্ম দেয়। আমরা ভুলে যাই যে, জীবনের বেশিরভাগ ঘটনাই আমাদের ব্যক্তিগত চেষ্টার বাইরে এক বৃহত্তর নিয়মের অধীন। আবহাওয়া কেমন হবে, অন্য একজন মানুষ কী ভাববে, বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা কখন ঘটবেএই সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।

তবুও, আমরা সেই নিয়ন্ত্রণের মোহ ত্যাগ করতে পারি না। যখন জীবন আমাদের ছক ভেঙে অন্য পথে হাঁটে, তখনই আমরা হতাশ হই, ক্ষুব্ধ হই এবং নিজেদের অসুখী মনে করি। এই প্রতিরোধই হলো কষ্টের মূল কারণ। যা আমাদের জীবনে একটু পর ঘটতে চলেছে, তা যদি আমরা সহজে মেনে নিতে পারতাম, তবে অনেক মানসিক চাপ আপনা থেকেই দূর হয়ে যেত।

২. নিজেকে "যা হতে চাই" তাই হতে দিন

সুখী হওয়ার প্রথম শর্ত হলো নিজের ভেতরের সত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। আপনার জীবন আপনার ইচ্ছানুসারে যেভাবে বিকশিত হতে চাইছে, তাকে সেই পথে চলতে দিন। এর অর্থ এই নয় যে আপনি চেষ্টা করা বা পরিকল্পনা করা বন্ধ করে দেবেন। বরং, এর অর্থ হলো আপনি প্রচেষ্টা করবেন, কিন্তু ফলাফলের ভার মহাকালের হাতে ছেড়ে দেবেন।

যখন আপনি নিজেকে বিচার করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বা সমাজের চাপিয়ে দেওয়া আদর্শের পথে চলতে বাধ্য করা বন্ধ করেন, তখনই আপনার ভেতরের "যা হতে চাই" তা প্রকাশ পেতে শুরু করে। এই স্বতঃস্ফূর্ততা এবং নিজস্ব পথে এগিয়ে চলার স্বাধীনতাতেই লুকিয়ে আছে সত্যিকারের শান্তি।

৩. স্বীকৃতির (Acceptance) শক্তি

'যা হবার তা হবেই'এই ভাবনাটি আসলে এক ধরনের গভীর স্বীকৃতি (Acceptance)। এটি কোনো হতাশা বা নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং এটি জীবনের অনিবার্য সত্যকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস। এর মানে হলো:

  • বর্তমানের প্রতি মনোযোগ: যা ঘটতে চলেছে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, আপনি আপনার বর্তমান কাজটি পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে করতে পারছেন।
  • মানসিক স্বাধীনতা: আপনি অনিয়ন্ত্রিত ঘটনার ভার মন থেকে নামিয়ে ফেলছেন এবং একটি হালকা, চাপমুক্ত জীবন যাপন করতে পারছেন।
  • পরিবর্তনের প্রতি নমনীয়তা: যখন কোনো অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে, তখন তাকে প্রতিরোধ না করে, তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার শক্তি খুঁজে পাচ্ছেন।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তার নিজস্ব রূপে মেনে নেওয়ার এই ক্ষমতাই হলো প্রকৃত সুখের চাবিকাঠি। যখন আপনি জানেন যে, আপনার সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও যদি কোনো কিছু না ঘটে, তবে তা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিলতখন আর নিজেকে দোষারোপ করার বা কষ্ট পাওয়ার প্রয়োজন থাকে না।

সহজ হও, সুখী হও

জীবনকে তার আপন গতিতে বইতে দিন। যা আপনি পারেন, তা করুন। আর যা পারেন না, তা প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিন। আপনার জীবনে যা হতে যাচ্ছে, তা যদি আপনি থামানোর চেষ্টা না করে বরং বরণ করে নেন, তবে সেই সহজ জীবনযাত্রাই আপনাকে এনে দেবে অনাবিল সুখ।

জীবনকে সহজ করুন। যা হবার তা হবেইএই সত্যকে বুকে ধারণ করে নিজের মতো করে বাঁচুন। সুখ আসলে বাইরের কোনো অর্জন নয়, এটি জীবনকে তার সমস্ত অনিশ্চয়তা সহকারে মেনে নেওয়ার একটি অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত।

 

Friday, November 14, 2025

⚖️ বিচার যখন প্রশ্নের মুখে: মারধরের শিকার নারীই এখন আসামি!

 

সাম্প্রতিক এক ঘটনা বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সমাজে বিদ্যমান আস্থার সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। 'ঢাকা লকডাউন' কর্মসূচির মধ্যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে এক মধ্যবয়সী নারীকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা শুধু নিন্দনীয়ই ছিল না, বরং এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আরও বেশি উদ্বেগজনক। মারধরের শিকার ওই নারীকে এখন গত বছরের জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এই ঘটনা জন্ম দিয়েছে অসংখ্য প্রশ্নেরআদালত প্রাঙ্গণ থেকে রাজপথের জনমানস পর্যন্ত।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ধানমন্ডির মতো একটি সংরক্ষিত এলাকায় একজন তরুণী লাঠি দিয়ে ওই মধ্যবয়সী নারীকে নির্মমভাবে পেটাচ্ছেন। মারধরের শিকার হওয়া ব্যক্তির আইনি সুরক্ষা পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা গেল। আঘাতের শিকার নারীকে হাসপাতালে না পাঠিয়ে কিংবা মারধরকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, পুলিশ তাকে আটক করে এবং পরে তাঁকে এক বছর আগের গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখায়।

এটি যেন এক বিপরীতমুখী ন্যয়বিচার! ভুক্তভোগীকে ত্রাণকর্তার ভূমিকা থেকে মুহূর্তেই অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। সমাজের চোখে যিনি ছিলেন সহানুভূতির পাত্র, রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় তিনি হয়ে গেলেন আইনের চোখে 'পলাতক' কিংবা 'সন্দেহভাজন'।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত বছরের জুলাই মাসে সংঘটিত একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই মামলাটি ওই সময়ের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো:

প্রকাশ্যে মারধরের শিকার হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আটক করা হলো। কেন মারধরের দিনই বা তার আগে তাকে পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়নি?

ধানমন্ডিতে মারধরের ঘটনার সঙ্গে জুলাই মাসের হত্যাচেষ্টা মামলার যোগসূত্র কী? মারধরের ঘটনাটি কি শুধু পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর একটি 'সুযোগ' তৈরি করে দিল?

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মারধরের ঘটনাটি যেহেতু জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তাই এই গ্রেপ্তার জনদৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে। এতে করে মারধরের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার চেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক মামলার দিকেই মনোযোগ চলে যাচ্ছে।

ন্যায়বিচারের প্রাথমিক শর্ত হলোতা যেন দৃশ্যমান হয় এবং সাধারণ মানুষ যেন এর ওপর আস্থা রাখতে পারে। কিন্তু এই ঘটনা জনগণের মনে গভীর সংশয় সৃষ্টি করেছে। মারধরের মতো প্রকাশ্য অপরাধের শিকার হওয়ার পরও যদি একজন ব্যক্তিকে রাতারাতি পুরনো মামলায় জেলে যেতে হয়, তবে তা বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ করে।

এটি সমাজে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে, দুর্বলের উপর আঘাত করার পর উল্টো সেই দুর্বলকেই কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখে পড়তে হতে পারে। এমন ঘটনা আইনের চোখে সকলের সমতার নীতিকে ম্লান করে দেয় এবং এটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত।

এই ঘটনাটি একটি প্রহসনএই অভিযোগটি কেবল আবেগের বশবর্তী নয়, বরং এটি আমাদের বিচারিক এবং পুলিশি প্রক্রিয়ার একটি গুরুতর দুর্বলতা চিহ্নিত করে। একজন নাগরিক যখন বিচার চাইতে এসে নিজেই আসামির তালিকায় চলে যান, তখন সাধারণ মানুষ কোথায় আস্থা রাখবে?

কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে এই পুরো বিষয়টি তদন্ত করা। মারধরের ঘটনার জন্য দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়াটি আইন ও যৌক্তিকতার নিরিখে সঠিক ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অন্যথায়, এই ঘটনা বাংলাদেশের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি 'কালো অধ্যায়' হিসেবে থেকে যাবে।

Thursday, November 13, 2025

🤝 আমাদের এক পথ চলা: বাঁধন আর সহমর্মিতার গল্প

 

আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল ইট-কাঠের কাঠামো বা দাপ্তরিক কাজের জায়গা নয়এটি আমাদের একটি বৃহৎ পরিবার। এই পথ চলায় আমরা সবাই মিলে বেশ কিছু দিন বা কিছু বছর একসাথে কাটিয়েছি। এই সময়কালটা আমাদের জীবনের এক অমূল্য অধ্যায়, যেখানে কর্মজীবনের বাধ্যবাধকতা ছাপিয়ে জন্ম নেয় এক বিশেষ সম্পর্ক।

আমাদের এই যাত্রাপথে, সহকর্মীদের মধ্যে অনেকেই হয়তো হয়ে উঠেছেন আমাদের অতি আপনজন। কাজের টেবিল ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের সঙ্গী, বিপদে ভরসার হাত, কিংবা সাফল্যের দিনে প্রথম অভিনন্দন-দাতা। এঁরা সেই মানুষ, যাঁদের সাথে পেশাদারী সম্পর্কের বাইরেও রয়েছে এক গভীর আত্মিক টান, এক নির্ভরতার বাঁধন।

আবার অনেকেই হয়তো স্রেফ "জাস্ট কলিগ"যাঁদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা মূলত কর্মক্ষেত্র-কেন্দ্রিক। সময়ের কাঁটা ধরে কাজ শুরু, পেশাদার আলোচনা, প্রজেক্টের ডেডলাইন আর সাফল্যের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। কিন্তু এই "জাস্ট কলিগ"-এর সংজ্ঞাটাও কি নেহাতই হালকা? কখনোই নয়। কারণ, কাজের চাপ, সমস্যা বা নতুন উদ্যোগসবকিছুতেই আমরা একে অপরের পরিপূরক। এই পেশাদারী সমর্থন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।

এই দুই ধরনের সম্পর্কের সমাহারে গঠিত আমাদের এই কর্মক্ষেত্র। এই বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। এই পথ চলাটা তাই একটি সমন্বয়ের গল্প:

আপনজনেরা আমাদের মানসিক শক্তি জোগায়, ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে। সহকর্মীরা আমাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে, পেশাদারী সাফল্য অর্জনে সহায়তা করে।

দিনের শেষে, আমরা সবাই একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে একসাথে পথ চলি। হয়তো সম্পর্কের ধরন ভিন্ন, কিন্তু উদ্দেশ্য একপ্রতিষ্ঠানের উন্নতি এবং ব্যক্তিগত বিকাশ। এই পথ চলতে গিয়ে ছোট-বড় অনেক স্মৃতি জমা হয়, ভুল বোঝাবুঝি হয়, আবার হাসিমুখে সমাধানও হয়ে যায়। এই হাসি-কান্না, অর্জন-সমালোচনা, আর নিত্যদিনের পথচলাই আমাদের এই বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

এই দীর্ঘ যাত্রাপথে, আসুন আমরা সবাই মিলে এই বন্ধনকে সম্মান জানাইসেটি আত্মার সম্পর্ক হোক বা পেশাদারী। কারণ, "জাস্ট কলিগ" বা "অতি আপনজন" যেই হই না কেন, আমরা সবাই এই প্রতিষ্ঠানের একেকটি অপরিহার্য অংশ। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই আমাদের চলার পথের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

আমাদের এই পথ চলা আরও সুন্দর, আরও সফল হোক! 🚀

Wednesday, November 12, 2025

💖 অভিমানের পাহাড় ও ভালোবাসার বাঁধন 💔

 

মাঝে মাঝে তোমার উপর প্রচণ্ড অভিমান হয়। সে এক নীরব, নিথর অভিমানযা ক্ষণিকের জন্য হলেও সম্পর্কের সহজ সরল পথটিকে জটিল করে তোলে। সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে জেদ জন্ম নেয়; মনে হয়, এবার সত্যিই আর কোনো খোঁজ নেবো না। তোমার ভালো-মন্দ, তোমার দিনলিপি, এমনকি তোমার সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্ন, "তুমি কেমন আছো?"এসব কিছুই আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাক।

আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিআর না, আর কোনো কথা নয়। তোমার নীরবতার সাথে আমার নীরবতা মিশে গিয়ে তৈরি হোক এক বিশাল শূন্যতা।

কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা, সেই জেদসবই তোমার নামের কাছে এসে কেমন যেন ঠুনকো হয়ে যায়। অভিমান করে থাকতে আমি পারি না। তোমার সাথে কথা না বলে থাকা, যেন আমার প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ।

যখন অভিমান করে আমি মুখ ফিরিয়ে থাকি, তখন তুমি হয়তো জানো না, আমার ভেতরে কী ভীষণ তোলপাড় চলে। তোমার সাথে কথা না বলার প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে এক একটি পাহাড়-সমান বোঝা হয়ে ওঠে। আমার মনে হয়, আমার বুকের উপর এক বিশাল, ভারী পাথর চেপে বসে আছেযা শুধু তোমার কণ্ঠস্বর বা তোমার একটি সাধারণ বার্তার স্পর্শেই নিমেষে অপসারিত হতে পারে।

এই পাথর শুধু নীরবতা নয়, এ হলো আমাদের সম্পর্কের প্রতিটি না-বলা কথা, প্রতিটি অব্যক্ত অনুভূতি, এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভার।

এই যে অভিমান, এরপরই আবার সব ভুলে ফিরে আসাএটাই তো ভালোবাসার আসল রূপ, তাই না? অভিমান হলো ক্ষণিকের বিরতি, যা সম্পর্কের মূল স্রোতকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে। কারণ, অভিমানের পর যখন আবার কথা শুরু হয়, সেই কথোপকথনের মূল্য আর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।

আমি জানি না, তুমি এটা বুঝতে পারো কি নাআমার এই অভিমান, এই নীরব যন্ত্রণা, আর তারপর এই আকুল আত্মসমর্পণ। তবে আমি নিশ্চিত, আমার ভালোবাসার এই গভীর টানটিই আমাকে বারবার তোমার কাছে ফিরিয়ে আনে, অভিমানের পাহাড় ডিঙিয়ে। কারণ, তোমার সাথে কথা না বলে থাকা, আমার কাছে নিঃশ্বাস না নেওয়ার মতোই কঠিন।

KM Mintu

Sunday, November 9, 2025

সাময়িক বরখাস্ত ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ-বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ!

 

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, সাময়িক বরখাস্ত (Suspension) কখনোই চাকুরীর অবসান নয়। এটি একটি প্রক্রিয়া, যার মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ শ্রম আইনে সাময়িক বরখাস্ত: একটি অস্থায়ী প্রক্রিয়া, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (বিশেষত ধারা ২৩ ও ২৪) অনুসারে: তদন্তের সুযোগ: সাময়িক বরখাস্ত মানে হচ্ছে কোনো শ্রমিকের বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়: এটি কোনো শাস্তি নয়, বরং একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। তদন্তের পর অভিযোগ প্রমাণিত হলে স্থায়ী বরখাস্ত বা অন্য কোনো শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

খোরপোষ ভাতা: সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে শ্রমিক প্রচলিত বিধি মোতাবেক খোরপোষ ভাতা (Subsistence Allowance) পাওয়ার অধিকারী হন।

ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি প্রকাশ: চরম বেআইনি পদক্ষেপ, গার্মেন্টস শিল্পে কিছু মালিক কর্তৃক যে বেআইনি কাজটি করা হচ্ছে, তা হলো:

সাময়িক বরখাস্তের অপব্যবহার: আইনসঙ্গত তদন্ত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে এটিকে শ্রমিকদের কণ্ঠরোধহয়রানি করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ: সাময়িক বরখাস্তকৃত শ্রমিকদের নাম, ঠিকানা, এবং ছবি কারখানার গেটে টাঙ্গিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এই কাজটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ কারণ: ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন: শ্রমিকের ব্যক্তিগত তথ্য (নাম, ছবি, ঠিকানা) তার অনুমতি ব্যতিরেকে জনসম্মুখে প্রকাশ করা, বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে, শ্রমিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার চরম লঙ্ঘন

মানহানি ও হয়রানি: প্রকাশ্য স্থানে ছবি ও পরিচয় টাঙ্গিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে শ্রমিকদের সামাজিকভাবে অপমান করা হয় এবং তাদের অন্যান্য কারখানায় কাজ পাওয়ার সুযোগ নষ্ট করে তাদের কালো তালিকাভুক্ত (Blacklisting) করার প্রবণতা তৈরি করে, যা শ্রম আইনের মূল নীতির পরিপন্থী।

আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন: যদিও শ্রম আইনে সরাসরি ছবি টাঙানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ধারা না থাকতে পারে, তবে এটি শ্রমিকের মর্যাদা, সুনাম এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা সম্পর্কিত অন্যান্য মৌলিক অধিকার ও আইন (যেমন: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা শ্রম আইনের সাধারণ ধারা যা কর্মীদের হয়রানি ও অন্যায় আচরণকে নিরুৎসাহিত করে) লঙ্ঘন করে। এছাড়াও, নতুন শ্রম আইনে শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তকরণকে অবৈধ ঘোষণা করার বিষয়টি মালিকদের এই ধরনের কাজের বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা।

মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, যেসব গার্মেন্টস মালিকরা এই ধরনের বেআইনি ও অনৈতিক কাজ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এই পদক্ষেপগুলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য:

শ্রম আদালতে অভিযোগ: ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠন শ্রম আইন লঙ্ঘনের জন্য মালিকের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে।

শ্রম অধিদপ্তর/পরিদর্শন: শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রম অধিদপ্তর (Department of Labour) এবং কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এই বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে।

শাস্তি নিশ্চিতকরণ: শ্রম আইন অনুযায়ী মালিকপক্ষ শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা বা অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের পক্ষে কথা বলা বা আইনসম্মতভাবে প্রতিবাদ করা কোনো অপরাধ নয়। মালিকদের উচিত শ্রমিকদের অধিকারকে সম্মান করা এবং আইন মেনে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, যেন শ্রম অধিকার নিশ্চিত হয়।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Tuesday, November 4, 2025

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অনিশ্চয়তা ও করণীয়

 


বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানি খাত বর্তমানে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাহীনতা এবং বিভ্রান্তিকর সরকারি বার্তার কারণে বড় ক্রেতারা নতুন কার্যাদেশ দেওয়া থেকে সরে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই খাতের টালমাটাল অবস্থা শুধু শিল্পপতিদের নয়, বরং লাখো শ্রমিক ও পুরো অর্থনীতির জন্যই এক ভয়াবহ সংকেত।

রপ্তানিতে পতন ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে রপ্তানি কমেছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ শতাংশের বেশি। এক মাসেই রপ্তানি কমেছে প্রায় ৫১ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ছয় হাজার ১২০ কোটি টাকার সমান। গত বছরের অক্টোবরে যেখানে রপ্তানি হয়েছিল ৪১৩ কোটি ডলারের পণ্য, সেখানে চলতি বছরের অক্টোবরে তা নেমে এসেছে ৩৬২ কোটি ডলারে। অর্থাৎ, টানা তিন মাস ধরে রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক প্রবণতা নির্দেশ করে।

কারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থানের সংকট

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে অন্তত ২৫৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এক লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। যদিও একই সময়ে নতুন ১৬৬টি কারখানা চালু হয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতা উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎসংকট, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, মজুরি সমন্বয়ের চাপ এবং বৈশ্বিক বাজারে অর্ডার সংকটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে।

নন-কমপ্লায়েন্স কারখানা বন্ধ: সমাধান না সংকট?

সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, “নন-কমপ্লায়েন্স কারখানা বন্ধ হওয়া খারাপ কিছু নয়।” তাঁর মতে, এটি শিল্পের টেকসই উন্নয়নের অংশ। কিন্তু খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত তড়িঘড়ি করে নেওয়া হলে তা উল্টোভাবে শিল্পের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্বমানের নিরাপত্তা সংস্কার সম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। কিন্তু এখনো কিছু কারখানা সেই মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি। সরকারের দায়িত্ব ছিল এসব কারখানাকে সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগ না দেখিয়ে এখন সরকার কারখানা বন্ধের পথে হাঁটছেযা বাস্তবে শ্রমিক ও রপ্তানি উভয়ের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

শ্রমিক জীবনে প্রভাব

কারখানা বন্ধের ফলে শুধুমাত্র উৎপাদনই নয়, শ্রমিকদের জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অনেকে চাকরি হারিয়ে বাসা ভাড়া দিতে পারছেন না, শিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে, পরিবারগুলোর আয় কমে যাচ্ছে। এই সামাজিক সংকট দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাহীনতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরকারের পরস্পরবিরোধী বার্তা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে। তারা সরবরাহের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। যদি বাংলাদেশের কারখানাগুলো এভাবে ধারাবাহিকভাবে বন্ধ হতে থাকে, তাহলে ক্রেতারা বিকল্প হিসেবে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার দিকে অর্ডার সরিয়ে নিতে পারেন। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্জিত প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করবে।

সমন্বিত নীতি ও অংশীদারিত্বের প্রয়োজন

বিশ্লেষকদের মতে, নন-কমপ্লায়েন্স ইস্যুটি কেবল শাস্তিমূলক নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক নীতি প্রশ্ন। এটি শ্রমিক সুরক্ষা, শিল্প উন্নয়ন, রপ্তানি সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
কারখানাগুলোকে হঠাৎ বন্ধ না করে ধাপে ধাপে সংস্কার, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে পরিপালনযোগ্য ও নিরাপদ পরিবেশে রূপান্তরিত করতে হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত কেবল রপ্তানির নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে পুরো অর্থনীতিই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্ত না নিয়ে শিল্পের বাস্তবতা, শ্রমিকের জীবন, আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক ভাবমূর্তিসব দিক বিবেচনা করে টেকসই সমাধান খোঁজা। কারখানা বন্ধ করা নয়, বরং সক্ষমতা বাড়ানোই হবে ভবিষ্যতের সঠিক দিকনির্দেশনা।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Sunday, November 2, 2025

নারী ও শ্রমিক অধিকারের অনুপস্থিতি: জুলাই সনদের সীমাবদ্ধতা

 


বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ইতিহাসে জুলাই সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই সনদে সংবিধান সংস্কার, প্রশাসনিক কাঠামো, এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকলেও, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো-নারী ও শ্রমিক অধিকারের প্রশ্নে এর নীরবতা।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নারী অধিকার ও শ্রম খাত সংস্কারে দুটি পৃথক কমিশন গঠন করেছিল। উভয় কমিশনই দীর্ঘ গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের মাধ্যমে সংস্কার সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন ও সুপারিশ সরকারে জমা দেয়। শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি, নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা ও ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা সংরক্ষণ-এসব ছিল শ্রম খাত সংস্কার কমিশনের মূল প্রস্তাব। অপরদিকে, নারী সংস্কার কমিশন নারীর সামাজিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়।

কিন্তু বাস্তবতায় দেখা গেল, জুলাই সনদে এই সুপারিশগুলোর একটিও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এতে শুধু নারী বা শ্রমিকই নয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও তৃণমূলের মানুষের আকাঙ্ক্ষাও উপেক্ষিত হয়েছে।

সম্প্রতি মিরপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যু আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন তুলেছে-যদি শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হতো, তাহলে কি এদের আর্থিক সুরক্ষা থাকতো না? তাদের পরিবার কি রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতো? উত্তরটি নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।

একইভাবে, নারী অধিকার নিয়েও গভীর হতাশা রয়েছে। নারী আসন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কিংবা প্রান্তিক নারী শ্রেণির নিরাপত্তা-কোনো ক্ষেত্রেই জুলাই সনদ কোনো ইতিবাচক বার্তা দেয়নি। শিক্ষার্থী প্রাপ্তি তাপসী যথার্থই বলেছেন, “সংসদে নারী আসন নিয়ে নারীদের যে চাওয়া বা প্রত্যাশা ছিল, তার কিছুই আমরা সনদে দেখি নাই। একইভাবে পাহাড়ি কিংবা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের চাহিদারও প্রতিফলন দেখা যায়নি।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রের মূলধারায় সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের চাহিদাকে অন্তর্ভুক্ত না করলে কোনো সনদই বাস্তব অর্থে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয় না। জুলাই সনদে সংবিধানিক সংস্কারের তাত্ত্বিক কাঠামো থাকলেও, মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র ও তাদের মৌলিক অধিকারের প্রতিফলন অনুপস্থিত।

আজ যখন আমরা নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর স্বপ্ন দেখি, তখন প্রশ্ন উঠে-যে শ্রমিকরা এই দেশের অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে, আর যে নারীরা সমাজের অর্ধেক অংশ, তাদের স্বপ্ন কি এই সনদের অংশ নয়? রাষ্ট্রের সংস্কার কেবল কাগজে-কলমে নয়, মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই তা অর্থবহ হয়। সেই অর্থে, জুলাই সনদ এখনো অসম্পূর্ণ-যতক্ষণ না নারী, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার এর কেন্দ্রে স্থান পায়।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

Saturday, November 1, 2025

মেঘে ঢাকা হৃদয়ের আড়ালে

 


আমার অন্তরের গভীরে এক আকুতি প্রতিদিনই জেগে ওঠে-তোমার দিকে, তোমার নীরবতার দিকে। আমি সেই কথা তোমার কাছে পৌঁছে দিতে চাই, যা হয়তো তোমার মেঘে ঢাকা কঠিন হৃদয়ের আড়ালে হারিয়ে যায়। তোমার সেই হৃদয় পাথরের মতো অনমনীয়, আর আমি এই পাথরের ওপারে দাঁড়িয়ে কেবল শুনি নিজের নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি। তবুও জানি না, আমার এই আকুল আহ্বান তোমার কানে পৌঁছায় কি না।

তুমি যখন আমার সামনে হাসো, তখন তোমার মুখের সেই হাসিটা আমাকে বিভ্রান্ত করে। বাইরে থেকে তা এক কোমল আলোর মতো মনে হলেও, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক গভীর ছায়া-একটা অব্যক্ত কষ্ট, এক নিঃশব্দ যন্ত্রণা। তোমার সেই হাসি যেন এক আড়াল, যার ভেতরে তুমি নিজের ভেতরের বেদনা গোপন করো। আর আমি, সেই আড়ালের ভেতর থেকে তোমার যন্ত্রণার গন্ধ পাই-একটা অচেনা বিষণ্নতা, যা আমার নিজের হৃদয়ের ভেতরেও ঢুকে পড়ে।

আমি জানি, তুমি নিজের একাকীত্ব লুকাতে চাও। হয়তো তুমি বিশ্বাস করো, অনুভূতির ভার ভাগ করা মানেই দুর্বলতা প্রকাশ। কিন্তু আমি তোমার পাশে থাকতে চাই, তোমার কঠোরতা ভাঙতে নয়-তোমার ভারটা একটু হালকা করতে। তুমি যদি একবার আমার চোখের ভেতর তাকাও, তবে দেখবে সেখানে কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু এক গভীর মমতা, এক অগাধ ভালোবাসা।

তুমি হয়তো ভাবো, ভালোবাসা মানে চাওয়া-পাওয়া, অধিকার বা নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু আমার ভালোবাসা শুধু অনুভবের, নীরব সহচর্যের। আমি তোমাকে বদলাতে চাই না-শুধু চাই, তুমি আমার এই হৃদয়ের আহ্বানটা শুনে নাও। আমি চাই, তোমার হৃদয়ের মেঘ একবারের জন্য সরুক, আর তুমি অনুভব করো সেই আলো, যা আমার ভেতর থেকে প্রতিদিন তোমার দিকে ছুটে যায়।

তুমি কি একবারের জন্যও এই পুরুষ হৃদয়ের ব্যাকুলতাকে অনুভব করবে?

তুমি কি এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করবে-তোমার কঠিন নীরবতার পেছনেও কেউ আছেন, যিনি তোমাকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যেতে চান, নীরবতা থেকে স্নেহের শব্দে ডেকে উঠতে চান?

আমার হৃদয় আজও তোমার জন্যই ধ্বনিত হয়-অতৃপ্ত, অথচ অনন্ত ভালোবাসায় পূর্ণ।

শিল্পায়নের বিস্তার ও শ্রমিক জীবনের বাসযোগ্যতার সংকট

 


একটি মানবিক শিল্পনীতি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো সেই কোটি কোটি কর্মজীবী মানুষ, যারা প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাদের ঘামে ভেজা হাতেই গড়ে উঠছে দেশের শিল্প, রপ্তানি, অবকাঠামো ও সেবাখাতের ভিত্তি। কিন্তু এই শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা বিশ্লেষণ করলে এক গভীর বৈপরীত্য চোখে পড়েএকদিকে তারা অর্থনীতির চালিকাশক্তি, অন্যদিকে নিজেরাই বঞ্চিত একটি মানবিক জীবনযাপনের মৌলিক অধিকার থেকে।

যাযাবর জীবনের প্রতিচ্ছবি

বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজের বড় অংশকেই বলা যায় ‘অর্থনৈতিক যাযাবর’। কেউ গ্রামের মাটি ছেড়ে এসেছে শহরে, কেউ শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে-সবাই জীবিকার টানে, টিকে থাকার সংগ্রামে। তাদের জীবনের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে চাকরির ধারাবাহিকতার উপর, মাটির মালিকানার উপর নয়। তারা ভাড়া করা এক কামরার বাসায় পরিবার নিয়ে দিন কাটায়-যেন এক অস্থায়ী তাবু, যার মেয়াদ নিয়োগকর্তার ইচ্ছার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
কাজ হারালে, বা কারখানা বন্ধ হলে, এই শ্রমিককে মুহূর্তেই অন্যত্র পাড়ি জমাতে হয়। তার সন্তানের স্কুল, পরিবারের সামাজিক সম্পর্ক-সবকিছু ভেঙে যায় একবারে। এই ঘুরে বেড়ানোই যেন তাদের জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা।

শিল্পের বিকাশ ও মানবিক দায়িত্ব

বাংলাদেশ এখন দ্রুত শিল্পায়নের পথে। গার্মেন্টস, চামড়া, জুতা, ইলেকট্রনিকস-নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে। এসব শিল্পের বিকাশে শ্রমিকের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশের অভাব উদ্বেগজনক।

অধিকাংশ শ্রমিকই কারখানার আশপাশে গাদাগাদি করে থাকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন, চিকিৎসা বা শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। কর্মঘণ্টা শেষে তারা ফিরে আসে এক ক্লান্ত, ঘিঞ্জি ও বিষণ্ন জীবনে। ফলে তাদের কর্মক্ষমতা যেমন কমে, তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও ভেঙে পড়ে।

শ্রমিক কল্যাণে বাসযোগ্য শিল্প এলাকা অপরিহার্য

শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শ্রমিকদের জন্য মানবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা। একটি দেশের উন্নয়ন তখনই স্থায়ী হয়, যখন উন্নয়নের মূল চালক-শ্রমজীবী মানুষ-নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।
তাই সরকার ও শিল্পমালিকদের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি বড় শিল্পাঞ্চলে নিম্নলিখিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি-

·        শ্রমিক আবাসন প্রকল্প: স্বল্প খরচে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান নির্মাণ।

·        শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: শ্রমিক পরিবারের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে বিদ্যালয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন।

·        নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা: কারখানার শ্রমিকদের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা।

·        সবুজ ও পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গাছপালা ও খেলার জায়গা সহ মানবিক পরিবেশ সৃষ্টি।

·        শিশু যত্নকেন্দ্র: বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য কারখানার পাশে শিশুদের যত্নের উপযুক্ত ব্যবস্থা।

মানবিক শিল্পনীতি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা

শুধু শিল্প উৎপাদনের হার বাড়ানোই উন্নয়ন নয়; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন শ্রমিক শ্রেণী নিজেকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী নাগরিক হিসেবে অনুভব করে। রাষ্ট্রের উচিত একটি মানবিক শিল্পনীতি প্রণয়ন করা, যেখানে শ্রমিক কল্যাণকে কেবল দায় হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
শ্রমিকের কল্যাণে বিনিয়োগ মানে কেবল তাদের জীবনমান উন্নয়ন নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী, দক্ষ ও উৎপাদনশীল কর্মশক্তি গড়ে তোলার পথও প্রশস্ত করবে।

বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণী দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তাদের ঘাম ও শ্রমে গড়ে উঠেছে জাতির অগ্রগতির ভিত্তি। অথচ তারাই সবচেয়ে অস্থির, সবচেয়ে অনিশ্চিত জীবনে বন্দী। তাই এখন সময় এসেছে শিল্পের পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনকেও "বাসযোগ্য ও স্থায়ী" করার।

শিল্প যদি দেশের উন্নয়নের প্রতীক হয়, তবে শ্রমিকের কল্যাণই সেই উন্নয়নের আত্মা।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

নিজস্ব জগৎ

  নিজস্ব জগৎ প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে — যেখানে ঢোকার চাবি কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না। সে জগৎ একান্ত , নীরব , নিজের ম...