Followers

Saturday, October 11, 2025

সীমারেখার কাঁটাতার

 

তিথি আর অভ্রর ভালোবাসা ছিল আকাশের মতো উদারঅন্তত তিথির দিক থেকে। তাদের সম্পর্কের শুরুটা ছিল রূপকথার মতো, কিন্তু যত দিন যেতে লাগলো, অভ্রর কাছে তিথির এই উদারতা যেন একরকম ভার হয়ে দাঁড়ালো। তিথি ভালোবাসতো অভ্রকে, আর ভালোবাসতো নিজের মতো করে। কিন্তু সেই ‘নিজের মতো করে’ ভালোবাসাটা কখন যে বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল, তিথি নিজেও বোঝেনি।

অভ্র অফিস থেকে ফিরলেই তিথি ছুটে আসতো। "কোথায় ছিলে এতক্ষণ? ফোনটা ধরছিলে না কেন? বসের সাথে কী কথা হলো? পাশের ডেস্কে বসা মেয়েটা কি আজ তোমার দিকে তাকিয়েছিল?"প্রশ্নগুলো শুনতে শুনতে অভ্রর মনে হতো, সে যেন কোনো নিরন্তর জেরার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। তিথির কণ্ঠে ভালোবাসা ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ধরনের তীব্র অধিকারবোধ।

তিথির কাছে অভ্র ছিল তার জীবনের কেন্দ্রে। তাই সে চাইতো অভ্রও যেন তার চারপাশে ঘোরে। অভ্র বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখতে গেলে তিথি সারাক্ষণ মেসেজ করতো, "কখন ফিরবে? আমার খুব একা লাগছে।" অভ্রর প্রোফাইল পিকচারে অন্য কোনো মেয়ের কমেন্ট দেখলেই তিথি রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে দিতো। একবার অভ্রর ছোটবেলার এক বান্ধবী জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করেছিল, আর তাতেই তিথি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিল, "কেন সে এখনো তোমার সাথে যোগাযোগ রাখবে? তোমার জীবনে শুধু আমিই তো যথেষ্ট!"

অভ্র প্রথম দিকে তিথির এই আচরণকে তার 'গভীর ভালোবাসা' হিসেবেই দেখতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সে হাঁপিয়ে উঠলো। তার মনে হতে লাগলো, তিথির ভালোবাসা যেন একটা ভারী জালের মতো, যা তাকে চারপাশ থেকে জাপটে ধরে শ্বাসরুদ্ধ করে দিচ্ছে। সে যেন তিথির কোনো প্রিয় সম্পত্তি, যার উপর তিথির নিরঙ্কুশ অধিকার।

একদিন সন্ধ্যায় দু'জনে বসে ছিল। অভ্র কোনো বিষয়ে মন দিয়ে কাজ করছিল, আর তিথি বারবার অভ্রকে জিজ্ঞেস করছিলসে তাকে আগের মতো ভালোবাসে কিনা।

বিরক্ত হয়ে অভ্র বলল, "তিথি, সবসময় আমিই কেন প্রমাণ দেবো যে আমি তোমাকে ভালোবাসি? তুমি আমার প্রতিটি পদক্ষেপে এত নিয়ন্ত্রণ করতে চাও কেন? তুমি আমার বন্ধু-বান্ধব, আমার ব্যক্তিগত জায়গায় নাক গলাচ্ছোএটা ভালোবাসা নয়, তিথি। এটা অসুস্থতা।"

তিথি কেঁদে ফেললো। "তুমি বলছো আমি অসুস্থ? আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি বলেই এমন করি। তুমি কি বোঝো না, আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে থাকি?"

"ঠিক এই ভয়টাই তো আমাদের সম্পর্কটাকে বিষিয়ে দিচ্ছে, তিথি!" অভ্র বলল। "ভালোবাসা মানে মুক্ত শ্বাস নিতে দেওয়া। তোমার এই অতিরিক্ত অধিকারবোধ, এই ঈর্ষাআমার মনে হচ্ছে তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না। আমি তোমার ওথেলো সিনড্রোমের শিকার হতে চাই না।"

তিথির কাছে এই কথাগুলো ছিল আঘাতের মতো। সে ভাবতে পারেনি তার ভালোবাসা এমন নেতিবাচকভাবে ফিরে আসবে। তাদের মধ্যে অসামঞ্জস্য এত বেড়ে গিয়েছিল যে, অভ্রর কাছে তিথির শত চেষ্টা সত্ত্বেও সেই ভালোবাসা আর 'যথেষ্ট' মনে হতো না।

কয়েক মাস ধরে তাদের মধ্যে চলতে থাকলো শীতল যুদ্ধ। তিথি চেষ্টা করলো নিজেকে বদলাতে, অভ্রকে একটু স্বাধীনতা দিতে। কিন্তু অভ্র ততদিনে মানসিকভাবে অনেক দূরে চলে গেছে। সে বুঝে গিয়েছিল, এই সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা তাদের দু'জনের জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছেবিশেষ করে তিথির এই আবেগ তাকে কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনে মন দিতে দিচ্ছে না।

অবশেষে এক কঠিন সিদ্ধান্ত এলো। যখন বোঝাপড়ার আর কোনো পথ রইল না, তখন অভ্র বিচ্ছেদের কথা বললো।

তিথি প্রথমে মানতে পারেনি। "আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না!"তার কান্নায় অভ্রর মন গলে গেল না। সে শান্তভাবে জানালো, তাদের এই 'বিষাক্ত ভালোবাসা' থেকে বেরিয়ে আসাটাই এখন দু'জনের জন্য মঙ্গল।

বিচ্ছেদের পর তিথির জীবনে নেমে এলো এক তেতো অধ্যায়। সে অভ্রকে দোষারোপ করতে শুরু করলো, কারণ তার কাছে মনে হলো, ভালোবাসার মূল্য সে-ই বেশি দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, যখন সে নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলো, তখন উপলব্ধি করলোআসলে ভালোবাসা দিয়ে সে অভ্রকে বাঁধতে চায়নি, বেঁধেছিল তার নিজের নিরাপত্তাহীনতা দিয়ে।

তিথি শিখলোভালোবাসার স্বাস্থ্যকর চর্চা জীবনের সমৃদ্ধি আনে, আর তার অসুস্থতা কেবল ক্ষতিই ডেকে আনে। অতিরিক্ত আবেগ আর তীব্র অধিকারবোধের কাঁটাতার সরিয়ে এবার সে নিজেকে ভালোবাসতে শিখলো, এবং আশা করলোপরবর্তী সম্পর্কে সে ভালোবাসবে সীমারেখা মেনে, একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা ও সমাজকর্মী

No comments:

Post a Comment

মহান মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে মহান মে দিবস এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্...