![]() |
খাইরুল মামুন মিন্টু |
বাংলাদেশের
অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার ও টেক্সটাইলশিল্প। এই শিল্প কেবল বিপুল
পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাই এনে দেয় না, এটি দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানও
নিশ্চিত করে। তবে গত এক বছরে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর
মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এক গভীর সংকটের
ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক, যা দেশের অর্থনীতি এবং সামাজিক
কাঠামোর জন্য এক অশনি সংকেত।
বেকারত্বের
প্রবল আঘাত
বিভিন্ন পত্র
পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, এই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে সাভার-আশুলিয়াতে একাই বন্ধ হয়েছে
২১৪টি, যেখানে প্রায় ৩১ হাজার
শ্রমিক বেকার হয়েছেন। গাজীপুরে
৭২টি কারখানা বন্ধ হওয়ায় বেকার হয়েছেন সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭৩ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। চট্টগ্রাম,
নারায়ণগঞ্জ এবং নরসিংদীর চিত্রও একই রকম হতাশাজনক। এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের হঠাৎ
কর্মহীন হয়ে পড়া মানে হাজার হাজার পরিবারের আয়ে ছেদ পড়া।
শ্রমিকরা,
যারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেন, তাঁরা এখন চাকরির খোঁজে ঘুরতে
ঘুরতে হতাশ হয়ে গ্রামে ফিরছেন। তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন এবং পরিবার পরিজনের
দুরাবস্থা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়
এটি মানবিক বিপর্যয়ের এক প্রতিচ্ছবি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক
হলো, এই শ্রমিকরা যখন তাঁদের ন্যূনতম পাওনা আদায়ের চেষ্টা করেছেন, তখন উল্টো
মামলা, হামলা, জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়েছে। সরকারী উদ্যোগে তাঁদের কোনো বিকল্প
কর্মসংস্থান বা সহায়তা করা হয়নি।
নতুন
শঙ্কা: নাসা গ্রুপের কারখানা বন্ধ
পুরোনো
বেকারত্বের ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি গভীর উদ্বেগ। নাসা
গ্রুপের মতো বড় আকারের কারখানাও যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কর্মরত, তবে বেকার
শ্রমিকের সংখ্যা আরও ৩০ হাজার বাড়বে। এই ৩০ হাজার শ্রমিকের পরিবারও নতুন করে
অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। ইতোমধ্যেই কর্মহীন ১ লাখ ১৯ হাজারের বেশি শ্রমিকের
কর্মসংস্থান হয়নি, এর উপর নতুন করে এই শ্রমিকরা যুক্ত হলে সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও
ভয়াবহ হবে।
অর্থনীতির
উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
কারখানা বন্ধ
হওয়া মানে কেবল শ্রমিক বেকার হওয়া নয়; এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং দেশের
সামগ্রিক অর্থনীতির উপর পড়বে: কর্মসংস্থান হারানো শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমে
যায়। ফলে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা হ্রাস পায়, যা পরোক্ষভাবে অন্যান্য শিল্প ও
ব্যবসার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বেকারত্ব এবং আর্থিক দুরাবস্থা সমাজে হতাশা ও
অস্থিরতা বাড়ায়, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। তৈরি পোশাক ও
টেক্সটাইল শিল্পের কারখানা বন্ধের সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের মোট উৎপাদন এবং
রপ্তানি আয়ের উপর। এতগুলো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক
ক্রেতাদের মধ্যে দেশের শিল্পখাত নিয়ে আস্থা সংকট তৈরি করতে পারে।
সরকারের
প্রতি আহ্বান
এই
পরিস্থিতিতে, সরকারের কাছে প্রত্যাশা হলো, বন্ধ কারখানার সিদ্ধান্ত নেওয়ার
পরিবর্তে তা পুনরায় কীভাবে চালু করা
যায় সেই বিষয়ে জরুরি এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। শ্রমিক বেকার হওয়া
মানে দেশের এক বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া। সরকার ও শিল্প
মালিকপক্ষকে সমন্বিতভাবে এই সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে।
বন্ধ হয়ে
যাওয়া কারখানাগুলো কেন বন্ধ হলো, তার কারণ অনুসন্ধান করে দ্রুত আর্থিক ও নীতিগত
সহায়তা দিয়ে সেগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা জরুরি। যে
শ্রমিকরা ইতোমধ্যেই বেকার হয়েছেন, তাঁদের জন্য সরকারী উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদী
প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাঁরা অন্য কোনো খাতে
নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে
পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে এবং পাওনা আদায় করতে গিয়ে শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ
করতে হবে।
দেশের লাখ লাখ
শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
বজায় রাখা এই দুইয়ের
স্বার্থেই কারখানা বন্ধের এই ধারাকে অবিলম্বে থামাতে হবে এবং বন্ধ কারখানাগুলো
পুনরায় সচল করার যথাযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
লিখেছেনঃ
খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক
ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

No comments:
Post a Comment