Followers

Sunday, October 19, 2025

শ্রমিক আন্দোলন ধ্বংসের ষড়যন্ত্র ও মুক্তির পথ: ঐক্যের আবশ্যকতা

দীর্ঘদিনের আশঙ্কা আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শ্রমিক নেতাদের মধ্যে চরম বিভক্তির মধ্য দিয়ে মালিকপক্ষের শ্রমিক আন্দোলন ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র যেন আজ পূর্ণতা পেয়েছে। বর্তমানে গার্মেন্টসসহ দেশের বিভিন্ন শিল্প ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জীবনমান অত্যন্ত শোচনীয়। স্বল্প মজুরি, চাকুরীর নিরাপত্তার অভাব, শ্রমিকদের নামে মিথ্যা মামলা, কর্মক্ষেত্রের খারাপ পরিবেশ, খারাপ ব্যবহার এবং সময়মতো মজুরি না পাওয়াসহ অসংখ্য সমস্যায় শ্রমিক সমাজ জর্জরিত।

আইনি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রায় ৪৬টি শ্রম সেক্টর এবং অসংখ্য অস্বীকৃত সেক্টরে নিয়োজিত কোটি কোটি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৫ বছর পর পর ঘোষণার বিধান থাকলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবের মুখ দেখেনি। অধিকার আদায়ের জন্য আইনি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সেক্টরগুলোতে প্রায় একশোরও বেশি জাতীয় ফেডারেশন এবং কেবল গার্মেন্টস সেক্টরেই প্রায় ১৪০০ কারখানায় বেসিক ইউনিয়ন এবং ৭০টি সেক্টর-ভিত্তিক ফেডারেশন কাজ করছে। এত বিপুল সংখ্যক সংগঠনের উপস্থিতি সত্ত্বেও শ্রমিকদের অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন না হওয়া এক চরম বেদনাদায়ক বাস্তবতা।

এই করুণ অবস্থার মূল কারণ হলো শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চরম মাত্রার দ্বন্দ্ব। সংগঠনগুলোর এই বিভক্তির মূলে রয়েছে মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত। মালিক এবং সরকারের কাছ থেকে ব্যক্তিগত বা দলগত সুবিধা নেওয়াকে কেন্দ্র করেই এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বেশি তীব্র হয়। বিশেষ করে এনজিও-ভিত্তিক বা তাদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা কিছু সংগঠনের মালিকদের সহায়তায় কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা নিয়ে যে বিতর্ক ও সংঘাত, তা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে বড় অন্তরায়। এই বিভেদ আন্দোলনের শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা প্রকারান্তরে মালিকপক্ষের স্বার্থকেই রক্ষা করছে।

যখন কোনো আন্দোলন আভ্যন্তরীণ কোন্দলে জীর্ণ হয়ে পড়ে, তখন তার লক্ষ্যচ্যুত হওয়া অনিবার্য। বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনও আজ সেই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। সংগঠনের নেতারা যখন ব্যক্তিগত সুবিধা, দলীয় আনুগত্য বা অর্থনৈতিক প্রাপ্তির লোভে একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন, তখন শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য গৌণ হয়ে যায়। আন্দোলনের গতিপথ নিয়ন্ত্রিত হয় বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তির হাতে। ফলস্বরূপ, শ্রমিকরা দিনের পর দিন তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।

শ্রমিক আন্দোলনকে ধ্বংস করার যে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র মালিকপক্ষ করে চলেছে, তা রুখে দেওয়ার একমাত্র হাতিয়ার হলো শ্রমিক সংগঠনগুলোর দৃঢ় ঐক্য। এই মুহূর্তে প্রয়োজন হলো সকল দল, মত ও ব্যক্তিগত সুবিধা-স্বার্থ পরিহার করে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ইস্পাতকঠিন বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে সকল সেক্টরের সকল ফেডারেশন ও ইউনিয়নকে ভুলে যেতে হবে তাদের অতীত কোন্দল এবং এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও সম্মানজনক জীবনযাপনের দাবি জানাতে হবে।

যতদিন না শ্রমিক সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যেকার সকল দ্বন্দ্ব নিরসন করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে, ততদিন শ্রমিকদের অধিকার আদায় সুদূরপরাহত থাকবে। কেবল একটি সম্মিলিত ও অটল শ্রমিক আন্দোলনই পারে শোষণের জাল ছিন্ন করে শ্রমিকদের মুক্তি এনে দিতে। কারণ, শ্রমিকের মুক্তি কোনো একক নেতার বা সংগঠনের দ্বারা সম্ভব নয়তা কেবল সম্ভব সকল শ্রমিকের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর এবং ঐক্যবদ্ধ শক্তির মাধ্যমে। এই ঐক্যই হবে শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং শোষণমুক্তির চাবিকাঠি।

তাই, সময় এসেছে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর শ্রমিক সমাজের কল্যাণে এক পতাকাতলে আসার। এই ঐক্যের মাধ্যমেই শ্রমিক আন্দোলন তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং নিশ্চিত করতে পারবে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি ও ন্যায্য অধিকার।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দরকষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


No comments:

Post a Comment

নিজস্ব জগৎ

  নিজস্ব জগৎ প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে — যেখানে ঢোকার চাবি কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না। সে জগৎ একান্ত , নীরব , নিজের ম...