বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপটে জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা: অগ্রাধিকারের প্রশ্নে পুনর্মূল্যায়ন
সম্প্রতি
মিরপুরের শিয়ালবাড়ী গার্মেন্টস কারখানা, চট্টগ্রাম ইপিজেড, এবং ঢাকার
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো
আমাদের জাতীয় উদ্বেগের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর আগেও তাজরিন ফ্যাশনস, হামিম
গ্রুপসহ বহু শিল্প-কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ও
বিপুল সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দেশের অর্থনীতি ও মানুষের
জীবনযাত্রার মূল ভিত্তি মানুষের জীবন ও তাদের কষ্টার্জিত
সম্পদ এখনও পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই
বাস্তবতায়, সাধারণ জনগণের মনে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে: যখন দেশের ভেতরে
নিয়মিতভাবে জীবন ও সম্পদের এমন ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, তখন কি সরকারের অগ্রাধিকারের
খাতগুলোতে কোনো ভারসাম্যহীনতা রয়েছে?
নিরাপত্তা
ও প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহিরাগত
হুমকি মোকাবিলার জন্য সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখা অপরিহার্য। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র
কেনা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ। তবে, প্রশ্ন হলো দেশের অভ্যন্তরে যে "দৈনন্দিন যুদ্ধ" চলছে আগুন, দুর্ঘটনা ও
অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তা মোকাবেলার জন্য কী পরিমাণ
গুরুত্ব ও সম্পদ বরাদ্দ করা হচ্ছে?
দেশের
সম্পদ বলতে কেবল সামরিক সরঞ্জাম বা প্রাকৃতিক সম্পদকে বোঝায় না, এর প্রধানতম অংশ
হলো দেশের জনগণ ও তাদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ। লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ
হয় যে গার্মেন্টস কারখানাগুলো থেকে, যে বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো দেশের অর্থনীতির
চালিকাশক্তি, সেগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশের সম্পদের সুরক্ষারই অংশ।
শ্রমিকদের জীবন রক্ষা করা, কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ করা, এবং কোটি কোটি টাকার
যন্ত্রপাতি ও পণ্যসামগ্রী পুড়ে যাওয়া থেকে বাঁচানো এগুলো সরাসরি জাতীয় সম্পদের সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত।
ফায়ার
সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আধুনিকীকরণ, তাদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, এবং
দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা আজ সময়ের
দাবি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে, যা মোকাবিলায়
বর্তমান সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত। সরকারের উচিত যুদ্ধাস্ত্র কেনার পাশাপাশি জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষার এই
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতেও বিপুল বিনিয়োগ করা।
মানবিক
দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষের জীবনের মূল্য অপরিসীম। কোনোভাবেই যেন মুনাফার তাড়নায়
শ্রমিকের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা জরুরি। যথাযথ
অগ্নি-প্রতিরোধক ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার
শৈথিল্য না দেখানো নিশ্চিত করতে হবে।
সুতরাং,
সরকারের উচিত হবে দেশের ভেতরের এই নীরব দুর্যোগ
মোকাবেলায় প্রতিরক্ষা খাতের মতোই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। জাতীয় অগ্রাধিকারের
ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন, যেখানে মানুষের জীবন এবং তাদের নিরাপত্তা হবে প্রথম ও প্রধানতম অগ্রাধিকার।
অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হলো যেকোনো দেশের
সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। যুদ্ধাস্ত্রের মতোই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা সরঞ্জাম এবং সুরক্ষা নিশ্চিতকারী কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আজ
বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দরকষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

No comments:
Post a Comment