ভালোবাসা—মানুষের জীবনের সবচেয়ে পবিত্র,
সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। এই ভালোবাসাই কখনো মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, আবার কখনো একই
ভালোবাসা পরিণত হয় মানসিক ক্লান্তি ও অসহায়তার উৎসে। কারণ, ভালোবাসা যখন নিজের
স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে অতিরিক্ত আবেগে পরিণত হয়, তখন তা সম্পর্কের ভারসাম্যকে নষ্ট
করে ফেলে।
সম্পর্কে
দু’জন মানুষ পরস্পরের প্রতি যত্নবান থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন একজন তার
সমস্ত সত্তা, প্রতিটি ভাবনা, প্রতিটি নিশ্বাস অন্যজনের উপর কেন্দ্রীভূত করে ফেলে—তখন সেই ভালোবাসা ধীরে ধীরে
শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে ওঠে। সম্পর্কের একপাশের ওজন যত বাড়ে, অন্যপাশ ততটাই হালকা হয়ে
পড়ে। এই ভারসাম্যহীনতাই জন্ম দেয় ভুল বোঝাবুঝি, মানসিক দূরত্ব ও অভিযোগের
পাহাড়।
“সে আর আগের
মতো ভালোবাসে না”—এই বাক্যটি
তখন বাস্তবতার চেয়ে বেশি আসে অসন্তুষ্টি ও প্রত্যাশার অতিরিক্ত চাপ থেকে।
ভালোবাসা কখনোই মাপার বিষয় নয়; কিন্তু যখন তা তুলনার মাপে বিচার করা শুরু হয়,
তখন আবেগের স্বচ্ছতা নষ্ট হয়ে যায়। কারণ ভালোবাসা প্রতিদান দাবি করে না—এটি কেবল অনুভবের জায়গা।
অতিরিক্ত
ভালোবাসা অনেক সময় মানসিক নির্ভরতার রূপ নেয়। মানুষ তখন প্রিয়জনকে নিজের
সম্পত্তি মনে করে, তার ওপর একধরনের অদৃশ্য মালিকানা খাটাতে চায়। এর ফলেই জন্ম
নেয় সন্দেহ, ঈর্ষা, নজরদারি ও আত্মসম্মানহানি। এমন এক অবস্থায় ভালোবাসা আর
মুক্তির জায়গা থাকে না—বরং তা হয়ে
ওঠে মানসিক শৃঙ্খল।
সুস্থ
সম্পর্কের মূল হলো সমতা, সম্মান ও স্বাধীনতা। একজনের অতিরিক্ত উপস্থিতি
যেমন সম্পর্ককে দমিয়ে ফেলে, তেমনি অতিরিক্ত অনুপস্থিতিও তা নিঃশেষ করে দেয়। তাই
দরকার একটি সুস্থ সীমারেখা—যেখানে
ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু অধিকারবোধ নয়; কাছাকাছি থাকার তাগিদ থাকবে, কিন্তু
শ্বাসরুদ্ধকর আঁকড়ে ধরা নয়।
যদি সম্পর্কের
টানাপোড়েন দুইজনের মধ্যকার আলোচনায় মীমাংসা করা যায়, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে
ইতিবাচক পদক্ষেপ। একে অপরের চাহিদা, সীমা ও দুর্বলতা বুঝে নেওয়াই পারে সম্পর্ককে
নতুন প্রাণ দিতে।
তবে যদি সেই বোঝাপড়া না গড়ে ওঠে—আর
সম্পর্ক যদি ক্রমে মানসিক চাপ, হতাশা ও ব্যক্তিজীবনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়—তবে বিচ্ছেদও হতে পারে একটি
প্রয়োজনীয় ও মর্যাদাপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
বিচ্ছেদ মানেই
ব্যর্থতা নয়, বরং কখনো কখনো তা আত্মরক্ষার উপায়। কারণ ভালোবাসার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ
হলো নিজের মানসিক সুস্থতা। ভালোবাসা তখনই সুন্দর, যখন তা মুক্ত করে—বেঁধে নয়।
লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন
মিন্টু, শ্রমিকনেতা ও সমাজকর্মী
No comments:
Post a Comment