Followers

Wednesday, June 10, 2026

বাজেট কার জন্য—সরকারি কর্মচারীদের জন্য, নাকি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জন্য?

আগামী ১১ জুন ২০২৬ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে জানা গেছে, নতুন পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এবং আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর ৫০ শতাংশ সুবিধা পেতে শুরু করবেন। এর ফলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকায় উন্নীত হওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, দেশের প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারগুলোর জন্য এই বাজেটে কী আছে?

বাংলাদেশে শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ। পরিবারপ্রতি গড়ে দুইজন সদস্য হিসাব করলেও শ্রমিক পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ। দেশের শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, সেবা ও রপ্তানি খাতের সমগ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও শ্রমের ওপর। অথচ বাজেটের আলোচনায় তাদের অস্তিত্ব যেন ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, চামড়া খাত, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার অজুহাতে গণছাঁটাই করা হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েও প্রাপ্য পাওনা পাননি। নতুন চাকরি পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

বাজেটের আগে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আবারও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে—এই বিপুল সংখ্যক বেকার ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্রের কী পরিকল্পনা রয়েছে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাজেট আলোচনায় শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা বেকারত্ব ভাতার বিষয়গুলো এখনও প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছে। অথচ মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রা আজ চরম সংকটের মুখে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি সেই হারে বাড়ছে না।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বাস্তবসম্মত দাবি জানিয়ে আসছি— যেমন, দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গার্মেন্টস ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে শ্রমিক রেশন ব্যবস্থা চালু। 

শ্রমজীবী মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বিশেষ স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে শ্রমিক ও তাদের পরিবার ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত। 

কারখানা বন্ধ, মজুরি বকেয়া, গণছাঁটাই বা শিল্প সংকটের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য একটি স্থায়ী মজুরি সুরক্ষা তহবিল(Wage Protection Fund) গঠন।

বেকার শ্রমিকদের জন্য সীমিত পরিসরে হলেও বেকারত্ব ভাতা ও পুনঃকর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু।

জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষায় ব্যয় নিশ্চিত করা। 

বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনীতি শ্রমিকদের শ্রমে চলে, কিন্তু বাজেটের সুবিধা সবচেয়ে কম পৌঁছায় শ্রমিকদের কাছেই। সরকারি কর্মচারীদের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও শ্রমিকদের জন্য সমমানের সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। যদি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জীবন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথ গুরুত্ব না পায়, তাহলে এই বাজেটকে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শ্রমিকদের বাজেট বলা কঠিন হবে।

আমরা আশা করি সরকার বাজেট বাস্তবায়নের সময় শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। কারণ শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে, আর অর্থনীতি বাঁচলেই দেশ এগিয়ে যাবে।


খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক , বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

No comments:

Post a Comment

বাজেট কার জন্য—সরকারি কর্মচারীদের জন্য, নাকি দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের জন্য?

আগামী ১১ জুন ২০২৬ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে জানা গেছে,...