বাংলাদেশের
শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং সংগ্রামমুখর। এই ইতিহাসে শ্রমিকদের অধিকার
আদায়ের পথে অসংখ্য আত্মত্যাগ ও লড়াই রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো
আজ অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনেই প্রকৃত শ্রমিকদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ অত্যন্ত
সীমিত। সংগঠনের নামে শ্রমিক আন্দোলন পরিচালিত হলেও, বাস্তবে অনেক
ক্ষেত্রেই সেই সংগঠনগুলো শ্রমিকদের দ্বারা নয়, বরং
শ্রমিকদের “নামে” পরিচালিত হচ্ছে।
অধিকাংশ শ্রমিক
সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বড় একটি অংশ কখনো শ্রমিক ছিলেন না, কিংবা শ্রমিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের নেই। ফলে শ্রমিকদের
দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, কর্মস্থলের শোষণ, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনার বাস্তবতা
তাদের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। যারা কখনো মজুরি বকেয়া থাকার যন্ত্রণা বোঝেননি, যাদের জীবন কাটেনি কারখানার গরমে, ঝুঁকিপূর্ণ
যন্ত্রের পাশে কিংবা দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চাপে তারা
শ্রমিকদের প্রকৃত কণ্ঠস্বর কতটা ধারণ করতে পারেন, সে প্রশ্ন
থেকেই যায়।
আরও উদ্বেগজনক
বিষয় হলো,
অনেক সংগঠনে নেতৃত্বের পদগুলো কার্যত আজীবন পদে পরিণত হয়েছে।
কিছু নেতা পৃথিবী থেকে বিদায় না নেওয়া পর্যন্ত পদ আঁকড়ে ধরে রাখেন। নিয়মিত সম্মেলন,
নেতৃত্বের পরিবর্তন কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চা সেখানে অনেক সময়
কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের শ্রমিক নেতাদের বিকাশ
বাধাগ্রস্ত হয় এবং সংগঠনগুলো ক্রমেই স্থবির ও জনগণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে
শ্রমিক সংগঠনগুলো পেশাদারিত্ব ও আদর্শিক সংগ্রামের বদলে ব্যক্তি স্বার্থ, ক্ষমতার রাজনীতি কিংবা দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে। এতে করে যোগ্য,
সচেতন ও সংগ্রামী শ্রমিকরা নেতৃত্বে উঠে আসার সুযোগ পান না।
সংগঠন পরিণত হয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত বলয়ে, যেখানে শ্রমিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ গুরুত্ব হারায়।
এই নেতৃত্ব
সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব
না থাকায় শ্রমিকদের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে, আন্দোলন হারায়
বিশ্বাসযোগ্যতা ও গতি। শ্রমিকরা সংগঠনের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন, যা সামগ্রিকভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শ্রমিক সংগঠনের
শক্তি আসে শ্রমিকদের থেকেই এই সত্য ভুলে গেলে
চলবে না। সংগঠনের নেতৃত্বে শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক চর্চা
এবং নতুন নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা ছাড়া শ্রমিক আন্দোলনের নবজাগরণ সম্ভব নয়।
প্রকৃত শ্রমিক নেতৃত্ব ছাড়া শ্রমিক সংগঠন কেবল নামেই শ্রমিকের
বাস্তবে নয়।
শ্রমিক
আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হলে এখনই প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ।
নেতৃত্বে শ্রমিকদের ফেরানোই হতে পারে শ্রমিক সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও শক্তি
পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত।
KM
Mintu

No comments:
Post a Comment