Followers

Friday, April 24, 2026

গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল বিষয়ে উদাসীন

আমরা সবাই অবগত আছি ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবনে ঘটে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। ভবনটিতে অবস্থিত পাঁচটি পোশাক কারখানা-নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড কারখানায় ১,১৩৮ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত হন এবং ২,৫০০-এর অধিক শ্রমিক আহত হন।

উল্লেখযোগ্য যে, ২৩ এপ্রিল ভবনটিতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ার পরও ২৪ এপ্রিল শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। এই অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাই এত বড় বিপর্যয়ের প্রধান কারণ শ্রমিক হত্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

রানা প্লজার ঘটনার মাত্র পাঁচ আগে, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশিন্তপুরে তোবা গ্রুপের তাজরিন গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১৪ জন শ্রমিক মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান এবং বহু শ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। পরিকল্পিত ভাবে কারখানার গেইট বন্ধ রাখার কারনে শ্রমিকরা মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। শ্রমিকরা পুড়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচে অবস্থান করলেও এখনো তাদের ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। এই ঘটনার জন্য দায়ী কারখানা মালিক দেলোয়ার এর নামে মামলা হলে তিনি এখন জামিনে মুক্ত হয়ে সুন্দর জীবন যাপন করছেন। 

রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টস কারখানায় বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পরিকল্পিত শ্রমিক হত্যার ঘটনা কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব মামলার অধিকাংশ আসামি বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন, কেবল ভবন মালিক সোহেল রানা ব্যতীত অন্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার এখনো দৃশ্যমান নয়।

গত ২০০৫ সালে ১১ এপ্রিল আশুলিয়ার বাইপাইলে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস কারখানার ৭৩ জন এবং ২০১০ সালে ১৪ ডিসেম্বর আশুলিয়ার হামিম গ্রুপের দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেড কারখানায় ২৯ জন শ্রমিক নিহত হয়। এই দুই কারখানার শ্রমিকদেরও ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। এই ঘটনার জন্য দায়ী কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

সাভার-আশুলিয়াসহ বিভিন্ন যায়গায় বারবার কোন সময় ভবন ধ্বসে, কোন সময় অগ্নিকান্ড ঘটিয়ে শ্রমিক হত্যা হলেও দায়ী ব্যাক্তিদের শাস্তি না হওয়ার কারনেই এমন গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল বিষয়ে উদাসীন।

রানা প্লাজা ও তাজরিন ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকদের জীবন কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়। তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সকলের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।

রানা প্লাজা ভবনের এসব কারখানায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করা হতো, যা এই ঘটনার আন্তর্জাতিক গুরুত্বও তুলে ধরে।

রানা প্লাজা দিবসে আমরা নিহত শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং আহতদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করি। একই সাথে, সাভার রানা প্লাজায় অবস্থিত নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড এবং আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর অবস্থিত তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড গার্মেন্টস কারখানায় নিহত, আহত শ্রমিকদের পুনরাই রি-অ্যাসেসমেন্ট (পুনঃমূল্যায়ন) করে  ক্ষতিপূরণ, পূনবাসন, এবং বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় কর্মরত সকল শ্রমিকদের বাংলাদেশ সরকার, আইএলও (ILO), এবং নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম' (Employment Injury Scheme - EIS) প্রকল্পটি ২১ জুন ২০২২ থেকে কার্যকর হওয়া এই স্কিমের আওতায় সাভার রানা প্লাজায় অবস্থিত নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম টেক্স লিমিটেড, ইথার টেক্স লিমিটেড এবং আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর অবস্থিত তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড গার্মেন্টস কারখানায় নিহত, আহত শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী দেলোয়ার হোসেন (তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড)সোহেল রানা (রানা প্লাজা ভবনের মালিক)বজলুস সামাদ আদনান (মালিক, নিউ ওয়েভ বটমস)  আমিনুল ইসলাম (মালিক, ফ্যান্টম গার্মেন্টস) মাহবুবুর রহমান তাপস (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিউ ওয়েভ বটমস) ইমতেমাম হোসেন (প্রকৌশলী, সাভার পৌরসভা) আলী মিয়া (সহকারী প্রকৌশলী, সাভার পৌরসভা) বিরুদ্ধে মামলা হলেও অধিকাংশ আসামি আজও জামিনে মুক্ত। বিচার প্রক্রিয়ার এই ধীরগতি শ্রমিকদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছে। শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী ব্যাক্তিদের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচারে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টসের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহয়তার নামে সরকার-বিজিএমইএ-বিভিন্ন এনজিও, এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সিআরপি সহ বিভিন্ন সংগঠন কারকাছ থেকে কত টাকা কি বাবদ অনুদান নিয়েছেন এবং কাকে কত টাকা কি বাবদ অনুদান দিয়েছেন তা প্রকাশ করতে হবে।

দেলোয়ার হোসেন (তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেড), সোহেল রানা (রানা প্লাজা ভবনের মালিক), বজলুস সামাদ আদনান (মালিক, নিউ ওয়েভ বটমস), আমিনুল ইসলাম (মালিক, ফ্যান্টম গার্মেন্টস), মাহবুবুর রহমান তাপস (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিউ ওয়েভ বটমস), এদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাদের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। 

নিহত শ্রমিকদের স্মরণে সাভার রানা ভবনের সামনে ও জুরাইন কবরস্থানে স্থায়ী ভাবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করতে হবে। ২৪ এপ্রিলকে শ্রমিক হত্যা দিবস এবং গার্মেন্টস শিল্পে সাধারণ ছুটি হিসাবে ঘোষণা করতে হবে।

রানা প্লাজা ধস এবং তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। এই কারখানাগুলোতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক তৈরি করা হতো। তাই এই দুর্ঘটনার দায়ভার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কোনোভাবেই এই ব্র্যান্ডগুলো এড়িয়ে যেতে পারে না। যেসব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এই কারখানাগুলো থেকে পণ্য সংগ্রহ করত, তাদের নৈতিক ও আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


No comments:

Post a Comment

গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল বিষয়ে উদাসীন

আমরা সবাই অবগত আছি ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবনে ঘটে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। ভবনটিতে অবস্থিত পাঁচটি পোশাক কারখা...