Followers

Thursday, January 8, 2026

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নারী প্রতিনিধিত্ব: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

 

বাংলাদেশে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ঘিরে নির্বাচন কমিশন ও বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য একটি গভীর ও অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হলেও সরাসরি সংসদ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও ভয়াবহভাবে সীমিত।

নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ৩০০টি সংসদীয় আসনে এবার মোট ২,৫৬৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ১০৯ জনযা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪.২৪ শতাংশ। এই ১০৯ জনের মধ্যে ৭২ জন দলীয় মনোনয়নে এবং ৩৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এই পরিসংখ্যান শুধু হতাশাজনকই নয়, এটি রাজনৈতিক দলগুলোর নারী নেতৃত্ব নিয়ে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রতিফলন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন ও নারীর অবস্থা

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালে চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি (জিএম কাদের) থেকে ২৮০-এর বেশি প্রার্থী দেওয়ার পরও নারী প্রার্থী মাত্র ৯ জন করে। বামধারার কিছু দল তুলনামূলকভাবে কিছুটা অগ্রগামী হলেও সংখ্যার বিচারে সেটিও খুবই সীমিত।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলোপ্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এলডিপি, খেলাফত মজলিসের মতো পরিচিত দল।

অথচ এসব ইসলামী রাজনৈতিক দল তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারে প্রায়ই “নারীর সম্মান”, “নারীর অধিকার”, “নৈতিক সমাজ” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনের মাঠে তারা নারীদের নেতৃত্বে দেখতে রাজি নয়এটাই তাদের প্রকৃত অবস্থান প্রকাশ করে।

প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার দ্বন্দ্ব

যে রাজনৈতিক শক্তি নারীদের নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের জায়গা দিতে চায় না, তারা ক্ষমতায় গেলে নারীর অধিকার রক্ষায় কতটা আন্তরিক হবেএই প্রশ্ন এখন আর তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তব ও জরুরি।

সংসদে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব মানে শুধু একটি আসন নয়; এটি নীতি নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ। যখন কোনো দল ধারাবাহিকভাবে নারীদের এই জায়গা থেকে বাদ দেয়, তখন স্পষ্ট হয়তারা নারীদের সমান নাগরিক হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত একটি গোষ্ঠী হিসেবেই দেখতে চায়।

বিশেষ করে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি এমন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় আসে বা ক্ষমতার কাছাকাছি যায় যারা নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতিকে স্বীকারই করে না, তাহলে প্রশ্ন উঠবেইবাংলাদেশে নারীদের কর্মস্থানের স্বাধীনতা কী হবে?

শিক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা কতটা সংকুচিত হবে?

রাষ্ট্র কি নারীর অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারবে?

জনগণের বোঝার সময় এখন

এই নির্বাচন শুধু দল বদলের নির্বাচন নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গির নির্বাচন। ভোটারদেরবিশেষ করে নারী ভোটারদেরবোঝা উচিত, কোন দল নারীদের কেবল ভোটব্যাংক হিসেবে দেখে আর কোন দল নারীদের নেতৃত্বে বিশ্বাস করে।

নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়, এটি সাংবিধানিক অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার প্রথম ধাপ হলো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব। যে দল সেই জায়গায় নারীদের স্থান দিতে ব্যর্থ, তাদের প্রতিশ্রুতি যতই আকর্ষণীয় হোক না কেনবাস্তবে তা নারীবান্ধব নয়।

এই নির্বাচনে নারী প্রার্থীর স্বল্পতা আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। এখন সিদ্ধান্ত জনগণেরএই আয়নায় দেখা বাস্তবতা আমরা উপেক্ষা করব, নাকি ভবিষ্যতের জন্য সচেতন নির্বাচন করব।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, রাজনৈতিক কর্মী ও শ্রমিকনেতা।

No comments:

Post a Comment

মহান মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে মহান মে দিবস এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্...