Followers

Friday, June 5, 2026

শ্রমিকের জীবন কি এতটাই সস্তা?

রক্ত, ঘাম আর অশ্রুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠছে, ব্যবসায়ীদের সম্পদের পাহাড় উঁচু হচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্যের ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা—যেখানে শ্রমিকের ঘাম, অশ্রু, অপমান এবং কখনো কখনো রক্ত দিয়েই নির্মিত হচ্ছে এই শিল্পের ভিত্তি।
যে শ্রমিকের হাতের স্পর্শে বিদেশে রপ্তানির জন্য পোশাক তৈরি হয়, সেই শ্রমিকের জীবন যেন সবচেয়ে সস্তা। তার কষ্ট, তার কান্না, তার সম্মান, এমনকি তার জীবনও যেন উৎপাদনের হিসাব-নিকাশের কাছে মূল্যহীন হয়ে গেছে।

গত ২৫ মে ২০২৬ তারিখে সাভারের হেমায়েতপুরে ব্যাবিলন গ্রুপের অবনী ফ্যাশন লিমিটেডে কর্মরত সুইং সুপারভাইজার মোঃ সুজন (সজল)-এর মরদেহ কারখানার ভেতর থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। পরিবারের সদস্য এবং সহকর্মী শ্রমিকদের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার পর মরদেহ গুম করারও চেষ্টা করা হয়েছে।
নিহত সুজনের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চর হরিণা গ্রামে। তার পিতা জহিরুল ইসলাম। ঘটনার পর মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় এবং পরে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র একদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে কারখানার জেনারেল ম্যানেজার সকালে সুজনকে তার কক্ষে ডেকে নেন। সেখানে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরে আবারও তাকে ডাকা হয়। সেই ডাকার পর থেকে আর কেউ তাকে জীবিত দেখেনি। কয়েক ঘণ্টা পর হঠাৎ কারখানার মাইকে ঘোষণা আসে—একজন শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন।
প্রশ্ন জাগে, এটি কি সত্যিই আত্মহত্যা? নাকি একজন শ্রমিককে নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে? নাকি আরও ভয়ংকর কোনো সত্য আড়াল করার চেষ্টা চলছে?

কিন্তু সুজন একা নন।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৮ জুন গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে গ্রিনল্যান্ড গার্মেন্টস লিমিটেডে হৃদয় নামের এক শ্রমিককে চুরির অভিযোগে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শুকতার বাইদ গ্রামের আবুল কালামের ছেলে হৃদয় ওই কারখানায় মেকানিক্যাল মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। একজন শ্রমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, কিন্তু সেখানে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় কারখানা কর্তৃপক্ষ, আর তার ফল হয় এক শ্রমিকের মৃত্যু।

একই বছরের ২ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে ডিবিএল গ্রুপের জিন্নাত নিটওয়্যার কারখানায় আরেক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। শ্রমিক জাকির হোসেন একটি পোশাকে ভুল লেবেল লাগিয়েছিলেন। সেই "অপরাধে" তাকে সহকর্মীদের সামনে কান ধরে উঠবস করিয়ে অপমান করা হয়। অপমানের সেই ভার তিনি সহ্য করতে পারেননি। পরে কারখানার আটতলা ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন।

একটি ভুল লেবেলের মূল্য কি একটি মানুষের জীবন?
একজন শ্রমিকের আত্মসম্মান কি এতটাই তুচ্ছ যে তাকে সবার সামনে অপদস্থ করা যাবে?
সুজন, হৃদয় এবং জাকির—এই তিনটি নাম কেবল তিনজন ব্যক্তির নাম নয়। তারা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্ধকার বাস্তবতার প্রতীক। তারা হাজার হাজার নিপীড়িত, অপমানিত ও নীরবে কষ্ট সহ্য করা শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করেন, যাদের গল্প কখনো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, যাদের কান্না কারখানার দেয়ালের মধ্যেই আটকে যায়।
আজ দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ করছেন ভয়, অনিশ্চয়তা এবং চরম মানসিক চাপে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য অমানবিক চাপ, অতিরিক্ত কাজ, চাকরি হারানোর আতঙ্ক, ন্যায্য মজুরি না পাওয়া, চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি, ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে বাধা এবং মানবিক মর্যাদার অভাব—সব মিলিয়ে অসংখ্য শ্রমিক প্রতিদিন এক অদৃশ্য যন্ত্রণা বহন করছেন।

অথচ এই শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতির প্রকৃত নির্মাতা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক আন্দোলনে গুলি করে তিনজন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, অসংখ্য শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। অথচ রাষ্ট্র, শিল্পমালিক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সবাই এই শ্রমিকদের শ্রমের ওপর নির্ভর করেই লাভবান হচ্ছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে—শ্রমিক কি শুধু উৎপাদনের একটি উপাদান? একটি যন্ত্র? একটি সংখ্যা?

না, শ্রমিক একজন মানুষ।
তারও স্বপ্ন আছে, পরিবার আছে, সন্তান আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে, সম্মানের সঙ্গে কাজ করার অধিকার আছে।
যে শিল্প শ্রমিকের জীবনকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে কর্মপরিবেশ শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, যে ব্যবস্থায় একজন শ্রমিক অপমান, নির্যাতন বা মৃত্যুর শিকার হওয়ার পরও সত্য গোপনের চেষ্টা করা হয়—সেই ব্যবস্থাকে অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে।
আজ প্রয়োজন প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা, কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি একটি মানবিক কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা।

কারণ শ্রমিক ছাড়া পোশাক শিল্পের অস্তিত্ব নেই।
সাভারের সুজন, গাজীপুরের হৃদয় এবং জাকিরের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়। তাদের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দিক। আমাদের মনে করিয়ে দিক—উৎপাদনের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ আছেন, যার জীবন, সম্মান এবং অধিকার কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সেই শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের ওপর, যিনি নিজের শ্রম দিয়ে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী—রক্তের দাগ বেশিদিন চাপা থাকে না। শ্রমিকের কান্নাও একদিন প্রতিবাদ হয়ে ফিরে আসে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু 
আইন ও দর-কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র 

No comments:

Post a Comment

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি

  বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (Ready-Made Garments-RMG) শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি। প্রতি বছর এই শিল্প থেকে কয়েক দশমিক বি...