Followers

Monday, December 22, 2025

একজন শ্রমিককে এভাবে অমানবিকভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়

 

ময়মনসিংহের ভালুকায় পাইওনিয়ার নিটওয়্যার গার্মেন্টসের শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকল অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার আমরা জোরালোভাবে দাবি করছি। একই সঙ্গে নিহত দীপু চন্দ্র দাসের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। একজন শ্রমিককে এভাবে অমানবিকভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে শ্রমিকসমাজ ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। যদি এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকে, তবে সমাজে কেউই নিরাপদ থাকবে না। তাই অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের আশু বিচার নিশ্চিত করা জরুরি

কারখানার মালিকের মৌলিক দায়িত্ব হলো তার অধীনস্থ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এ ঘটনায় মালিক চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। শ্রমিককে সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে তাকে মবের মুখে ঠেলে দিয়ে এমন একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের পথ সুগম করা হয়েছে। এই দায় মালিক কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য মালিককেও দায় বহন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনের আওতায় আনতে হবে

ধর্মের নামে, ‘কাফের’ ফতোয়া দিয়ে শ্রমিকের ওপর হামলা এবং নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের উগ্রতা ও সহিংসতা চলতে থাকলে সমাজে কোনো মানুষেরই নিরাপত্তা থাকবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় অত্যাচারী শাসন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ করেছে এবং পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। আজ আবারও শ্রমিকের ওপর সংঘটিত এই নির্মমতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ সংগঠিত করতে হবে

দীপু চন্দ্র দাসের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন শ্রমিক। শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকার কারণেই তাকে এমন মর্মান্তিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এ দেশের শিল্পব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে

আমাদের সুস্পষ্ট ও দৃঢ় দাবি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকলকে অবিলম্বে বিচারের আওতায় আনতে হবে, নিহতের পরিবারের জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে

KM Mintu

Saturday, December 20, 2025

নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা

 


একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাথমিক এবং প্রধান শর্ত হলো তার প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ময়মনসিংহের ভালুকায় শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ রাষ্ট্রের সেই মৌলিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে

ভালুকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারসে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং তা সমাজের এক গভীর ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষকে কেবল ‘অভিযোগের’ ভিত্তিতে কারখানার ভেতরে ও বাইরে পিটিয়ে হত্যা করা এবং পরবর্তীতে মহাসড়কে তার লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এটি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। এই বর্বরোচিত ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক ভয়ানক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা মূলত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ওপর অনাস্থারই ফল

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৪ মাসে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনিতে যে পরিমাণ প্রাণহানি ঘটেছে, তা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যখন একের পর এক মাজারে হামলা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে আগুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে, তখন রাষ্ট্রের 'নীরব দর্শক' ভূমিকা তার প্রশাসনিক ব্যর্থতাকেই স্পষ্ট করে তোলে

রাষ্ট্র যদি কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে টিকে থাকে কিন্তু তার নাগরিকের জীবনের গ্যারান্টি দিতে না পারে, তবে সেই কাঠামোর নৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি চর্চা এবং ভিন্নমতের ওপর ক্রমাগত আক্রমণগুলো প্রমাণ করে যে, আইনের শাসনের বদলে পেশিশক্তির শাসন জেঁকে বসছে

ভালুকার সেই শ্রমিকের রক্ত এবং মহাসড়কে জ্বলা আগুন কেবল একজনের মৃত্যু নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক নিরাপত্তার ব্যর্থতার স্মারক

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে বিলম্ব করে, সেই রাষ্ট্রে অরাজকতা স্থায়ী রূপ নেয়। বর্তমান সরকারকে কেবল আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা এবং মব ভায়োলেন্স এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই পারে রাষ্ট্রের হারানো নৈতিক বৈধতা পুনরদ্ধার করতে

KM Mintu 

Friday, December 19, 2025

রাষ্ট্র কি তার নাগরিকের জীবন রক্ষার অধিকার হারিয়েছে?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় জনগণের সামনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আইনের শাসন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। আজ বাংলাদেশে মানুষ মারা যাচ্ছে বন্দুকযুদ্ধে, রাজনৈতিক সংঘাতে, গণপিটুনিতে আর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে নীরব দর্শকের ভূমিকায়। প্রশ্ন একটাই: এই রক্তপাতের দায় কে নেবে?

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম ১৪ মাসে (আগস্ট ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর মাঝামাঝি সময়) অন্তত ৪০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু যা সরাসরি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়, তখন সেটি আর বিচ্যুতি থাকে না তা হয়ে ওঠে শাসনব্যবস্থার চরিত্র

একই সময়ে রাজনৈতিক সংঘাতে অন্তত ২৮১ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। গুলি, অগ্নিসংযোগ, গণপিটুনি মৃত্যুর ধরন আলাদা করে হিসাব করা কঠিন হলেও একটি সত্য পরিষ্কার: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে ব্যর্থ। মতভিন্নতা দমনের ভাষা হয়ে উঠেছে লাঠি, আগুন ও মৃত্যু

এই ব্যর্থতার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পেয়েছে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনিতে। মাত্র ১৪ মাসে ১৫৩ জন মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয় এটি রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ। যখন মানুষ বিচার নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন বোঝা যায় রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা পরিত্যাগ করেছে

এর সর্বশেষ ও হৃদয়বিদারক উদাহরণ ময়মনসিংহের ভালুকা। ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানার ভেতর ও বাইরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়শুধু তাই নয় কারখানার সামনে ঢাকাময়মনসিংহ মহাসড়কের জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় তাঁর লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়এই ঘটনা কোনো আকস্মিক উন্মত্ততা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার চরম বহিঃপ্রকাশ। যেখানে একজন শ্রমিক কারখানায় নিরাপদ নয়, সেখানে ‘উন্নয়ন’ ও ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দগুলো কেবল রাজনৈতিক ভণ্ডামি

এতেই শেষ নয়। এই সময়কালে বিভিন্ন স্থাপনা দখল, মাজার, রিসোর্ট, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। সর্বশেষ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং ছায়ানট ভবনে হামলা ও আগুন এটি কেবল সম্পদের ক্ষতি নয়, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আক্রমণ

এই ঘটনাগুলো কি বিচ্ছিন্ন? না। এগুলো একটি সুসংগঠিত ব্যর্থতার ফল যেখানে সরকার আইন প্রয়োগে অক্ষম, রাজনৈতিকভাবে দিকনির্দেশনাহীন এবং নৈতিকভাবে দেউলিয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে না পারলে, বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে, তাহলে তার অস্তিত্বের নৈতিক বৈধতা কোথায়?

রাষ্ট্র যদি নাগরিকের জীবন রক্ষা করতে না পারে, রাষ্ট্র যদি ধর্ম, রাজনীতি বা গুজবের নামে মানুষ পিটিয়ে মারার দায় এড়ায়, রাষ্ট্র যদি সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির ওপর হামলার সময় নিশ্চুপ থাকে তাহলে সেটি আর রাষ্ট্র থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ব্যর্থ এক প্রশাসনিক কাঠামো

এই সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে ইতিহাস এই সময়কে চিহ্নিত করবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামল হিসেবে নয়,
বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও নীরব রক্তপাতের সময়কাল হিসেবে

KM Mintu


Monday, December 15, 2025

যখন নীরবতাই হয় ভালোবাসার ভাষা

 

পৃথিবীতে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। কেউ কেউ কথার মালায় ভালোবাসাকে সাজাতে পছন্দ করেন, আবার কেউ কেউ আছেন যারা মৌনতাকেই বেছে নেন শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে। বিশেষ করে অনেক পুরুষ আছেন, যাঁদের কাছে 'ভালোবাসি' শব্দটা উচ্চারণের চেয়েও বড় হলো সেই ভালোবাসাকে যাপন করা। তাঁদের এই অব্যক্ত অনুরাগ কখনো কখনো হাজারো কবিতার চেয়েও বেশি কাব্যময়

যিনি মুখে বলতে পারেন না, তাঁর চোখ কিন্তু মিথ্যে বলে না। ভিড়ের মাঝে প্রিয় মানুষটির দিকে রাখা এক পলক লাজুক দৃষ্টি কিংবা আড়াল থেকে করা পর্যবেক্ষণএসবই বুঝিয়ে দেয় সেই অদৃশ্য টান। যেখানে শব্দ ব্যর্থ হয়, সেখানে এক চিমটি লজ্জা মেশানো চাহনিই বলে দেয় মনের সব জমানো কথা

অব্যক্ত প্রেম প্রকাশ পায় ছোট ছোট অভ্যাসে। রাস্তা পার হওয়ার সময় আলতো করে আগলে রাখা, মন খারাপের দিনে প্রিয় কোনো খাবার নিয়ে আসা, কিংবা অসুস্থতায় শিয়রে বসে থাকাএই কাজগুলো কোনো বিশেষ দিবসের সংলাপে সীমাবদ্ধ নয়। এই ছোট ছোট যত্নগুলোই প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল পাশে থাকার জন্য নয়, বরং ভালো রাখার জন্য পাশে আছেন

কথার ফুলঝুরি সাজানো মানুষটি হয়তো বিপদের সময় দূরে সরে যেতে পারেন, কিন্তু যিনি নিঃশব্দে ভালোবাসেন, তিনি মূলত এক প্রকাণ্ড বটবৃক্ষ। তাঁর ভালোবাসা শব্দের চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য। কারণ তা লুকিয়ে থাকে কঠিন সময়ে শক্ত করে হাত ধরার সাহসে এবং একনিষ্ঠ ভরসায়

মানুষ যখন খুব বেশি ভালোবাসে, তখন অনেক সময় শব্দরা ভাষা হারিয়ে ফেলে। এই নীরবতা কোনো অবহেলা নয়, বরং এক ধরনের পরম মমতা। এই না-বলা ভালোবাসাগুলো অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং গভীর হয়, কারণ এতে কোনো কৃত্রিমতা বা লোকদেখানো আড়ম্বর থাকে না

ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সবসময় শব্দের প্রয়োজন হয় না। যারা আচরণে, দৃষ্টিতে আর নিভৃত যত্নে ভালোবাসা বিলিয়ে দেন, তাঁদের প্রেম অনেক বেশি টেকসই। তাঁদের সেই নীরব স্পর্শ আর অদৃশ্য মমত্বই জীবনকে করে তোলে সুন্দর ও ভরসাপূর্ণ। তাই মনে রাখবেন, 'ভালোবাসি' না বলা মানুষটিই হয়তো আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন

KM Mintu

Tuesday, December 2, 2025

বৈষম্য দূর না হওয়া এবং গণছাঁটাই: সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের বর্তমান সংকট

বাংলাদেশের প্রধান পোশাক শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং পরবর্তী গণছাঁটাইয়ের ঘটনা পোশাক শিল্পে এক গভীর মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে শ্রমিকরা জীবন দিলেও, ৫ আগস্টের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একদিকে যেমন শ্রমিকের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর হয়নি, তেমনই অন্যদিকে ব্যাপক হারে কারখানা বন্ধ ও বেআইনী ছাঁটাইয়ের কারণে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের 'শ্রমিক বৈষম্য দূরীকরণ' এবং 'নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির' প্রতিশ্রুতির বিপরীতে, এই অঞ্চলে এখন বিরাজ করছে চরম অনিশ্চয়তা ও নীরব নির্যাতন

গণছাঁটাইয়ের চিত্র ও বেকারত্বের ভয়াবহতা

৫ আগস্টের পর ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে ২৩টিরও বেশি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা যায়। এই হঠাৎ বন্ধ ও বেআইনীভাবে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতিতে প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক সরাসরি বেকারত্বের শিকার হয়েছেন

শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ও মানবিক সংকট

চাকরি হারানো এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের জীবন এখন অর্ধাহারে-অনাহারে কাটছে। বেকার শ্রমিকরা প্রতিদিন বিভিন্ন কারখানার গেটে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন, যা এই শিল্পাঞ্চলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে

১. অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা: চাকরিচ্যুত শ্রমিকরা সঞ্চয় ভেঙে, জিনিসপত্র বিক্রি করে এবং ঋণের মাধ্যমে দিন পার করছেন। অনেকেই ঘরভাড়া দিতে পারছেন না, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম হয়েছে

২. নিম্ন মজুরিতে কাজ: বাধ্য হয়ে অনেকেই তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক কম মজুরিতে কাজ নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মান আরও নামিয়ে দিয়েছে

৩. মানসিক ও পারিবারিক চাপ: বেকারত্বের কারণে শ্রমিক পরিবারগুলোতে চরম হতাশা ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে

আন্দোলন দমনে হত্যা ও নিরব নির্যাতন

শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করার সময় ৩ জন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে, যা এই শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অধিকারের পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বর্তমানে কারখানার ভেতরেও এক ধরনের 'নিরব নির্যাতন' চলছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • শ্রমিকদের সক্ষমতার বাইরে মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ
  • ন্যায্য ছুটি না পাওয়া
  • যখন তখন চাকরি হারানোর ভয়
  • শ্রমিকদের সাথে অসৌজন্যমূলক ও খারাপ আচরণ
  • 'কালো তালিকা' তৈরি: চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা অন্য কোনো কারখানায় চাকরি না পায়যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগকে স্থায়ীভাবে রুদ্ধ করে দিচ্ছে

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের ফারাক

অন্তর্বর্তী সরকার শ্রমিকদের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিলেও, সাভার-আশুলিয়ার বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্যাপক হারে কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই কেবল শ্রমিকদের অধিকারকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পোশাক খাতকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, শ্রমিকদের জীবন দিয়ে অর্জিত আন্দোলনের ফলেও বৈষম্য দূর হয়নি, বরং তাদের জীবনে নেমে এসেছে আরও কঠোর ও অনিশ্চিত বাস্তবতা

এই পরিস্থিতিতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালু করার মাধ্যমে শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহাল নিশ্চিত করা অপরিহার্য

খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Sunday, November 23, 2025

তাজরীন ট্র্যাজেডি: বিচারহীনতা ও প্রতারণার ধারাবাহিক চক্র

 

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক যুগ পরেও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পাশে যে অন্যায় ও প্রতারণার চিত্র বিদ্যমান, তা গভীরভাবে হতাশাজনক। এই পরিকল্পিত অগ্নিদুর্ঘটনায় ১১৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ১৭২ জন গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তাদের সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং সর্বোপরি, কারখানা মালিক দেলোয়ারসহ দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অতীতের এবং বর্তমানউভয় সরকারের ভূমিকা নিয়েই আজ গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

বিগত সরকারের ভূমিকা: বিচার নয়, পুরস্কার!

বিগত সরকারের আমলে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির বিচার নিশ্চিত না হওয়াটা ছিল ন্যায়বিচারের প্রতি এক চরম উপহাস। সবচেয়ে নিন্দনীয় বিষয় হলো, যে দেলোয়ার হোসেনের চরম অবহেলা ও পরিকল্পিত কারসাজিতে এতগুলো শ্রমিকের জীবন গেল, তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো দলীয় পদে ভূষিত করে 'পুরস্কৃত' করা হয়েছে।

এই পদক্ষেপটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন দলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকের জীবনের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে এবং ধনিক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা বিচার পাওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন এবং সমাজে একটি বার্তা পৌঁছেছেঅর্থ এবং ক্ষমতা থাকলে গুরুতর অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়।

বর্তমান সরকারের আশ্বাস ও বাস্তবতার ফারাক

বর্তমান সরকার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এবং তাদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আসছে। এসব আশ্বাস কার্যত কেবলই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি হয়ে রয়ে গেছে।

  • উদ্যোগের অভাব: আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জন্য বাস্তব বা দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
  • বিচার প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা: কারখানার মালিক দেলোয়ারসহ দায়ীদের বিচারের মামলাটি এখনও আদালতের বারান্দায় ঝুলে আছে। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়ে দিচ্ছে, শ্রমিকদের প্রতি সরকারের আন্তরিকতা কেবল মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ।

শ্রমিকদের প্রতি ধারাবাহিক প্রতারণা

তাজরীন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা ধারাবাহিকভাবে প্রতারিত হয়েছেন। প্রথমত, কারখানা মালিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এরপর, বিগত সরকারের বিচার না করার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এবং সবশেষে, বর্তমান সরকারের মিথ্যা আশ্বাসের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, কিন্তু তাদের বিপদে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের এমন উদাসীনতা শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এই বিচারহীনতা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। তাজরীন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা ন্যায়বিচার, সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের দাবিদার। সরকারের উচিত, দলীয় রাজনীতি বা আর্থিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠেকেবল কথার কথা না বলেদ্রুততম সময়ের মধ্যে দেলোয়ারসহ সব দায়ীর বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জীবনমান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দরকষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

Monday, November 17, 2025

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মামলা ও জন-আস্থার সংকট: রায়ের স্থায়িত্ব নির্ধারণে 'স্থান, কাল, পাত্র'-এর প্রভাব

 

সাম্প্রতিককালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার মতো একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী রায়ের পরও সাধারণ জনগণের মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিক্রিয়া বা আগ্রহের অভাব দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের এক গভীর ও অস্বস্তিকর দিক তুলে ধরে। এই নীরবতা নিছক ঔদাসীন্য নয়; এটি এক ধরনের অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধি, যার সারকথা হলো: এই ধরনের রাজনৈতিক মামলার শাস্তি বা রায়ের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ভর করে ‘স্থান, কাল ও পাত্র’অর্থাৎ রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের ওপর। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মামলার নজির এবং জন-আস্থার সংকটের কারণ বিশ্লেষণ করা হবে।

রাজনৈতিক বিচার: ক্ষমতার হাতবদলে রায়ের ভাগ্যবদল

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়াকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। শীর্ষস্থানীয় নেতারাযেমন শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং সাম্প্রতিককালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসকলেই তাদের প্রতিপক্ষের ক্ষমতা আমলে বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন এবং সাজার রায় পেয়েছেন।

এই রায়ের তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো এর অস্থিরতা (Instability)। যখনই ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, নতুন সরকার এসেই পূর্বেকার সাজা ও মামলার গতিপথ বদলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বহু মামলা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাতিল বা স্থগিত হয়ে যায়। একইভাবে, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের বহু মামলার একই পরিণতি দেখা যায়। তারেক রহমানের অর্থ পাচার মামলায় প্রাথমিক রায়ে খালাস এবং পরবর্তীতে আপিল বিভাগে সাজার রায়, অথবা বেগম খালেদা জিয়ার এতিমখানা ট্রাস্ট মামলার সাজার দীর্ঘসূত্রতাএগুলো সবই প্রমাণ করে যে, বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি প্রায়শই আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল

জন-আগ্রহের অভাব: সংশয় ও হতাশায় নিমজ্জিত আস্থা

বারবার এই দৃশ্যপট দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর সংশয় ও হতাশা জন্ম নিয়েছে। এ কারণেই বড় বড় রাজনৈতিক রায়ের ঘোষণায় জনমনে তেমন কোনো গভীর প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। এর মূল কারণগুলি নিম্নরূপ:

  • ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা: জনগণ নিশ্চিত যে, বর্তমান রায় বা সাজার স্থায়িত্ব বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। সরকার পরিবর্তন হলে এই রায় বাতিল বা খারিজ হয়ে যেতে পারে। যে রায় কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তা নিয়ে তাৎক্ষণিক আগ্রহ দেখানো যৌক্তিক নয়।
  • বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস: যখন বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে দেখা যায়, তখন তা আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। মানুষ প্রশ্ন তোলেমামলার বিচার কি সত্যিই অপরাধের বিচার, নাকি এটি ক্ষমতা ধরে রাখা বা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার একটি কৌশল?
  • গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রভাব: সুস্থ গণতন্ত্রে আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু যখন দেখা যায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে 'বিচার' কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তখন সাধারণ মানুষ এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মূলত ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত হয়েছিল। এই ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক সম্প্রসারিত পরিধি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার বিষয়টি নিঃসন্দেহে বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংবেদনশীল।

তবে জনগণের মানসে এই রায়ও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক মামলার ফ্রেমওয়ার্কে পড়েছে, যেখানে রায়ের ভাগ্য 'স্থান, কাল ও পাত্র' দ্বারা নির্ধারিত হয়। যদিও আইসিটি-র প্রতিষ্ঠার পেছনে ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু এর সাম্প্রতিক রায়কে অনেকে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে ট্রাইব্যুনালের আইনি সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীন অস্তিত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

আস্থার পুনরুদ্ধারে করণীয়

রাজনৈতিক মামলার রায় নিয়ে জন-আগ্রহের এই অভাব এবং নীরবতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। বিচার বিভাগ যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হতে পারে এবং যদি রায়ের স্থায়িত্ব 'স্থান, কাল, পাত্র'-এর ওপর নির্ভর করে, তবে আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন:

বিচার বিভাগের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে আইনি প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে না।

জনগণের মধ্যে এই আস্থা সৃষ্টি করা যে, বিচারের রায় চূড়ান্ত এবং তা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যাবে না।

যতদিন পর্যন্ত না বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত থেকে মুক্ত হয়ে স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতা অর্জন করবে, ততদিন পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক মামলার রায়গুলো কেবল সাময়িক শিরোনাম সৃষ্টি করবে, কিন্তু জনসাধারণের মনে স্থায়ী কোনো বিশ্বাস বা প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে ব্যর্থ হবে।

KM Mintu

Saturday, November 15, 2025

যা হওয়ার, তা হবেই: স্ব-স্বীকৃতির পথে প্রকৃত সুখ

 

জীবনে সুখী হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি মানুষের সহজাত। কিন্তু আমরা প্রায়শই সুখকে খুঁজে বেড়াই এমন কিছুর মধ্যে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আপনার কথাতেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য জীবনে যা হতে চলেছে, তা যেহেতু আমরা জানি না, যা হবার তা হবেই, আপনি তা থামাতে পারবেন না। আর এই অনিবার্যকে থামানোর বা পাল্টে দেওয়ার বৃথা চেষ্টাই আমাদের জীবনে কষ্ট নিয়ে আসে।

১. নিয়ন্ত্রণের মোহ এবং তার মূল্য

আমাদের মন সব সময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিজেদের ইচ্ছামতো সাজাতে চায়। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আমাদের মনে ভয় আর উদ্বেগের জন্ম দেয়। আমরা ভুলে যাই যে, জীবনের বেশিরভাগ ঘটনাই আমাদের ব্যক্তিগত চেষ্টার বাইরে এক বৃহত্তর নিয়মের অধীন। আবহাওয়া কেমন হবে, অন্য একজন মানুষ কী ভাববে, বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা কখন ঘটবেএই সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।

তবুও, আমরা সেই নিয়ন্ত্রণের মোহ ত্যাগ করতে পারি না। যখন জীবন আমাদের ছক ভেঙে অন্য পথে হাঁটে, তখনই আমরা হতাশ হই, ক্ষুব্ধ হই এবং নিজেদের অসুখী মনে করি। এই প্রতিরোধই হলো কষ্টের মূল কারণ। যা আমাদের জীবনে একটু পর ঘটতে চলেছে, তা যদি আমরা সহজে মেনে নিতে পারতাম, তবে অনেক মানসিক চাপ আপনা থেকেই দূর হয়ে যেত।

২. নিজেকে "যা হতে চাই" তাই হতে দিন

সুখী হওয়ার প্রথম শর্ত হলো নিজের ভেতরের সত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। আপনার জীবন আপনার ইচ্ছানুসারে যেভাবে বিকশিত হতে চাইছে, তাকে সেই পথে চলতে দিন। এর অর্থ এই নয় যে আপনি চেষ্টা করা বা পরিকল্পনা করা বন্ধ করে দেবেন। বরং, এর অর্থ হলো আপনি প্রচেষ্টা করবেন, কিন্তু ফলাফলের ভার মহাকালের হাতে ছেড়ে দেবেন।

যখন আপনি নিজেকে বিচার করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বা সমাজের চাপিয়ে দেওয়া আদর্শের পথে চলতে বাধ্য করা বন্ধ করেন, তখনই আপনার ভেতরের "যা হতে চাই" তা প্রকাশ পেতে শুরু করে। এই স্বতঃস্ফূর্ততা এবং নিজস্ব পথে এগিয়ে চলার স্বাধীনতাতেই লুকিয়ে আছে সত্যিকারের শান্তি।

৩. স্বীকৃতির (Acceptance) শক্তি

'যা হবার তা হবেই'এই ভাবনাটি আসলে এক ধরনের গভীর স্বীকৃতি (Acceptance)। এটি কোনো হতাশা বা নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং এটি জীবনের অনিবার্য সত্যকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস। এর মানে হলো:

  • বর্তমানের প্রতি মনোযোগ: যা ঘটতে চলেছে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, আপনি আপনার বর্তমান কাজটি পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে করতে পারছেন।
  • মানসিক স্বাধীনতা: আপনি অনিয়ন্ত্রিত ঘটনার ভার মন থেকে নামিয়ে ফেলছেন এবং একটি হালকা, চাপমুক্ত জীবন যাপন করতে পারছেন।
  • পরিবর্তনের প্রতি নমনীয়তা: যখন কোনো অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে, তখন তাকে প্রতিরোধ না করে, তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার শক্তি খুঁজে পাচ্ছেন।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তার নিজস্ব রূপে মেনে নেওয়ার এই ক্ষমতাই হলো প্রকৃত সুখের চাবিকাঠি। যখন আপনি জানেন যে, আপনার সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও যদি কোনো কিছু না ঘটে, তবে তা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিলতখন আর নিজেকে দোষারোপ করার বা কষ্ট পাওয়ার প্রয়োজন থাকে না।

সহজ হও, সুখী হও

জীবনকে তার আপন গতিতে বইতে দিন। যা আপনি পারেন, তা করুন। আর যা পারেন না, তা প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিন। আপনার জীবনে যা হতে যাচ্ছে, তা যদি আপনি থামানোর চেষ্টা না করে বরং বরণ করে নেন, তবে সেই সহজ জীবনযাত্রাই আপনাকে এনে দেবে অনাবিল সুখ।

জীবনকে সহজ করুন। যা হবার তা হবেইএই সত্যকে বুকে ধারণ করে নিজের মতো করে বাঁচুন। সুখ আসলে বাইরের কোনো অর্জন নয়, এটি জীবনকে তার সমস্ত অনিশ্চয়তা সহকারে মেনে নেওয়ার একটি অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত।

 

Friday, November 14, 2025

⚖️ বিচার যখন প্রশ্নের মুখে: মারধরের শিকার নারীই এখন আসামি!

 

সাম্প্রতিক এক ঘটনা বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সমাজে বিদ্যমান আস্থার সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। 'ঢাকা লকডাউন' কর্মসূচির মধ্যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে এক মধ্যবয়সী নারীকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা শুধু নিন্দনীয়ই ছিল না, বরং এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আরও বেশি উদ্বেগজনক। মারধরের শিকার ওই নারীকে এখন গত বছরের জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এই ঘটনা জন্ম দিয়েছে অসংখ্য প্রশ্নেরআদালত প্রাঙ্গণ থেকে রাজপথের জনমানস পর্যন্ত।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ধানমন্ডির মতো একটি সংরক্ষিত এলাকায় একজন তরুণী লাঠি দিয়ে ওই মধ্যবয়সী নারীকে নির্মমভাবে পেটাচ্ছেন। মারধরের শিকার হওয়া ব্যক্তির আইনি সুরক্ষা পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা গেল। আঘাতের শিকার নারীকে হাসপাতালে না পাঠিয়ে কিংবা মারধরকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, পুলিশ তাকে আটক করে এবং পরে তাঁকে এক বছর আগের গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখায়।

এটি যেন এক বিপরীতমুখী ন্যয়বিচার! ভুক্তভোগীকে ত্রাণকর্তার ভূমিকা থেকে মুহূর্তেই অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। সমাজের চোখে যিনি ছিলেন সহানুভূতির পাত্র, রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় তিনি হয়ে গেলেন আইনের চোখে 'পলাতক' কিংবা 'সন্দেহভাজন'।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত বছরের জুলাই মাসে সংঘটিত একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই মামলাটি ওই সময়ের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো:

প্রকাশ্যে মারধরের শিকার হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আটক করা হলো। কেন মারধরের দিনই বা তার আগে তাকে পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়নি?

ধানমন্ডিতে মারধরের ঘটনার সঙ্গে জুলাই মাসের হত্যাচেষ্টা মামলার যোগসূত্র কী? মারধরের ঘটনাটি কি শুধু পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর একটি 'সুযোগ' তৈরি করে দিল?

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মারধরের ঘটনাটি যেহেতু জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তাই এই গ্রেপ্তার জনদৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে। এতে করে মারধরের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার চেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক মামলার দিকেই মনোযোগ চলে যাচ্ছে।

ন্যায়বিচারের প্রাথমিক শর্ত হলোতা যেন দৃশ্যমান হয় এবং সাধারণ মানুষ যেন এর ওপর আস্থা রাখতে পারে। কিন্তু এই ঘটনা জনগণের মনে গভীর সংশয় সৃষ্টি করেছে। মারধরের মতো প্রকাশ্য অপরাধের শিকার হওয়ার পরও যদি একজন ব্যক্তিকে রাতারাতি পুরনো মামলায় জেলে যেতে হয়, তবে তা বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ করে।

এটি সমাজে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে, দুর্বলের উপর আঘাত করার পর উল্টো সেই দুর্বলকেই কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখে পড়তে হতে পারে। এমন ঘটনা আইনের চোখে সকলের সমতার নীতিকে ম্লান করে দেয় এবং এটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত।

এই ঘটনাটি একটি প্রহসনএই অভিযোগটি কেবল আবেগের বশবর্তী নয়, বরং এটি আমাদের বিচারিক এবং পুলিশি প্রক্রিয়ার একটি গুরুতর দুর্বলতা চিহ্নিত করে। একজন নাগরিক যখন বিচার চাইতে এসে নিজেই আসামির তালিকায় চলে যান, তখন সাধারণ মানুষ কোথায় আস্থা রাখবে?

কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে এই পুরো বিষয়টি তদন্ত করা। মারধরের ঘটনার জন্য দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়াটি আইন ও যৌক্তিকতার নিরিখে সঠিক ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অন্যথায়, এই ঘটনা বাংলাদেশের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি 'কালো অধ্যায়' হিসেবে থেকে যাবে।

নিজস্ব জগৎ

  নিজস্ব জগৎ প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে — যেখানে ঢোকার চাবি কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না। সে জগৎ একান্ত , নীরব , নিজের ম...