অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় জনগণের সামনে যে প্রতিশ্রুতি
দিয়েছিল আইনের শাসন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ
বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। আজ বাংলাদেশে মানুষ মারা যাচ্ছে বন্দুকযুদ্ধে, রাজনৈতিক সংঘাতে, গণপিটুনিতে আর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে নীরব দর্শকের ভূমিকায়। প্রশ্ন একটাই:
এই রক্তপাতের দায় কে নেবে?
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম ১৪ মাসে (আগস্ট ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর
২০২৫-এর মাঝামাঝি সময়) অন্তত ৪০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর
গুলিতে মৃত্যু যা সরাসরি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়, তখন সেটি আর বিচ্যুতি থাকে না তা হয়ে ওঠে শাসনব্যবস্থার
চরিত্র।
একই সময়ে রাজনৈতিক
সংঘাতে অন্তত ২৮১ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। গুলি, অগ্নিসংযোগ, গণপিটুনি মৃত্যুর ধরন আলাদা করে হিসাব করা কঠিন হলেও একটি সত্য পরিষ্কার:
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে ব্যর্থ। মতভিন্নতা দমনের
ভাষা হয়ে উঠেছে লাঠি, আগুন ও মৃত্যু।
এই ব্যর্থতার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পেয়েছে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনিতে। মাত্র ১৪ মাসে ১৫৩ জন মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয় এটি রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ।
যখন মানুষ বিচার নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন বোঝা যায় রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা পরিত্যাগ করেছে।
এর সর্বশেষ ও হৃদয়বিদারক উদাহরণ ময়মনসিংহের ভালুকা। ধর্ম নিয়ে কটূক্তির
অভিযোগ তুলে পাইওনিয়ার
নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানার ভেতর ও বাইরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয় কারখানার সামনে
ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় তাঁর লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা কোনো আকস্মিক উন্মত্ততা
নয়;
এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার চরম বহিঃপ্রকাশ।
যেখানে একজন শ্রমিক কারখানায় নিরাপদ নয়, সেখানে ‘উন্নয়ন’ ও ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দগুলো কেবল রাজনৈতিক ভণ্ডামি।
এতেই শেষ নয়। এই সময়কালে বিভিন্ন স্থাপনা দখল, মাজার, রিসোর্ট, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। সর্বশেষ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং ছায়ানট ভবনে হামলা ও আগুন এটি কেবল সম্পদের ক্ষতি নয়, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক
চর্চা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আক্রমণ।
এই ঘটনাগুলো কি বিচ্ছিন্ন? না। এগুলো একটি
সুসংগঠিত ব্যর্থতার ফল যেখানে সরকার আইন প্রয়োগে অক্ষম, রাজনৈতিকভাবে দিকনির্দেশনাহীন এবং নৈতিকভাবে দেউলিয়া।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে না পারলে, বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে, তাহলে তার অস্তিত্বের নৈতিক বৈধতা কোথায়?
রাষ্ট্র যদি নাগরিকের জীবন রক্ষা করতে না পারে, রাষ্ট্র যদি ধর্ম, রাজনীতি বা গুজবের নামে মানুষ পিটিয়ে মারার দায় এড়ায়, রাষ্ট্র যদি সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির ওপর হামলার সময়
নিশ্চুপ থাকে তাহলে সেটি আর
রাষ্ট্র থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে
ব্যর্থ এক প্রশাসনিক কাঠামো।
এই সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের
দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে ইতিহাস এই সময়কে চিহ্নিত করবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামল হিসেবে নয়,
বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও নীরব রক্তপাতের সময়কাল হিসেবে।
KM Mintu

No comments:
Post a Comment