Followers

Thursday, October 15, 2026

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ ও ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করতে হবে।

গার্মেন্টস শিল্পে অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন পোশাকশ্রমিকরা। শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবির প্রতি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও তাদের জোট সংহতি প্রকাশ করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর উত্তরা, দক্ষিণখান ও উত্তরখান এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিকরাও ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। শ্রমিকদের এই দাবি কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়; বরং বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনধারণের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

শ্রমিকদের প্রশ্ন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গ্যাস, বিদ্যুৎ, ডিজেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে। অন্যদিকে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাহলে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরিতে কীভাবে জীবনযাপন করবেন? তাঁদের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষাসহ ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়টি কি সরকারের বিবেচনায় নেওয়া উচিত নয়? যাঁদের শ্রমে দেশের রপ্তানি আয় ও অর্থনীতি সচল থাকে, তাঁদের জীবনমান নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষের রয়েছে।

বাস্তবতা হলো, বর্তমান মজুরি দিয়ে একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের পক্ষে মাসের প্রয়োজনীয় সংসার খরচ মেটানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মাসের শুরুতে বেতন হাতে পেলেও বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের খরচ এবং সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অধিকাংশ শ্রমিককে চরম সংকটে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাসের প্রথম ১০ দিন পার হওয়ার পরই সংসার চালানোর মতো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। ফলে শ্রমিকদের বাধ্য হয়ে খাদ্যতালিকা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে হচ্ছে। তাঁরা কম দামের নিম্নমানের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাঁদের নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপর। বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টিহীনতা, শারীরিক বিকাশের বাধা এবং শিক্ষার ব্যয় বহন করতে না পারার মতো সমস্যা ক্রমেই গুরুতর হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক শিশু নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না; কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে কিংবা অপরাধপ্রবণতার দিকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। একটি শ্রমজীবী পরিবারের এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।

দুঃখজনকভাবে, শ্রমিকরা যখনই ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির দাবি তোলেন, তখনই তাঁদের দাবিকে ঘিরে বিদেশি ষড়যন্ত্র, বিরোধী রাজনৈতিক দলের উসকানি কিংবা শিল্প ধ্বংসের পরিকল্পনার মতো নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সামনে আনা হয়। শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যা ও তাঁদের জীবনযাপনের সংকট নিয়ে আলোচনা না করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। এবারের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে কেন্দ্র করেও একই ধরনের বক্তব্য ও অভিযোগ প্রচারিত হচ্ছে। অথচ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উত্থাপন করা তাঁদের মৌলিক অধিকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বেঁচে থাকার উপযোগী মজুরি চাওয়া কোনো ষড়যন্ত্র নয়; এটি শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন।

বর্তমান সময়ের শ্রমিকরা তাঁদের অধিকার, বাস্তবতা ও স্বার্থ সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা বোঝেন, কোন বক্তব্য তাঁদের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে আর কোন বক্তব্য তাঁদের ন্যায্য দাবিকে আড়াল করে। তাই শ্রমিকদের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্রের তকমা দিয়ে দমন করার চেষ্টা না করে তাঁদের দাবির যৌক্তিকতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করা এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। বরং ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা গেলে শিল্পে উৎপাদনশীলতা, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।

গার্মেন্টস শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিকদের বাঁচাতে হবে। ক্ষুধা, অপুষ্টি, ঋণ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে কোনো শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব নয়। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিকে উপেক্ষা না করে অবিলম্বে গার্মেন্টস শিল্পের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকেই নতুন মজুরি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া হলে তা শুধু শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করবে না, বরং দেশের অর্থনীতি, শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার নয়, শ্রমিকদের বাস্তব সংকটের সমাধানই হোক সরকারের ও মালিকপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার। শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই গার্মেন্টস শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। 

No comments:

Post a Comment

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ ও ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করতে হবে।

গার্মেন্টস শিল্পে অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন , ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে নতুন মজুরি কার্যকর...