বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, সকালে ঢাকার আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের একটি পোশাক কারখানার বহুতল ভবন থেকে পড়ে মো. জামাল উদ্দিন (৩৯) নামে এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তিনি শারমিন গ্রুপের ডিভিশন-৩-এর সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি গাজীপুর সদর থানার বুরুলিয়া ডুয়েট এলাকায়। তিনি মৃত মো. সেকেন্দার আলীর ছেলে। ঘটনার পর দুপুরে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
জামাল উদ্দিনের মৃত্যুকে ঘিরে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে বেশ কিছু
গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। নিহতের ভাই ফখরুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, সকালে অফিসে যাওয়ার পর সাড়ে ৯টার
দিকে তাঁকে ফোন করে জানানো হয়, তাঁর ভাই ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছেন। তিনি ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যা
বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, ছোট সন্তান থাকা এবং প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হিসেবে জীবনযাপন করা একজন মানুষ
কেন আত্মহত্যা করবেন, তা তাঁদের বোধগম্য নয়। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও
প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কিছু লোক ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
নিহত জামাল উদ্দিনের স্ত্রী নাহারের বক্তব্যেও ঘটনার আগে কারখানায় কোনো
সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁর দাবি, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মুঠোফোনে জামাল
জানিয়েছিলেন, কারখানায়
কিছুটা ঝামেলা হয়েছে। পরদিন সকালে তিনি আবারও জানান, কর্তৃপক্ষ খারাপ কিছু করতে পারে। এ কারণে স্ত্রী তাঁকে
অফিসে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু জামাল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, অফিসে না গেলে তাঁকে উল্টো
ফাঁসিয়ে দেওয়া হতে পারে।
নাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, অফিসে যাওয়ার পর জামাল আর ফোন রিসিভ করেননি। প্রায় দুই ঘণ্টা পর অন্য একজন
ফোন ধরে জানান, তিনি
অসুস্থ এবং তাঁদের হাসপাতালে যেতে বলেন। হাসপাতালে যাওয়ার পর পরিবার জানতে পারে, জামাল আত্মহত্যা করেছেন বলে
জানানো হচ্ছে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা এ বক্তব্য মেনে নিতে পারছেন
না।
অন্যদিকে, শারমিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে ঘটনাটিকে
আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ উঠেছে। তবে পরিবারের অভিযোগ কিংবা কর্তৃপক্ষের
বক্তব্য—কোনোটিকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কী
ঘটেছিল, কী কারণে
ঘটেছিল এবং এর পেছনে কারও দায় বা অপরাধ ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করা
জরুরি। একজন মানুষের মৃত্যুকে কেবল আত্মহত্যা বলে চিহ্নিত করে তদন্তের আগেই দায়
এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।
জামাল উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও পোশাক
কারখানায় শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ৩ জুন
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নয়নপুরের দক্ষিণ ধনুয়া এলাকায় ডিবিএল গ্রুপের জিন্নাত
নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানায় জাকির হোসেন নামে এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
শ্রমিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ছুটি চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁকে অপমান করা হয়েছিল। এর জের ধরে তিনি
কারখানার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি আত্মহত্যা
হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর
পেছনে কারও দায় ছিল কি না, সে বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও ফলাফল জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
একইভাবে, ২০২৬
সালের ২৪ মে সাভারের হেমায়েতপুরে ব্যাবিলন গ্রুপের অবনী ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায়
মো. সুজন, যিনি সজল নামেও
পরিচিত, তাঁর রহস্যজনক
মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের একাংশ
ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যা বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, এ ঘটনাকেও আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে
অভিযোগ ওঠে। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
এসব ঘটনার মধ্যে একটি উদ্বেগজনক মিল রয়েছে—মৃত্যুর পরপরই আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা কিংবা পরিকল্পিত হত্যার
মতো ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসে। নিহতের পরিবার ও সহকর্মীরা এক ধরনের অভিযোগ
তোলেন, অন্যদিকে
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
প্রশ্নটি হলো, শেষ
পর্যন্ত প্রকৃত সত্য কী? তদন্তের ফলাফল কী? কারও অবহেলা, নির্যাতন, হুমকি কিংবা অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া
হয়েছে?
দুঃখজনকভাবে, এ ধরনের অনেক ঘটনার পর প্রাথমিক আলোচনা, প্রতিবাদ ও অভিযোগের মধ্যেই বিষয়গুলো সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
তদন্তের অগ্রগতি, ময়নাতদন্তের ফলাফল কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়ে সাধারণ
মানুষ, শ্রমিকসমাজ এবং
নিহতের পরিবার অনেক সময় স্পষ্ট তথ্য জানতে পারেন না। ফলে একদিকে ন্যায়বিচার নিয়ে
অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, অন্যদিকে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি
না, তা নিয়েও
প্রশ্ন ওঠে।
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের
সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ শ্রমিক ও কর্মকর্তা তাঁদের শ্রম, দক্ষতা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ
সময় ব্যয় করে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। অথচ সেই শিল্পের কর্মক্ষেত্রেই যদি
মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধোঁয়াশা থেকে যায়, তাহলে তা শুধু একটি পরিবারের
ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়; এটি কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা এবং আইনের শাসনের জন্যও গভীর উদ্বেগের
বিষয়।
একজন শ্রমিক কিংবা কর্মকর্তা আত্মহত্যা করেছেন—এমন দাবি করা হলে
তার পেছনের পরিস্থিতিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি কর্মক্ষেত্রে মানসিক
চাপ, অপমান, হুমকি, হয়রানি কিংবা অন্য কোনো সমস্যার
শিকার ছিলেন কি না, তা তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। একইভাবে, কেউ পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তুললে সেটিও গুরুত্বের
সঙ্গে বিবেচনা করে প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। কোনো পক্ষের
বক্তব্যের ভিত্তিতে আগেভাগেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন অনুচিত, তেমনি প্রভাবশালী ব্যক্তি বা
প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কোনো অভিযোগ উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
জামাল উদ্দিন, জাকির হোসেন কিংবা সুজন (সজল)—প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি
পরিবার, স্বজনদের অসীম
শোক এবং অসংখ্য অনুত্তরিত প্রশ্ন। তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা শুধু
পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার স্বার্থে নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করার জন্যও
জরুরি।
আমরা চাই, শারমিন গ্রুপে জামাল উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনার আগে ও পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য এবং
কর্মক্ষেত্রে তাঁর ওপর কোনো চাপ বা হুমকি ছিল কি না—সবকিছু আইনসম্মতভাবে
যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে জিন্নাত নিটওয়্যার ও অবনী ফ্যাশনে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর ঘটনাগুলোর
তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফলও জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
গার্মেন্টস কারখানায় একের পর এক রহস্যজনক মৃত্যু ঘটবে, আত্মহত্যা কিংবা পরিকল্পিত
হত্যার অভিযোগ উঠবে, তারপর সময়ের সঙ্গে সবকিছু চাপা পড়ে যাবে—এ পরিস্থিতি চলতে
পারে না। প্রতিটি মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ
নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন একটাই—পোশাকশিল্পের কর্মক্ষেত্রে মানুষের মৃত্যু নিয়ে এই রহস্য
ও বিতর্কের অবসান হবে কবে? নিহত ব্যক্তিদের পরিবার কবে প্রকৃত সত্য জানতে পারবে? আর দায়ী ব্যক্তিরা কবে জবাবদিহির
আওতায় আসবে?
মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি জীবন, একটি পরিবার এবং ন্যায়বিচার
পাওয়ার অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতেই প্রতিটি রহস্যজনক মৃত্যুর সত্য উদ্ঘাটন
করতে হবে।
লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন
মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী।

No comments:
Post a Comment