Followers

Saturday, August 8, 2026

বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে?

 

                      বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে?

বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শ্রমজীবী মানুষ। তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পে লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রম, ঘাম ও দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং নগর অর্থনীতির একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। কিন্তু শিল্পের এই সাফল্যের আড়ালে বর্তমানে যে বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক—কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়াই শ্রমিকদের জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে যেন শ্রমিক ছাঁটাইয়ের এক মহোৎসব চলছে। কোনো মালিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কথা বলছেন, কেউ অর্ডার কমে যাওয়ার কথা বলছেন, কেউ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়ার কথা বলছেন, আবার কেউ কাঁচামাল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সুদের হার কিংবা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। এসব সমস্যার অনেকগুলোই বাস্তব এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

একটি কারখানা যখন লাভ করে, তখন সেই লাভের মালিকানা উদ্যোক্তার। কিন্তু সংকট দেখা দিলে কেন শ্রমিককে চাকরি হারিয়ে সেই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে? আর যদি সত্যিই কোনো কারখানায় কাজ কমে যায়, তাহলে সেই কাজের পরিমাণ কতটা কমেছে, শ্রমিকের সংখ্যা কতটা কমানো প্রয়োজন এবং ছাঁটাইয়ের আগে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর কি যথাযথভাবে খোঁজা হচ্ছে? বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সর্বশেষ উদাহরণগুলোর একটি সামনে এসেছে সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পুকুরপাড়, জিরাবো এলাকায় অবস্থিত এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিট লিমিটেডে। শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য ও ৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখের কর্তৃপক্ষের নোটিশ অনুযায়ী, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে কারখানায় মারাত্মক ব্যবসায়িক মন্দা, প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং ও আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়া এবং পর্যাপ্ত কাজের স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে ৫৬৫ শ্রমিককে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২০ অনুযায়ী ছাঁটাই করা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের আইনগত পাওনা ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হবে। ভবিষ্যতে কাজের পরিধি বাড়লে বা নতুন শ্রমিক নিয়োগের প্রয়োজন হলে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনরায় কাজে নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

কারখানাটির অস্তিত্ব ও অবস্থান নিয়ে সরকারি ও শিল্প-সংগঠনের নথিও রয়েছে। বিজিএমইএর সদস্য-তথ্যে এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ঠিকানা জিরাবো, আশুলিয়া এবং কর্মীসংখ্যা ৭৬৭ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; অন্যদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের একটি ইউনিট-ভিত্তিক রেকর্ডে ১২০ শ্রমিকের তথ্য রয়েছে। ফলে বিভিন্ন সরকারি ও সংগঠনভিত্তিক ডাটাবেজে কারখানার কর্মীসংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। তবে শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ৫৬৫ জন ছাঁটাইয়ের বিষয়টি যদি সঠিক হয়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকোচনের ঘটনা।

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটিকে নিটিং, ডাইং, ফিনিশিং, তৈরি পোশাক ও প্রিন্টিং—বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিটসমৃদ্ধ একটি কম্পোজিট কারখানা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি একটি বহুমুখী উৎপাদন কাঠামোর শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে ‘কাজের স্বল্পতা’ বা ‘ব্যবসায়িক মন্দা’ দেখিয়ে এত বড় সংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তা যাচাই করা জরুরি।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২০-এ প্রয়োজনের অতিরিক্ততার কারণে বা redundancy-এর ভিত্তিতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিধান রয়েছে। তবে এক বছর বা তার বেশি সময় অবিচ্ছিন্নভাবে চাকরিতে থাকা শ্রমিকের ক্ষেত্রে লিখিত নোটিশ, নোটিশের পরিবর্তে মজুরি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশের কপি পাঠানো এবং আইনানুগ ক্ষতিপূরণের মতো শর্ত রয়েছে। বিশেষ কোনো শ্রেণির শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে চুক্তি না থাকলে ওই শ্রেণিতে সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রমিককে আগে ছাঁটাই করার বিধানও রয়েছে।

অন্যদিকে ধারা ২১-এ বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে মালিক পুনরায় শ্রমিক নিয়োগ করতে চাইলে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের তাদের সর্বশেষ জানা ঠিকানায় নোটিশ দিয়ে আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে এবং আবেদনকারী ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনঃনিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে হবে; একাধিক প্রার্থী হলে পূর্বের চাকরির জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অতএব, ধারা ২০ কোনো মালিককে ‘কাজ কমেছে’ বললেই ইচ্ছামতো শ্রমিকের কর্মসংস্থান বাতিল করার সীমাহীন ক্ষমতা দেয়—এমন ধারণা সঠিক নয়।

আইনের উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রমিকের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। সেই কারণে কোনো বড় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠলে তার প্রকৃত কারণ, প্রয়োজনীয়তা এবং আইনগত প্রক্রিয়া যাচাই করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ঘটনাটি বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে বর্তমান সংকটের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। ২০২৫ সালে বিজিএমইএর তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানায়, আগের ১৪ মাসে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৩৫৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন বলে বিজিএমইএর তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়। এই তথ্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের বড় অংশ বিকল্প কর্মসংস্থান না পেয়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানেই শ্রমিক অন্য একটি কারখানায় গিয়ে চাকরি পেয়ে গেলেন—বাস্তবতা এমন নয়। বরং যখন একই সময়ে একটি শিল্পাঞ্চলের একাধিক কারখানা বন্ধ হতে থাকে, তখন শ্রমিকের জন্য বিকল্প চাকরির বাজারও সংকুচিত হয়ে যায়।

উল্লিখিত ৩৫৩টি কারখানার মধ্যে সাভার ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সাভারে ২১৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল—এর মধ্যে ১২২টি স্থায়ী এবং ৯২টি অস্থায়ী। এর ফলে প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সাভার-আশুলিয়ার জন্য এই সংখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই অঞ্চল দেশের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চল। এখানে একদিকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মরত, অন্যদিকে এক কারখানা থেকে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের জন্য আশপাশের অন্য কারখানায় কাজ পাওয়ার সুযোগই সাধারণত প্রধান ভরসা। কিন্তু যখন একই শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়, তখন সেই ভরসাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সাভার-আশুলিয়ার সাম্প্রতিক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানায় ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই। ৬ জুন ২০২৬-এ এ কে এম নিটওয়্যার লিমিটেড, প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার এবং আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে যথাক্রমে ১,২৮৬, ৫২৯ ও ৫৩ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। মালিকপক্ষ ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কথা বলে ধারা ২০-এর আওতায় ছাঁটাইয়ের কথা জানায়।

কিন্তু শ্রমিকরা এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।ঈদের ছুটির পর কাজে ফিরে এসে অনেক শ্রমিক কারখানার গেটে ছাঁটাইয়ের তালিকা দেখতে পান। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শ্রমিকদের একাংশ দাবি করেন যে নিয়মিত ওভারটাইম করার পরও ‘কাজ নেই’ যুক্তি তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।

এখানেই বর্তমান শ্রমিক ছাঁটাইয়ের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—কাজের স্বল্পতা কি সত্যিই উৎপাদনের স্বল্পতা, নাকি শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে শ্রম ব্যয় কমানোর কৌশল? এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, কারখানার উৎপাদন, অর্ডার, শ্রমঘণ্টা এবং ছাঁটাইয়ের আগে-পরে উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করেই বের করতে হবে।

সাভার-আশুলিয়ার পাশাপাশি গাজীপুরও দীর্ঘদিন ধরে শিল্প ও শ্রমিক সংকটের অন্যতম কেন্দ্র। ২০২৫ সালের বিজিএমইএ-উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ওই ৩৫৩টি বন্ধ কারখানার মধ্যে গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং ৭৩ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০২৬ সালেও গাজীপুরে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের নতুন ঘটনা সামনে এসেছে। ১৭ মার্চ কোনাবাড়ীর জরুন এলাকার রিপন নিট ওয়্যার লিমিটেডে ১০৯ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। এই ঘটনাটি দেখায়, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সমস্যা শুধু সাভার-আশুলিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলেও কর্মসংস্থান নিরাপত্তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের জায়গা এখানেই। একটি কারখানায় যদি সত্যিই অর্ডার কমে যায় এবং উৎপাদনের প্রয়োজন কমে যায়, তাহলে শ্রমিকের প্রয়োজন কমতে পারে। কিন্তু ছাঁটাইয়ের পর যদি কারখানার উৎপাদন খুব বেশি না কমে, অথবা একই উৎপাদন কম শ্রমিক দিয়ে চালানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ধরা যাক, একটি কারখানায় ১,০০০ শ্রমিক কাজ করেন। মালিক বললেন, কাজ কমে গেছে এবং ২০০ শ্রমিক ছাঁটাই করলেন। কিন্তু ছাঁটাইয়ের পরও যদি ৮০০ শ্রমিক দিয়ে আগের কাছাকাছি উৎপাদন করা হয়, তাহলে ২০০ শ্রমিকের কাজ কোথায় গেল? কাজটি নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে বাকি ৮০০ শ্রমিকের ওপর পড়বে। এর অর্থ হলো—একদিকে ২০০ শ্রমিক বেকার হলেন, অন্যদিকে ৮০০ শ্রমিকের কাজের চাপ বাড়ল। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ার পরিবর্তে শ্রমিকের ক্লান্তি, মানসিক চাপ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু ‘কাজ কমেছে’ বলা যথেষ্ট নয়। কাজ কতটা কমেছে এবং তার অনুপাতে শ্রমিক কতজন কমানো হয়েছে—এই সম্পর্কটি যাচাই করা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে কারখানা ‘কাজের স্বল্পতা’র কথা বলে শ্রমিক ছাঁটাই করছে, সেখানে ছাঁটাইয়ের পরও যদি নিয়মিত ওভারটাইম চালু থাকে, তাহলে সেই ছাঁটাইয়ের অর্থনৈতিক যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?

অবশ্যই উৎপাদনের ধরন, অর্ডারের সময়সীমা ও বিভাগভেদে ওভারটাইমের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বড় আকারের ছাঁটাইয়ের পর একই সঙ্গে ব্যাপক অতিরিক্ত কাজ চলতে থাকলে সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কারণ তখন প্রশ্ন উঠবে—কারখানায় শ্রমিকের প্রয়োজন কমেছে, নাকি শুধু শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে বেশি উৎপাদন নেওয়া হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইকে ‘স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত’ বলে মেনে নেওয়া বিপজ্জনক।

কারখানা বন্ধ বা ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে বড় মানবিক সমস্যা হলো—শ্রমিকের পরবর্তী গন্তব্য। একজন শ্রমিক যখন চাকরি হারান, তখন তিনি শুধু মাসিক বেতন হারান না। তিনি হারান বাসাভাড়া দেওয়ার নিশ্চয়তা, পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা, সন্তানের স্কুলের খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা।

২০২৫ সালে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার পরও বিকল্প কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিক কাজ না পেয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শহরের ভাড়া বাসা, বাজার, পরিবহন, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব। অর্থাৎ, একটি শিল্পকারখানা বন্ধ হলে শুধু মালিকের ব্যবসা বন্ধ হয় না; একটি বৃহৎ স্থানীয় অর্থনৈতিক চক্র দুর্বল হয়ে যায়।

বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প নানা বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, আমদানির জন্য এলসি খোলার সমস্যা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং অর্ডারের ওঠানামা—এসব বিষয় শিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে এসব সমস্যার কথা উল্লেখ করা হলেও

প্রয়োজন হলো স্বচ্ছ যাচাই। কারখানার অর্ডার কত? উৎপাদন কত? ব্যাংক ঋণ পরিস্থিতি কী? রপ্তানি কত কমেছে? উৎপাদন ব্যয় কত বেড়েছে? শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পর উৎপাদন কত কমেছে? ছাঁটাইয়ের পর নতুন শ্রমিক নেওয়া হয়েছে কি না? ওভারটাইম বেড়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর থেকেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

মালিকপক্ষ প্রায়ই বলে থাকে—‘শ্রমিকদের সব আইনগত পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে।আইনগত পাওনা পরিশোধ করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এটি শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে না। একজন শ্রমিকের হাতে এককালীন ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে দেওয়া হলো। কিন্তু তিনি পরের মাসে কোথায় কাজ করবেন? দুই মাস পর? ছয় মাস পর? ক্ষতিপূরণের টাকা একসময় শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ শেষ হবে না। তাই শ্রমিক ছাঁটাইয়ের নীতি শুধু ‘পাওনা পরিশোধ’কেন্দ্রিক হলে চলবে না। এর সঙ্গে বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন যুক্ত করতে হবে।

শ্রম আইনের ধারা ২১ ইতোমধ্যেই ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনঃনিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রেখেছে। কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে মালিক নতুন শ্রমিক নিতে চাইলে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিধান বাস্তবে কতটা কার্যকর? যদি ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের তালিকা থাকে, কিন্তু পরে নতুন নিয়োগের সময় সেই শ্রমিকদের খোঁজা না হয়, তাহলে আইনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।

তাই প্রয়োজন একটি কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা। প্রতিটি বড় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, পদ, দক্ষতা ও চাকরির মেয়াদ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এক বছরের মধ্যে নতুন নিয়োগ হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে সেই নিয়োগের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের নোটিশে শ্রমিকদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ বা কারখানার শান্তিশৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড ঘটলে কর্তৃপক্ষ প্রচলিত ফৌজদারি ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে। কারখানার নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শ্রমিক বা ব্যক্তি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলা বা অন্য কোনো অপরাধ করতে পারেন না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে আইনসম্মত প্রতিবাদ, পাওনা দাবি, শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে অভিযোগ এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ন্যায্য প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়। চাকরি হারানো শ্রমিকদের ক্ষোভ কত দ্রুত শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে তা আমরা অতিতে দেখেছি। তাই শ্রমিকদের ভয় দেখানোর পরিবর্তে আলোচনায় বসা প্রয়োজন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হওয়া উচিত বড় ধরনের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আগে ও পরে একটি কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা তৈরি করা। কোনো প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করতে চাইলে তার আগে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে—

কারখানার বর্তমান অর্ডার পরিস্থিতি কী, গত ১২ মাসের উৎপাদন কত, গত ১২ মাসে রপ্তানি বা বিক্রয় কত, শ্রমিক সংখ্যা কত, কতজন ছাঁটাই করা হবে, কেন ওই সংখ্যক শ্রমিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত, বিকল্প ব্যবস্থা কী কী নেওয়া হয়েছে, ছাঁটাইয়ের পর উৎপাদন কত হবে, অতিরিক্ত শ্রমঘণ্টা বা ওভারটাইম বাড়বে কি না, ভবিষ্যতে নতুন শ্রমিক নিয়োগ হলে কীভাবে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ ধরনের যাচাই থাকলে প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকট এবং ছাঁটাইকে শ্রম ব্যয় কমানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করা সহজ হবে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে প্রথম সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নয়—‘কতজন শ্রমিক ছাঁটাই করা যায়?’ প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘কীভাবে শ্রমিকের কর্মসংস্থান ধরে রাখা যায়?’

সাময়িকভাবে উৎপাদন পুনর্বিন্যাস করা যায় কি না, শ্রমঘণ্টা পুনর্বিন্যাস করা যায় কি না, নতুন পণ্য বা বাজার খোঁজা যায় কি না, শ্রমিকদের অন্য বিভাগে স্থানান্তর করা যায় কি না, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের পুনর্বিন্যাস করা যায় কি না—এসব বিকল্প আগে দেখতে হবে। ব্যাংকিং সংকট থাকলে ব্যাংক ও সরকারের সহায়তায় ঋণ পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা হতে পারে। অর্ডার সংকট থাকলে নতুন বাজার ও ক্রেতা খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, শ্রমিক ছাঁটাই হবে সর্বশেষ বিকল্প; প্রথম বিকল্প নয়।

একজন শ্রমিককে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া এবং তাকে নতুন কাজ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। শিল্পাঞ্চলে চাকরির বাজার যখন সংকুচিত, তখন একজন ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের জন্য নতুন চাকরি পাওয়া সহজ নয়। একটি কারখানা বন্ধ হলে ৫০০ শ্রমিক যদি একসঙ্গে চাকরি খোঁজেন, তখন আশপাশের কারখানায় ৫০০টি খালি পদ থাকতেই হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে শ্রমিকের সামনে তিনটি পথ থাকে—অন্য শিল্পাঞ্চলে চলে যাওয়া, গ্রামে ফিরে যাওয়া অথবা বেকার থাকা। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক ঋণ করে শহরে থাকেন। চাকরি চলে গেলে বাসাভাড়া দিতে পারেন না। দোকানে বাকি জমে যায়। সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। চিকিৎসা ব্যাহত হয়।

এই বাস্তবতায় বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া ব্যাপক ছাঁটাই কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সামাজিক সংকট তৈরির সিদ্ধান্তও। একটি কারখানার হিসাবের খাতায় শ্রমিককে শুধু ‘লেবার কস্ট’ হিসেবে দেখলে ব্যবসায়িক সংকটের প্রথম সমাধান হিসেবে শ্রমিক কমানোর চিন্তা আসবে। কিন্তু শ্রমিক কোনো যন্ত্র নয়। একজন শ্রমিকের বহু বছরের অভিজ্ঞতা থাকে। একটি নির্দিষ্ট মেশিন পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন প্রক্রিয়া, সময় ব্যবস্থাপনা—এসব দক্ষতা অর্জন করতে বছর লাগে। একজন দক্ষ শ্রমিককে ছাঁটাই করার অর্থ শুধু একটি বেতন কমানো নয়; প্রতিষ্ঠানের অর্জিত দক্ষতার একটি অংশও হারানো। তাই দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতিতে শ্রমিককে ব্যয় নয়, উৎপাদনের অংশীদার ও মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

একজন শ্রমিকের বেতন বন্ধ হলে তার পরিবারের ব্যয় কমে যায়। হাজার হাজার শ্রমিকের বেতন বন্ধ হলে শিল্পাঞ্চলের বাজারে ভোগ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে মুদি দোকান, হোটেল, পরিবহন, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, ক্ষুদ্র ব্যবসা—সবখানে। অর্থাৎ ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাই জাতীয় অর্থনীতিতে চাহিদার সংকটও তৈরি করতে পারে। এই কারণে শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষা শুধু শ্রমিকবান্ধব নীতি নয়; এটি অর্থনীতিবান্ধব নীতিও।

সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পকেন্দ্র। এখানে যদি একের পর এক কারখানা বন্ধ হয় এবং শ্রমিক ছাঁটাই হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। ২০২৫ সালে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ ও প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, তার সঙ্গে ২০২৬ সালের আল-মুসলিম গ্রুপের ১,৮৬৮ শ্রমিক এবং গাজীপুরের ১০৯ শ্রমিকের মতো নতুন ছাঁটাইয়ের ঘটনাগুলো যুক্ত করলে বোঝা যায়—সমস্যাটি কেবল অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন সংকট নয়। এর সঙ্গে ৮ আগস্টের এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা যুক্ত হলে উদ্বেগ আরও বাড়ে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারকে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বড় ধরনের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সরকারি যাচাই চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ‘ব্যবসায়িক মন্দা’, ‘অর্ডার কমে যাওয়া’, ‘ব্যাংকিং সংকট’ বা ‘কাজের স্বল্পতা’—এসব কারণের বাস্তবতা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, ছাঁটাইয়ের আগে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের জন্য শিল্পাঞ্চলভিত্তিক পুনঃকর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করতে হবে। পঞ্চমত, শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২১ অনুযায়ী পুনঃনিয়োগের অগ্রাধিকার বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। এর পাশাপাশি শিল্প মালিকদের জন্যও একটি কার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনা নীতি তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে ব্যবসায়িক সংকটের সময় সরকার, ব্যাংক, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি একসঙ্গে বসে সমাধান খুঁজতে পারেন। বাংলাদেশের শিল্পনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো—আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু কর্মসংস্থান হারানো মানুষের পুনর্বাসন নিয়ে খুব কম কথা বলি।

একটি নতুন কারখানা ১,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলে সেটি বড় সাফল্য। কিন্তু একটি পুরোনো কারখানা ১,০০০ মানুষকে ছাঁটাই করলে সেই ১,০০০ মানুষের কী হবে—এই প্রশ্নের উত্তরও রাষ্ট্রীয় শ্রমনীতিতে থাকা উচিত। শ্রমিকের হাতে ছাঁটাইয়ের নোটিশ তুলে দিয়ে বলা যাবে না—‘আইন অনুযায়ী আপনার পাওনা দেওয়া হয়েছে।’ রাষ্ট্রকে বলতে হবে—‘আপনার কর্মসংস্থান হারিয়েছে, কিন্তু আপনার জীবিকা হারাতে দেওয়া হবে না।’ এই পার্থক্যটিই একটি মানবিক রাষ্ট্র ও নিছক বাজারনির্ভর রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।

ব্যবসায়িক সংকট বাস্তব হতে পারে।হয়তো কোনো কোনো মালিক সত্যিই কঠিন সময় পার করছেন। ব্যাংকিং সংকট, অর্ডার সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—এসব সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। কিন্তু সেই সমাধানের প্রথম শিকার যদি শ্রমিক হন, তাহলে আমাদের শিল্পনীতির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হবে।

একটি শিল্পের সাফল্য শুধু রপ্তানি আয় দিয়ে মাপা যায় না। সেই শিল্পের শ্রমিক কতটা নিরাপদ, তার পরিবার কতটা নিশ্চিন্ত, তার মজুরি দিয়ে জীবনযাপন সম্ভব কি না, সংকটের সময় তার চাকরি কতটা সুরক্ষিত এবং চাকরি হারালে তার বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে কি না—এসবও শিল্পের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

আজ এ্যালায়েন্স নীট কম্পোজিটের ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর সামনে এসেছে। এর আগে আল-মুসলিম গ্রুপের তিন কারখানায় ১,৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। গাজীপুরে ১০৯ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।

এগুলো শুধু সংখ্যা নয়। ৫৬৫ মানে ৫৬৫টি জীবিকা। ১,৮৬৮ মানে ১,৮৬৮টি পরিবারের অনিশ্চয়তা। ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ মানে একটি বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সংকট। এই মানুষগুলো দেশের অর্থনীতির বোঝা নন; তারাই দেশের অর্থনীতি তৈরি করেন। তাই এখন সময় এসেছে শ্রমিক ছাঁটাইকে শিল্প ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে সহজ সমাধান হিসেবে দেখা বন্ধ করার। কারণ একটি কারখানা বাঁচানোর নামে যদি হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই শিল্পের টেকসই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।

শ্রমিকদের হাতে কি শুধু ছাঁটাইয়ের নোটিশ তুলে দেওয়া হবে, নাকি তাদের হাতে আবারও কাজ ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও শিল্প মালিকরা গ্রহণ করবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশের শ্রমনীতি ও শিল্পনীতির মানবিক চরিত্র নির্ধারণ করবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। 

বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে?

                        বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মহোৎসব, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকটের দায় কে নেবে? বাংলাদেশের শিল্প অর্থন...