সাভারের চন্দনপুর–রাজফুলবাড়িয়া এলাকায় অবস্থিত একে এইচ স্টিচ আর্ট লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানায় অসুস্থ অবস্থায় এক শ্রমিককে ছুটি না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে কারখানা ছুটির পর বাসায় ফিরে ওই শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ১ অক্টোবর ২০২৬ কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করেছেন।
নিহত শ্রমিকের নাম মোছাঃ কুলসুমা বেগম (২২)। তার আইডি কার্ড নম্বর ৮১৪৮২১৯। তিনি কারখানার সুইং
বিভাগে জুনিয়র অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০ জানুয়ারি ২০২২ সাল থেকে তিনি
কারখানাটিতে স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। তার স্থায়ী ঠিকানা রংপুর জেলার
পীরগাছা থানার হোসেনপুর গ্রামে। মৃত্যুকালে তিনি তিন বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান
রেখে গেছেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, কুলসুমা বেগম
মৃত্যুর আগে টানা ৩–৪ দিন অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি একাধিকবার কারখানার
মেডিক্যালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কারখানার মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ
তার অসুস্থতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি এবং তাকে বিশ্রাম বা ছুটির জন্য কোনো সুপারিশ করা
হয়নি বলে সহকর্মীরা অভিযোগ করেছেন।
সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে কর্মরত অবস্থায় কুলসুমা হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ
হয়ে পড়েন। তখন তিনি সুপারভাইজারের কাছে ছুটি চাইলেও তাকে ছুটি দেওয়া হয়নি বলে
সহকর্মীরা জানান। ফলে শারীরিকভাবে অসুস্থ অবস্থাতেই তাকে কারখানায় অবস্থান করে কাজ
চালিয়ে যেতে বাধ্য হতে হয়।
কারখানা ছুটির পর তিনি বাসায় ফিরে যান। কিন্তু বাসায় যাওয়ার পর তার শারীরিক
অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হয়। শ্রমিকদের
দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরদিন ১ অক্টোবর ২০২৬ কুলসুমা বেগমের মৃত্যু হয়।
কুলসুমার মৃত্যুর খবর কারখানায় পৌঁছালে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও
বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অসুস্থ অবস্থায় ছুটির আবেদন উপেক্ষা করা, যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়া এবং নিরাপদে বাড়ি বা হাসপাতালে
পাঠানোর ব্যবস্থা না করার অভিযোগে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করেন।
শ্রমিকদের প্রশ্ন—একজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও যদি ছুটি না পান, চিকিৎসা না পান, নিরাপদে হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ না পান, তাহলে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?
শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, কারখানায়
ইউনিয়ন থাকলেও শ্রমিকদের সমস্যার কার্যকর সমাধান হয় না। কোনো অভিযোগ নিয়ে ইউনিয়ন
নেতাদের কাছে গেলে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। শ্রমিকদের দাবি, ইউনিয়নের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অনেক সময় মালিকপক্ষের
স্বার্থকে প্রাধান্য দেন এবং শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যা নিয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন
করেন না।
শ্রমিকরা বলেন, প্রতিদিন
অসুস্থ অবস্থায়ও অনেক শ্রমিককে কাজ করতে হয়। অসুস্থ হয়ে ছুটির আবেদন করলে তা গ্রহণ
করা হয় না। ফলে চাকরি হারানোর ভয়ে অসুস্থ শরীর নিয়েই ডিউটি করতে বাধ্য হন শ্রমিকরা।
সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো—যে মজুরি একজন শ্রমিক পান, তা দিয়ে তিনবেলা ঠিকমতো খাবার জোটে না; সেখানে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা অনেকের কাছেই অসম্ভব। শ্রমিকদের ভাষ্য, অসুস্থ হলে তারা স্থানীয় ফার্মেসি থেকে মাস চুক্তিতে ওষুধ কিনে খান। বড়
কোনো হাসপাতালে বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই।
শ্রমিকদের আশঙ্কা, কুলসুমার মতো
আরও অনেক শ্রমিক অসুস্থ অবস্থায় কাজ করতে করতে একদিন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে
ঠেলে দেওয়া হতে পারে।
তাদের কণ্ঠে তাই এক গভীর প্রশ্ন—কুলসুমা চলে গেলেন, কিন্তু তার তিন বছরের শিশুটির কী হবে? তার পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে? একজন শ্রমিকের জীবন কি এতটাই মূল্যহীন?
কুলসুমা বেগমের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এটি পোশাকশিল্পে শ্রমিকের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, ছুটি, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে
গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
কর্মরত অবস্থায় কোনো শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসা নিশ্চিত করা, প্রয়োজন হলে ছুটি দেওয়া এবং নিরাপদে বাড়ি বা হাসপাতালে
পাঠানো কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অসুস্থ শ্রমিককে ছুটি না দেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। তদন্তে কারও দায়িত্বহীনতা বা অবহেলা প্রমাণিত
হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে কারখানায় শ্রমিকদের জন্য কার্যকর চিকিৎসাব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, অসুস্থ অবস্থায় ছুটি এবং নিরাপদে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে
হবে। শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে অভিযোগ করার কারণে কোনো শ্রমিক চাকরি হারানোর ভয় না
পান।
আমরা চাই না আর কোনো কুলসুমা অসুস্থ শরীর নিয়ে মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে
মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাক।
শ্রমিক মানুষ—সে কোনো মেশিন নয়। তারও অসুস্থ হওয়ার অধিকার আছে, চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে, বিশ্রাম নেওয়ার অধিকার আছে এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার
অধিকার আছে।
কুলসুমা বেগমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কোনো অবহেলা বা
দায়িত্বহীনতা জড়িত ছিল কি না, তা তদন্ত করে
সত্য উদঘাটন করতে হবে। দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং কুলসুমার
পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
আর কোনো কুলসুমার মৃত্যু নয়—শ্রমিকের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা বন্ধ, অসুস্থ
শ্রমিককে চিকিৎসা ও ছুটি, কর্মক্ষেত্রে মানবিক আচরণ নিশ্চিত এবং শ্রমিকের
জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন
কর্মী।
