Followers

Saturday, October 17, 2026

অসুস্থ শ্রমিককে ছুটি না দেওয়া ও কর্মস্থলে চিকিৎসার অবহেলায় নারী শ্রমিকের মৃত্যু: দায় নেবে কে?

পোশাক কারখানায় কর্মরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়া শ্রমিককে যথাসময়ে চিকিৎসা দেওয়া, প্রয়োজনে ছুটি দিয়ে হাসপাতালে পাঠানো এবং তার জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা কারখানা কর্তৃপক্ষের মানবিক ও আইনগত দায়িত্ব। অথচ দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের অসুস্থতা, চিকিৎসা পাওয়া এবং জরুরি প্রয়োজনে ছুটি নেওয়ার অধিকার নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। অসুস্থ অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য করা, ছুটি না দেওয়া এবং যথাসময়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করার অভিযোগে একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এসব ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। ফলে শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

সর্বশেষ গত শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, বিকেলে ঢাকার আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত ডেকো গ্রুপের আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেড পোশাক কারখানায় কর্মরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে মারা যান সুমি আক্তার নামের এক নারী শ্রমিক। তিনি কারখানাটির সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। তার গ্রামের বাড়ি রংপুরের ডিমলা উপজেলার খোকারহাট এলাকায়। তিনি বজলার মিয়ার মেয়ে। স্বামী সাজ্জাদ ও দুই ছেলেকে নিয়ে আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকার সালামের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তিনি। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন সুমি।

তার স্বামী সাজ্জাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেলে কারখানায় কাজ করার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুমি। পরে কারখানার এক সহকর্মী ফোন করে তাকে স্ত্রীর অসুস্থতার কথা জানান। খবর পেয়ে স্বজনেরা কারখানার ফটকে গেলে কর্তৃপক্ষ শুধু সাজ্জাদকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়। তিনি কারখানার ভেতরে গিয়ে কয়েকজনকে সুমির হাত-পা চেপে ধরে রাখতে দেখেন বলে অভিযোগ করেন। এ সময় সুমিকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিল। পরে কারখানার একটি গাড়িতে করে তাকে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

সাজ্জাদের আরও অভিযোগ, তার স্ত্রী কারখানার ভেতরেই মারা গেছেন এবং মৃত্যুর পর কারখানা কর্তৃপক্ষ কাউকে না জানিয়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। মরদেহ হস্তান্তর নিয়ে স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। তবে সুমি আক্তারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, তিনি ঠিক কী ধরনের শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, অসুস্থ হওয়ার পর তাকে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। স্বামীর অভিযোগ এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করা এবং কোনো ধরনের অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।

সুমি আক্তারের মৃত্যুর ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সাভারের চন্দনপুর–রাজফুলবাড়িয়া এলাকায় অবস্থিত একে এইচ স্টিচ আর্ট লিমিটেড পোশাক কারখানার সুইং বিভাগের জুনিয়র অপারেটর মোছা. কুলসুমা বেগম (২২) অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ছুটি না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তিনি কারখানাটিতে ২০ জানুয়ারি ২০২২ থেকে স্থায়ীভাবে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অসুস্থ অবস্থায় ছুটি না পেয়ে কারখানার নির্ধারিত কর্মঘণ্টা শেষে বাসায় ফিরে তিনি মারা যান। এই মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা ১ অক্টোবর ২০২৬ কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানান। একজন তরুণ নারী শ্রমিকের অসুস্থতার সময় ছুটি না পাওয়ার অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যু শ্রমিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।

এর আগেও গাজীপুরের ইসলাম গ্রুপসহ বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের অসুস্থ অবস্থায় ছুটি না পাওয়া এবং কর্মস্থলে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর যথাযথ চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনার প্রতিটিতে একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে—একজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়লে কেন তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য পাঠানোর নিশ্চয়তা থাকবে না? কেন জরুরি শারীরিক সমস্যার মধ্যেও তাকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চাপের মুখে পড়তে হবে? আর কোনো শ্রমিকের মৃত্যু হলে কেন ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং দায় নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে না?

তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের উৎপাদন, রপ্তানি ও মুনাফার পেছনে লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রম, ঘাম এবং ত্যাগ জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকেরা পরিবার পরিচালনা, সন্তানদের লালন-পালন এবং সংসারের ব্যয় মেটানোর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কারখানায় কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, চিকিৎসা ও ছুটির নিশ্চয়তা না থাকলে সেই শিল্পের অগ্রগতির দাবি মানবিকতার প্রশ্নে ব্যর্থ হয়ে পড়ে।

একজন শ্রমিকের জীবন কোনো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা, অর্ডার কিংবা সময়সীমার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। অসুস্থতা কোনো অপরাধ নয়, আর অসুস্থ শ্রমিককে ছুটি দেওয়া বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা মালিকপক্ষের দয়া নয়; এটি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মৌলিক দায়িত্বের অংশ। একজন শ্রমিক অসুস্থ হলে তার অবস্থা বিবেচনা করে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসা নিতে বিলম্ব করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধে শুধু শোক প্রকাশ কিংবা শ্রমিকদের প্রতিবাদের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই যথেষ্ট নয়। সুমি আক্তার ও কুলসুমা বেগমের মৃত্যুর অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কারখানার চিকিৎসাসেবা, অসুস্থ শ্রমিককে ছুটি দেওয়ার নীতি, জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে কারখানার অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা কার্যকর কি না, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরকে যাচাই করতে হবে। তদন্তে কোনো ধরনের অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে শ্রমিকদের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। কোনো কারখানায় শ্রমিকের মৃত্যু হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে অসুস্থ হলে তারা চাকরি হারানোর ভয়, কর্তৃপক্ষের চাপ কিংবা ছুটি না পাওয়ার আশঙ্কা ছাড়াই চিকিৎসা নিতে পারবেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একের পর এক মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পরও যদি কার্যকর তদন্ত, জবাবদিহি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত না হয়, তাহলে একই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটার আশঙ্কা থেকে যায়। কোনো শ্রমিকের মৃত্যুর পর তার পরিবার শুধু প্রিয়জনকেই হারায় না; হারায় সংসারের উপার্জনক্ষম একজন মানুষকে। সুমি আক্তারের দুই সন্তান এবং কুলসুমা বেগমের পরিবারের ভবিষ্যৎ ও জীবিকার প্রশ্নও তাই উপেক্ষা করা যায় না। মৃত্যুর ঘটনায় দায় ও অবহেলা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণসহ পরিবারের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

সুমি আক্তার ও কুলসুমা বেগমের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে—পোশাকশিল্পে উৎপাদন ও মুনাফার হিসাব কি শ্রমিকের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে? যদি একজন অসুস্থ শ্রমিক সময়মতো ছুটি ও চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েন, তবে সেই পরিস্থিতির দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকা উচিত নয়। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না, কিন্তু নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো ঘটনাকেই উপেক্ষা করাও চলবে না।

শ্রমিকের জীবন রক্ষা, অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা ও ছুটির অধিকার নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে অবহেলার অভিযোগের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। আর কোনো নারী শ্রমিককে যেন অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগের মুখে পড়তে না হয়, আর কোনো পরিবারকে যেন কর্মস্থলে প্রিয়জন হারিয়ে ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়—এ জন্য সরকার, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে; শ্রমিকের জীবন ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে কোনো শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। 

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। 

No comments:

Post a Comment

অসুস্থ শ্রমিককে ছুটি না দেওয়া ও কর্মস্থলে চিকিৎসার অবহেলায় নারী শ্রমিকের মৃত্যু: দায় নেবে কে?

পোশাক কারখানায় কর্মরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়া শ্রমিককে যথাসময়ে চিকিৎসা দেওয়া, প্রয়োজনে ছুটি দিয়ে হাসপাতালে পাঠানো এবং তার জীবন রক্ষায় প্রয়োজন...