Followers

Thursday, July 30, 2026

শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?




বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ১২৪ক: শ্রমিক অধিকার আদায়ের আইনি সুরক্ষা নাকি নিঃস্ব করার নতুন হাতিয়ার?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তবে যে শ্রমিকের গায়ের ঘামে এই শিল্পের চাকা সচল থাকে, তাঁদের আইনগত পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘটে নানা অনিয়ম ও প্রতারণা। অতি সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’-এর ১২৪ক ধারা ব্যবহার করে শ্রমিকদের আইনি পাওনা থেকে বঞ্চিত করার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইনগতভাবে কোনো বিরোধ দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে আপোষ-মীমাংসার এই বিধান তৈরি করা হলেও, বাস্তবচিত্রে এটি হয়ে উঠেছে অসাধু মালিক ও সুবিধাভোগী কিছু শ্রমিকনেতার যোগসাজশে শ্রমিক ঠকানোর এক ‘মহা হাতিয়ার’।

১২৪ক ধারার আইনি উদ্দেশ্য ও তার বাস্তবতা

আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকদ্দমা এড়িয়ে শ্রমিকের বকেয়া মজুরি এবং প্রাপ্য পাওনা দ্রুত পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা। আইনের ১২৪ক ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে:

আবেদনের সুযোগ (উপ-ধারা ১): কর্মে কর্মরত, অবসরে যাওয়া, চাকরিচ্যুত বা বরখাস্তকৃত শ্রমিক বা শ্রমিকরা মজুরিসহ আইনত প্রাপ্য পাওনা আদায়ে প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে পারেন।

সময়সীমা (উপ-ধারা ২ ও ৩): আবেদন পাওয়ার সর্বোচ্চ ২০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উদ্যোগ গ্রহণ করে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন।

সিদ্ধান্ত ও কার্যকারিতা (উপ-ধারা ৪ ও ৫): সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে দুই পক্ষকে দিতে হবে এবং তা পালনে পক্ষসমূহ বাধ্য থাকবে।

শ্রম আদালতে আপিলের পথ (উপ-ধারা ৬): কোনো পক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সিদ্ধান্তে সম্মত না হলে তারা শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবেন এবং আদালত এই মধ্যস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।

কাগজে-কলমে এই প্রক্রিয়াটি শ্রমিকের জন্য সময় ও অর্থ বাঁচানোর কথা থাকলেও, বাস্তবে এতে চরম ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বেআইনি কারসাজি চলছে।

যেভাবে হচ্ছে প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার

১২৪ক ধারার সুবিধা নিয়ে কিছু অসাধু পক্ষ আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করছে, যা মূলত তিনটি প্রধান উপায়ে শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে:

আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, শ্রমিক নিজে বা শ্রমিকরা সরাসরি প্রধান পরিদর্শকের কাছে আবেদন করবেন। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকদের সরাসরি যুক্ত না করে অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত কিছু ফেডারেশন বা অসাধু শ্রমিকনেতা শ্রমিকদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের প্রতিনিধি সেজে আবেদন করছেন। অথচ আইনি ভিত্তিতে শ্রমিকদের আইনি সর্বনিম্ন পাওনার চেয়ে কম মূল্যে রফাদফা বা আপোষ করার কোনো এখতিয়ার বা অধিকার এই প্রতিনিধি বা ফেডারেশনগুলোর নেই।

শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের সার্ভিস বেনিফিট, নোটিশ পে, ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া মজুরি পাওয়া একটি নির্দিষ্ট আইনি অধিকার (Statutory Right)। এটি মালিকের কোনো অনুগ্রহ নয়। কিন্তু ১২৪ক ধারার অধীনে মধ্যস্থতার নামে অসাধু মালিক ও শ্রমিকনেতারা যোগসাজশ করে শ্রমিকদের আইনত প্রাপ্য সর্বনিম্ন সুবিধার চেয়ে অনেক কম অর্থে ‘আপোষ’ করতে বাধ্য করছেন। ফলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অর্ধেক বা তারও কম টাকায় সই দিয়ে চলে যাচ্ছেন।

অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির পর শ্রমিককে দিয়ে এমনভাবে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বা বুঝানো হয় যে, তারা আর কোথাও অভিযোগ করতে পারবেন না। ফলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিকরা।

সম্প্রতি লিথি গ্রুপ, ইউনিক ডিজাইনসহ বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিকের সাথে আপোষ-মীমাংসার নামে এই ধরনের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। যেখানে শত শত শ্রমিকের কোটি কোটি টাকার আইনি পাওনাকে ১২৪ক ধারার দোহাই দিয়ে নামমাত্র টাকায় নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

এই অনিয়মের লাগাম এখনই টেনে ধরা না গেলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এবং সামগ্রিক শ্রম খাতের জন্য এর পরিণতি হবে মারাত্মক:

 শ্রমিকরা যখন বুঝতে পারবেন যে আইনি প্রক্রিয়াতেও তারা প্রতারিত হচ্ছেন, তখন আইনি ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা উঠে যাবে। ফলে তারা রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হবেন, যা শিল্পে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা ডেকে আনবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং বিদেশী ক্রেতারা (Buyers) বাংলাদেশে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। ১২৪ক ধারার এই অপব্যবহারের খবর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছালে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে এবং অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হবে।

চাকরি হারানোর পর পাওনা না পেয়ে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার চরম অর্থনৈতিক মানবেতর জীবনের মুখে পড়বে।

১২৪ক ধারাকে শ্রমিক ঠকানোর মাধ্যম থেকে রক্ষা করে পুনরায় ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

প্রধান পরিদর্শক বা তাঁর কোনো প্রতিনিধি এমন কোনো আপোষ-মীমাংসা অনুমোদন বা সই করতে পারবেন না, যা শ্রম আইনে নির্দিষ্টকৃত ন্যূনতম প্রাপ্য পাওনার চেয়ে কম। আইনি পাওনার চেয়ে কম অর্থমূল্যে সমঝোতা করাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ ঘোষণা করতে হবে।

মধ্যস্থতা বৈঠকে শ্রমিকদের সরাসরি উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো অননুমোদিত ফেডারেশন বা নেতার মধ্যস্থতায় শ্রমিকের অবর্তমানে সমঝোতা করা বন্ধ করতে হবে।

ডিআইএফই (DIFE) বা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা অসাধু আপোষ-মীমাংসায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সই করছেন, তাঁদের ওপর কঠোর গোয়েন্দা তদারকি চালাতে হবে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

১২৪ক ধারার উপ-ধারা (৬) অনুযায়ী কোনো আপোষ জোরপূর্বক চাপিয়ে দিলে শ্রমিকরা যে শ্রম আদালতে যেতে পারেন—সে বিষয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক আইনি সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১২৪ক ধারা তৈরি করা হয়েছিল দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য, তাঁদের বলির পাঁঠা বানানোর জন্য নয়। অসাধু মালিক চক্র এবং নামধারী কিছু শ্রমিকনেতার অপতৎপরতায় এই আইনি বিধানটি আজ শ্রমিকের মূল অধিকার হননকারী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শিল্প রক্ষা এবং শ্রমিকের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার স্বার্থে এখনই সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই ধারার অপব্যবহার রোধে কঠোর নীতিমালা জারি করা। অন্যথায়, এই অন্যায় ও ক্ষোভের আগুন দীর্ঘমেয়াদে পুরো গার্মেন্টস শিল্পকেই সংকটের মুখে ফেলে দেবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


Saturday, July 18, 2026

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি

 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (Ready-Made Garments-RMG) শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি। প্রতি বছর এই শিল্প থেকে কয়েক দশমিক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে এবং প্রায় ৪০ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক—যাদের অধিকাংশই নারী—তাদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের মাধ্যমে এই শিল্পকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক খাতে পরিণত করেছেন। অথচ এই শিল্পের প্রকৃত চালিকাশক্তি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। ওই বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনিকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে একাধিক বৈঠক, মতবিনিময় ও আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় এবং নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯(৬) ধারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, কোনো শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত নিম্নতম মজুরির হার প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এই বিধানের উদ্দেশ্য হলো জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয়সহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরির সামঞ্জস্য বজায় রাখা।

একই সঙ্গে প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত, শুনানি ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করে নতুন মজুরির সুপারিশ চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডে নিয়োগপ্রাপ্ত মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি—উভয়েরই তিন বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত সর্বনিম্ন মজুরির গেজেটেরও তিন বছর পূর্ণ হবে ২০২৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর।

অর্থাৎ আইনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা অনুসারে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের পরই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে পরবর্তী মজুরি পুনর্নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল, যাতে ডিসেম্বরের আগেই আইনসম্মত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। এটি শুধু প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; বরং শ্রম আইনের উদ্দেশ্য ও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশে একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি যেন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শ্রমিকরা দীর্ঘদিন দাবি জানালেও তাতে কার্যকর সাড়া মেলে না। বরং শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয়, কারখানা বন্ধ হয়, সড়ক অবরোধ হয়, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে, মামলা-হামলা হয়, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। এরপরই কেবল সরকার ও মালিকপক্ষ নড়েচড়ে বসে। একটি আধুনিক ও আইনভিত্তিক রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আজকের বাস্তবতা আরও কঠিন। বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরি দিয়ে অধিকাংশ শ্রমিকের পক্ষে একটি পরিবারের এক মাসের ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, মাসের প্রথম ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অর্থ ফুরিয়ে যায়। এরপর ধার-দেনা, ঋণ কিংবা অতিরিক্ত ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করেই বাকি মাস কাটাতে হয়।

অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির কারণে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসা ও ওষুধের খরচও বহুগুণ বেড়েছে। ফলে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারছেন না। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

একজন অপুষ্ট, অসুস্থ ও মানসিক চাপে থাকা শ্রমিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। শিল্পের উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নত করতেই হবে। কারণ শ্রমিক সুস্থ থাকলে শিল্পও সুস্থ থাকবে; শ্রমিক নিরাপদ থাকলে উৎপাদনও টেকসই হবে।

বর্তমান বিশ্বে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও কেবল কম দামের পণ্য নয়; তারা শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।

আমরা বিশ্বাস করি, নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ কোনো রাজনৈতিক বা আন্দোলনের বিষয় হওয়া উচিত নয়; এটি একটি নিয়মিত, আইনসম্মত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। শ্রম আইনে যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই সময়সীমা মেনেই সরকারকে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে এবং জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক পরিবারের মৌলিক চাহিদা, পুষ্টি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সঞ্চয় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

আমরা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাই—অবিলম্বে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বাস্তবসম্মত, ন্যায্য এবং বেঁচে থাকার উপযোগী নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করুন। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলে শিল্প শক্তিশালী হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আরও টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

লিখেছেন: খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা ও সমাজকর্মী

নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর: শ্রমিকের জীবনে এর সুফল কোথায়?

জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ বাস্তবতা। বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্...