বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই শিল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা—শ্রমিকের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদার চরম অবমূল্যায়ন। প্রতিনিয়ত শ্রমিকের ঘাম, রক্ত, অশ্রু এবং কখনো কখনো প্রাণের বিনিময়ে দাঁড়িয়ে আছে এই শিল্পের তথাকথিত উন্নয়ন।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি এলাকায় অবস্থিত কালার অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড গার্মেন্টসে ২৪ জুন ২০২৬ (বুধবার) দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া লিজা বেগমের মৃত্যু সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতার আরেকটি বেদনাদায়ক উদাহরণ। এটি শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে অবহেলা, অমানবিকতা এবং দায়িত্বহীনতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বাসিন্দা, ৩৭ বছর বয়সী সুইং অপারেটর লিজা বেগম টানা দুই সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একাধিকবার ছুটির আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ তা মঞ্জুর করেনি। অসুস্থ শরীর নিয়েই তাকে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। অবশেষে গভীর রাতে কর্মস্থলেই তিনি অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। একজন শ্রমিকের জীবনের চেয়ে যদি উৎপাদনের লক্ষ্য, শিপমেন্ট কিংবা মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে সেটি কোনোভাবেই মানবিক বা সভ্য কর্মপরিবেশের পরিচয় হতে পারে না।
এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—গার্মেন্টস শিল্পে একজন শ্রমিক কি কেবল উৎপাদনের একটি যন্ত্র, নাকি তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্র, মালিক এবং প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব?
দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের বহু কারখানায় এখনো এমন একটি সংস্কৃতি বিদ্যমান, যেখানে অসুস্থ শ্রমিক ছুটি চাইলে তাকে নানা অজুহাতে নিরুৎসাহিত করা হয়, কখনো চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়, আবার কখনো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অজুহাতে কাজে বাধ্য করা হয়। ফলে শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতা আধুনিক শিল্পব্যবস্থার নয়; বরং এটি এক ধরনের আধুনিক দাসত্বের প্রতিফলন।
লিজা বেগমের মৃত্যুর পর সহকর্মী শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ প্রমাণ করে যে এই ক্ষোভ শুধুমাত্র একজন শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অবিচার, বৈষম্য এবং অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে জমে থাকা প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
প্রথমত, লিজা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। যদি প্রমাণিত হয় যে অসুস্থতা সত্ত্বেও তাকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ছুটি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার, ব্যবস্থাপক এবং দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, লিজা বেগমের পরিবারকে সামান্য অনুদান দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। পরিবার যে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য, পর্যাপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, দেশের প্রতিটি তৈরি পোশাক কারখানায় অসুস্থতাজনিত ছুটিকে (Sick Leave) শ্রমিকের আইনি অধিকার হিসেবে কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কারখানায় সার্বক্ষণিক যোগ্য চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত মেডিকেল টিম, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসা-সুবিধা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চতুর্থত, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার অজুহাতে কোনো অসুস্থ শ্রমিককে জোরপূর্বক কাজ করানো, ছুটি প্রত্যাখ্যান করা অথবা চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়ার মতো অমানবিক চর্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে শ্রমিক কেবল উৎপাদনের মাধ্যম নন; তিনি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই শিল্পায়ন কিংবা উন্নয়নের দাবি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোনো জাতির জন্য গৌরবের বিষয় হতে পারে না।
লিজা বেগমের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই কার্যকর সংস্কার না আনা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বহু লিজা বেগম একই পরিণতির শিকার হবেন। তাই এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, বরং শ্রমিক অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে দেখতে হবে।
শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই শিপমেন্ট, উৎপাদন বা মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান হতে পারে না। এখনই সময় শ্রমিককে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং এমন একটি শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার, যেখানে আর কোনো শ্রমিককে অসুস্থ শরীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হবে না।
আর কোনো লিজা বেগমের জীবন এভাবে ঝরে পড়ুক—এটি কোনো সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। গার্মেন্টস কারখানায় মৃত্যুর এই মিছিল থামাতেই হবে। শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার এখনই সময়।
খাইরুল মামুন মিন্টু

No comments:
Post a Comment