রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংসদীয় গণতন্ত্র, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহারের প্রশ্ন। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় যখন ফলাফল ভোট গ্রহণের আগেই কার্যত নির্ধারিত হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এমন নির্বাচনে বিপুল অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় করার প্রয়োজন কতটা?
বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কেউই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। ফলে তফসিল অনুযায়ী আগামী বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার সাধারণ জনগণ নন; সংসদ সদস্যরাই এ নির্বাচনের ভোটার। বর্তমান সংসদে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্য ২৫৯ জন এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদ সদস্য ৯০ জন। ফলে বিএনপির এককভাবেই দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্ট দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপির সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সুযোগ কার্যত অত্যন্ত সীমিত। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে একজন সংসদ সদস্যকে নিজের আসন হারানোর ঝুঁকি নিতে হবে।
ফলে বিএনপির ২৫৯ জন সংসদ সদস্য যদি দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভোট দেন, তাহলে তিনি প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবেন—এটি প্রায় নিশ্চিত। বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের ৯০ জন সংসদ সদস্য সম্মিলিতভাবে ভোট দিলেও তাঁদের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
অর্থাৎ ভোটের ফলাফল নির্ধারণে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। নির্বাচনের দিন ব্যালট বাক্সে ভোট পড়বে, ভোট গণনা হবে, ফলাফল ঘোষণা করা হবে—কিন্তু ফলাফলের রাজনৈতিক বাস্তবতা ইতোমধ্যেই সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কে নির্ধারিত হয়ে আছে।
এ অবস্থায় প্রশ্নটি হলো—যখন ফলাফল প্রায় নিশ্চিত, তখন এই নির্বাচন আয়োজনের জন্য রাষ্ট্রের কত টাকা ব্যয় হবে এবং সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা কোথায়?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে শুধু ব্যালট পেপার ছাপানোর খরচ জড়িত নয়। এর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহন ও সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত দায়িত্ব, পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, গণনা ও ফলাফল প্রকাশসহ নানা ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয় যুক্ত থাকে।
একটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এসব ব্যয় স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কারণ প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে ভোটারদের মতামত গ্রহণ এবং সেই মতামতের ভিত্তিতে ফলাফল নির্ধারণের জন্য এসব ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু যখন নির্বাচনের ফলাফল ভোট গ্রহণের আগেই সংসদের দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কার্যত নির্ধারিত হয়ে যায়, তখন একই মাত্রার নির্বাচনী আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়।
এখানে বিষয়টি শুধু কয়েকটি ব্যালট পেপারের খরচের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতার প্রশ্ন।
জনগণের করের টাকা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। সেই অর্থের প্রতিটি টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি নির্বাচন যদি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি না করে এবং ফলাফল যদি দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আগেই প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, তাহলে শুধু সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ব্যয় করা অর্থের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বিধান অমান্য করা উচিত। সংবিধানে নির্বাচন নির্ধারিত থাকলে তা অনুসরণ করতেই হবে। বরং প্রশ্নটি আরও গভীর—সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকেই কীভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো যায় এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, অর্থবহ ও গণতান্ত্রিক করা যায়?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যদি সংসদ সদস্যরাই ভোটার হন এবং সংসদে কোনো একটি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তাহলে বাস্তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিসর খুব সংকুচিত হয়ে যায়। কারণ সংসদীয় দলের সিদ্ধান্তই ভোটের ফলাফলকে প্রায় নির্ধারণ করে দেয়। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনেক সময় জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের প্রতিফলন না হয়ে সংসদে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিফলনে পরিণত হতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গণতন্ত্রের মান। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন আয়োজনের নাম নয়। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো কার্যকর প্রতিযোগিতা, স্বাধীন মতপ্রকাশ, ভিন্নমতের মর্যাদা, জবাবদিহি এবং জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার।
একটি নির্বাচন আয়োজন করা হলো বলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থবহ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হয়ে যায় না। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা বাস্তব, ভোটাররা কতটা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন এবং নির্বাচনের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে কতটা অনিশ্চিত—এসব বিষয়ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—নির্বাচনটি আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় কি না, তা নয়; বরং বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে এই নির্বাচনকে কীভাবে আরও অর্থবহ করা যায়।
যদি নির্বাচনে দুজন প্রার্থী থাকেন, তাহলে তাঁদের সমানভাবে প্রচারের সুযোগ, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ, প্রার্থীদের যোগ্যতা ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এবং ভোটের প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ হারানোর ঝুঁকি থাকলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার বাস্তব সুযোগ কতটা থাকে—সেই প্রশ্নও আলোচনায় আসা দরকার।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ঘটনাটি তাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে দলীয় শৃঙ্খলা যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নির্বাচনকে অর্থবহ করার জন্য সংসদ সদস্যদের বিবেক, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার—রাষ্ট্রীয় অর্থ কোনো রাজনৈতিক দলের অর্থ নয়; এটি জনগণের অর্থ। নির্বাচন কমিশন কিংবা সরকারের যে অর্থ ব্যয় হয়, তার উৎস জনগণের কর ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব। তাই রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনেরও সর্বোচ্চ দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জয় নিশ্চিত জেনেও যদি একটি নির্বাচনের জন্য ব্যালট পেপার ছাপাতে হয়, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করতে হয়, কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে হয় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় করতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে ব্যয় কমানোর কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও ভাবা যেতে পারে।
তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। নির্বাচনকে শুধু ‘অপচয়’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির সাংবিধানিক গুরুত্ব খাটো করার ঝুঁকি থাকে। একটি নির্বাচন প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিত করে এবং সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে—এটিও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই সমাধান নির্বাচন বাতিল করা নয়; বরং এমন একটি নির্বাচনব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও স্বাধীন মতামতেরও মূল্য থাকে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন রাখে: গণতন্ত্র কি শুধু নিয়ম মেনে নির্বাচন সম্পন্ন করার নাম, নাকি জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয়, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং বাস্তব প্রতিযোগিতাও গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ?
যদি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কেই নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকে নির্ধারিত থাকে, তাহলে ভোট গ্রহণের আগে থেকেই যখন বিজয়ী প্রায় নিশ্চিত, তখন রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এই প্রশ্ন কোনো প্রার্থী বা কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে একটি নীতিগত প্রশ্ন।
অতএব, বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ সব সাংবিধানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন, যাতে নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের অর্থের প্রতি দায়িত্বশীল একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
কারণ গণতন্ত্রের মূল্য শুধু ভোটের সংখ্যায় নয়; গণতন্ত্রের মূল্য নির্ধারিত হয় ভোটের অর্থবহতা, স্বাধীনতা, প্রতিযোগিতা এবং জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার মাধ্যমে।
লিখেছেনঃ-খাইরুল মামুন মিন্টু, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী
No comments:
Post a Comment