গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন কেন জরুরি
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের(BGMEA) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৮.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০.৬২ শতাংশ।
কিন্তু যে শ্রমিকদের ঘাম, শ্রম ও দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে এই বিশাল রপ্তানি অর্থনীতি, তাদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা আজও অত্যন্ত কঠিন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা, যাতায়াত, খাদ্য ও অন্যান্য ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও শ্রমিকের মজুরি সেই হারে বাড়েনি। ফলে কাগজে-কলমে মজুরি বৃদ্ধি ঘটলেও বাস্তবে শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি।
এই বাস্তবতায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং জরুরি ভিত্তিতে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন এখন আর কেবল শ্রমিকদের দাবি নয়; এটি শিল্পের স্থায়িত্ব, উৎপাদনশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় প্রয়োজন।
২০১৮ সালে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ হাজার টাকা। দীর্ঘদিনের শ্রমিক আন্দোলন ও দাবির পর ২০২৩ সালে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে। সেখানে পোশাক শ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা আগের ৮ হাজার টাকার তুলনায় ৫৬.২৫ শতাংশ বেশি। নতুন কাঠামোতে বছরে ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির কথাও বলা থাকলেও ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ১৮ দফা একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সেখানে বছরে ৯ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির কথা বলা আছে।
২০২৩ সালে এই মজুরি নির্ধারণের সময়ই শ্রমিক সংগঠনগুলো ন্যুনতম মজুরি ২৩ হাজার টাকা দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১২ হাজার ৫০০ টাকাতেই ন্যুনতম মজুরি নির্ধারিত হয়।
এখন প্রশ্ন হলো—২০২৬ সালের বাস্তবতায় ২০২৩ সালে নির্ধারিত ১২ হাজার ৫০০ টাকা কি একজন শ্রমিক ও তার পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট? বাস্তব উত্তর হলো—না।
২০২৩ সালের পর তিন বছর ধরে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সামঞ্জস্য হয়নি। ফলে নামমাত্র মজুরি বৃদ্ধি হলেও প্রকৃত মজুরি বা প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
একজন পোশাক শ্রমিকের মজুরি দিয়ে শুধু তার নিজের জীবন চলে না। অধিকাংশ শ্রমিকের আয়ের ওপর নির্ভর করে একটি পরিবার। একজন শ্রমিককে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা, পোশাক, যাতায়াত এবং অন্যান্য সামাজিক প্রয়োজন মেটাতে হয়।
বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাকশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ২০২৫ সালের একটি ETI-BRAC University গবেষণার উদ্ধৃতি অনুযায়ী, RMG workforce-এর প্রায় ৫৩.৭ শতাংশ নারী। একই গবেষণায় ২০২৩ সালের মজুরি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিচ্যুতি, কাজের চাপ এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মতো সমস্যার কথাও উঠে এসেছে।
অতএব মজুরি বৃদ্ধি শুধু একজন শ্রমিককে বেশি টাকা দেওয়ার বিষয় নয়। এটি একটি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, সন্তানের শিক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কখনো কখনো বলা হয়, শ্রমিকের মজুরি বাড়লে কারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। এই যুক্তি একপাক্ষিক।
কারণ শ্রমিকের মজুরি কোনো অপ্রয়োজনীয় খরচ নয়; এটি উৎপাদনের অন্যতম মৌলিক উপাদান। একজন শ্রমিক যখন দীর্ঘদিন অপুষ্টি, বাসস্থানের সংকট, চিকিৎসার অভাব, ঋণের চাপ এবং পারিবারিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন, তখন তার কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ওপরও প্রভাব পড়ে।
ন্যায্য মজুরি শ্রমিকের মধ্যে কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়, দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখতে সাহায্য করে, শ্রমিকের চাকরি পরিবর্তনের প্রবণতা কমায় এবং শিল্পে স্থিতিশীলতা তৈরি করে।
অন্যদিকে কম মজুরি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং অনিশ্চিত চাকরি শ্রমিকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। এর ফল হতে পারে শ্রমিক অসন্তোষ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শ্রমিকের ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তন এবং শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা। সুতরাং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি আসলে শিল্পের ব্যয় নয়; এটি শিল্পের মানবসম্পদে বিনিয়োগ।
একটি মজুরি কাঠামো নির্ধারণের সময় শুধু মালিকের উৎপাদন ব্যয় কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতাকে বিবেচনা করলে হবে না। শ্রমিকের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়কেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
একজন শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তত কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি যেমন, খাদ্য ও পুষ্টির ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও ওষুধ, সন্তানের শিক্ষা, যাতায়াত, পোশাক ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের ব্যয়, পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের প্রয়োজন, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের ভবিষ্যৎ সঞ্চয় ও সামাজিক নিরাপত্তা।
অর্থাৎ মজুরি নির্ধারণে শুধু ‘শ্রমিক কত টাকা পেলে বেঁচে থাকতে পারবে’—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘একজন শ্রমিক ও তার পরিবার মানবিক মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করতে কত টাকা প্রয়োজন?’
বাংলাদেশের শ্রম আইনে নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৩ সালে তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল এবং সেই বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতেই ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারিত হয়।
কিন্তু মজুরি নির্ধারণ কোনো এককালীন ঘটনা হতে পারে না। অর্থনীতি পরিবর্তিত হয়, মূল্যস্ফীতি পরিবর্তিত হয়, উৎপাদনশীলতা পরিবর্তিত হয়, শ্রমবাজার পরিবর্তিত হয় এবং শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়ও পরিবর্তিত হয়। তাই শ্রম আইন অনুযায়ী তিন বছর পরপর নতুন করে মজুরি পর্যালোচনা করা অপরিহার্য।
২০২৩ সালে যে মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেটিকে নতুন বাস্তবতার আলোকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এই কাজের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, আইনসম্মত এবং অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান হলো নিম্নতম মজুরি বোর্ড।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করলেই হবে না। বোর্ডকে হতে হবে কার্যকর, স্বাধীন, প্রতিনিধিত্বশীল ও শ্রমিকবান্ধব।
বোর্ডে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—তিন পক্ষের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব যেন কেবল নামসর্বস্ব না হয়; প্রকৃত শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিকদের আস্থা রয়েছে এমন প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে বোর্ডকে শ্রমিক পরিবারের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে স্বাধীন গবেষণা করতে হবে। ঢাকা, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মিরপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক পরিবারের প্রকৃত ব্যয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কারণ শুধু রাজধানীভিত্তিক অফিসে বসে মজুরি নির্ধারণ করলে শ্রমিকের বাস্তব জীবন বোঝা সম্ভব নয়।
বর্তমান বিশ্বে শ্রমিকের মজুরি নিয়ে আলোচনায় ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এর অর্থ হলো—শ্রমিক শুধু ন্যূনতমভাবে বেঁচে থাকবে এমন মজুরি নয়; বরং শ্রমিক ও তার পরিবার যেন মানবিক মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করতে পারে এমন মজুরি।
বাংলাদেশের পোশাক খাত বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পোশাক সংগ্রহ করেন। ফলে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণের দায় শুধু স্থানীয় মালিক বা সরকারের ওপর সীমাবদ্ধ নয়। ক্রেতা-ব্র্যান্ড, সরবরাহকারী, সরকার ও শ্রমিক—সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা যেন শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়; বরং দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, মান এবং ন্যায্য শ্রমব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়—এটাই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
গার্মেন্টস শ্রমিকরা তাদের আয়ের বড় অংশই দেশে ব্যয় করেন। খাদ্য, বাসা, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাকসহ স্থানীয় বাজারে তাদের ব্যয় সরাসরি অর্থনীতিতে প্রবাহ সৃষ্টি করে।
অর্থাৎ শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি মানে শুধু শ্রমিকের আয় বৃদ্ধি নয়; এর মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে চাহিদা বাড়ে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবাখাত সক্রিয় হয় এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে।
অন্যদিকে শ্রমিকের আয় যদি ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে সঞ্চয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ সীমিত থাকে। তাই ন্যায্য মজুরি একটি সামাজিক বিনিয়োগ এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ।
বর্তমান সময়ে গার্মেন্টস খাতে শুধু মজুরি নয়, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারখানা বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা শ্রমিকদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারকে একদিকে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে শিল্পের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে।
কারখানা মালিকদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার, মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তাকে শিল্পনীতির কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।
মজুরি বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি—এই তিনটি একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া গেলে শিল্পের প্রতিযোগিতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
একজন দক্ষ শ্রমিক যদি তার দক্ষতার যথাযথ মূল্য না পান, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প সেই দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখতে পারবে না। তাই নতুন মজুরি কাঠামোর সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, গ্রেডভিত্তিক মজুরি এবং উৎপাদনশীলতার স্বচ্ছ মানদণ্ড তৈরি করা প্রয়োজন।
২০২৩ সালের মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের ওপর পরিচালিত গবেষণায় বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা এবং শ্রমিকের ওপর বাড়তি কাজের চাপের বিষয় উঠে এসেছে। তাই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পাশাপাশি মজুরি বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা প্রয়োজন।
প্রতিটি কারখানায়— নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র নিশ্চিত করা, সঠিক গ্রেড অনুযায়ী মজুরি দেওয়া, নিয়মিত বেতন পরিশোধ, ওভারটাইমের যথাযথ পারিশ্রমিক, বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি, উৎসব বোনাস ও অন্যান্য আইনগত পাওনা, চাকরির নিরাপত্তা এবং শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার— এসব নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আজ প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। একসময় যে শিল্প কয়েকশ কোটি ডলারের রপ্তানি দিয়ে শুরু করেছিল, সেটি এখন প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাতে পরিণত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট RMG রপ্তানি ছিল ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এই বিশাল শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কত বেশি পোশাক রপ্তানি করা যায় তার ওপর নয়; বরং কতটা নিরাপদ, দক্ষ, উৎপাদনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় তার ওপর। যে শিল্প শ্রমিকের শ্রমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করে, সেই শিল্পে শ্রমিকের জীবনযাপন যদি অনিশ্চিত থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে কয়েকটি বিষয় জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রথমত, অবিলম্বে তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বোর্ডে প্রকৃত ও গ্রহণযোগ্য শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বর্তমান বাজারদর, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক পরিবারের প্রকৃত ব্যয় এবং জীবনযাপনের ব্যয় বিবেচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। চতুর্থত, শুধু নামমাত্র মজুরি নয়, ‘লিভিং ওয়েজ’ বা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপযোগী মজুরির ধারণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। পঞ্চমত, মজুরি কাঠামোর সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় বা নিয়মিত সমন্বয় ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন, যাতে মূল্যস্ফীতি বাড়লে শ্রমিককে বছরের পর বছর নতুন মজুরি বোর্ডের অপেক্ষায় থাকতে না হয়। ষষ্ঠত, নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে কারখানাভিত্তিক কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সপ্তমত, মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ দেওয়া বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ, কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে।
গার্মেন্টস শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং শ্রমিকের মৌলিক মানবিক অধিকারের প্রশ্ন। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প যদি বিশ্ববাজারে তার অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তাহলে কম মজুরির ওপর নির্ভরশীল প্রতিযোগিতার পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দক্ষতা, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, ন্যায্য মজুরি এবং শ্রমিকের মর্যাদা—এই পাঁচটি ভিত্তির ওপর ভবিষ্যতের পোশাকশিল্প গড়ে তুলতে হবে।
২০২৩ সালে নির্ধারিত ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি আজকের বাস্তবতায় নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। সেই মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড।
অতএব এখন আর অপেক্ষা করার সময় নেই। গার্মেন্টস শ্রমিকদের বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অবিলম্বে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং সেই মজুরি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
কারণ শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে। আর শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
¬লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

No comments:
Post a Comment