বাংলাদেশের
অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো পোশাক শিল্প। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই
খাত থেকে, যা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। কিন্তু এই শিল্পের
মালিকদের একটি অংশ যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে, তখন এটি পুরো
খাতকেই এক অজানা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
যখন যে সরকার
ক্ষমতায় আসে, কিছু গার্মেন্টস মালিক সেই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে।
তারা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা, যেমন প্রণোদনা, নীতি সহায়তা এবং ঋণের সুবিধা পেতে
সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। অনেক ক্ষেত্রে, তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর
সমালোচনা করে এবং নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে গিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যও করেন।
এই ধরনের আচরণ সাময়িকভাবে তাদের ব্যবসায় লাভজনক মনে হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী
প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক।
সরকার
পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই রাজনৈতিক আনুগত্যের খেলা পাল্টে যায়। নতুন সরকার
ক্ষমতায় এলে, আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা প্রায়শই রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক
সংকটে পড়েন। তাদের ব্যবসার সুযোগ-সুবিধা কমে যায়, কখনো কখনো তাদের প্রতিষ্ঠানকে
নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। এর ফলে শুধু যে মালিকদের ব্যবসা সংকটে পড়ে তা
নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন ও জীবিকার ওপর। যখন একটি
কারখানা বা গ্রুপ রাজনৈতিক কারণে সংকটে পড়ে, তখন এর উৎপাদন ব্যাহত হয়, নতুন
বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বেক্সিমকো
গ্রুপ এবং নাসা গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো প্রায়শই এই ধরনের রাজনৈতিক
উত্থান-পতনের শিকার হয়। যদিও তাদের সাফল্য মূলত তাদের বাণিজ্যিক দক্ষতার ওপর
নির্ভরশীল, রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে তাদের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সময়ে
প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তাদের ব্যবসায়িক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ
নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, যা পুরো শিল্প খাতের জন্য এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।
পোশাক শিল্প
মালিকদের উচিত রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা, পণ্যের গুণগত
মান, এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর মনোযোগ দেওয়া। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং একটি
টেকসই ও স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ তৈরি করা তাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীলতা পরিহার করে যদি এই শিল্প নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে
পারে, তবেই এটি সত্যিকারের টেকসই এবং সমৃদ্ধ হবে। অন্যথায়, রাজনৈতিক ঝড়ের
প্রতিটি ধাক্কায় হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং দেশের
অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি দুর্বল হয়ে পড়বে।
লিখেছেনঃ
খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড
ইউনিয়ন কেন্দ্র

No comments:
Post a Comment