Followers

Thursday, September 25, 2025

পোশাক শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা: নাসা গ্রুপের কারখানা বন্ধের প্রভাব

 

পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই শিল্পের সামান্য অস্থিরতাও হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন-জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি নাসা গ্রুপ-এর আশুলিয়ার ১৬টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তটি তেমনই এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

নাসা গ্রুপ, যা ১৯৯০ সালে তাদের যাত্রা শুরু করার পর থেকে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে দেশের অন্যতম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক পোশাক ও টেক্সটাইল উৎপাদনকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। পোশাক উৎপাদন ছাড়াও ব্যাংকিং, রিয়েল এস্টেট, শেয়ার ব্রোকারেজ, শিক্ষা ও ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর বিশ্বখ্যাত ক্রেতা যেমন Sears, Kmart, Zara, Marks & Spencer-দের নিয়মিতভাবে পরিষেবা দিয়ে আসা এই গ্রুপের ৩৪টি কারখানায় কাজ করেন প্রায় ৩০ হাজার ৫ শত শ্রমিক। এই শ্রমিকদের জীবন চলে এই শিল্পকে কেন্দ্র করেই।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কারখানার টালমাটাল পরিস্থিতি

গত ৫ আগস্ট ২০২৪, সরকারের পটপরিবর্তনের পর নাসা গ্রুপের মালিক নজরুল ইসলাম মজুমদার গ্রেফতার হলে পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। মালিকের অনুপস্থিতিতে কারখানাগুলিতে টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে। সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে কলকারখানা প্রতিষ্ঠান ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে শ্রমিক নেতাদের উপস্থিতিতে এক চুক্তির মাধ্যমে আশুলিয়ার ১৬টি কারখানা ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

এই চুক্তিতে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি ১৫ থেকে ৩০ অক্টোবর এবং শ্রম আইনের ২০ ধারা মোতাবেক আইনানুগ পাওনা আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। এই চুক্তি আপাতত কিছু পাওনা মিটিয়ে দিলেও, এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক রাতারাতি বেকার হয়ে যাবেন, যা তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্যোগ নিয়ে আসবে। এই শ্রমিকরা সহজে বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজে পাবেন না, বিশেষত যখন এর আগে বেক্সিমকো কারখানাসহ আরও অনেকগুলো কারখানা বন্ধ হওয়ায় ইতিমধ্যেই প্রায় এক লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।

রাজনৈতিক কারণ ও অর্থনীতির ঝুঁকি

এই ধরনের বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত যখন আসে, তখন এর কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মালিকের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন, এত বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। অনেকেই মনে করছেন, কারখানা বন্ধের এই সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে নেওয়া হচ্ছে এবং সরকার কারখানাগুলি চালু রাখার জন্য কোনো বিকল্প পথ বা সমাধান খুঁজে দেখেনি

অভিযোগ রয়েছে, নাসা গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপের মালিকদের বিরুদ্ধে যেসব ঋণ সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা কার্যত দেশের অধিকাংশ গার্মেন্টস মালিকদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। গার্মেন্টস শিল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা একটি সাধারণ চিত্র, যেখানে নিজস্ব পুঁজি বলে কিছু নেই বললেই চলে। যদি রাজনৈতিক কারণে এভাবে একটার পর একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে থাকে, তবে তা শুধু বেকারত্ব নয়, দেশের পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে

সরকারের কাছে আবেদন: বিকল্প পথের সন্ধান হোক

বর্তমানে দেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা এক ভয়াবহ সংকটের মুখে। একদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে কর্মসংস্থান তৈরির ব্যর্থতা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হবে এই সমস্যার রাজনৈতিকীকরণ না করে, লক্ষাধিক শ্রমিকের জীবন বাঁচানোর জন্য অর্থনৈতিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া

এখনও সময় আছে। সরকারের উচিত, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নাসা গ্রুপের কারখানাগুলো চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রয়োজনে কারখানা পরিচালনার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হোক। দেশের প্রধান শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা এবং শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই শ্রমিকদের বেকারত্ব কোনোভাবেই অর্থনীতির জন্য সুসংবাদ হতে পারে না।

এই পরিস্থিতিতে সরকার কি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করে দ্রুত একটি কার্যকর সমাধানের পথ দেখাবে, নাকি দেশের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠীর পতন দেখতে হবে?

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Sunday, September 21, 2025

বেক্সিমকো গ্রুপের বন্ধ কারখানা: নতুন আশা, পুরোনো শ্রমিকদের অগ্রাধিকার

 

বেক্সিমকো গ্রুপের বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো আবার চালু হওয়ার খবরে নতুন করে আশা জেগেছে। জাপানের রিভাইভাল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইকোমিলি এই দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যৌথ বিনিয়োগে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে এই নতুন উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরোনো এক বিষণ্ণ অধ্যায় বেক্সিমকোর হাজারো চাকরিচ্যুত শ্রমিকের মানবেতর জীবন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার। অনেকের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে, কেউ কেউ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের জীবনের এই কষ্ট আমাদের সবার জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।

নতুন বিনিয়োগ ও কারখানার কার্যক্রম শুরু হওয়ার এই শুভক্ষণে, সরকারের পাশাপাশি বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষ এবং নতুন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, কারখানায় নতুন করে শ্রমিক নিয়োগের সময় যেন চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এই শ্রমিকরা কারখানার সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে যুক্ত ছিলেন, তাদের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা নতুন করে নিয়োগপ্রাপ্তদের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের এই অভিজ্ঞতা কারখানার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে।

চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা শুধু মানবিকতার দৃষ্টান্তই হবে না, বরং এটি একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নেরও প্রতিফলন ঘটাবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধুমাত্র পুঁজি বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশটির প্রতি সংবেদনশীলতাও প্রদর্শন করে।

আমরা আশা করি, সরকার, বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষ এবং নতুন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেবে যা হাজারো শ্রমিকের জীবনে আবার স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে এবং তাদের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Thursday, September 18, 2025

মনের কষ্টের আড়ালে একাকী পুরুষ

 

আমাদের জীবনে অনেক সময়ই এমন হয় যে, ভালো না থাকলেও অন্যের প্রশ্নের জবাবে জোর করে উত্তর দিতে হয়, 'আমি ভালো আছি'। এই যে ভালো না থাকার অভিনয়, নিজের মানসিক দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখার প্রবণতা এগুলো আসলে খুব অদ্ভুত। যখনই কেউ আমাদের খোঁজ নেয়, জানতে চায় কেমন আছি, আমরা খুব সহজভাবে কোনো কিছু না ভেবেই বলে ফেলি, 'ভালো আছি'। কারণ আমরা আসলে মুখ খুলতে বা সত্য বলতে ভয় পাই। আমরা ভালো থাকার ভান করি, সবকিছু চেপে রাখি আর এমনভাবে এগিয়ে যাই, যেন কিছুই হয়নি।

বিশেষ করে, এই প্রত্যাশার চাপ পুরুষদের ওপর অনেক বেশি। নারীরা 'আবেগপ্রবণ' হিসেবে পরিচিত হলেও অন্তত পরিচিত বা কাছের বন্ধুদের কাছে মনের সত্যিকারের ভাব প্রকাশ করতে পারেন এবং সেখানে আশ্রয়ও খুঁজে পান। কিন্তু পুরুষরা তাদের খুব কাছের মানুষের কাছেও মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন না। মনের কষ্টে দু'ফোঁটা চোখের জল ফেলাকে এখানে তুলনা করা হয় নিজের গোটা পুরুষত্ব খুইয়ে দেওয়ার সঙ্গে। এটাকে দেখা হয় লজ্জা এবং দুর্বলতার বিষয় হিসেবে। আমাদের সমাজে পুরুষকে সবসময় শান্ত, সংহত ও শক্তিশালী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে বাধ্য করা হয়। এমনকি যখন তারা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছেন, তখনও বাইরে থেকে শক্তপোক্ত দেখাতে হয়।

পৌরুষের নির্মম সংজ্ঞা

এই সংকটের মূলে রয়েছে সেই পুরোনো পুরুষতন্ত্র, যা পুরুষকে পরিবারের প্রধান হতে বাধ্য করে। পুরুষকে হতে বলে এমন এক স্তম্ভ, যা কোনো ঝড়ে ভেঙে পড়ে না। ছোটবেলা থেকেই আমরা ছেলেদের বলি, 'সত্যিকারের পুরুষ হয়ে ওঠো' বা 'ছেলেরা কখনো কাঁদে না'। হয়তো খুব পরিকল্পনা করে বা কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব কথা বলা হয় না। কিন্তু ছোটবেলা থেকে এসব শুনতে শুনতে একসময় পুরুষদের খুব গভীরে এগুলো প্রোথিত হয়ে যায়। ছেলেরা শেখে দুর্বলতা প্রকাশ করতে নেই, আর সময়ের সঙ্গে এটি তাদের জন্য নিয়মে পরিণত হয়। এই গোটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ছেলেরা শিখে যায়, পুরুষেরা কখনো কাঁদে না।

এক পর্যায়ে পুরুষ তার নিজের মানসিক চাহিদাগুলোকেই অস্বীকার করতে শুরু করে। ফলে এসবের জন্য থেরাপি নেওয়া বা ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলাপ করারও প্রসঙ্গ ওঠে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, নারীর তুলনায় পুরুষদের আত্মহত্যার হার দ্বিগুণ। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই আত্মহত্যায় মৃত্যুর ৮০ শতাংশই পুরুষ।

অন্যদিকে, এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় সহায়তা চাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষরা নারীদের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। ২০২২ সালে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩০ শতাংশ পুরুষ বলেছেন যে তারা হতাশা বোধ করলে কারো সঙ্গে তা নিয়ে খোলাখুলি আলাপ করেন। অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬০ শতাংশেরও বেশি। এটা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটা হলো পুরুষতন্ত্রের ব্যর্থতার দায়, যা যুগ যুগ ধরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে পুরুষদের ওপর।

আবেগ দমন: এক নীরব বিপদ

'পৌরুষ মানেই আবেগ নিয়ন্ত্রণ' এই ধারণাটি কেবল পুরোনোই নয়, বরং বিপজ্জনকও। যে পুরুষরা তাদের আবেগ চেপে রাখেন, তাদের মধ্যে রাগ, হতাশা ও অ্যালকোহলের ওপর নির্ভরতা বেশি দেখা যায়। এর ফলে বেশিরভাগ সময়ই তাদের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। সবচেয়ে খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় যখন এই চেপে রাখা আবেগ অন্যের প্রতি নির্যাতনের কারণ হয়, সহিংসতা সৃষ্টি করে বা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তৈরি করে মানসিক বিচ্ছিন্নতা। এসবই একটি শিশুর লালনপালনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং শৈশবের এই আঘাত বড় হওয়া পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়, যা তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলে।

বর্তমান পৃথিবীতে আবেগের প্রকাশকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। বার বার বলা হচ্ছে, মনের কথা প্রকাশ করতে, খুলে বলতে, প্রয়োজন হলে অন্যের সহায়তা চাইতে। এখন মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তারপরেও অনেক পুরুষ আটকে আছেন সেই নিষ্ঠুর মুখোশের আড়ালে।

নতুন সংজ্ঞা তৈরি করার সময়

এখন সময় এসেছে আবেগের প্রতি বিরূপ মনোভাব বন্ধ করার। কারণ এই আবেগই আসলে আমাদের মানুষ হিসেবে আলাদা করে তোলে। প্রথমেই আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে যে, এটি পুরুষতান্ত্রিকতার একটি সমস্যা, আর এটাই হলো এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম ধাপ। আমাদের ছেলেসন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, তাদের যেন এটা শেখানো না হয় যে আবেগের প্রকাশ মানে দুর্বলতা। বরং তাদের শেখাতে হবে কীভাবে নিজের আবেগকে প্রকাশ করতে হয়, সবার সামনে আবেগকে কীভাবে স্বীকার করে নিতে হয়।

আর সে কারণেই বিশ্বজুড়ে সব সংস্কৃতিতে পৌরুষের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করা দরকার। আমাদের ছেলেসন্তানদের শেখাতে হবে যে, শক্তি হলো সেটাই যা আত্মসচেতনতা সৃষ্টি করে। তাদের বলতে হবে, কান্না কারও চরিত্রের ব্যর্থতা নয়, এটি আঘাত বা বিষণ্ণতা প্রকাশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমাদের এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে পুরুষরা প্রাণ খুলে কথা বলতে পারবেন। অর্থাৎ, ক্লাসরুম, কর্মক্ষেত্র ও ঘর সবখানেই পুরুষদের মানসিক সততাকে স্বাগত জানানো হবে। তারা মন খুলে কথা বললে সেটা নিয়ে উপহাস করা হবে না। এর অর্থ হলো, বাবারা তাদের ছেলেসন্তানদের মনের কথা বলার জন্য খোলা জানালা দেবেন, বন্ধুরা নিজেদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য নিরাপদ ক্ষেত্র তৈরি করবে। এর অর্থ হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সবাই জানবে, বুঝবে যে পুরুষদেরও সহানুভূতি প্রয়োজন। পুরুষরাও অন্য সবার মতোই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়, যা খুবই স্বাভাবিক।

তাই এরপর যখন আপনার বা আপনার আশপাশের কোনো পুরুষের মানসিক যন্ত্রণা হবে, তখন তাকে 'আসল পুরুষ' হতে বলবেন না। কারণ ছেলেরাও কাঁদে এবং প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই তাদের কাঁদা উচিত।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, শ্রমিকনেতা

Wednesday, September 17, 2025

গার্মেন্টস মালিকদের রাজনৈতিক প্রভাব: শিল্পের ঝুঁকি ও শ্রমিকদের জীবন

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো পোশাক শিল্প। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে, যা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। কিন্তু এই শিল্পের মালিকদের একটি অংশ যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে, তখন এটি পুরো খাতকেই এক অজানা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।

যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, কিছু গার্মেন্টস মালিক সেই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে। তারা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা, যেমন প্রণোদনা, নীতি সহায়তা এবং ঋণের সুবিধা পেতে সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। অনেক ক্ষেত্রে, তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করে এবং নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে গিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যও করেন। এই ধরনের আচরণ সাময়িকভাবে তাদের ব্যবসায় লাভজনক মনে হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক।

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই রাজনৈতিক আনুগত্যের খেলা পাল্টে যায়। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে, আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা প্রায়শই রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সংকটে পড়েন। তাদের ব্যবসার সুযোগ-সুবিধা কমে যায়, কখনো কখনো তাদের প্রতিষ্ঠানকে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। এর ফলে শুধু যে মালিকদের ব্যবসা সংকটে পড়ে তা নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন ও জীবিকার ওপর। যখন একটি কারখানা বা গ্রুপ রাজনৈতিক কারণে সংকটে পড়ে, তখন এর উৎপাদন ব্যাহত হয়, নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

বেক্সিমকো গ্রুপ এবং নাসা গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো প্রায়শই এই ধরনের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের শিকার হয়। যদিও তাদের সাফল্য মূলত তাদের বাণিজ্যিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল, রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে তাদের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তাদের ব্যবসায়িক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, যা পুরো শিল্প খাতের জন্য এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।

পোশাক শিল্প মালিকদের উচিত রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা, পণ্যের গুণগত মান, এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর মনোযোগ দেওয়া। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং একটি টেকসই ও স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ তৈরি করা তাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীলতা পরিহার করে যদি এই শিল্প নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তবেই এটি সত্যিকারের টেকসই এবং সমৃদ্ধ হবে। অন্যথায়, রাজনৈতিক ঝড়ের প্রতিটি ধাক্কায় হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং দেশের অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি দুর্বল হয়ে পড়বে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Tuesday, September 2, 2025

শ্রমিকের রক্তে ভেজা একুশ শতকের বাংলাদেশ

 

বৈষম্যের শিকল ভেঙে অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকেরা যুগে যুগে জীবন দিয়েছেন। তবুও রাষ্ট্রের চোখে তারা যেন মানুষ হিসেবে গণ্য হতে পারেন না, রয়ে যান কেবলই ‘শ্রমিক’ হয়ে। এই অমানবিক বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে এভারগ্রিন প্রোডাক্টস ফ্যাক্টরি বিডি লিমিটেডের (হংকং) শ্রমিক আন্দোলনে। নিজেদের ন্যায্য অধিকার অবৈধভাবে ছাঁটাই বন্ধ, বন্ধ কারখানা চালু করা এবং অন্যান্য ২৩ দফা দাবীর জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে শ্রমিকেরা যৌথবাহিনীর নির্বিচার গুলির শিকার হয়েছেন। এই বর্বর আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন হাবিবুর রহমান নামের একজন শ্রমিক এবং গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও প্রায় ১২ জন।

হাবিবুর রহমান, যিনি নীলফামারী সদর উপজেলার কাজিরহাট গ্রামের দুলাল হোসেনের ছেলে, তার অপরাধ কী ছিল? তিনি তো কেবল তার কাজের ন্যায্যতা চেয়েছিলেন। যে শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে কারখানার চাকা সচল রাখে, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সেই শ্রমিকের জীবন কি উৎপাদিত পণ্যের চেয়েও সস্তা? রাষ্ট্রের আচরণ দেখে এমন প্রশ্নই বারবার মনের মধ্যে উঁকি দেয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল দায়িত্ব ছিল শ্রমিকদের দাবীগুলো নিয়ে মালিকপক্ষের সাথে একটি আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু তারা তা না করে উল্টো শ্রমিকদের উপর গুলি চালিয়েছে। এমন ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সরকারের আমলে শ্রমিকেরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বুলেটের শিকার হয়েছেন। এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস আবারও প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে শ্রমিকের জীবন তুচ্ছ।

একটি কারখানার মূল্য, তার উৎপাদিত পণ্যের মূল্য এসবের চেয়ে একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্য অনেক বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না। এই বৈষম্য আর অবজ্ঞার কারণেই শ্রমিকেরা বারবার প্রাণ হারাচ্ছেন, আর এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হচ্ছে না।

শ্রমিকের রক্ত ঝরছে, কিন্তু তার অধিকারের পথ এখনও মসৃণ হয়নি। এই নির্মম বাস্তবতা কি বদলাবে না? রাষ্ট্র কি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি, অর্থাৎ শ্রমিকদের, মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে শিখবে না? যতদিন এই প্রশ্নের উত্তর না মিলছে, ততদিন শ্রমিকদের লড়াই চলবে, আর ঝরতে থাকবে তাদের রক্ত।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন ও দর কষাকষি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

নিজস্ব জগৎ

  নিজস্ব জগৎ প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে — যেখানে ঢোকার চাবি কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না। সে জগৎ একান্ত , নীরব , নিজের ম...