Followers

Monday, December 22, 2025

একজন শ্রমিককে এভাবে অমানবিকভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়

 

ময়মনসিংহের ভালুকায় পাইওনিয়ার নিটওয়্যার গার্মেন্টসের শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকল অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার আমরা জোরালোভাবে দাবি করছি। একই সঙ্গে নিহত দীপু চন্দ্র দাসের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। একজন শ্রমিককে এভাবে অমানবিকভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে শ্রমিকসমাজ ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। যদি এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকে, তবে সমাজে কেউই নিরাপদ থাকবে না। তাই অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের আশু বিচার নিশ্চিত করা জরুরি

কারখানার মালিকের মৌলিক দায়িত্ব হলো তার অধীনস্থ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এ ঘটনায় মালিক চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। শ্রমিককে সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে তাকে মবের মুখে ঠেলে দিয়ে এমন একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের পথ সুগম করা হয়েছে। এই দায় মালিক কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য মালিককেও দায় বহন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনের আওতায় আনতে হবে

ধর্মের নামে, ‘কাফের’ ফতোয়া দিয়ে শ্রমিকের ওপর হামলা এবং নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের উগ্রতা ও সহিংসতা চলতে থাকলে সমাজে কোনো মানুষেরই নিরাপত্তা থাকবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় অত্যাচারী শাসন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ করেছে এবং পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। আজ আবারও শ্রমিকের ওপর সংঘটিত এই নির্মমতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ সংগঠিত করতে হবে

দীপু চন্দ্র দাসের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন শ্রমিক। শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকার কারণেই তাকে এমন মর্মান্তিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এ দেশের শিল্পব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে

আমাদের সুস্পষ্ট ও দৃঢ় দাবি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকলকে অবিলম্বে বিচারের আওতায় আনতে হবে, নিহতের পরিবারের জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে

KM Mintu

Saturday, December 20, 2025

নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা

 


একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাথমিক এবং প্রধান শর্ত হলো তার প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ময়মনসিংহের ভালুকায় শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ রাষ্ট্রের সেই মৌলিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে

ভালুকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারসে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং তা সমাজের এক গভীর ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষকে কেবল ‘অভিযোগের’ ভিত্তিতে কারখানার ভেতরে ও বাইরে পিটিয়ে হত্যা করা এবং পরবর্তীতে মহাসড়কে তার লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এটি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। এই বর্বরোচিত ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক ভয়ানক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা মূলত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ওপর অনাস্থারই ফল

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৪ মাসে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনিতে যে পরিমাণ প্রাণহানি ঘটেছে, তা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যখন একের পর এক মাজারে হামলা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে আগুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে, তখন রাষ্ট্রের 'নীরব দর্শক' ভূমিকা তার প্রশাসনিক ব্যর্থতাকেই স্পষ্ট করে তোলে

রাষ্ট্র যদি কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে টিকে থাকে কিন্তু তার নাগরিকের জীবনের গ্যারান্টি দিতে না পারে, তবে সেই কাঠামোর নৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি চর্চা এবং ভিন্নমতের ওপর ক্রমাগত আক্রমণগুলো প্রমাণ করে যে, আইনের শাসনের বদলে পেশিশক্তির শাসন জেঁকে বসছে

ভালুকার সেই শ্রমিকের রক্ত এবং মহাসড়কে জ্বলা আগুন কেবল একজনের মৃত্যু নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক নিরাপত্তার ব্যর্থতার স্মারক

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে বিলম্ব করে, সেই রাষ্ট্রে অরাজকতা স্থায়ী রূপ নেয়। বর্তমান সরকারকে কেবল আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা এবং মব ভায়োলেন্স এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই পারে রাষ্ট্রের হারানো নৈতিক বৈধতা পুনরদ্ধার করতে

KM Mintu 

Friday, December 19, 2025

রাষ্ট্র কি তার নাগরিকের জীবন রক্ষার অধিকার হারিয়েছে?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় জনগণের সামনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আইনের শাসন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। আজ বাংলাদেশে মানুষ মারা যাচ্ছে বন্দুকযুদ্ধে, রাজনৈতিক সংঘাতে, গণপিটুনিতে আর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে নীরব দর্শকের ভূমিকায়। প্রশ্ন একটাই: এই রক্তপাতের দায় কে নেবে?

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম ১৪ মাসে (আগস্ট ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর মাঝামাঝি সময়) অন্তত ৪০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু যা সরাসরি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়, তখন সেটি আর বিচ্যুতি থাকে না তা হয়ে ওঠে শাসনব্যবস্থার চরিত্র

একই সময়ে রাজনৈতিক সংঘাতে অন্তত ২৮১ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। গুলি, অগ্নিসংযোগ, গণপিটুনি মৃত্যুর ধরন আলাদা করে হিসাব করা কঠিন হলেও একটি সত্য পরিষ্কার: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে ব্যর্থ। মতভিন্নতা দমনের ভাষা হয়ে উঠেছে লাঠি, আগুন ও মৃত্যু

এই ব্যর্থতার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পেয়েছে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনিতে। মাত্র ১৪ মাসে ১৫৩ জন মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয় এটি রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ। যখন মানুষ বিচার নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন বোঝা যায় রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা পরিত্যাগ করেছে

এর সর্বশেষ ও হৃদয়বিদারক উদাহরণ ময়মনসিংহের ভালুকা। ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানার ভেতর ও বাইরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়শুধু তাই নয় কারখানার সামনে ঢাকাময়মনসিংহ মহাসড়কের জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় তাঁর লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়এই ঘটনা কোনো আকস্মিক উন্মত্ততা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার চরম বহিঃপ্রকাশ। যেখানে একজন শ্রমিক কারখানায় নিরাপদ নয়, সেখানে ‘উন্নয়ন’ ও ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দগুলো কেবল রাজনৈতিক ভণ্ডামি

এতেই শেষ নয়। এই সময়কালে বিভিন্ন স্থাপনা দখল, মাজার, রিসোর্ট, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। সর্বশেষ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং ছায়ানট ভবনে হামলা ও আগুন এটি কেবল সম্পদের ক্ষতি নয়, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আক্রমণ

এই ঘটনাগুলো কি বিচ্ছিন্ন? না। এগুলো একটি সুসংগঠিত ব্যর্থতার ফল যেখানে সরকার আইন প্রয়োগে অক্ষম, রাজনৈতিকভাবে দিকনির্দেশনাহীন এবং নৈতিকভাবে দেউলিয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে না পারলে, বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে, তাহলে তার অস্তিত্বের নৈতিক বৈধতা কোথায়?

রাষ্ট্র যদি নাগরিকের জীবন রক্ষা করতে না পারে, রাষ্ট্র যদি ধর্ম, রাজনীতি বা গুজবের নামে মানুষ পিটিয়ে মারার দায় এড়ায়, রাষ্ট্র যদি সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির ওপর হামলার সময় নিশ্চুপ থাকে তাহলে সেটি আর রাষ্ট্র থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ব্যর্থ এক প্রশাসনিক কাঠামো

এই সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে ইতিহাস এই সময়কে চিহ্নিত করবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামল হিসেবে নয়,
বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও নীরব রক্তপাতের সময়কাল হিসেবে

KM Mintu


Monday, December 15, 2025

যখন নীরবতাই হয় ভালোবাসার ভাষা

 

পৃথিবীতে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। কেউ কেউ কথার মালায় ভালোবাসাকে সাজাতে পছন্দ করেন, আবার কেউ কেউ আছেন যারা মৌনতাকেই বেছে নেন শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে। বিশেষ করে অনেক পুরুষ আছেন, যাঁদের কাছে 'ভালোবাসি' শব্দটা উচ্চারণের চেয়েও বড় হলো সেই ভালোবাসাকে যাপন করা। তাঁদের এই অব্যক্ত অনুরাগ কখনো কখনো হাজারো কবিতার চেয়েও বেশি কাব্যময়

যিনি মুখে বলতে পারেন না, তাঁর চোখ কিন্তু মিথ্যে বলে না। ভিড়ের মাঝে প্রিয় মানুষটির দিকে রাখা এক পলক লাজুক দৃষ্টি কিংবা আড়াল থেকে করা পর্যবেক্ষণএসবই বুঝিয়ে দেয় সেই অদৃশ্য টান। যেখানে শব্দ ব্যর্থ হয়, সেখানে এক চিমটি লজ্জা মেশানো চাহনিই বলে দেয় মনের সব জমানো কথা

অব্যক্ত প্রেম প্রকাশ পায় ছোট ছোট অভ্যাসে। রাস্তা পার হওয়ার সময় আলতো করে আগলে রাখা, মন খারাপের দিনে প্রিয় কোনো খাবার নিয়ে আসা, কিংবা অসুস্থতায় শিয়রে বসে থাকাএই কাজগুলো কোনো বিশেষ দিবসের সংলাপে সীমাবদ্ধ নয়। এই ছোট ছোট যত্নগুলোই প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল পাশে থাকার জন্য নয়, বরং ভালো রাখার জন্য পাশে আছেন

কথার ফুলঝুরি সাজানো মানুষটি হয়তো বিপদের সময় দূরে সরে যেতে পারেন, কিন্তু যিনি নিঃশব্দে ভালোবাসেন, তিনি মূলত এক প্রকাণ্ড বটবৃক্ষ। তাঁর ভালোবাসা শব্দের চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য। কারণ তা লুকিয়ে থাকে কঠিন সময়ে শক্ত করে হাত ধরার সাহসে এবং একনিষ্ঠ ভরসায়

মানুষ যখন খুব বেশি ভালোবাসে, তখন অনেক সময় শব্দরা ভাষা হারিয়ে ফেলে। এই নীরবতা কোনো অবহেলা নয়, বরং এক ধরনের পরম মমতা। এই না-বলা ভালোবাসাগুলো অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং গভীর হয়, কারণ এতে কোনো কৃত্রিমতা বা লোকদেখানো আড়ম্বর থাকে না

ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সবসময় শব্দের প্রয়োজন হয় না। যারা আচরণে, দৃষ্টিতে আর নিভৃত যত্নে ভালোবাসা বিলিয়ে দেন, তাঁদের প্রেম অনেক বেশি টেকসই। তাঁদের সেই নীরব স্পর্শ আর অদৃশ্য মমত্বই জীবনকে করে তোলে সুন্দর ও ভরসাপূর্ণ। তাই মনে রাখবেন, 'ভালোবাসি' না বলা মানুষটিই হয়তো আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন

KM Mintu

Tuesday, December 2, 2025

বৈষম্য দূর না হওয়া এবং গণছাঁটাই: সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের বর্তমান সংকট

বাংলাদেশের প্রধান পোশাক শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং পরবর্তী গণছাঁটাইয়ের ঘটনা পোশাক শিল্পে এক গভীর মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে শ্রমিকরা জীবন দিলেও, ৫ আগস্টের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একদিকে যেমন শ্রমিকের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর হয়নি, তেমনই অন্যদিকে ব্যাপক হারে কারখানা বন্ধ ও বেআইনী ছাঁটাইয়ের কারণে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের 'শ্রমিক বৈষম্য দূরীকরণ' এবং 'নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির' প্রতিশ্রুতির বিপরীতে, এই অঞ্চলে এখন বিরাজ করছে চরম অনিশ্চয়তা ও নীরব নির্যাতন

গণছাঁটাইয়ের চিত্র ও বেকারত্বের ভয়াবহতা

৫ আগস্টের পর ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে ২৩টিরও বেশি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা যায়। এই হঠাৎ বন্ধ ও বেআইনীভাবে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতিতে প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক সরাসরি বেকারত্বের শিকার হয়েছেন

শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ও মানবিক সংকট

চাকরি হারানো এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের জীবন এখন অর্ধাহারে-অনাহারে কাটছে। বেকার শ্রমিকরা প্রতিদিন বিভিন্ন কারখানার গেটে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন, যা এই শিল্পাঞ্চলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে

১. অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা: চাকরিচ্যুত শ্রমিকরা সঞ্চয় ভেঙে, জিনিসপত্র বিক্রি করে এবং ঋণের মাধ্যমে দিন পার করছেন। অনেকেই ঘরভাড়া দিতে পারছেন না, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম হয়েছে

২. নিম্ন মজুরিতে কাজ: বাধ্য হয়ে অনেকেই তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক কম মজুরিতে কাজ নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মান আরও নামিয়ে দিয়েছে

৩. মানসিক ও পারিবারিক চাপ: বেকারত্বের কারণে শ্রমিক পরিবারগুলোতে চরম হতাশা ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে

আন্দোলন দমনে হত্যা ও নিরব নির্যাতন

শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করার সময় ৩ জন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে, যা এই শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অধিকারের পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বর্তমানে কারখানার ভেতরেও এক ধরনের 'নিরব নির্যাতন' চলছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • শ্রমিকদের সক্ষমতার বাইরে মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ
  • ন্যায্য ছুটি না পাওয়া
  • যখন তখন চাকরি হারানোর ভয়
  • শ্রমিকদের সাথে অসৌজন্যমূলক ও খারাপ আচরণ
  • 'কালো তালিকা' তৈরি: চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা অন্য কোনো কারখানায় চাকরি না পায়যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগকে স্থায়ীভাবে রুদ্ধ করে দিচ্ছে

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের ফারাক

অন্তর্বর্তী সরকার শ্রমিকদের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিলেও, সাভার-আশুলিয়ার বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্যাপক হারে কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই কেবল শ্রমিকদের অধিকারকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পোশাক খাতকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, শ্রমিকদের জীবন দিয়ে অর্জিত আন্দোলনের ফলেও বৈষম্য দূর হয়নি, বরং তাদের জীবনে নেমে এসেছে আরও কঠোর ও অনিশ্চিত বাস্তবতা

এই পরিস্থিতিতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালু করার মাধ্যমে শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহাল নিশ্চিত করা অপরিহার্য

খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

নিজস্ব জগৎ

  নিজস্ব জগৎ প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব জগৎ থাকে — যেখানে ঢোকার চাবি কারও হাতে সহজে তুলে দেওয়া হয় না। সে জগৎ একান্ত , নীরব , নিজের ম...