বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হলো তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়ে আসছে যে এই শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই শিল্প কি সত্যিই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং বিশেষ করে শ্রমিকদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে?
আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত। কর্মজীবনের শুরুতে আমি একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলাম। বর্তমানে শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে কাজ করছি। এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। আমি কোনো গার্মেন্টস মালিককে কখনও বলতে শুনিনি যে তিনি এই শিল্পে ব্যবসা করে খুব লাভবান হয়েছেন এবং খুব ভালো আছেন। একইভাবে কোনো শ্রমিককেও বলতে শুনিনি যে তিনি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করে সুখে ও স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে—এই শিল্পের প্রকৃত লাভবান কারা?
প্রতিবার যখন শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি ওঠে, তখন গার্মেন্টস মালিকরা তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু একই সময়ে আমরা দেখি, বিভিন্ন সংকটের মুহূর্তে মালিকরা সরকারের কাছে বিশেষ প্রণোদনা, স্বল্পসুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং নানা ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করেন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, করোনা মহামারির সময় গার্মেন্টস শিল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো অজুহাতে বারবার সরকারকে বিশেষ সহায়তা দিতে হয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের জন্যও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা নেওয়া হয়েছে। তারপরও দেখা যায় অনেক শ্রমিক তাদের ন্যায্য বেতন ও বোনাসের দাবিতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন।
এই বাস্তবতা থেকে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প কি আসলেই একটি শক্তিশালী ও লাভজনক শিল্প, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি প্রণোদনা-নির্ভর শিল্পে পরিণত হয়েছে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মালিকদের জীবনযাত্রা ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মধ্যে বিশাল বৈষম্য। একদিকে মালিকরা প্রায়ই ব্যবসার দুর্দশার কথা বলেন, অন্যদিকে তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে সেই কথার সাথে বাস্তবতার অনেক সময় মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সময় বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও সামনে এসেছে, যা এই খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন ও অনিশ্চিত। কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব—সব মিলিয়ে তাদের জীবন প্রায়ই সংগ্রামময়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে বর্তমান মজুরিতে অনেক শ্রমিক প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ক্যালোরি গ্রহণ করতে পারেন না। ফলে অপুষ্টি, শারীরিক দুর্বলতা এবং নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় তারা ভুগে থাকেন।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—শ্রমিকদের মজুরি কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃদ্ধি করা হয়নি। ইতিহাস বলে, প্রতিবার মজুরি বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের জন্য শ্রমিকদের জীবন দিতে হয়েছে, মামলা-হামলার শিকার হতে হয়েছে, এমনকি চাকরিও হারাতে হয়েছে।
তবুও এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে গার্মেন্টস শ্রমিকরাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের শ্রম, ঘাম এবং ত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের এই বিশাল শিল্পখাত।
সুতরাং আজ সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—গার্মেন্টস শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন কাকে বলা হবে? শুধু রপ্তানি আয় বাড়লেই কি উন্নয়ন হবে, নাকি সেই উন্নয়নের সুফল শ্রমিকদের জীবনেও পৌঁছাতে হবে?
একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, শ্রমিকদের বাদ দিয়ে কোনো শিল্পের উন্নয়ন কখনোই সত্যিকারের উন্নয়ন হতে পারে না।
KM Mintu

