Followers

Tuesday, August 26, 2025

গ্রাম থেকে শহরে মানুষের জীবন: নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য ও স্বৈরশাসনের বাস্তবতা

 

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদ দীর্ঘদিন ধরে শহরমুখী অভিবাসনের চাপে ভুগছে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, কৃষিজীবনের অনিশ্চয়তা এসব কারণেই মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছে। কিন্তু শহর তাদের জন্য কোনো মুক্তির ঠিকানা হতে পারেনি। বরং শহরে এসে তারা নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা, হতাশা এবং অশান্তির মধ্যে ডুবে গেছে।

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হলো বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধি। একটি সাধারণ পরিবার যে আয়ে জীবন-যাপন করে, তা দিয়ে প্রতিদিনের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। শ্রমজীবী ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো অর্ধাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে শিশুদের পুষ্টিহীনতা, শিক্ষার ব্যাঘাত এবং পারিবারিক টানাপোড়েন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।

অন্যদিকে, ধনী শ্রেণি ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ভোগ-বিলাসের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে চলেছে। সমাজে বৈষম্যের এমন চিত্র আজ এতটাই প্রকট যে, শহরের এক প্রান্তে মানুষ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, অন্য প্রান্তে অল্পসংখ্যক ধনী শ্রেণি অঢেল সম্পদ ভোগ করছে।

মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু আজ সেই অধিকার ভয়ঙ্করভাবে খর্ব হয়েছে। সাধারণ মানুষ নিজের কষ্ট, ক্ষোভ বা প্রতিবাদ প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছে। কারণ, কোনো সমালোচনা বা ভিন্নমত প্রকাশ করলেই হয়তো অজানা নিপীড়নের শিকার হতে হবে। এই ভয়ের সংস্কৃতি মানুষের মনে গভীর হতাশা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনকে বিদায় জানিয়েছিল। মানুষ ভেবেছিল, এর মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মাত্র এক বছরের মাথায় সেই জনগণের বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার পরিবর্তে তারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বদলে তারাও স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট শাসনের পথে হাঁটছে।

বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ধনীকুল ও বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করছে। ফলে সাধারণ মানুষ, শ্রমিক-কৃষক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক খাতে কোনো উন্নয়ন নেই, বরং শোষণ ও বৈষম্য দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।

আজ মানুষ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও বন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের বাঁচার অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার, সংগঠিত হওয়ার অধিকার সবকিছুই সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত মুক্তি এখনো অর্জিত হয়নি।

বাংলাদেশে যে বৈষম্যের চিত্র আমরা দেখি, তা কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও বটে। ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী যেই সরকারই থাকুক না কেন প্রকৃতপক্ষে জনগণের প্রতিনিধি নয়, বরং অভিজাত শ্রেণি, ধনিক গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক স্বার্থবাদী শক্তির প্রতিনিধি।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসন মানুষকে দমিয়ে রেখেছিল। কিন্তু জনগণ যখন আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে সেই ফ্যাসিস্ট শাসনকে বিদায় দিল, তখন প্রত্যাশা ছিল একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মাত্র এক বছরের মধ্যেই সেই প্রত্যাশাকে ধূলিসাৎ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা মুখে বললেও তারা বাস্তবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সাথে আপস করেছে।

ফলাফল স্বৈরতন্ত্রের নতুন রূপ। শুধু সরকারের নাম পাল্টেছে, চরিত্র পাল্টায়নি। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনের দমননীতি, শ্রমিক আন্দোলনের দমন, বাকস্বাধীনতার সংকোচন সবই পূর্ববর্তী শাসনের মতোই চলছে।

বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যখন মানুষ নিপীড়িত হয়, তখন তারা সংগঠিত হয়ে নতুন মুক্তির পথ খুঁজে নেয়। আজকের প্রেক্ষাপটে সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব আবারও জনগণের কাঁধে এসে পড়েছে। শোষণমুক্ত সমাজ, প্রকৃত গণতন্ত্র এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে এগিয়ে আসতে হবে।

আজকের বাংলাদেশে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের জীবন সংগ্রাম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হয়নি, হচ্ছে না। দরকার হলো প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তর, যেখানে সাধারণ মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। মানুষকে মুক্তির সেই সংগ্রামে আবারো নতুন করে প্রস্তুত হতে হবে।

খাইরুল মামুন মিন্টু, আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

No comments:

Post a Comment

মহান মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বাংলাদেশের প্রত্যাশা

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে মহান মে দিবস এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্...